শুচিস্মিতা
কাকলি ঘোষ
একমনে প্রতিমার মুখের দিকে চেয়েছিলেন রাজেন তরফদার। কই ?! মায়ের মুখের সেই ভাবটি তো ফোটাতে পারেনি মধুসূদন ! অন্য সকলের চোখে ধরা না পড়লেও তার চোখ এড়িয়ে যেতে পারে নি। নাহ্ বংশীধর পালের হাতের সেই জাদু নেই তার ছেলের হাতে। ক্রোধদীপ্ত আয়ত নয়ন অথচ অধরে সুস্মিত হাসি। এই হল তরফদার বাড়ির প্রতিমার রূপ। বছরের পর বছর এমনটিই হয়ে আসছে। বংশী জানত। বংশী পারত। কিন্তু এ বছর আর —-
একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে ভেতর থেকে। মাত্র কদিনের জ্বরে হঠাৎ চলে গেলো বংশী। প্রায় চল্লিশ বছরের পুরানো লোক তরফদার বাড়ির। মনটা বিষাদে ছেয়ে গেল আবার। প্রায় তারই সমবয়েসি বংশী। সেই কোন ছেলেবেলায় বাবার হাত ধরে এ বাড়িতে এসেছিল ! তখন এই এতটুকু ! অন্তরঙ্গতা হতে সময় লাগে নি। তারপর লেখাপড়ার তাগিদে তাকে যেতে হল বাইরে আর বাবা কৃষ্ণধন পালের হাতে হাতে মাটির জোগাড় দিতে দিতে নিজেই একদিন মুর্তি গড়তে শিখে গেল বংশী। তারপর থেকে তো এই এত বছর বংশীধর পালের হাতের দুর্গা প্রতিমাই পুজো পেয়ে আসছে এ বাড়িতে। এই প্রথম ব্যতিক্রম ! বংশীর মৃত্যুর খবর পেয়ে এ বছর পুজো বন্ধ করে দেবার কথাই ভেবেছিলেন রাজেন তরফদার। কিন্তু আপত্তি উঠল অন্দর মহল থেকে। বচ্ছরকার পুজো বন্ধ করা হবে কেন ? এতে অমঙ্গল হতে পারে। তাছাড়া এই ছোট্ট গ্রামে এই একটাই তো পুজো ! সারা বছর এখানকার মানুষ গুলো আশা করে বসে থাকে এই দিন গুলোর জন্য। নবমীর মাংস ভাত পাবার আশায় থাকে গরীব , প্রায় অভুক্ত মানুষগুলো। সেটা থেকে তাদের বঞ্চিত করা উচিত কি ?
যুক্তি মেনে নিয়েছেন রাজেন তরফদার। মুর্তি গড়ার দায়িত্ব দিয়েছেন বংশীর বড় ছেলে মধুসূদনকে। কাল ষষ্ঠীর বোধন হয়ে গেছে। আজ সপ্তমী। সকাল থেকে দলে দলে আসছে সব। কারুর হাতে পদ্মপাতায় সকালের টাটকা শিউলি ফুল, কেউ নিয়ে এসেছে গাছের পেয়ারা, মাচার শসা। বাগদি পাড়া থেকে কোন সকালে এসে এক ঝুড়ি পদ্ম রেখে গেছে মাতুর মা। পুজোর দালানে বসে হাসিমুখে সেসব সামলাচ্ছেন মেজকর্তা ব্রজেন।আজ মহাসপ্তমীর ভোগ। কমসে কম তিন চারশো লোকের পাত পড়বে দুপুরে। কর্মযজ্ঞ একেবারে। ওদিককার দায়িত্বে আছেন দ্বিজেন। এবাড়ির ছোট জন। ভট্টাচার্য মশাই বসে পড়েছেন আসনে। পুজো শুরুর দেরী নেই আর। দালানের অন্য দিকটায় একবার অলস চোখ বুলিয়ে নিলেন রাজেন। প্রভাময়ী বসে গেছেন বাড়ির বউ মেয়েদের নিয়ে। ফল কাটা , নৈবেদ্য সাজানো প্রায় শেষের মুখে।
পুজো শুরুর কদিন আগে থেকেই নাড়ু বানানোর কাজ শুরু হয়েছিল। মস্ত তামার টাটে চুড়ো করে রাখা সেই নাড়ু আজ বিলোনো হবে প্রসাদের সাথে। সব আয়োজন নিখুঁত। সম্পূর্ণ। শুধু বংশী টাই নেই।
