ভেলায় ভাসা ষোড়শী
সলিল চক্রবর্ত্তী
তপন— সোমনাথ তুই ঈশ্বর বিশ্বাস করিস?
সোমনাথ — ইয়েস।
তপন — তাহলে তোর আত্মায় বিশ্বাস নেই কেন?
সোমনাথ — আত্মা হল জীবিত মানুষের প্রাণ। মারা গেলে সব শেষ।
প্রবীর — তাহলে জাতিশ্বর, জন্মজন্মান্তর এগুলো মিথ্যা বলছিস?
সোমনাথ — সত্যি যে তার অকাট্য প্রমাণ আছে কি?
তপন— তার মানে ভূতে তোর বিশ্বাস নেই।
সোমনাথ — একদমই না, ওটা দুর্বল চিত্তের বহিঃপ্রকাশ মাত্র।
তরুন— জায়গা মতো পড়নি তো, পড়লে অতিকথন বেরিয়ে যেত।
সেমনাথ —- আমার দুঃখ কোথায় জানিস, কত লোকে কত অলৌকিক ঘটনার সাক্ষী হয়। আমার কপালে এখনো কিছু জুটল না।
তপন— এত অবিশ্বাসী মন হলে জুটবেও না।
সোমনাথ — আমার মনে হয়, তোদের ভূত আমাকে দেখে পালায়।
সোমনাথ, তপন,তরুন, প্রবীর রমাপুর গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া রায়মঙ্গল নদীর বাঁধের উপর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে লঞ্চ ঘাটের দিকে যাচ্ছে। সকলে উচ্চ মাধ্যমিকের ছাত্র। হোস্টেলে থাকে। আজ স্কুল ছুটি থাকায় নদীর ধারে বেড়াতে বেরিয়েছে। বাঁধের ধার বরাবর হেঁতাল, কেওড়া গাছের জঙ্গল। “একা এই রাস্তা দিয়ে হাঁটলে দিনের বেলায়ও কেমন যেন গা ছমছম করে।” কথাটা তরুণ বলতেই সোমনাথ তরুণের মুখের কথা কেড়ে নিয়ে বলল-” আমি যদি রাতে একা এই পথ দিয়ে যাই, আমার কিছু মনেই হবে না। এটা তোদের মনের ব্যাপার।”
প্রবীর হঠাৎ চেঁচিয়ে বলল -” ওই দেখ!!”
সকলে তাকিয়ে দেখে, একটা ভেলা জোয়ারের জলে ভাসতে ভাসতে এসে হেঁতাল গাছের জঙ্গলে আঁটকে আছে। ভেলাটা বেশ বড়সড়, ওটাতে আবার সুতির মশারী টানানো। ভিতরে কি আছে কিছুই বোঝা যাচ্ছে না। সোমনাথ বলল-” ভেরি ইন্টারেস্টিং কি আছে মশারীর মধ্যে!!” তপন বলল-” কি আবার, সাপেকাটা কোন মৃত শরীর।”
প্রবীর — এই ভাবে ভাসিয়ে দেয়!!
