নাড়ি ছেঁড়া ভারত ভূমি – মাদাগাস্কার
দীননাথ চক্রবর্তী
“তানিন্দ্রা জামা” শুধু একটা শব্দবন্ধ নয়, আমার কাছে। এটা এমন একটা শব্দ – ঝড় তোলে হৃদয় – মনে। হঠাৎই কোন এক মৃত আগ্নেয়গিরির জেগে ওঠা যেন হৃদয় – মনে। তানিন্দ্রা জামা সেই শব্দ। মালাগাসি ভাষার শব্দ। অর্থ যা পূর্বপুরুষের ভূমি। মাদাগাস্কার হল সেই পূর্বপুরুষের ভূমি। একদিন যা ভারতের অন্তর্ভুক্ত ছিল। উদ্ভ্রান্ত সেই আদিম যুগে,স্রষ্টার অসন্তোষেই একদিন বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এই ভূমি। এটা জানার পর থেকেই তার হাতছানি। যদিও পুরো ভারতবর্ষটাই এখনো দেখা হয়ে ওঠেনি, তবুও ব্যাকুল করে তোলে তানিন্দ্রা জামা। মনকে সান্ত্বনা দিই এই যুক্তিতে – যতই বিদেশ হোক না, সেটাও তো ভারত ভূমি। সুযোগ এসে গেল – তাই একলাফেই পাড়ি।
অলব্ধ শূন্যতা পূরণেই ভ্রমণ। শূন্যতা পূরণ না বলে শূন্যতা বিজয় বললেই যেন সঠিক বলা হয়। আফ্রিকা ভ্রমণে লব্ধ এবং অলব্ধ দুটো শূন্যতাই পূরণ হয়েছে অনেকাংশে। নতুন করে এও বুঝলাম ভ্রমণের এটাই গতিময়তা – যা কোনদিন পুরনো হয় না। নতুনত্বেই তার রহস্য, তার আকর্ষণ।
দমদম এয়ারপোর্টে ঢুকে খানিকটা চায়ের কাপের উষ্ণ ধোঁয়া পেলাম। পুরো চায়ের মেজাজ টা পেলাম ভিসরা বিমানের সীটে বসে। একেবারে সামনে কর্পোরেট সীটের দিকটা বাদ দিয়ে বাদবাকি ইকোনমিক ক্লাসে নেই কোন এলিট জাত – পাত, সাম্প্রদায়িক , উচ্চ – নীচ, আভিজাত্য। খোলামেলা মানসিকতার ছোঁয়া। মনোরম বাতাবরণ। একটা খোলা মেলা মেজাজ। পাবলিক ট্রেন – বাসের মত উপত্যকীয় উষ্ণতা। যেটা ছিল আমার লব্ধ অভিজ্ঞতার বিপরীত । সেই শূন্যতাই পূরণ হলো পরিচিত – অপরিচিতের আলাপ – আলোচনায়,সীটে না বসে খানিকটা দাঁড়িয়ে নেওয়ায়,হুটহাট টয়লেট ব্যবহারে, বেল্ট বাঁধতে বললেও কর্ণপাত না করায়। ভাষার সমস্যা থাকলেও লজ্জায় ফেলে না বিমান সেবক সেবিকাদের সঙ্গে কথা বলতে … এমনি খুঁটি নাটি কত বিষয়ে ।
কি যে ভালো লাগলো শুরুতে এই উষ্ণ পরিবেশ! ফুরফুরে মেজাজে পৌঁছে গেলাম মুম্বাই ছত্রপতি শিবাজী এয়ারপোর্টে। বৈভবে তাজমহল।এটি ওয়ান অফ দ্য বেস্ট ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট। মুম্বাই প্রথমে গেলাম। কেননা,মাদাগাস্কার যাবার সরাসরি কোনো বিমান নেই। কলকাতার ভাড়া ছ’ হাজার টাকা।
পুনরায় মুম্বাই থেকে নাইরোবির বিমান। এয়ার পোর্ট জমোকেনিয়াট্টা। নাইরোবি মানে কেনিয়া । কেনিয়া এয়ার ওয়ে -ই টিকিট।
. অভিজ্ঞতায় বুঝেছি ভ্রমণে বিরাট একটা ফ্যাক্টর জোড়। বিশেষ করে লম্বা ট্যুরে পার্মানেন্ট জোড় হলে তো একাদশে বৃহস্পতি। না হলেও নো – ম্যাটার। বন্ধুত্বের গভীরতায় হয়ে যায় সে জোড়। নানারূপ মানসিকতায় কত কিছুতেই যে জোড় হয়ে যায়। এ পৃথিবীতে মানুষ , পশুপাখি , জীবজন্তু, সব যুক্তের। বিযুক্তের কেউ নয়। জোড় এর ক্ষেত্রে স্বামী -স্ত্রী ‘র পাল্লাই ভারী আমাদের টিমে। তারপর বন্ধুর জোড়। স্ট্যাটিসটিক্স এর ভাষায় সাবসেট। আর যে সব এলিমেন্ট এই সাবসেটের বাইরে থাকে,যেমন আমি, বিদ্যুৎ দা, দেবাশীষ, তারা সব ইউনিভার্সাল সেটের এলিমেন্ট । আমরা হলাম তাই। দেবাশীষ ট্যুর মালিক। তার জোড় সবার সঙ্গে । বিদ্যুৎ দা পার্মানেন্ট ক্লাইন্ট । সুতরাং তাঁর সঙ্গে দেবাশীষের জোড় বাঁধার বাধ্যবাধকতা একটা থেকেই যায়। আর আমি একেবারেই নবাগত। যাদের মাধ্যমে এসেছি ( অর্থাৎ মধুসূদন দা, পল্টু দার সঙ্গে) , তাদের জোড় অনেক আগেই। ফলে আমি হলাম কিনা ইউনিভার্সাল সেটের একটা এলিমেন্ট। সকলের মধ্যেই আছি । কবিতার একটা লাইন মনে আসে।। মনে করিয়ে দেয় সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের এই লাইনটা – থেকেও নেই আবার না থেকেও আছি ….।
ওর এটা বরাবরের দুষ্টুমি । এই দুষ্টুমি টাই আমার ভ্রমণের এনার্জি। ইউনিভার্সাল সেটের একটা এলিমেন্ট হলেও আমারও একটা পার্মানেন্ট সঙ্গী আছে। পার্মানেন্ট ‘এর চেয়ে আরও বেশী যদি কিছু থাকে, তাহলে সে সেই অস্তিত্বের সঙ্গী।
কে সে? তাকে দেখতে কেমন!! সে কি ছাই জানি যে বলবো!! তবে আছে। জড়িয়ে লেপ্টে আছে।
এবার তার রীতিমত ধমকানী। ভ্রমণে সময় অমূল্য। ডোন্ট কিল দ্য টাইম।
বুঝলাম তার কথার তাৎপর্য। প্লেন গড়াতে শুরু করেছে। সময় এখন ইন্দ্রিয় সজাগের। পারলে চৌদ্দ ইন্দ্রিয়ই। অশেষ ধন্যবাদ দেবাশীষ কে। কথা রেখেছে সে। সব সীট ই হয়েছে জানালার ধারে। যেটা করতে গিয়েই হয়ত আমি সঙ্গীহারা। তেমনই কথা বললো দেবাশীষ । স্থায়ী হলো না আমার একাকিত্ব। কেননা আগেই বলেছি প্লেন এখন অনেক খোলামেলা। এখন আর বিশেষ শ্রেণী প্লেন চড়ে না। মানুষের আয় যথার্থই বেড়েছে। বুঝতে অসুবিধা হয়না। সে খোলামেলা,পোশাকে আশাকে, কথা বার্তায়। পরিচয় হয়ে গেল পাশের পিছনের সীটের যাত্রীর সঙ্গে। একেবারে পাশের সীটের যাত্রী গুজরাটি । কর্পোরেট কর্মচারী।
কোম্পানি পাঠিয়েছে জয়েন করতে সাইটে। কি যেন জায়গাটার নাম, বুঝতে পারলাম না । নাইরোবি হয়ে যেতে হবে। আমরাও তো নাইরোবি হয়ে যাবো মাদাগাস্কারের রাজধানী অ্যান্তানানারিভো ।
তেইশ চব্বিশের ইয়াং গুজরাটি হলে কি হরে, বিমান সেবিকাকে ডিনারে জানালো , ভেজ। বিরত থাকলো – চিকেন – বিফ – ল্যাম্ব থেকে। বুঝলাম নতুন করে,নিরামিষ বিষয়টি , গুজরাটিদের কত গভীরে। আমার মনের কথাটা ধরে নিয়ে সর্বক্ষণের সঙ্গী আমায় অঙ্গুলি নির্দেশ করলো বিমান সেবিকার দিকে। সেই জাতি প্রীতি তাদের মধ্যেও সমভাবে বর্তমান পোশাকে , আচরণে , কথাবার্তায়। নেই তাদের মধ্যে এতটুকু কৃত্রিমতার ছোঁয়া। ব্যতিক্রম শুধু গেসচার – পসচারে । কিভাবে সীট বেল্ট লাগানো পড়ানো, মাস্ক, পরা – খোলা, সেফটি জ্যাকেট খোলা – পরা । পোশাকে লাল, সাদা, কালোর ব্যবহার। মেয়েদের কালো চুলে টাইট করে বাঁধা বড় খোঁপা। ছেলেদেরও কারলিক চুল। মাথা প্রায় নেড়া। চোখে মুখে একটা শান্ত স্নিগ্ধ নীরবতার প্রলেপ। তাতেও ক্ষুন্ন হয়নি এতটুকু স্মার্টনেস। কথাবার্তায় নির্মেদ হলেও কমনীয়তার অভাব পড়েনি এতটুকু।