একটা ছোট্ট নিশ্বাস ফেলে পিছন ফিরলেন রাজেন। চোখ তুলে তাকাতেই চোখে পড়ল উদ্বিগ্ন মুখে দাঁড়িয়ে গোপাল সামন্ত। কী হল আবার ? কোন ঝামেলা নাকি? এমনিতে এদিককার সবকিছুর দায়িত্বে গোপালই থাকে। এই বাড়ি ঘর দোর সাফ সুতরো করা, বিষয় সম্পত্তি, জায়গা জমি বজায় রাখা, চাষ বাসের দেখা শোনা এমন কি এই পুজোর জোগাড় যন্তরও গোপালেরই ঘাড়ে। তারা তো শুধু বছরের এই কটা দিন এখানে আসেন। সত্যি বলতে কি গোপাল না থাকলে পুজো দূরের কথা বাড়িটাও বাসযোগ্য থাকতো কি সন্দেহ।
কী ব্যাপার ? দ্রুত ঠাকুর দালান থেকে নেমে সামনে এগোলেন রাজেন।
” একটা মুশকিল হয়েছে বড় বাবু __”
মুশকিল যে হয়েছে সে তো বুঝেইছেন। কিন্তু কী ? “সনাতন হাজরার মেজ মেয়েটা পুজো বাড়িতে এসে হাজির হয়েছে। আর তাই নিয়ে শুরু হয়েছে ঝামেলা। “
এক পলকের জন্য ভ্রু কুঞ্চিত করেও নিজেকে সামলে নিলেন রাজেন তরফদার। সনাতন হাজরা ! শুনেছিলেন বটে গোপালের মুখে। যার মেয়ে —
নিমেষের মধ্যে প্রশ্ন পড়ে ফেলে ঘাড় হেলালো গোপাল সামন্ত।
” হ্যাঁ বড় বাবু। এদিকে ওকে দেখেই হুজ্জতি শুরু করছে ওই বিশ্বনাথ নন্দীর লোকজন। “
” বিশ্বনাথ ! মানে বিশু নন্দী?”
” হ্যাঁ । ওরা ওকে ঢুকতে দেবে না ভেতরে। আর সে মেয়েটাও তেমনি বেহায়া ! নির্লজ্জের মত গলা ফাটিয়ে ঝগড়া করছে। একেবারে বিশ্রী ব্যাপার। “
ঘটনাটা জানেন রাজেন। সনাতন হাজরা গরীব লোক। এদিকে ঘরে ছেলেপুলেও একগাদা। জমি জায়গা কিছু যাও বা ছিল এক সময় __দেনার দায়ে সেসব বিক্রি বাটা হয়ে গেছে অনেক দিন। অন্ন জোটে না। বড় মেয়েটা কাজের খোঁজে শহরে গিয়ে বেপাত্তা। বড় ছেলেটা দিন মজুরের কাজ করে বটে কিন্তু সে আর কত টুকু ? ইদানিং মেজ মেয়েটাও সাজ গোজ করে শহরে যাওয়া শুরু করেছে। আর সনাতন হাজরার ঘরে নাকি এখন রোজই বাজার হচ্ছে। ফলে দুই এ দুই এ চার মিলিয়ে নিচ্ছে সবাই।কেউ কেউ নাকি ( যেমন বিশ্বনাথ নন্দী) মেয়েটাকে খারাপ পাড়ায় দেখেওছে। ( যদিও বিশ্বনাথ ওখানে কেন গেছিল সে প্রশ্ন কেউ করে নি।) ফলে গ্রামে এখন সনাতন হাজরা প্রায় একঘরে।গ্রামের ষষ্ঠী তলায় বা সিংহ বাহিনী মন্দিরে ঢুকতেই পায় না ওরা। সব থেকে বেশি আপত্তি ওই বিশ্বনাথ নন্দীরই। ইদানিং তেলের করবার করে দুটো পয়সার মুখ দেখেছে বিশ্বনাথ।সঙ্গে সঙ্গে স্তাবক জুটে গেছে এক পাল। ফলে মেজাজও পাল্লা দিয়ে বেড়েছে। দাপিয়ে বেড়াচ্ছে সারা গ্রাম। মানুষ জন ভয়ই করে ওদের।
নেহাত বড়বাবু আছেন এখানে তাই। আর পুজোটাও বড় বাড়িতে। তাই এতক্ষণ চুপ আছে ওর লোকজন। অন্য জায়গা হলে এতক্ষণে বোধহয় চুলের মুঠি ধরে ওই মেয়েকে বার করে দিত।
কিন্তু বিশ্বনাথেরই বা এত রাগ কিসের ? আর কেউ যখন কিছু বলে না গ্রামের —
মাথা নামিয়ে নেয় গোপাল। তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে ওর মুখের দিকে চেয়ে বুঝে নেন রাজেন। কিসের এত জ্বালা বিশ্বনাথের ! আর এত রাগের কারণ ই বা কী। হাতের মুঠোয় থাকা শিকার হঠাৎ ফসকে গেলে কার না গা চিড়বিড় করে !