তপন — এই ভাবে ভাসানোর দুটো কারণ আছে। এক, মনসামঙ্গল কাব্যে সাপেকাটা লখিন্দরের ভেলায় ভাসানোর কনসেপ্ট। দুই, যদি কোন নির্বিষ সাপ কামড়ায়, অনেক সময় আতঙ্কে জ্ঞান হারায়। পরে জ্ঞান ফেরে। বা কোন ওঝার নজরে এলে যদি বাঁচাতে পারে। সেই আশায় মৃত ব্যাক্তির শোকাতুর পরিবার ভেলায় ভাসিয়ে দেয়।” সোমনাথ কথাটা শুনে বলল-” তোরা দাঁড়া, আমি চট করে দেখে আসি সাপে কাটা মানুষটার জ্ঞান ফিরেছে কিনা।” সকলে রে রে করে উঠল। সোমনাথ শোনার পাত্র নয়। বাধ্য হয়ে বাকি সকলে ওর পিছু পিছু গেল। জোয়ার ছিল বলে কোনো অসুবিধা হয়নি। সোমনাথ এগিয়ে গিয়ে মশারীটা উঁচু করে দেখেই ওদের মন খারাপ হয়ে গেল- একটা পনেরো ষোলো বছরের ফুটফুটে মেয়েকে যেন মরণ কাঠি ছুঁইয়ে ঘুম পাড়িয়ে রাখা হয়েছে। বোঝা যাচ্ছে সদ্য ভাসানো। এক মাথা কালো চুল, ফরসা টুকটুকে লাল মুখখানা, যেন ক্লান্ত হয়ে এই মাত্র ঘুমিয়েছে। শরীরে এখনো পচন ধরেনি। মাথার পাশে কিছু খাতাপত্র আছে, সঙ্গে আছে, কিছু পোশাকআশাক। প্রবীরে মনে প্রশ্ন জাগল খাতা, কিছু পোশাক কেন? তপন বলল-“ওটা বিশ্বাসের ব্যাপার। যদি কেউ বাঁচাতে পারে তখন তো মেয়েটার পরিচয়ের প্রয়োজন হবে। মেয়েটির মনে না-ও পড়তে পারে। আবার মেয়ে তো জ্ঞান ফিরলে পোশাকের প্রয়োজন হতে পারে। যদি বেঁচে যায়, এই চিন্তাভাবনা থেকে এ সবকিছু।” সোমনাথ — যাই বলিস না কেন, মেয়েটির জন্যে আমার করুণা হচ্ছে।
প্রবীর — বেঁচে থাকলে তোর মা হয়ত বৌমা করে ঘরে নিয়ে যেত।
প্রবীর সোমনাথকে ইয়ার্কি করে কথাটা বলার সাথে সাথেই পাশে থাকা কেওড়া গাছে উপর বিকট কর্কশ আওয়াজ করে একটা পাঁচ ছয় কেজির শামুকখোল পাখি ডানা ঝাপটে উড়ে গেল। উপস্থিত সকলে ভয়ে আঁতকে উঠল। সোমনাথ হেসে বলল-” সত্যি তোরা ভয় দেখালি। দিনের বেলা একটা পাখি ডেকে উড়ে গেল, এতেই এত কিছু! আমার তো রাত হলেও কিছু মনে হত না।”
তরুণ একটু রেগে বলল-” রাতে এমন একটা সিচুয়েশনে তোর ভয় করত না?”
সোমনাথ — না, করত না, আমি অনুসন্ধান করতাম, শব্দটা কোথা থেকে আসছে।
তপন— বেশ, রাতে তুই এই ভেলার কাছে আসতে পারবি?
সোমনাথ — আমি পারব, তবে ভেলা থাকলে তো।
তপন– কলার বাসনা দিয়ে হেতাল গাছের সাথে বেঁধে রেখে যাব।
সোমনাথ — ঠিক আছে তাই কর।
প্রবীর— দাঁড়া, দাঁড়া, তুই যে এখানে আসবি আমরা বুঝব কি করে?
সোমনাথ ভেলায় টানানো মশারীটা নামিয়ে বলল-” তোরাই বল কি করলে তোরা বিশ্বাস করবি।”
প্রবীর— আমরা একটা কাগজে লিখে দেব “তোমার আত্মার শান্তি কামনা করি “, তুই কাগজটা মেয়েটির হাতের মুষ্টির ভিতর রেখে যাবি। আমরা কাল সকালে এসে দেখব।”
সোমনাথ— বেশ তাই হবে, বাজী ধর।
তরুন — এক হাজার টাকা।
সোমনাথ —- ও কে, আগে ভেলাটাকে কলার বাসনা দিয়ে বেঁধে ফেলি।
তপন—- থাম তোরা, সোমনাথ ব্যাপারটা একটু বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে না কি।
যাইহোক সোমনাথ কোনো কথা না শুনে ভেলাটাকে কলার বাসনা দিয়ে হেঁতাল গাছের সাথে বেঁধে রেখে হোষ্টেলে ফিরল।
হোষ্টেল থেকে নদীর পাড় মিনিট পনেরোর পথ। একটা বড় মাঠ পার হলেই নদীর পাড়। মাঠের আল ধরে যেতে হয়। দরকার একটা হেবি পাওয়ার টর্চ লাইট। যেটা কারোর কাছে নেই। আছে একমাত্র হোষ্টেল সুপারিন্টেন্ডেন্টের কাছে। কিন্তু তিনি তো সাহসিকতার পরীক্ষা দেওয়াটা এ্যাডমিডই করবেন না। তাহলে উপায়?? একটাই উপায় আছে কুক কানাই দা, যদি সুপারিন্টেন্ডেন্টের কাছ থেকে টর্চটা ম্যানেজ করতে পারে।
কানাইদা সব কথা শুনে রে রে করে উঠল-” তোমরা ক্ষেপেছ? রাতের বেলা ভূত প্রেত নিয়ে মশকরা! রাতে ওদের ক্ষমতা সম্বন্ধে তোমাদের কোনো ধারনা আছে? তার উপর আজ ভরা অমাবস্যা!! কোনো কিছু ঘটে গেলে সুপারিন্টেন্ডেন্টকে জবাবদিহি করতে হবে না।” সোমনাথ কানাইকে বুঝিয়ে বলল-” দেখ কানাইদা যারা ভয় পায়, ভূত শুধু তাদের কাছেই আসে। আর তর্কের খাতিরে ধর যদি আসেও আমার একটা সাধ মিটবে। “
কানাই— মানলাম তুমি তেনাদের বিশ্বাস করো না। কিন্তু সাপ খোপ, তাদের?