সঙ্গীর একটা চিমটিতে চোখ আবদ্ধ হলো সীটের সামনে LCD Screen ‘এ। এটা ভিসারা এয়ার বাসে ছিল না। আন্তর্জাতিক কেনিয়া এয়ার বাসেই প্রথম। যাবো নাইরোবি । সীটেই রাখা ছিল হেড ফোন , হেলান দেওয়ার বালিশ আর ঠান্ডাতে গায়ে দেবার লাল চাদর। সামনের ব্যাগে রাখা কয়েকটা ইংলিশ ম্যাগাজিন। অনেক যাত্রীই তখন স্ক্রীনে , হেড ফোনে ব্যস্ত। আমিও তখন স্ক্রীনে – ইওর সিট থেকে ইওর ফ্লাইট অপসনে ট্রাভেল করলাম। সঙ্গে সঙ্গে স্ক্রীনে ফুটে উঠলো জি পি এসের মতো মুম্বাই থেকে নাইরোবি যাত্রা পথে আমার বিমানের ছবি সহ প্রকৃত অবস্থান। সমগ্র পথটা রেখাচিত্র এর একটা আর্চ। ভারতের মুম্বাই থেকে আমরা চলেছি আরো পশ্চিমে। স্ক্রীনে মুম্বাই থেকে নাইরোবির দূরত্ব ৪৫৩৭ কিলোমিটার। প্লেন তখন উড়ে চলেছে ৩৩০০০ ফুট উঁচুতে। নিচে নীল ভারত মহাসাগর। ক্রমে ক্যার্লসবের্গ রিজ (Carlsberg Ridge), সোমালি বাসিন (Somali Basin ) কে ছুঁয়ে পুনরায় স্থলের ওপর। তারপর সমুদ্র পৃষ্ঠ থেকে লামু কে ছুঁয়ে নাইরোবি। কেনিয়ার রাজধানী। বিমানের অধিকাংশ যাত্রাপথই নীল সমুদ্রের ওপর। যেহেতু মাদাগাস্কার বা নাইরোবি পশ্চিম দিকে,তাই ভারতের চেয়ে সময় প্রায় আড়াই ঘণ্টা পেছনে। স্ক্রীনেও তা সুস্পষ্ট। গতিবেগ ৬০০- ১০০০ কিমিও অতিক্রম করে যায়। সাথে সাথে তাপমাত্রাও নির্দেশ করে চলেছে। প্রয়োজনীয় ঘোষণার সাথে স্ক্রীনে ফুটে ওঠে ক্যাপশন।
এই যে মশাই, স্ক্রীনে পড়ে থাকলেই হবে, জানালার সীটের জন্য তবে অত হ্যাংলামি করেছিলে কেন?
সত্যিই তো…ভ্রমণে টাইম ইজ দ্য কি লিমিট। নিমেষেই একটা কষে…সরি … সরি…।
জানালার কাঁচে এবার চোখ রাখলাম। অবাক কান্ড!! বিমান কি আদৌ চলছে ! স্থির। নড়ে না, চড়ে না। খেয়াল না রাখলে বোঝাই যায় না দুলুনিটা। নীচের দিকে তাকাতে বুঝলাম প্লেন চলছে। তবে কখনোই মনে হয় না অতি দ্রুত গতিতে চলেছে। নীচে – ওপরে দুটো আকাশ। নীচের আকাশটা বড় তারাখোচিত উজ্জ্বল আকাশ।
চোখে দেখা জিনিসটা বড় অদ্ভুত। যেটা দিনের আলোয় নীচুতে ঠেকেছে ঘর, সেটাই আবার উঁচুতে দেখা রাতের অন্ধকারে তারা। অ্যাই… এসব কি ভাবা হচ্ছে শুনি?
তুমি সুন্দর দেখছো। মনে নেই হেমন্তের গানটা – তুমি দেখ নারী পুরুষ / আমি দেখি শুধুই মানুষ ….
এই আমার ফুলেশ্বরী। ভ্রমণে জোড় সঙ্গী। ভালো না…?
আমার সীট বিমানের ডানার ওপর। 21- J। সেই ডানাতেও জাতীয়তাবাদের কৌম উষ্ণতা। সেই উষ্ণতায় ধোয়া আবার পোশাকের রঙে রঙে। হ্যাঁ আমি আফ্রিকান পতাকার রঙের কথা বলছি। সাদা – লাল – নীল। বিমানের ডানায় সেই রং। বিমান সেবিকা থেকে আফ্রিকান যাত্রীদের মধ্যে পুরোটা না হলেও অনেকটাই তার ছোঁয়া স্পষ্ট। বাস্তবে বুঝতে না পারলেও স্ক্রীনে বিমান এখন কার্লসবার্গ রিজ (Carlsberg Ridge )’এর কাছাকাছি।
এই কার্লসবার্গ রিজ হলো সেন্ট্রাল ইন্ডিয়ানা রিজের উত্তরের অংশ আফ্রিকান প্লেট এবং ইন্দো -অস্ট্রেলিয়ান প্লেটের মধ্যে একটি ভিন্ন টেকটোনিক প্লেট সীমানা, যা ভারত পশ্চিমাঞ্চল অতিক্রম করে। এরপর প্লেন সোমালি বেসিন, দক্ষিণ – পশ্চিম আরব সাগরের মেঝেতে সাবমেরিন বেসিন, সোমালিয়ার পূর্বে ভারত মহাসাগরের একটি বাহু। কার্লসবার্গ রিজ এটিকে উত্তর পূর্বে অগভীর আরব অববাহিকা থেকে পৃথক করেছে। সোমালি অববাহিকার দক্ষিণে মাসকারিন এবং মাদাগাস্কার অববাহিকা গুলির সাথেও সংযোগ স্থাপন করে।
জানালায় তখন হাতছানি , কেননা মেঘ ঠোঁট রেখেছে জানালায়। নাগালে আকাশ। নিজের মধ্যে যেন দেখতে পাচ্ছি মধু কাব্যের ইন্দ্রজিৎ কে। আমিও তীব্র এক অভিসারের পথে । পরীক্ষার খাতায় অভিসারের পথ কত দুর্গম বলে মনে হয়। কিন্তু এখন বড় আনন্দের। কত তার রোমাঞ্চ, শিহরণ। নীচের পৃথিবীটা যেন একটা ক্যালেন্ডার। শহরের রাস্তা গুলো বাটা জমির আল। মেঘের দেশ যেন পৃথিবীর শৈলশিখর। আবার কখন’ সাগর বুকে ঢেউয়ের ওঠানামা। প্লেন এবার মেঘের ওপরে। রোদ নীল সাদা কাশ মেঘ যেন। শূন্যে নীল সাগরে শুভ্র মেঘ – ফেনার নীরব সজীব কোলাহল। হঠাৎই পিছনের সীট থেকে ভেসে আসে গোঙানি। তিনজনই কেনিয়ান যাত্রী। একজনের অদ্ভুত ভৌতিক আচরণ। দেখে বুঝলাম অসুস্থ। দুজন আপাতত সামলে নেয়। পাশের সিটের গুজরাটি আয়ুস জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকায় । বললাম অসুস্থ। শূন্যে প্লেন উড়ে চলে। নেই কোন সীমানা, নেই কোনো আল, কোনো বিভাজন রেখা।
মাঝে মাঝে দৃষ্টি কেড়ে নেয় EXIT KUTOKA, প্লেনে লেখা একটা ক্যাপশন। হয়ত মালাগাসি ভাষায় কিউটোকা মানে exist, যেমন মেরিহাম বেরি মানে ভাত খাওয়া।
দৃষ্টি কাড়ে পিছন দিক থেকে কাপ বা গ্লাস হাতে যাত্রীদের আসা যাওয়া। তবে সকলের না। যারা হয়তো পাশের সঙ্গী জনকে কিংবা নিজেকে একটু বেশি ভালোবাসে, তারাই চা,কফি কিংবা জুস নিয়ে ফেরে । কেননা,বিমান সেবিকাদের কেবিনটা একেবারে বিমানের শেষে।ওয়াশরুমের পাশে।
নীচে ঘোলা গঙ্গা জলের ঢেউ যেন কত বিচিত্র। তবু তাদের মধ্যে বর্তমান সুন্দর একটা ঐকতান। কোনো বিরক্তি নেই ইঞ্জিনের আওয়াজে ।
স্ক্রীনে চোখ পড়লো। প্লেন তখন লামু ছুঁই ছুঁই। এই লামু দ্বীপ মাম্বাস থেকে আনুমানিক ১৫০ মাইল দূরে ভারত মহাসাগরে কেনিয়ার তীরে অবস্থিত একটি শহর বন্দর। এবার আর সমুদ্রের ওপর নয়। প্লেন মাটির ওপর। নাইরোবির মাটি। কেনিয়ার রাজধানীর মাটি। বড্ড বেশি বেশি সাদা যেন। রোদ কালো , সবুজ গাছ। হাতের না, মোবাইলের ঘড়িতে তখন দুপুর বারোটা বেজে সাইত্রিশ। প্লেন ল্যান্ড করলো এয়ার পোর্টে। জমোকেনিয়াট্টা টার্মিনাল 1A .
