বোবা হৃদয়ের কিছুকথা
নবু
কলকাতার উত্তরে, শ্যামবাজার পাঁচমাথার মোড়ের থেকে যে গলিটা সাপের মতো এঁকেবেঁকে চলে গেছে শোভাবাজারের দিকে, সেই গলির পেটের ভেতর একটা দোতলা বাড়ির একতলায় অলোক বাস করত। বাড়িটা পুরোনো, বর্ষার জল পেয়ে গায়ে কালশিটে দাগ, জানলার খড়খড়িগুলোর অবস্থাও তথৈবচ। অলোকের জীবনটাও ওই বাড়িটার মতোই। বাইরে থেকে চুপচাপ, বিবর্ণ, ভেতরে কোথাও যেন একটা স্যাঁতসেঁতে কষ্ট জমে আছে।
অলোক কথা বলত না। মানে, বলত না বললে ভুল হবে। নিতান্ত প্রয়োজন ছাড়া তার মুখ থেকে শব্দ বেরোত না। কলেজ স্ট্রিটের এক পুরোনো বইয়ের দোকানের কর্মচারী সে। বই’রা তার বন্ধু, আশ্রয়। ধুলোমাখা র্যাকে সাজানো মলাট ছেঁড়া বইগুলোর মতোই তার হৃদয়টা, ভেতরে অনেক গল্প, কিন্তু বাইরে থেকে বোঝার উপায় নেই। লোকে বলত, ছেলেটার মাথায় গণ্ডগোল আছে। কেউ বলত, ছ্যাঁকা খেয়ে বোবা হয়ে গেছে। অলোক শুনত, কিন্তু কিছু বলত না। তার চোখের ভেতর একটা দিগন্তজোড়া শূন্যতা, ঠোঁটে যেন কেউ পার্মানেন্ট মার্কার দিয়ে নীরবতা এঁকে দিয়ে গেছে।
সেই বাড়ির দোতলায় একদিন ভাড়াটে হয়ে এল মোহিনী। নামের মতোই মেয়েটা। চলনে-বলনে, হাসিতে-কথায় যেন জাদু আছে। প্রথম দিনই অলোকের দরজায় টোকা দিয়ে এক বাটি সুজি নিয়ে হাজির।
“এই যে দাদা, শুনছেন? আমি দোতলায় এসেছি। মা পাঠালেন, নতুন প্রতিবেশী তো!”— খিলখিল করে হেসে উঠেছিল মোহিনী। অলোক দরজা খুলে শুধু তাকিয়েছিল। তার সেই শূন্য দৃষ্টির সামনে মোহিনীর হাসিটা যেন একটা আগুনের ফুলকি। অলোক হাত বাড়িয়ে বাটিটা নিয়েছিল, কিন্তু ধন্যবাদটুকুও দেয়নি। শুধু একবার মাথা নেড়েছিল।
কিন্তু মোহিনী দমে যাওয়ার পাত্রী নয়। সে যেন পণ করেছিল, এই পাথরের ভেতর থেকে ঝর্ণা বের করবেই। রোজ সকালে অলোকের জন্য এক কাপ চা নিয়ে আসত। বিকেলে ছাদে কাপড় মেলতে গিয়ে তারস্বরে রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইত, এমনভাবে যেন গানটা শুধু অলোকের জন্যই।
“এই যে বইওয়ালা মশাই, আপনার দোকানে কি শীর্ষেন্দুর ‘ঘুণপোকা’ হবে?”— একদিন সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করল মোহিনী।
অলোক চমকে তাকালো। তার সবচেয়ে প্রিয় বই। সে শুধু মাথা নাড়ল, ‘হ্যাঁ’ সূচক।
“তাহলে তো দারুণ হলো! আমার জন্য একটা আনবেন? জানেন, আমার না মাঝে মাঝে নিজেকে ওই বইটার চরিত্রগুলোর মতো মনে হয়। সবাই কেমন যেন নিজের ভেতরকার পোকার সঙ্গে লড়ছে।”
সেই শুরু। অলোকের পাথুরে বুকে প্রথম ফাটল। সে মোহিনীর জন্য ‘ঘুণপোকা’ এনে দিল। মোহিনী বইটা পেয়ে এমনভাবে হাসল, যেন হাতে চাঁদ পেয়েছে। সেই প্রথম অলোক দেখল, হাসলে মোহিনীর গালে টোল পড়ে। অদ্ভুত একটা মায়া আছে সেই টোলে।
ধীরে ধীরে অলোকের নীরবতার বাঁধ ভাঙতে শুরু করল। প্রথমে এক শব্দে উত্তর, তারপর দুটো। তারপর একদিন বিকেলে চায়ের দোকানে বসে মোহিনীর সঙ্গে প্রায় মিনিট দশেক কথা বলল সে। পাড়ার লোক অবাক! যে ছেলেটাকে পাঁচ বছরে পাঁচটা কথা বলতে শোনা যায়নি, সে কিনা একটা মেয়ের সঙ্গে বসে অনর্গল কথা বলছে! চায়ের দোকানের নিতাইদা তো বলেই ফেলল, “কি গো অলোক ভাই, কেল্লা ফতে নাকি? মুখ ফুটেছে!”