সোমনাথ— সেই জন্যেই তো টর্চ লাইট চাইছি। কার্যসিদ্ধি হলে সবাই মিলে মাংস ভাত খাওয়া যাবে, প্লিজ তুমি টর্চটা একটু ম্যানেজ কর।
শেষ পর্যন্ত কানাই হার মেনে রাজি হল, তবে সর্তক করতে ভুলল না।
রাত আটটা বাজে, ইলেক্ট্রিসিটি না থাকায় মনে হচ্ছে যেন রাত বারোটা বেজে গেছে। সোমনাথ চিরকুটটা ট্যাঁকে গুজে হাতে পাঁচ সেলের টর্চটা নিয়ে ভেলায় শোওয়া ষোড়শীর উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়ল।
কানাই মন্ডল বন্ধুদের বলল-” তোমরা কাজটা ঠিক করলে না। অমাবস্যার নিশুতি রাতে নদীর পাড়ে যাওয়ার আগেই কিছু হয়ে যেতে পারে।”
প্রবীর— কেন অন্য কোন ভয় —।
কানাই— এটা মশকরা করার বিষয় নয়। একটু মাঠের দিক থেকে ঘুরে এসে দেখ।
তপন—- কানাই দা ঠিক কথাই বলেছে।
তরুণ — আমরা কি ওকে জোর করে পাঠিয়েছি।
কানাই— তা হয়ত পাঠাও নি, তবে বাধাও তো দাওনি। সুপারিন্টেন্ডেন্ট স্যার জানতে পারলে কেলেঙ্কারির হয়ে যাবে।
প্রবীর— তুমি না বললেই হল।
কানাই— আরে টর্চ টা তো ওনার!
এরি মধ্যে সুপারিন্টেন্ডেন্ট স্যারের ঘর থেকে ডাক পড়ল। কানাই ছুটে গিয়ে শোনে, স্যারের ঘরে মনে হয় একটা ধেড়ে ইঁদুর ঢুকে হুটোপুটি করছে। না তাড়াতে পারলে রাতে ঘুমোতে দেবেনা, আবার ইঁদুর ধরার জন্যে ঘরে সাপও ঢুকতে পারে। অর্থাৎ ইঁদুরটাকে তাড়াতে হবে। কানাই মুশকিলে পড়ে গেল, এবার তো টর্চের খোঁজ হবে, সে কি জবাব দেবে। কানাই ছাত্রদের কাছ থেকে একটা ছোট টর্চ এনে অতি কষ্টে আধঘন্টা খানিক ব্যায় করে সকলে মিলে ইঁদুর তো ঘর থেকে বার করল, পারল না পাঁচ সেল টর্চের বিষয়টি লুকোতে। বাধ্য হয়ে কানাই সুপারিন্টেন্ডেন্ট স্যারকে সব ঘটনা খুলে বলল। সুপারিন্টেন্ডেন্ট স্যার চিৎকার করে বললেন -” তোরা করেছিস কি!! এমন দুঃসাহসিক কাজ করতে গেল, কেউ আমাকে জানাবার প্রয়োজন মনে করল না।”
কানাই — না মানে আমি—।
সুপারিন্টেন্ডেন্ট — থাম তুই, কতক্ষণ বেরিয়েছে?