এরপর আমাদের অন্য কেনিয়ান প্লেন। গন্তব্য মাদাগাস্কারের রাজধানী এন্টানানারিভো। যেহেতু ডাইরেক্ট বোর্ডিং করা হয়েছে মুম্বাই থেকে, তাই লাগেজ নেওয়ার ঝামেলা নেই আর । অতঃপর সেই মাদাগাস্কার। আমাদের ট্যুর নাম যা ট্রেজার্স অফ মাদাগাস্কার।
মাদাগাস্কার মানেই বাহবাব , লেমুর, ক্যামেলিয়ান , অরণ্য , লালমাটি, সাদা বালির উপত্যকা , নীল জল , ধূসর প্রান্তর,শুষ্ক মালভূমি , জঙ্গল , অরণ্য , সাপ। সবচেয়ে বড় কথা দূষণ মুক্ত প্রাকৃতিক পরিবেশ ও অর্থনৈতিক জীব বৈচিত্র। এটি সেক্স ফ্রী, যুবা রাষ্ট্র। আবার ভূত , প্রেত, ম্যাজিক। মূল্যবান ওষধি গাছপালা। ভেষজ জড়িবুটির …।
গবেষণার আকর ক্ষেত্র। UNESCO স্বীকৃত ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট দ্য গ্রেট সিঙ্গি । ভাবতে অবাক লাগে একসময় এটি ভারতের অন্তর্ভুক্ত ছিল। আমাদের পূর্ব পুরুষদের মাদাগাস্কা । সত্যি কথা বলতে কি অনুভবে অনুভবে অদ্ভুত একটা শিহরণ , উত্তেজনা ।
এলোপাতাড়ি – আমার সর্বক্ষণের সাথী সঙ্গীর না পসন্দ। সে বড্ড বেশী পরিপাটি সংঘটিত। ভ্রমণ ক্ষুধা মেটাতে সে এভাবেই মনের খিদে মিটিয়ে দিতে সদা ব্যস্ত। পেটের খিদে কখনও তাকে দমাতে পারে না বা কোনো ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়ায় না। প্রকৃত ভ্রমণ শুরুর আগেই সূচনা করে দেয় তার পটভূমি। প্রকৃত স্পষ্ট ভ্রমণেই তার ঝালাই বা প্রমাণ।
ভারত মহাসাগরের দ্বীপরাষ্ট্র এই মাদাগাস্কার। দক্ষিণ পূর্ব আফ্রিকার উপকূল থেকে এর অবস্থান। এটি বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম দ্বীপ। গ্রীনল্যাণ্ড , নিউ গিনি আর বর্নিওর পর। কোটি কোটি বছর আগে এক প্রাগৈতিহাসিক ভাঙনের পর ভারতীয় উপদ্বীপ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় মাদাগাস্কার। এখানে প্রথম মানুষের বসতির সন্ধান পাওয়া যায় দুই হাজার খ্রিস্ট পূর্বে। ক্রমে বর্নিও বান্তু সহ নানা জাতি গোষ্ঠীর লোকজন বসবাস শুরু করে। বর্তমানে বর্ণিও দ্বীপ ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া এবং ব্রুনাইয়ের মধ্যে ভাগ হয়ে গিয়েছে। এরও ৫০০ বছর পর আফ্রিকার মানুষ মাদাগাস্কারে আসে। সময়ের আবর্তে দেশটিতে আফ্রিকা, এশিয়া এবং ইউরোপ থেকে ঔপনিবেশিকদের আগমন ঘটে। সঙ্গে নিয়ে আসে নিজ নিজ সংস্কৃতি। আর তাই মাদাগাস্কারে এই তিন মহাদেশীয় সংস্কৃতির মেলবন্ধন দেখা যায়।
ইউরোপীয় নাবিক ডিয়াগো ডিয়াস সর্বপ্রথম এই দ্বীপে পা রেখেছিলেন। তাঁরই সম্মানার্থে এই দ্বীপের উত্তরাঞ্চলের নাম রাখা হয় ” ডিয়াগো সুয়ারেজ ” ।
প্রায় ৭০ কোটি বছরের পুরোনো এই দ্বীপ। ১৬৫ বছর আগে আফ্রিকা থেকে এবং ১০০ কোটি বছর আগে ভারত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় মাদাগাস্কার। আর এই প্রাচীন বিচ্ছিন্নতাই মাদাগাস্কারকে অনন্য উদ্ভিদ ও প্রাণী জগৎ উপহার দিয়েছে। এখানে প্রাপ্ত প্রায় ৯০ শতাংশ জীব বৈচিত্র্য পৃথিবীর অন্য কোথাও পাওয়া যায় না।
মাদাগাস্কারের উল্লেখযোগ্য সাংস্কৃতিক ও প্রাকৃতিক মূল্যের বেশ কয়েকটি স্থানকে ইউনেস্কো দ্বারা মনোনীত করা হয়েছে ওয়ার্ল্ড সাইট হিসেবে। যার মধ্যে আন্তানানারিভোয় আম্বহিমাঙ্গার,রাজকীয় পাহাড় , আটসিনামের রেনই ফরেস্ট এবং দ্বীপের পশ্চিমে Tisingy de Bemaraha স্ট্রিক্ট নেচার রিসার্ভ।
এই অঞ্চলের সংকৃতি মূলত ইন্দোনেশিয়ান উপাদানে গঠিত। আরবী এবং ইসলামিক অবদানের মধ্যে রয়েছে সিকিভি, ক্যালেনডায়িক বৈশিষ্ট্য। যেমন সপ্তাহে দিনগুলির আরবী থেকে প্রাপ্ত নাম। পশ্চিম, উত্তর এবং দক্ষিণের উপকূলীয় অঞ্চলগুলো আফ্রিকান সংস্কৃতির উপাদানে পুষ্ট। তবে কিছু বান্টু শব্দ ছাড়া শনাক্ত করা কঠিন ব্যাপার।
কিছু কিছু দেশে অদ্ভুত এবং ব্যতিক্রমী ঐতিহ্য দেখা যায়। মাদাগাস্কার এমন ই এক দেশ। এখানে নারী পুরুষ একই পোশাক পরে। শুধু তাই নয় , বিয়ে, মৃত ব্যক্তির সৎকারেও এই পোশাক ব্যবহার করা হয়। এই পোশাকের নাম লাম্বা। অনেক নারী বাড়িতেও পোশাকটি পরে। অনেকে শহরে গেলেও পরে। রেশম, কটন , সিল্ক দিয়ে পোশাকটি তৈরী হয়। অধিকাংশ মানুষ লাল ডোরাকাটা এবং সাদা কালো রঙের লাম্বা পরেন। তবে এখন গেঞ্জি, জিন্সের ফুল – হাফ, কোয়াটার প্যান্ট ঢুকে গেছে।
এছাড়াও মাদাগাস্কারের সংস্কৃতি তে একজন জীবিত মানুষের চেয়ে মৃত মানুষের গুরুত্ব অনেক বেশী। বয়স্ক মানুষের গুরুত্ব ও অনেক বেশী। কারণ তিনি খুব অল্প সময়েই সম্মানিত একটি জীবনে পদার্পণ করতে চলেছেন। খাবার টেবিল, বসার স্থান , খাবার পরিবেশনে আলাদা মর্যাদা পায়।
শিক্ষা ব্যবস্থা (৬+৪+৩) প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও বিশ্ববিদ্যালয়। কারিগরী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, শিক্ষণ প্রশিক্ষণ কলেজ এবং একটি বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে গঠিত। ৬-১৩ বয়সের বাধ্যতামূলক শিক্ষা প্রাথমিক শিক্ষা। এখানকার বিশ্ববিদ্যালয় গুলির মধ্যে অন্তানানারিভো বিশ্ববিদ্যালয় ১৯৬১, মহাজাঙ্গা বিশ্ববিদ্যালয় ১৯৭৭, এবং ফিয়ানারান্তসোয়া বিশ্ববিদ্যালয় ১৯৮৮। ভাষা মালাগাসি। উপকূলীয় অঞ্চলের তুলনায় মালভূমিতে স্কুলের উপস্থিতি এবং শিক্ষা ভালো । প্রোটেস্ট্যান্ট এবং রোমান ক্যাথলিক মিশন ১৯ শতক থেকে শিক্ষা প্রদান করে আসছেন। যদিও সরকারের পক্ষ থেকে বেসরকারি স্কুল গুলোকে বন্ধ করে দিচ্ছে। কিন্তু প্রধান শহর গুলিতে বেসরকারি স্কুল আছে।