নিঃশব্দে নাট মন্দিরের গেট দিয়ে বেরিয়ে এলেন রাজেন। বাইরে এখন শ খানেক লোকের ভীড়। আরো বাড়বে ভোগ পরিবেশনের সময়। এদিকের দেখাশোনার ভার নিরঞ্জন আর ওর দলবলের ওপর। সারিবদ্ধভাবে ভেতরে লোক ঢোকায় ওরা। সব সুশৃঙ্খল ভাবে চলে।
বাইরে আসতেই চীৎকারটা কানে এলো এবার।
এক তরফা গলা বিশ্বনাথেরই। দু — এক মুহুর্ত অপেক্ষা করে হাঁক দিলেন রাজেন তরফদার। তরফদার বাড়ির বড় কর্তার হাঁক।
” নিরঞ্জন __”
নিমেষে শান্ত হয়ে গেল গুঞ্জন।
” বড় কর্তা — ” মাথা নিচু করে সামনে এসে দাঁড়ালো নিরঞ্জন।
” গোলমাল কিসের এত ?”
” আজ্ঞে ওই —“
ওর হাত অনুসরণ করে সামনে চাইলেন রাজেন। চোখে পড়ল নতুন ডুড়ে শাড়ি জড়ানো একটা ছিপছিপে কচি লাউডগা শরীর । সঙ্গে একটা অবাধ্য বুনো ঘাড় ! একজোড়া সজল কালো চোখে প্রতিবাদের আগুন !
” ওই টুকিকে নিয়েই ঝামেলা বড় কর্তা। বিশুদা না করছে তবু ঢুকবে ভেতরে। বেহায়ার একশেষ একেবারে ! এত করে বলছি — ”
ভ্রু কুঁচকে তাকালেন রাজেন। নিরঞ্জন বিশ্বনাথের হয়ে কথা বলছে ! হুম। বেশ ভালই তবে প্রভাব হয়েছে বিশু নন্দীর এ তল্লাটে ! কিন্তু এখানে আজকের দিনে তা হতে দেবেন না তিনি। পুরোটা না শুনেই হাত তুললেন এবার ,
“কোন গোলমাল শুনতে চাই না। মায়ের পুজো। সবাই ভেতরে যাবে। পুজো দেবে। প্রসাদ নেবে। যা। বলে দে। আমার হুকুম। কেউ যেন না ফিরে যায়। “
“ কিন্তু হুজুর বিশুদা বলছে —”
“ চোপ রাও” বজ্র নির্ঘোষে হাঁক দিয়ে ওঠেন তরফদার বাড়ির বড় কর্তা। তারপর ডেকে ওঠেন “ লক্ষ্মণ কোথায় রে?”
নিমেষে নিরঞ্জনকে ঠেলে সামনে এসে দাঁড়ায় রাজেন তরফদারের দুই পুরুষের সেবক লক্ষ্মণ সর্দার।
“ কি রে? তুই থাকতে এসব কী শুনছি?”
“ এজ্ঞে আপনি ভিতরে যান বড় কর্তা। আমি সব সামলে নেব। চিন্তা করবেন না।”
কয়েক পলক চেয়ে থেকে আবার নিশব্দে ভেতরে ঢুকে গেলেন রাজেন। সোজা গিয়ে দাঁড়ালেন প্রতিমার সামনে।
সবিস্ময়ে দেখলেন ! এতক্ষণ ভুল দেখছিলেন ! ওই তো মৃন্ময়ী মূর্তির অপরূপ ওষ্ঠাধরে সেই শাশ্বত মধুময় হাসি। দু চোখ ভরে দেখলেন রাজেন তরফদার। হাসছেন মা। মধুর হাসি।
—oooXXooo—
![]()