সকলের তখন টনক নড়ল, সত্যিই তো, বড়জোর আধঘন্টা সময় লাগার কথা, কিন্তু এক ঘন্টা পার হয়ে গেছে। সোমনাথ তো ফেরেনি। সকলে অপরাধীর মতো মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকল। সুপারিন্টেন্ডেন্ট স্যার কাল বিলম্ব না করে সকলকে বকাবকি করতে করতে হাতে একটা লন্ঠন নিয়ে ছুটলেন লঞ্চ ঘাটের দিকে, পিছু নিল হোস্টেলের প্রায় সবাই।
এতটাই অন্ধকার যে পাশের মানুষটিও আবছা লাগছে। লণ্ঠনের আলোতে যে টুকু দেখা যাচ্ছে, মিনমিনে দুটো টর্চ লাইট না থাকার মতো অবস্থা। তপনরা সবাই প্রায় নদীর পাড়ে এসে পড়েছে। কিন্তু সোমনাথকে দেখতে পেল না। তরুণ ‘সোমনাথ’, ‘সোমনাথ’ বলে বেশ কয়েকবার চিৎকার করে ডাকল। নিশুতিরাতে নিজের আওয়াজ নিজের কানেই ফিরে এল। শুনতে পেল না সোমনাথের কোন রিপ্লাই। সুপারিন্টেন্ডেন্ট স্যার বুঝতে পারছেন না ঠিক এই মুহূর্তে কি করা উচিত! সহপাঠীরা রিতীমত ভীতসন্ত্রস্ত। তবে কি সোমনাথের আশা ছেড়ে দিয়ে হোস্টেলে ফিরতে হবে?? কানাই মন্ডল কি যেন ভেবে বলল-” রাতের অন্ধকারে ভুল করে সর্দার পাড়ার দিকে চলে যাইনি তো!!” সুপারিন্টেন্ডেন্ট স্যার বললেন-” হতে পারে,চল ওদিকটায়।”
এক মাথা দুশ্চিন্তা নিয়ে মাঠের সরু আলপথ ধরে সকলে চলেছে সর্দার পাড়ার দিকে। ব্যাঙ আর ঝিঁঝি পোকার ডাকের মধ্যে ‘সোমনাথ’ বলে ডাকটা প্রতিধ্বনিত হয়ে একটা বিভীষিকার সৃষ্টি করল। হঠাৎ তরুণ ভয়ার্ত কন্ঠে বলে উঠল-” সাদা চকচক করছে ওটা কি?” সত্যিই তো কি ওটা! একটু এগিয়ে সকলে চমকে উঠল, এ তো সুপারিন্টেন্ডেন্ট স্যারের পাঁচ সেলের টর্চ লাইটটা। তাহলে সোমনাথ?? নিশ্চই কাছাকাছি কোথাও আছে। এবার সকলে মিলে ডাকতে ডাকতে খুঁজতে থাকল। এরইমধ্যে কানাই একটা ছোট বাবলাগাছের ঝোপের আড়ালে লম্বা মতো কিছু পড়ে থাকায় চিৎকার করে সকলকে দেখাল। কাছে গিয়ে সকলে দেখল, সোমনাথ মুখ থুবড়ে পড়ে আছে। সুপারিন্টেন্ডেন্ট স্যার নাড়ি দেখে বললেন। জ্ঞান হারিয়েছে। তাড়াতাড়ি হোস্টেলে নিয়ে চল, নন্দী ডাক্তারকে ডাকতে হবে।
টানা এক মাস জ্বরে ভুগে বাড়ি থেকে যখন সোমনাথ হোস্টেলে ফিরল, সকলে জিজ্ঞেস করল, সে রাতে তার কি হয়েছিল। সোমনাথ বলবে কি তার মুখে তখনো আতঙ্কের ছাপ। তারপর আরো একটু সুস্থ স্বাভাবিক হলে সহপাঠীরা আবার ঘটনা জানতে চাইল। সোমনাথ বলল-” জানিনা, সেদিন যা ঘটেছিল তা আমার চোখের ভুলও না, মনের ভুলও না, যা দেখেছি সব সত্যি। এখনো ভাবলে আমার গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠছে।” এরি মধ্যে সেখানে সুপারিন্টেন্ডেন্ট স্যার এসে পড়ায় তিনিও বললেন-” বলতো বাপু সেদিন কি ঘটেছিল? “