মালাগাসি একাডেমির গ্রন্থাগার, বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগার এবং বিশ্ববিদ্যালয় জাদুঘর বর্তমান। মালাগাসি সংস্কৃতি এবং প্রত্নতত্বের সংগ্রহশালা বর্তমান।
এখানে প্রায় দুই তৃতীয়াংশ নারী এবং প্রায় তিন চতুর্থাংশ পুরুষ শিক্ষিত।
মালাগাসি নাগরিকদের অধিকাংশ গ্রামীণ এলাকায় বাস করে। স্বাস্থ্য পরিষেবা বলতে প্রধান ও মাধ্যমিক হাসপাতাল , ডিসপেনসারি এবং চিকিৎসাকেন্দ্র অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। চিকিৎসা কর্মীদের মধ্যে ডাক্তারের পাশাপাশি ফার্মাসিস্ট , ডেন্টিস্ট , মিড ওয়াইফারি, সামাজিক সহকারী , পরিদর্শনকারী, নার্স ও স্বাস্থ্য সহকারী। ১৯ শতকের শেষে মাদাগাস্কার ডাক্তাররা পশ্চিমা চিকিৎসা অনুশীলন শুরু করেন এবং ১৮৯৭ সালে আন্তানা নারিভোতে একটি মেডিকেল স্কুলের প্রতিষ্ঠা হয়।
শিশু মৃত্যুর হার বেশি। ম্যালেরিয়া , সিস্টোসেমিয়াসিস , অন্ত্রের সংক্রমণ বেশী। যৌণ সংক্রমিত রোগ গুলোও ব্যাপক। যেমন এইচ আই ভি।
ঘর গুলো সাধারণত আয়তক্ষেত্রকার খাড়া কোণ যুক্ত। ছাদের সাথে মুকুট যুক্ত। গ্রামীণ এলাকায় অধিকাংশ মাটির তৈরী এবং খুঁটির দ্বারা ম্যাটিং দেওয়াল। এছাড়াও মাটির , কংক্রিটের দোতলা, তিনতলা বাড়ী দেখা যায়। ঘরের আব্রুতার জন্য দেওয়াল ব্যবহার করা হয়। সে দেওয়াল পান বরজের মত খাগড়া জাতীয় গাছের ছালের ম্যাট, চ্যাচারী জাতীয় কাঠের ম্যাট অথবা ইটের তৈরি। ধনী দরিদ্র নির্বিশেষে কাঠের ব্যাপক ব্যবহার – কাঠামোয় সৌন্দর্য রূপদানে ।
বর্তমান আইন ব্যবস্থা ফরাসি কোড এবং অনুশীলনের ওপর ভিত্তি করে। একটি উচ্চ সাংবিধানিক আদালত, একটি উচ্চ আদালত, একটি সুপ্রীম কোর্ট, আপিল আদালত এবং ট্রাইব্যুনাল আছে। প্রাক্তন মেরিনা রাজ্য ১৯ শতক জুড়ে দ্বীপটি শাসন করেছিল।
স্থানীয় সরকারী ব্যবস্থায় – প্রদেশ – অঞ্চল এবং কমিউনে বিভক্ত। একজন নির্বাচিত প্রধান ও প্রাদেশিক পরিষদ দ্বারা প্রদেশ পরিচালিত হয়। আঞ্চলিক প্রশাসন ও অনুরূপ কমিউনে সরাসরি নির্বাচিত প্রশাসন থাকে।
মাদাগাস্কারের অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য হলো ভ্যানিলা , লবঙ্গ ও লিচু। চিংড়িও কম অর্থকরী ফসল নয়। এছাড়া স্যাফায়ার বা নীলকান্ত মণি এখান থেকেই আসে। নীলকান্ত মণি ছাড়াও এই দ্বীপে বহু মূল্যবান পাথর পাওয়া যায়। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী মাদাগাস্কারের মূল্যবান রপ্তানি পণ্যের মধ্যে নিকেল ও কোবাল্ট ধাতু।
১৮৮৩ সালে ফরাসিরা এখানে আক্রমণ চালায়। এর তের বছর পর ১৮৯৬ সালে রাজতন্ত্র উচ্ছেদ করে উপনিবেশ ঘোষণা করেন। তারও বহু বছর পর মাদাগাস্কার ফ্রেঞ্চ ওভারসিস টেরিটোরি হিসেবে গৃহীত হয়। বহু আন্দোলনের পর ১৯৬০ সালে মাদাগাস্কার ফরাসিদের কাছ থেকে স্বাধীনতা অর্জন করে।
মাদাগাস্কারের জনগণ মাদাগাসি হিসেবে পরিচিত। ভাষার নাম মালাগাসি। দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে ফরাসি ভাষা প্রচলিত। সাহিত্য ভাষা দ্য মালাগাসি। এই ভাষায় কবিতা, কিংবদন্তি , ইতিহাস, সমসাময়িক থিম , চিকিৎসা এবং পাণ্ডিত্যের কাজ সহ লিখিত সাহিত্য রয়েছে।
এখানকার জাতীয় সঙ্গীত “রে টানিন্দ্রা যানায় মালালা ও “! ( Ry Tanindra Zanay malala o ! ) রাজধানী আন্তানানারিভো। প্রজাতন্ত্র সরকার । রাষ্ট্রপতি এনন্দ্রি রেজোলিনা। প্রধানমন্ত্রী Jean Revelonarivo . ফ্রান্সের কাছ থেকে স্বাধীনতা ছিনিয়ে নেয় ২৬ শে জুন ১৯৬০। এখানকার জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে মেরিনা (২৬%), বেটসিমি সায়াকা (১৫%), টিসিমি হেতি (৭%), সাকালাভা (৬%)। সরকারী পদ্ধতি ইউনিটারি, সেমি প্রেসিডেন্সিয়াল , কনস্টিটিউশনাল রিপাবলিক। আয়তন ৫৮৬৮৮৪বর্গ কিলোমিটার। জনসংখ্যা ২৮২৬০৮৫৭।
এই দ্বীপের প্রাণীগুলোর অধিকাংশই একটু আলাদা। প্রাণীগুলোর মধ্যে বিবর্তনের ধারা সুস্পষ্ট। কিছু কিছু প্রাণীর মধ্যে একাধিক প্রজাতির বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করা যায়। যেমন ফাসা।
একে দেখতে অনেকটাই বেজি , কুকুর আর বেড়ালের সংকর মনে হয়। ছ’ফুট পর্যন্ত লম্বা হতে পারে। লেজ দেহের প্রায় সমান সমান দৈর্ঘ্যের। এদের মধ্যে খানিকটা বেড়ালের আদল । আকারে ছোট। কান গোলাকার। মাদাগাস্কারের অন্যতম শিকারী।
মাদাগাস্কারের উদ্ভিদ-প্রাণীকুলের অধিকাংশই এন্ডোমিক। এটি সবচেয়ে বড় ইকোলজিক্যাল হট স্পট ‘এ পরিণত হয়েছে। প্রায় ৯৬ শতাংশ ভাস্কুলার উদ্ভিদ এন্ডোমিক। পাম জাতীয় উদ্ভিদ গুলি ৯৭ শতাংশ এন্ডোমিক, ৮৫ শতাংশ অর্কিড এন্ডোমিক। এখানে দেখা যায় এমন ৯০ শতাংশ সরীসৃপ এন্ডোমিক। উভচর দের ১০০% এন্ডোমিক, ৩৭% পাখি, আর ৭৩% বাদুর এন্ডোমিক। এতেই বোঝা যায় এখানকার একটা আলাদা বাস্তুতান্ত্রিক মূল্য বর্তমান।
দ্বীপটির পূর্বাঞ্চল মূলত রেইন ফরেস্টে আবৃত। পশ্চিমাঞ্চল এবং দক্ষিণাঞ্চল তুলনামূলক শুষ্ক এবং ট্রপিক্যাল ফরেস্টে আবৃত।
মাদাগাস্কারের খাদ্যে মূলতঃ এশিয়ান, আফ্রিকান, ভারতীয় , চীনা ও ইউরোপীয় অধিবাসীদের প্রভাব যথেষ্ট। তবে এখানকার খাবারের ভিত্তি ভাত। এখানকার মালাগাছি রন্ধন প্রণালীতে রসুন, পেয়াঁজ , আদা, টমেটো, নারকেল, ভ্যানিলা , লবঙ্গ এবং হলুদের ব্যবহার হয়ে থাকে।
এখানে মানবাধিকার রক্ষা ব্যবস্থাও আছে সরকারী ভাবে।