অলোক লজ্জা পেয়েছিল, কিন্তু তার ভেতরটা সেদিন বসন্তের প্রথম দিনের মতো ওম ওম লাগছিল।
মোহিনী তাকে জীবনের ছোট ছোট আনন্দগুলো নতুন করে চেনাতে শুরু করল। বর্ষার দিনে ছাদে উঠে একসাথে ভেজা, ফুচকা খাওয়ার প্রতিযোগিতা করা, গঙ্গার ঘাটে বসে সূর্যাস্ত দেখা—এসবই অলোকের কাছে ছিল নতুন। তার মনে হতো, যে হৃদয়টা আঘাতে আঘাতে বোবা হয়ে গিয়েছিল, সেটা যেন আবার ফিসফিস করে কথা বলতে শিখছে। মোহিনীর ছোঁয়া ছিল সেই পরশপাথর।
অলোকের অতীতটা ছিল যন্ত্রণার। কলেজে পড়তে ভালোবাসত সে একজনকে, ঈপ্সিতা। সেই ভালোবাসা ছিল তার সর্বস্ব। কিন্তু ঈপ্সিতার পরিবার, সামাজিক চাপ আর উচ্চাকাঙ্ক্ষার কাছে অলোকের ভালোবাসা হেরে গিয়েছিল। ঈপ্সিতা তাকে ছেড়ে এক ধনী শিল্পপতিকে বিয়ে করে বিদেশে চলে যায়। যাওয়ার আগে এমন কিছু কথা শুনিয়েছিল, যা অলোকের ভেতরটা চুরমার করে দিয়েছিল। সেই থেকেই সে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছিল। তার বিশ্বাসটাই মরে গিয়েছিল।
মোহিনী সেই মরা বিশ্বাসে জল সিঞ্চন করল। অলোক আবার স্বপ্ন দেখতে শুরু করল। সে ভাবত, মোহিনীকে তার সব কথা বলবে। তার ভাঙাচোরা বুকের ভেতর যে আরোগ্যের আলো জ্বলছে, তার সবটুকু কৃতিত্ব মোহিনীর।
কিন্তু ভালোবাসা, সে তো বড় অদ্ভুত জিনিস। সে যেমন গড়ে, তেমন ভাঙতেও জানে।
একদিন রাতে অলোকের ঘুম ভেঙে গেল। দোতলা থেকে চাপা কান্নার আওয়াজ আসছে। সঙ্গে একটা পুরুষ কণ্ঠের চিৎকার। অলোক সিঁড়ির কাছে গিয়ে কান পাতল।
“টাকাটা জোগাড় করতে পারলি না? আমি কি বলেছিলাম তোকে? এই শেষ সুযোগ, মোহিনী। এরপর কিন্তু আমি আর ভালো মানুষ থাকব না।”— কণ্ঠটা কর্কশ, হিংস্র।
“বিক্রম, প্লিজ আমাকে আর কিছুদিন সময় দাও। আমি চেষ্টা করছি তো…”— মোহিনীর গলাটা ভয়ে, কান্নায় ভেঙে আসছিল।
“সময়? আর কত সময়? তোর এই ন্যাকা কান্না আমি অনেক দেখেছি। ওই নিচের তলার বোবাটার কাছ থেকে কিছু আদায় করতে পারলি? শুনেছি বইয়ের দোকানে কাজ করে। পয়সাকড়ি তো কিছু আছে নিশ্চয়ই!”
অলোকের পায়ের তলার মাটি সরে গেল। পৃথিবীটা যেন দুলে উঠল। তাহলে মোহিনীর এই হাসি, এই যত্ন, এই ভালোবাসা—সবটাই অভিনয়? সে একটা টোপ ছিল? তার বোবা হৃদয়টাকে কথা বলানো হয়েছিল শুধু স্বার্থসিদ্ধির জন্য?