এবার সোমনাথ শুরু করল সে রাতে ঘটে যাওয়া ঘটনা —
রাতের অন্ধকারে মাঠ পার হতে গিয়ে আমি বুঝতে পারলাম, একা বার হওয়াটা কতটা বিপজ্জনক! ভূত, প্রেতের কথা আমি ভাবছি না। যাইহোক গুনগুন করে গান করতে করতে নদীর পাড়ের দিকে চলেছি। নিশুতিরাত, ব্যাঙ, ঝিঁঝি পোকার ডাক চারদিক মুখরিত করে তুলেছে। নদীর দিক থেকে শোঁশোঁ করে বাতাস বয়ে আসছে।
হঠাৎ একটা হিসহিস শব্দ শুনতে পেলাম। সেই দিকে টর্চের আলো ফেলতেই চমকে উঠলাম। ফুট ছয়েক দূরে একটা বিষধর সাপ এক হাত ফণা তুলে আলোর উৎসের দিকে তাকিয়ে আছে। চোখ দুটো তার জ্বলজ্বল করে জ্বলছে। কেউটে, গোখরো, চন্দ্রবোড়া কিছু একটা হবে। যাইহোক না কেন আমি ভয় পাচ্ছি ছুটে এসে না ছোবল মারে। আমি সাপের চোখে টর্চ মেরে পাথরের স্ট্যাচু হয়ে থাকলাম। এই ভাবে মিনিট খানিক থাকার পর আমার আঙ্গুলটা টর্চের সুইচ থকে একটু সরে যেতেই টর্চ নিভে গেল। তৎক্ষনাৎ আমি সুইচে আঙ্গুলের চাপ দিতেই দেখতে পেলাম,সাপটা আল পার হয়ে পালাচ্ছে। সাপটা এতটাই লম্বা, দেখা তো দূরের কথা, আমি শুনেছি বলেও মনে করতে পারছি না। সাপটার লেজের অংশটা যখন ধান খেতের মধ্যে মিলিয়ে যাচ্ছে, ঠিক তখনি কে যেন আমার পেছন থেকে খিলখিল করে হেসে উঠল। চমকে উঠে ঘাড় ঘুরিয়ে টর্চের আলো ফেলতেই, দেখি একটা ছায়া মূর্তি দূরে সরে গেল। ওই হাড়হিম করা পরিবেশেও আমি ভয় না পেয়ে মুচকি হেসে ভাবলাম, এক হাজার টাকা বাঁচানোর লোভে তোরা লুকিয়ে পিছু নিয়েছিস। যাইহোক আবার এগিয়ে চলেছি নদীর দিকে। নদীর কাছাকাছি আসতেই কেওড়া গাছের ডালে বসে থাকা নিশাচর পাখি গুলো এমন ভাবে কর্কশ শব্দে ডেকে উঠল যেন পিলে চমকে দিয়ে বুঝিয়ে দিল “এখন এখানে এসেছ কেন? বাঁচতে চাও তো ফিরে যাও!!” পায়ের তলায় পড়া শুকনো কেওড়া পাতার মচমচে আওয়াজ এই নিশুতি রাতে নিরবতাকে খানখান করে দিল। হঠাৎ কে যেন হেঁতাল গাছের জঙ্গলের দিক থেকে অট্টহাসি দিয়ে কর্কশ স্বরে বলল, “ফিরে যা, ফিরে যা।” আমি ভাবলাম,নিশুতি রাতের বিভিন্ন উদ্ভট শব্দে এটা আমার মনের ভ্রম। তবুও ব্যাপারটা কি যাচাই করতে আমি জঙ্গলের ওদিকটায় যেতেই দুটো শিয়াল জঙ্গলের ভিতর থেকে ছুটে পালাল। আমার যুক্তিতে নিজে নিজেই শিলমোহর বসালাম। প্রতিটি পদক্ষেপে এই ভাবে একটা করে যুক্তি খাড়া করে এগিয়ে চলেছি ভেলার দিকে। তারপর আমি ভেলাটাকে টর্চের আলোতে পরিষ্কার দেখতে পেলাম। ভাটার টানে ভেলা ভেসে না গেলেও জলস্তর নেমে যাওয়ায় ভেলাটাও নেমে গেছে। অমাবস্যার