প্রধান ধর্ম বলতে খ্রিস্টান ও মুসলিম। মুসলিম শতকরা 25 ভাগ। অবশিষ্ট খ্রিষ্টান। মসজিদের চেয়ে চার্চের সংখ্যা বেশি। তবে আজান কানে আসে নি। চার্চের ঘণ্টা সকালে কানে এসেছে। বিশেষ করে উল্লেখযোগ্য বলে না দিলে বাইরে থেকে দেখে কে কোন ধর্মের উপাসক, বলা অসম্ভব। মালাগাসি বিবাহিত কিংবা অবিবাহিত মহিলাদের চেনার একমাত্র উপায় সোনার রিং । সোনার রিং পরার অধিকার নাকি একমাত্র বিবাহিত মহিলাদের। সেই সাথে শ্রদ্ধাশীল হওয়া বাঞ্ছনীয়। অবিবাহিত মহিলারা রিং পরতে পারে কিন্তু সোনার রিং না।
এই যে মশাই ভালো করে মাথায় ঢুকিয়ে নাও পটভূমিকা। আমার কাজ শেষ । এবার তোমার পালা। সব মিলিয়ে মিলিয়ে দেখা। নোট করা খুঁটি নাটি।
পালা শেষ বললেও নিশ্চিত, একটুও আমাকে এদিক ওদিক হতে দেবে না। এই বিশ্বাসটাই ভ্রমণের চাবিকাঠি।
প্লেন এবার নাইরোবির আকাশ ছুঁয়ে আন্তনানাইরোভির পথে। চোখ একটুও সরেনি, নাইরোবির রানওয়ে থেকে কিভাবে স্পীড বাড়িয়ে উপরে ওঠে তার শিহরণ। দুদিনের এই ওঠা নামার মধ্যে ছেলেবেলার নারকেল দোলাকে খুঁজে পাই। খুঁজে পাই সেই বয়সে ঘুরতে ঘুরতে ওঠা নামার মধ্যে বুকের সেই অদ্ভুত শিহরণ টা। আজও সমভাবে।
প্লেন থেকে নীচে চোখ পড়ে। আহা! সব সাদা। ক্ষেত – চর – উপত্যকা। মনের মধ্যে উঁকি মারে সাদা বালি। নীল সমুদ্র, নীল আকাশ , সাদা মেঘ। কেনিয়ান মেয়ের মতো গাছের মাথায় চুলের টপ, পনিটেল, খোঁপা। রোদের সোহাগ জড়ানো ফিতা। ঠোঁটের মত নির্জনতা, মৃদুভাষী। ঘরবাড়ি চোখে পড়ে না। মেঘের ওপর বিচরণ। এ বিচরণ স্থির বিচরণ। যেমন বোঝা যায় না পৃথিবীর চলা । মেঘের ভেতর ডানার ছায়া । কখন যেন আমিও পাখি হয়ে মেলে দিয়েছি ডানা ।এক পরিযায়ী পাখি।
অতঃপর প্লেন ল্যান্ড করলো আন্তনানারিভো। স্থানীয় সময় তখন তিনটে দশ। বৈভব ছুঁয়ে না থাকলেও বলার মতোই এয়ারপোর্টটি। বেশ জমজমাট।
প্রথম খারাপ অভিজ্ঞতা রাজধানীতে। ভিসা করাই ছিল আগে থেকে। ইমিগ্রেশন এর সময় নতুন করে একটা ফর্ম ফিল আপ করতে বলা হলো কাউন্টার থেকে। ফর্ম ও সরবরাহ করা হলো। এরপর সরাসরি কিছু দাবি। ঘুষ ছাড়া তাকে কি আর বলতে পারি। কিন্তু মাদাগাস্কার কারেন্সি পাবো কোথায়। পরে দিচ্ছি বলে কোনোরকমে ম্যানেজ করলাম। তারপর যথারীতি পাসপোর্ট , স্ট্যাম্প , সই এর পর লাগেজ নিয়ে বেরুতেই আমাদের আপ্যায়ন করলো গাইড। সকলকে হাতে ধরিয়ে দিল জলের বোতল। সঙ্গের লাগেজ বাসে তুলে দিল অন্যান্য দুটো ছেলে। আমরা সকলেই হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম। মাটিতে পা ফেলার যে এত আনন্দ এই প্রথম বুঝলাম। বাইরে থেকে এয়ারপোর্ট ভারি সুন্দর! সকলে সেলফি তুলতে ব্যস্ত। আমিও। কোনো অসুবিধা হবার কথা নয়। ছবি তুলতেই হবে। কেননা জোড় তো আছেই। আমি বরাবর যা করে থাকি, অপরের সাহায্য নিলাম। তবে যার জন্য ছুটে এসেছি সেটাই মুখ্য। ফলে সেলফি বা নিজের ছবি তোলার প্রয়োজন হয় না। সামগ্রিক প্রকৃতিই প্রধান। সে নিজেই তুলি।
বাসে উঠে বসলে গাইডের পক্ষ থেকে হাতে তুলে দেওয়া হলো আইটিনারি । নাম তার বিশ্ব । উচ্চারণে অনুনাসিক এবং ‘ ট ‘এর ক্ষেত্রে ‘ ত ‘ এর প্রভাব বেশী। বুঝলাম ফ্রেঞ্চের ছোঁয়া। ভাষার একটা সমস্যা ছিল। মালাগাসি বা ফ্রেঞ্চ ছাড়া এখানে কিছু বোঝে না। গাইড বিশ্ব ইংলিশে বোঝায়। কষ্ট হলেও বুঝতে পারি। এটাই প্রকৃত অ্যাডজাস্টমেন্ট।
বাস ছাড়ে। প্রথমে কয়েকটা সাইট সিন। তারপর হোটেল। সবার আগে কারেন্সি চেঞ্জ। এয়ারপোর্ট ‘এর কাছেই এক্সচেঞ্জ অফিস। ভট্টাচার্য দা, সাগ্নিক দা, কেরালিয়ান মাধবন , সাথী ও জয়শ্রী দি এবং দেবাশিষ ডলার ভাঙিয়ে মাদাগাস্কার কারেন্সি ( আরিয়ারি ) নিল। এক ডলারে নাকি ৪৬০০ আরিয়ারি। ডিনোমিনেশনে নাকি তা ভ্যারি করে। ভারতীয় মুদ্রায় ১ অরিয়ারি = ০.০১৯ টাকা।
হঠাৎই মাথায় হাত কেরালিয়ন দম্পতির। তাদের লাগেজ এয়ারপোর্ট থেকে কালেক্ট করেনি। অদ্ভুত হলেও এটাই বাস্তব। অতঃপর গাইডের সাহায্য। ফোনে যোগাযোগ হলো। ঠিক হলো হোটেলে গিয়ে সকলকে নামিয়ে বাস নিয়ে এয়ারপোর্টে যাবে।
গাড়ি চলতে শুরু করলো। আন্তানানরিভো শহরে তখন ছুটির সময়। বেশ গা শিরশিরে ঠান্ডা। ধীরে ধীরে রোদ্দুর বুড়ো হচ্ছে, সাইন বোর্ড ইংলিশ , একটু এগুতেই জ্যাম। ফুটপাতে হকারী দোকান। রাস্তার দুধারে নিত্য যাত্রীর লম্বা লাইন। ঘরে ফেরার। সিটি বাসের জন্য। চোখে পড়ে কর্পোরেট বিজ্ঞাপন। কুচিয়ে কুচিয়ে সবজি বিক্রি। রাস্তার ধারে মাছ, মদ ও চাট এর দোকান। বেশ ভিড়। সঙ্গীর কণ্ঠে তখন রবি ঠাকুর –
উদভ্রান্ত সেই আদিম যুগে স্রষ্টা যখন …
আকাশ প্রকৃতি যতটা স্বচ্ছ – নির্মল, রাস্তাঘাট ততটা নয়। বেশ অগোছালো এবং নোংরা। প্রশাসনের ছোঁয়া মুক্ত। যথেষ্ট ট্রাফিক জ্যাম। সে জ্যাম এলোপাতাড়ি চলাফেরা । উল্লেখ করার মতো গাড়িও নেই। যাত্রীও নেমেছে রাস্তায় , ফুটপাত ছেড়ে। চোখে পড়ে না নিয়ন্ত্রণের জন্য ট্রাফিক পুলিশ। শহরটা যে ডানা মেলছে সেটা বোঝা যায়।
ধীরে ধীরে অন্ধকার গ্রাস করে। আলো জ্বলে ওঠে। বড্ড যেন কম কম আলো। বিজ্ঞাপনের হোর্ডিং এর আলো গুলোও। ল্যাম্প পোস্ট গুলোও বড্ড দূরে দূরে। আলোগুলোও তার মিটিমিটি। পোস্টগুলো বড্ড লিকলিকে। এরই মধ্যে বেয়ে ওঠার জন্য ছোট ছোট পাদানি। এক ধরনের মই বলা যেতে পারে।