পরদিন সকালে মোহিনী যখন হাসিমুখে চা নিয়ে এল, অলোক দরজা খুলল না। মোহিনী অনেক ডাকাডাকি করল, দরজায় ধাক্কা দিল। ভেতর থেকে কোনো সাড়া নেই। বিকেলে অলোক যখন দোকান থেকে ফিরছিল, মোহিনী সিঁড়িতে পথ আগলে দাঁড়াল।
“কি হয়েছে তোমার? কাল রাত থেকে এমন করছ কেন?”— মোহিনীর চোখে জল।
অলোক তার দিকে তাকালো। সেই চোখে আর শূন্যতা নেই, আছে দাউদাউ করে জ্বলা আগুন আর তীব্র ঘৃণা। সে একটা কথাও বলল না। মোহিনীকে পাশ কাটিয়ে নিজের ঘরে ঢুকে সজোরে দরজা বন্ধ করে দিল। সেই দরজা বন্ধের শব্দটা যেন একটা সম্পর্কের মৃত্যুর ঘোষণা।
কয়েকদিন পর মোহিনী বাড়ি ছেড়ে চলে গেল। যাওয়ার আগে অলোকের দরজার নিচ দিয়ে একটা চিঠি গলিয়ে দিয়ে গিয়েছিল। অলোক চিঠিটা খুলেছিল অনেক পরে। তাতে লেখা ছিল—
“আমি জানি তুমি সব শুনে ফেলেছ। বিক্রম আমার স্বামী। বিয়ের পর জানতে পারি, সে একজন দাগী আসামী। অনেক টাকার দেনা ওর। ওর হাত থেকে পালানোর জন্যই আমি এখানে এসেছিলাম। ভেবেছিলাম নতুন জীবন শুরু করব। তোমাকে দেখে আমার মনে হয়েছিল, পৃথিবীতে এখনো ভালো মানুষ আছে। তোমার নীরবতার আড়ালে যে কষ্টটা লুকিয়ে ছিল, আমি সেটা অনুভব করতে পেরেছিলাম। বিশ্বাস করো, তোমাকে ভালোবেসে ফেলেছিলাম আমি। তোমার কাছ থেকে টাকা নেওয়ার কথা আমি ভাবতেও পারিনি। কিন্তু বিক্রম আমাকে খুঁজে বের করে ফেলে। আমি নিরুপায়, অলোক। আমাকে যেতেই হচ্ছে। হয়তো আর কোনোদিন দেখা হবে না। ভালো থেকো। —মোহিনী”
চিঠিটা পড়ার পর অলোক হাসল। একটা অদ্ভুত, যন্ত্রণাকাতর হাসি। সে আবার কথা বলা বন্ধ করে দিল। কিন্তু এবারকার নীরবতা আগের মতো ছিল না। আগের নীরবতা ছিল একটা শান্ত, জমাটবাঁধা হ্রদের মতো। আর এখনকার নীরবতা হলো এক ভয়ঙ্কর ঘূর্ণিঝড়ের পর শ্মশানের নিস্তব্ধতা। ভেতরে সবকিছু তোলপাড় হয়ে যাচ্ছে, অথচ বাইরে থেকে কিচ্ছুটি বোঝার উপায় নেই।
যে হৃদয় একবার ভালোবাসার ছোঁয়ায় কথা বলতে শিখে আবার প্রতারিত হয়, সেই হৃদয়ের যন্ত্রণা আরও গভীর। কারণ সে জেনে গেছে কথা বলার আনন্দটা কেমন, স্পর্শের উষ্ণতা কেমন। সেই আনন্দ হারিয়ে ফেলার কষ্ট ভোলার কষ্টের চেয়ে অনেক বেশি। অলোকের হৃদয়টা এবার শুধু বোবা হয়নি, চিরকালের জন্য বধিরও হয়ে গিয়েছিল। সে আর কোনোদিন কোনো ডাক শুনবে না, কোনো কথায় সাড়া দেবে না। তার চোখের ভেতর এখন আর শূন্যতা নেই, আছে এক অনন্ত মহাকাশের অন্ধকার, যেখানে কোনো নক্ষত্রের আলো পৌঁছায় না।
একদিন পাড়ার চায়ের দোকানে বসে এক প্রৌঢ় ভদ্রলোক নতুন আসা এক যুবককে বলছিলেন, “ওই যে ছেলেটাকে দেখছ, অলোক। এককালে খুব ভালো ছিল। তারপর কি যে হলো! একেবারে পাথর হয়ে গেল। লোকে বলে, ওর মনে নাকি একটা পোকা আছে। সেই পোকাটা ওর ভেতরটা রোজ একটু একটু করে খায়, কিন্তু ওকে মরতে দেয় না। বাঁচিয়ে রেখে কষ্ট দেয়।”
আসলে, যে হৃদয় আঘাতে বোবা হয়ে যায়, সে হয়তো একদিন স্নেহের স্পর্শে কথা বলতে শেখে। কিন্তু সেই স্পর্শ যদি মরীচিকা হয়, যদি সেই আশ্রয়টা হঠাৎ ভেঙে পড়ে, তখন সে আর বোবা হয় না, সে জীবন্ত ফসিল হয়ে যায়। তার বুকের ভেতরটা একটা জাদুঘর হয়ে ওঠে, যেখানে একটা ব্যর্থ প্রেমের গল্প কাঁচের শোকেসে সাজানো থাকে। বাইরে থেকে দেখা যায়, কিন্তু ছোঁয়া যায় না। সেই গল্পের যন্ত্রণা শুধু সেই অনুভব করতে পারে, যার হৃদয়টা জীবন্ত থেকেও মৃত।
—oooXXooo—
![]()