করাল গ্রাসে টর্চের আলো না জ্বালালে কিছুই দেখা যাচ্ছে না। একটু কাদায় নামতে হবে, ভাবছি কি করা যায়। হঠাৎ মনে হল কে যেন পিছনে দাঁড়িয়ে আমার ঘাড়ের উপর নিঃশ্বাস ফেলছে। ঘুরে টর্চ জ্বালতেই একটা কালো মোটকা হুলো বেড়াল বিকট শব্দ (ম্যাও) করে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। চাউনি তার স্বাভাবিক বিড়ালের মত নয়। কয়েক সেকেন্ড আমার দিকে ক্রূর ভাবে তাকিয়ে থেকে কেওড়া গাছের জঙ্গলের ভেতর মিলিয়ে গেল। অবাক হলাম এমন ভাবে বিড়ালটাকে অদৃশ্য হতে দেখে। তারপর যা দেখলাম তাতে নিজের চোখকে অবিশ্বাস করি কি করে। কালো বিড়ালটা অদৃশ্য হয়ে একটা সাদা ওড়নায় পরিনত হয়ে শূন্যে ভাসতে ভাসতে ভেলার দিকে চলে গেল। তাহলে বিড়ালটা কি——। আর মন গড়া কোনো যুক্তি খাড়া করতে পারলাম না। গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল। অনুভব করলাম ভয় রিপুটাকে। সাথে সাথে এতদিনের বিশ্বাস ‘অশরীরী বলে কিছু হয় না’ যেটা পরিচিত মহলে ফলাও করে বলে বেড়িয়েছি, সেটাও প্রায় ভাঙতে বসেছে। আমি ঠিক করলাম অনেক সময় নষ্ট করেছি এবার ভেলায় শোয়ানো মৃত মেয়েটির হাতে চিরকুটটা গুঁজে দিয়ে ফিরে যাব। যতই মনের জোর বাড়াচ্ছি, ততোই যেন পরিবেশটা আরো থমথমে হয়ে উঠছে। নদীর বাতাস কেওড়া গাছের ডালে আছড়ে পড়ে একটা শোঁশোঁ আওয়াজ হয়ে চলেছে, তার সাথে ঝিঁঝি পোকা, ব্যাঙের ডাক তো আছেই। আমি ভয় উপেক্ষা করে এগিয়ে গেলাম। জুতোটা পাড়ে খুলে কাদায় নেমে ভেলার কাছে গেলাম। হাতে টর্চ লাইট থাকলেও শরীরটা কেমন ভার হয়ে গেল। তবুও ধীরেধীরে মশারী তুলে টর্চের আলো ফেলতেই চমকে উঠলাম, দেখি মেয়েটি নেই। মশারীটা ছেড়ে দিয়ে ভাবলাম, তাহলে কি মেয়েটা—-। কি মনে হল আবার মশারী তুলে দেখি মেয়েটি শুয়ে আছে, এবং ঘাড় ঘুরিয়ে আমার দিকে ক্রূর ভাবে তাকিয়ে আছে, চোখ দুটো দিয়ে যেন আগুন ঠিকরে বেরুচ্ছে। আমি ভয়ে চিৎকার করে ভেলা ছেড়ে দৌড়াই। আমার চিৎকারে অন্যান্য নিশাচর প্রাণীরাও ডেকে ওঠে। আমি জানিনা কোথায় যাচ্ছি, শুধু ছুটছি, কানে আসছে কোনো মহিলার বিকট অট্টহাসি। তারপর আর জানিনা।
যখন জ্ঞান ফিরল তখন তো তোরা পাশে ছিলি।
প্রবীর বলল-” আমরা কিছু করিনি। স্যার না থাকলে তোকে ফিরে পেতাম কিনা সন্দেহ আছে। কিছু একটা ঘটে যেতই।” সুপারিন্টেন্ডেন্ট স্যার নাকে এক টিপ নস্যি দিয়ে বললেন-” নির্ঘাত হার্ট অ্যাটাক। বাচ্চা বলে অজ্ঞানের উপর দিয়ে গেছে। তবে বাপু সাহস ভাল, কিন্তু দুঃসাহস ভাল না।”
★★★★★★★★★★
![]()