শরীরেও তখন নেমেছে একরাশ ক্লান্তির অন্ধকার । মনটা সকলের হোটেল হোটেল। সন্ধ্যা সাত টা বাজে বাজে। হোটেলে ঢুকলাম। নাম Chalet De Rose Hotel, শহরের সেরা হোটেল ই বলা যায়। শরবত দিয়ে আপ্যায়ন । আলাদা ভাবে উল্লেখ করতে হয় কাঠের ব্যবহার আর ফার্নিচার। গাইড ঘরের চাবি ডিস্ট্রিবিউশন করে । ঘর প্রতি ডাবল অথবা টুইন । বুঝলাম স্বামী স্ত্রীর ক্ষেত্রে ডাবল বেড , নচেৎ দুজনের সিঙ্গেল সিঙ্গেল করে। দেবাশিষ গাইড কে নিয়ে এয়ারপোটে ছুটলো লাগেজ সংগ্রহ করতে। আমারা রিসেপশন থেকে WiFi এর পাসওয়ার্ড নিয়ে রুমে গেলাম।
পুনরায় বাজে অভিজ্ঞতা। হোটেল বয় ওদের ভাষায় টাকা চায়। ঘরে ঢুকতে না ঢুকতেই। মনে পড়ে গেল এয়ারপোর্টের কথা।
আমার জোড় সঙ্গী এগিয়ে এলো। ভুল করছ’। একে এয়ার পোর্টের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলো না। ওর দিকে চেয়ে দেখ … দু ‘ বেলা হয়তো পেট পুরে খেতেই পায় না ।
শুনেছি ওরা তো কুঁড়ে। কাজই করে না। পয়সা পেলে নেশা করে কাটায়।
সেটাতো বহু বঞ্চনার আর্থ সামাজিক কারণ। কিন্তু খেতে তো পায় না , সেটাতো সত্য।
সঙ্গীর গলাটা ধরে এলো, চোখ দু ‘টো গেল ভিজে। গ’ লে গেল মনটা। চুপ করে গেলাম। আমাদের কারেন্সি নিলে তাই দেবো। নেয় শুনেছি।
ফ্রেশ হয়ে নিজেকে বিছানায় ছেড়ে দিলাম। মধু দা পাশের ঘরের পল্টু দাকে নিয়ে বেরিয়ে গেল। জানি চা কফির তৃষ্ণা। আমি তখন ডুব দিলাম ফোনে। কেননা দু ‘ দিন হতে চললো আত্মীয় পরিজন থেকে বিচ্ছিন্ন।
অল্পক্ষণ পরেই মধু দা পল্টু দা ফিরে আসে। ভালো চা খাওয়া আর হয়ে ওঠেনি। এখানে ডলারে কাজ করে নি। আরিয়ারি চাই চা খেতে। অতঃপর তাড়াতাড়ি ডিনার খেয়ে লম্বা ঘুম। যথেষ্ট ঠাণ্ডার আমেজ ঘুম কে করে গাঢ়।
আজ মঙ্গলবারের সকাল। সেপ্টেম্বর ২০২৩ এর পাঁচ তারিখ। বেশ ঠাণ্ডা। ব্রেকফাস্ট টেবিলে পাশের এক পর্যটক ডাকে। কাছে গেলাম। ওনারা দুই বন্ধু। মুম্বাই থেকে এসেছেন। একজন বাঙালি, অপরজন মারাঠী। বাংলা কথা শুনে এই আগ্রহ। আজকে টানা, মাঝে আন্তনানাইরিভোর সাইট সিন। ঘর থেকে লাগেজ আনতে গিয়ে হোঁচট -ভুলটা আমারই। চাবি না নিয়ে ঘরের দরজা বন্ধ করে চলে এসেছি। অটোমেটিক্যালি সেটা লক হয়ে যায়। অতঃপর মুস্কিল আসান রিসেপশন কাউন্টার থেকে হলো। ডুপ্লিকেট চাবি তে কাজ মিটলো। সকাল সাতটায় বাসে উঠলাম। এখনও টানার রাস্তা ঘাট জেগে ওঠে নি। তারই মধ্যে ছোট ছোট শিশু পিঠে কোমরে হাজির হয়েছে যুবা যুবতী। বুভুক্ষু চোখ মুখ। ভিখারি বলতে ইচ্ছে করে না। বিক্রির জন্য জড়ো হয়েছে হকার । দেশজ শিল্প নিয়ে। আমরা এখন ফাজা, মানে ফরেনার । পছন্দ হলেও আমার কেনার উপায় নেই। আরিয়ারি পাবো কোথায়!! বাস ছেড়ে দিলো। একটু পরেই গাইডের মাধ্যমে হাতে হাতে পৌঁছে গেল একটা করে জলের বোতল। কালকের ডিনারে এবং আজকে ব্রেকফাস্ট ‘এ নজর কাড়লো টেবিলে সাদা ধবধবে রুমাল, সুদৃশ্য পানপাত্র রাখা , কিন্তু জলের টিকি টি নেই। কোনো বাধা নেই বাবা – মায়ের বাচ্ছা ছেলেমেয়ের সাথে ড্রিংক করতে।
বাঁক নিয়েই বাস ওপরের দিকে উঠতে থাকে । দিনের আলোয় বুঝলাম এটি শহরের হার্ট প্লেস। সাত সকালেই জ্যাম। কেননা স্কুলের স্টুডেন্ট। গাইডের ভাষায় এখন এটা নিত্য সঙ্গী। এখানে স্কুল বন্ধ থাকে তিনমাস, জুন, জুলাই, আগস্ট ।এখন স্কুল জ্যাম। ইতঃস্তত পচা কালো জল জমে। নোংরা ছড়িয়ে ছিটিয়ে। তবু রাস্তার দুপাশে লম্বা লম্বা গাছ যা ঢেকে দেয় নোংরা। পন্সসিটিয়া ফুল কেড়ে নেয় দৃষ্টি। হরেক পাম তো আছেই। আবার আম, শিরীষ , তুলা, শিমুল , কাঠ মল্লিকা মনে করিয়ে দেয় তোমারও এটা তানিন্দ্র জামা বা পূর্বপুরুষের ভূমি। অবাধে বিচরণ করে ধোঁয়া ছাড়া গাড়ি। গাইডের কাছে জানতে পারলাম পুরোনো – নতুন লাইফ বলে গাড়ির কোনো বাধ্যবাধকতা নেই এখানে । মালভূমির বাঁকে বাঁকে সুদৃশ্য বাড়ি, দোকান, মল, প্রাইভেট স্কুল। ফ্রেঞ্চ ভবনও চোখে পড়ে।
গাড়ি এসে থামলো একটা ভিউ পয়েন্টে। বাম দিকে ওপরে রাজ প্রাসাদ। আজ বন্ধ। সকলে তখন ছবি তুলতে ব্যস্ত।
১৬২৫ সালে রাজা আন্দ্রিয়ান জাকা এই শহরটি গড়ে তুলেছেন। আন্তানানারিভো অর্থ হাজারের শহর। এই নাম করণের কারণ হলো রাজার হাজার সৈন্য এই শহর টি পাহারা দিত।
এই শহর টি মাদাগাস্কারের সবচেয়ে বড় এবং জনবহুল শহর। মাদাগাস্কারের ভৌগোলিক, রাজনৈতিক , প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দু এই শহরটি। কর্পোরেট কোম্পানির যে আয়ত্বে সেটা বোঝা যায় বিজ্ঞাপনে।
এতৎ সত্বেও মেরিনা রাজা অন্দ্রিয়ান জাকার, যিনি প্রায় ১৬১০ থেকে ১৬৩০ সাল পর্যন্ত মেরিনা শাসন করেছিলেন। তাই ওনার একটা প্রভাব রয়েই গেছে মেরিনাবাসীর মধ্যে। প্রধানত উপকূলের ক্ষেত্রে।
এখানকার সামাজিক জীবনে গরুর প্রভাব খুব বেশি। উৎসব অনুষ্ঠানে বিফ এর ব্যাপক প্রচলন। কেনিয়ানদের নাকি যত গরু থাকবে তত বিয়ে । আবার গাছকে পরম পবিত্র ও গড মানে। সকলে একসঙ্গে বসে প্রার্থনা করে। গাছের মতোই যেন জীবনে শপথ করে , সকলে গাছের মতো শাখা প্রশাখায় জড়িয়ে লেপ্টে আত্মীয়তার বন্ধনে থাকবে । আমরা যেমন বট অশ্বথে জল দিই – মানত করি। কল্পতরুর মত পূজা করি। মাদাগাস্কার সংস্কৃতিতেও তা দেখা যায়।
ঘড়িতে তখন সাড়ে দশটা। এবার নিচে নামছি হেঁটে হেঁটে । অদূরে লাল পলাশ ফুলের মত গাছ। ঠিক তার পাশে চার্চের মত একটা গির্জা। দেখলাম সরকারী মেডিসিন স্টোরেজ ,আর রাস্তা জুড়ে , মেডিকেল কিটস নিয়ে একদল মানুষের ভিড়। মহিলা , যুবতীই বেশী। ফিটফাট। টপ -স্কার্ট -জিন্স পরনে। জানলাম শহর থেকে সেন্ট্রালি ভ্যাকসিন নিতে এসেছে। এগুলিই তাদের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়বে শহরে গ্রামে।
একটু নেমেই ডানদিকে মিলিটারি ক্যাম্প। মাছের আঁশ এর মত কারুকার্য ঘরের চালে । সেখান থেকে নিচে নেমেই বাস স্ট্যান্ড। বিরাট এলাকা নিয়ে চার্চ। দেখলাম অনেক স্টুডেন্ট। নার্সিং ট্রেনিং নিচ্ছে। কিশোরী সব স্টুডেন্ট । ছবি তুললাম। কথাও হল গেসচারে – পসচারে বা অঙ্গ ভঙ্গিমায়। কেননা ইংরেজি তেমন বোঝে না। ফ্রেঞ্চ না হলে মালাগাসি। চার্চের প্রার্থনা হলে জুতো পরে ঢুকতে মানা নেই। সেখান থেকে শহরের ভিউ অপূর্ব।দেখলাম একদল ছেলেমেয়েকে ফ্রি হ্যান্ড এক্সারসাইজে ব্যস্ত। কিন্তু সে দেখাকে ছাপিয়ে যায় প্রাকৃতিক পরিবেশের উষ্ণতা। এতটুকু আক্ষেপ করার কোনো জায়গা নেই। ধরে রাখলুম নিজের মোবাইলে।
এরপর সাইট সিন বলতে শহর পরিক্রমা। এদিকে বেশ পরিপাটি। হিল শহরের মত যথেষ্ট কেয়ারি গাছ গাছালি। গাছগুলোকে কখনোই অপরিচিত বলে মনে হয় না। বরং বেশি বেশি পরিচিত। আমি তো নভিস। পল্টুদা, মধুদা পটাপট বলে দিচ্ছে তার জাত গোত্র। মনেও থাকে না আমার । আবার সেসব নামগুলো শুনলে বড্ড অপরিচিত বলে মনে হয়। আমি তো আর গবেষণা করছি না। চোখে পড়ল পেট্রল পাম্প, ব্যাংক অফ আফ্রিকা , মাল্টি ন্যাশনাল অফিস, পুলিশ ফাঁড়ি । তাদের পোশাক আমাদের মত খাঁকি বা সাদা নয় – কালো। দেখা হলো ট্রেন লাইনের সাথে। তবে লাইন নামেই । চলতে দেয় না প্রাইভেট বাস মালিকরা। নজর কাড়ে একটা বিষয়। প্রায় প্রতিটি রাস্তার আঁকে বাঁকে রোগা লিকলিকে ছোট বাচ্ছা পিঠে বেঁধে যুবতী দের যেতে আসতে বা ভিক্ষা করতে। পরনে অধিকাংশরই জিন্স গেঞ্জি। রাস্তা- ঘাটে বা দোকানে, ফুটপাতে মাঝ বয়সী বা বুড়ো বুড়ি চোখেই পড়ে না। বরং কিশোর কিশোরীর সংখ্যাই বেশী। জেনেছিলাম এটা যুবা রাষ্ট্র। গড় বয়স সাড়ে উনিশ বছর। যা দেখছি তাতে সেটাই সত্য । সাক্ষী হই বস্তির । কোভিড নাকি বড্ড ক্ষতি করে দিয়েছে। গরীব করে দিয়েছে শহরবাসীকে। সাইকেল যাতায়াতে, মাল বহনে খুব উপযোগী। ইয়াং দের মধ্যে হাত ছেড়ে চালানোর একটা প্রবণতা। মাল বওয়ার ক্ষেত্রে পিছন দিক থেকে ঠেলে নিয়ে যায়। হ্যান্ডেল ধরার প্রয়োজন হয় না। স্কুল খুব বেশী চোখে পড়ে না। কলা গাছ যে এত আনন্দ দিতে পারে – তখন কল্পনাতেও আসেনি। মাছ সবজির বাজার গুলো কে মানুষ ছাড়া আলাদা ভাবে কিছুই ভাবা যায় না। সবই বেশী বেশি চেনা পরিচিত। এদিকে এসে থেকেই বিদ্যুৎ দার বাড়িতে সমস্যা। উনি অবসর প্রাপ্ত যোগমায়া কলেজের প্রফেসর। বিষয় জুওলজি । একা একাই প্রায় বিশ্ব ভ্রমণ করে ফেলেছেন। ইতিমধ্যে নব্বই টা দেশ হয়ে গেছে। ওনার থেকে বেশি আবার জয়শ্রী দির , মাড়োয়ারি গৃহবধূ। আমি একেবারে নবাগত। দমদমের বাড়িতে প্রোমোটারের পাঁচিল নিয়ে সমস্যা যেটা কোর্টের দিকে এগুচ্ছে। শলা পরামর্শ করা যাচ্ছে না। ফোনের সমস্যা। হোটেলে wifi ছাড়া হয় না ফোন। তাও নেট পুওর। ঠিক হলো নতুন সিম নেবেন । উনি অকৃতদার। তেমন একটা জোড় ও হয়ে ওঠেনি এখানে । এখানে সকলের কথাবার্তায় জানা গেল – ভ্রমণ কালে এমন সমস্যা নাকি ওনার বরাবরের। সেই সাথে আরো কিছু শোনা গেল। সেগুলো আর না বলাই ভালো।
বাস থামলো। দেবাশিষ , বিদ্যুৎ দা কে নিয়ে নেমে পড়লো। সাগ্নিকদাও নেমে গেলেন বাজার পরিদর্শনে । অল্পক্ষণ পরে দেবাশিষ নতুন সিম ভরে নিয়ে ফিরে এলো। বিদ্যুৎ দা খুশি। তিন ডলার খরচ হয়েছে ।
অদূরেই একটা মেলা বসেছে। কিসের? জানিনা। বুঝলাম নারকেল দোলা,ঘোড়ার দোলার মত সব মেলার উপাদান দেখে। অপরদিকে একজন দোলার রিং এ আপন মনে খেলা অনুশীলনে ব্যস্ত ।
এবার আমাদের গন্তব্য অন্তনানারিভো এয়ার পোর্ট। সেখান থেকে পশ্চিমে মরণডোভা এয়ার পোর্টের ফ্লাইট। ঠিক সময়েই বাস পৌঁছোয়। ইতিমধ্যে পথেই গাইড দেবাশিষ কে সঙ্গে নিয়ে এয়ারপোর্ট অফিস থেকে খোয়ানো লাগেজ সংগ্রহ করে আনে। কেরালিয়ন দম্পতি খুশি। এজন্য আলাদা করে ট্যাক থেকে খসে পঞ্চাশ ডলার। খুশির ড্রিংক খরচ। যে যার লাগেজ লাইনে রেখে সীটে বসে পড়লাম। কেউ কেউ গেল ওয়াশরুমে।
এয়ার পোর্টের সামনে একটা গাছের সঙ্গে মধুদা পরিচয় করিয়ে দিল, যার বাংলা নাম বজ্রবরণ। এক ইয়াং ম্যান কে দেখলাম বসার সীটে বেহুঁশ। অদূরে কেয়ারি বাগানের ঘাসের মেঝেতেও একজন।
বাতাস বইছে। যথেষ্ট ঠান্ডা। ক্রমে ক্রমে বাড়ছে ভিড়। লাগেজের লাইন। নেই কাজ তো খই ভাজতে লাগলাম। কটা মালাগাসি ভাষা ক্যাপশন থেকে। মিভোজা মানে ওপেন বা খোলা । Tsaradia ( সারাডিয়া) মানে Laugne বা প্রতিবন্ধী।
পল্টুদার তো সমস্যা আর মিটছে না। মধুদা বলে এসব কিছু হচ্ছে পল্টুর দাড়ির জন্য। সমস্যাটা পল্টুদার লাগেজ ব্যাগ। একটু ছেঁড়া থাকায় আটকে দেয়। শেষমেশ ব্যাগের প্লাস্টিক সার্জারি। পুরো রঙ ই চেঞ্জ হয়ে যায় ব্যাগের । লাল থেকে একেবারে কালো। এয়ারপোর্টের ডাক্তার মুচি রেডিই ছিল। এই কি, সার্জারি তো! এমনি এমনি আর হয় না। আবার খসে পাঁচ ডলার।
মরণডোভার ফ্লাইট 12: 40, T22702,ভাড়া 893.200 আরিয়ারি 0.019=17000 টাকা ।
যথারীতি এবারও জানালার ধারে সিট। এক ঘন্টা পনের মিনিটের যাত্রা। তিনবার জানালার ধারে বসতে বসতে মনের মধ্যে উঁকি মারে বীজগণিত। মনের ভাবনা আমার বুঝতে পেরেই সঙ্গী প্রতিবাদ করে ওঠে।
এই যে মশাই, জানালার ধারে প্রাকৃতিক দৃশ্যকে কমনের ঘরে ফেলে দিলে হবে না। সেই পাঁঠার চোখে দেখতে হবে। মনে করিয়ে দেয় যেন বিভূতিভূষণ কে। অনেকটাই তাই। এক রকম সব দেখতে হলেও মোটেই তা নয়। রাস্তাগুলো এখন সব নদী। নীচে সাদা বালির চরের মাঝে অরণ্য গুলো যেন মেলা ছাতা। ঘর বাড়ি গুলো নীল সি বিচে পাতা আরাম কেদারা। মন ভালো করা সব উপাদানই বর্তমান। একরাশ উষ্ণতার ছোঁয়া বিমান সেবক সেবিকাদের।
ক্ষুদে সাদামাটা এয়ার পোর্ট মরণডোভা । এয়ার পোর্ট থেকে বেরিয়ে গাড়ি প্রস্তুত। এবার আর বাস নয়। চারটে গাড়ি। আমি -মধুদা – পল্টুদা লাগেজ নিয়ে একটা নিশান গাড়িতে উঠে পড়লাম। গাড়ি ছেড়ে দিলো। ঘড়িতে তখন আড়াইটে। জানালায় চোখ। চারিদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে একরাশ নীরবতা। প্রচুর গাছ। পাকা রাস্তা। তবু সার্বিক অঙ্গ জুড়ে একটা শুষ্কতার খড়ি ওঠা প্রলেপ। এই সেই মরণডোভা। মাদাগাস্কারের একটি জনপ্রিয় বিচ। পশ্চিমের একটা দ্বীপ শহর বলেও ততোধিক পরিচিত। আন্তানানারিভো থেকে দূরত্ব ৬০০ কিমি । একটা ব্যস্তময় পর্যটন শহর। সারা পৃথিবী থেকে লোক আসে বেড়াতে। মধুচন্দ্রিমা উপভোগ করতে।
মাইফ এই ভাবেই ঋদ্ধ করে। আমাদের গাড়ির ড্রাইভার। ইয়ং ম্যান। ধর্মে খৃষ্টান। অল্প অল্প ইংরেজি বোঝে। ট্যাবে গাড়ির কাগজ পত্র।
গাড়ি এয়ারপোর্ট থেকে বেরিয়ে প্রথমে ডানদিকে বাঁক নিয়ে ছোটে। খুব যে প্রশস্ত রাস্তা বলা যায় না। গাড়ির সংখ্যা খুবই কম। তবে প্রচুর গাছপালা। অল্পক্ষণ পরেই হাইওয়ে তে উঠলাম। এই প্রথম চোখে পড়লো অটো – টোটো। লাইন দিয়ে রিক্সা। গাছগুলো এত লম্বা যে মাথা দেখা যায় না। ঝড় প্রবন এরিয়া এটা। এই চব্বিশ -ত্রিশ ফুটের সাই বাবলার জঙ্গল তো, এই প্রচুর শিমুল তুলোর হাইব্রিড গাছ। পল্টুদার চোখ তখন গাছ ছাড়াও খুঁজে বেড়ায় পাখির সন্ধানে। আর অভিজ্ঞতায় ধরা পড়ে ডাক জাতীয় একটা পাখি বিশেষ ভঙ্গিমায় ডানা তুলে আকর্ষণ করে ফিমেল পাখিকে। হঠাৎই গাড়ি থেমে যায়। পুলিশ চেকিং। মাইফ তার ট্যাব নিয়ে নেমে যায়।
সেই একই ছবি। পথে কম বয়সের ছেলেমেয়ে। তারমধ্যে আবার ছোটো ছেলে মেয়ে। অপেক্ষাকৃত কম চুল , ছোটো স্কার্ট , কালো সাদা চুল, বিশেষ চুলের বিনুনি। কী একটা যেন নাম আছে। অনেকের পায়ে জুতো। অনেকের আবার খালি পা। তবে নোংরা – গন্ধ নয়। একটা স্নিগ্ধ পরিচ্ছন্ন প্রলেপ স্পষ্ট।
প্রথম মাটির রাস্তার সঙ্গে পরিচয়। জায়গা টার নাম বাহবাব এভিনিউ। বাহবাবই মাদাগাস্কার কে দিয়েছে বিশেষ পরিচিতি। বাহবাবের জন্য বলা হয়ে থাকে বাহবাব শহর।( City of Bahbab ) । এখানকার মানুষের সামাজিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক জীবনে বাহবাবের প্রভাব ব্যাপক।
বাহবাব একটি উপত্যকার পর্ণমোচী ফলের গাছ। উচ্চতা ২০ থেকে ৩০ মিটার। যে কোনো জায়গায় বাড়তে পারে। বহু শতাব্দী বেঁচে থাকতে পারে। এর স্ফীত এবং ঘণ ফাঁপা কান্ড টি একটি বিশাল বোতলের মতো দেখায়। জিমার ও বলে থাকে। ৩ -৭ মিটার ব্যাস পর্যন্ত প্রশস্থ হতে পারে। Adansonia গণের অন্তর্ভুক্ত। বিশেষত আফ্রিকা এবং আরবের মরু অঞ্চলের বৃক্ষহীন তৃণভূমিতে এই গাছ দেখা যায়। আফ্রিকা, আরব এবং অস্ট্রেলিয়া এর আদি নিবাস। সপুষ্পক উদ্ভিদ। এই গাছের প্রতিটি অংশই মানুষের সরাসরি কাজে আসে। গাছের বাকল দিয়ে পোশাক ও শক্ত দড়ি তৈরী হয়। ফল ও খাওয়া যায় এবং পাতা থেকে চাটনি তৈরী করা যায়। পাতা থেকে বিভিন্ন ধরনের ওষুধ ও তৈরী হয়। গাছের কাণ্ড এত বিশাল যে এর গুঁড়ির গর্তে মানুষ বসবাস করতে পারে। মরু ঝড়ে মানুষ এই গাছের গুঁড়ির গর্তে আশ্রয় নিয়ে থাকে । বর্ষা কালে এই গাছ ১.২ লক্ষ লিটার জল ধরে রাখতে পারে। এর ফল দেখতে লাউ এর মতো। এই গাছ নিয়ে গল্পও আছে।
এই গাছের আদি নিবাস ছিল স্বর্গে। শয়তানের কুনজর পড়ল এই গাছটার ওপর। তার মাথায় চাপলো বদ খেয়াল। গাছটিকে তখন সে উপড়ে ফেললো স্বর্গের মাটি থেকে। তারপর পৃথিবীতে নিয়ে এলে উল্টো করে মাটিতে পুঁতে দেয়। গাছটি হিবিস্কাস বা ম্যালো পরিবার ভুক্ত একটি প্রজাতি (৯ টি প্রজাতির মধ্যে ) ।
অরণ্যের মধ্যে যে গাছটি তার পাতা ও বাকলের পোশাক হারিয়ে শ্বেতী, ওটা আসলে ঘোষ্ট ট্রী, মধুদা জানায়। এরকম নাম কেননা, রাতে অন্ধকারে চাঁদের আলোয় এদেরকে ভূতের মতো দেখায়।
যথার্থই বাহবাব এভিনিউ। নানান আকারের নানান রূপের বাহবাব গাছ। ছবি তোলার হিড়িক পড়ে গেল ফোনে, ক্যামেরায়। বিশেষত পল্টুদা ও মধুদার উভয় মাধ্যমেই । বিদেশিদেরও অভাব নেই। পরিচয় হয়েছে গ্রীস পর্যটকের সঙ্গে। গাড়ি এগোয় – আবার থেমে যায় – আবার ছবি। এভাবে বেশ খানিকক্ষণ চলে। জল চক্রের মতো এক সময় প্রবণতা হ্রাস পায়। ভাগ্যিস মনে তখনও বাহবাব। আর রাস্তার যা অবস্থা … লাল ধুলো মাটির রাস্তা । বড় বড় গর্ত। মাইফের স্টিয়ারিং’ এর হাত প্রশংসার দাবি রাখে। এসি গাড়ি বলে জানালা বন্ধ। লাল ধুলোয় আবির মাখা হয়ে ওঠেনি। এমনই ধুলো যে মাঝে মাঝে উইন্ড স্ক্রীনে হাইফার চালাতে হচ্ছে। ধীরে ধীরে সন্ধ্যার অন্ধকার নেমে আসে। ছোটো বড় নির্বিশেষে পথিক হাত নেড়ে অভ্যর্থনা জানায়। বড্ড ভালো লাগে তা দেখে। জানতে পারি – বলছে ফাজো – মানে ফরেনার। আর বিস্কুট , ক্যান্ডি ও খালি বোতল দিলে খুব খুশি হয়। শুনিয়ে দেয় ওদের জাতীয় সঙ্গীত।
গাড়ি এগুতে থাকে। দোল ফ্রি। সারি সারি ফুল গাছ। বাঁশের কাঠের বেড়া। মিনি বাহবাব এর অরণ্য। দেখা হলো হাটের সঙ্গে। সবজির পসার। কড়াই শুটি, রাঙ্গালু, শুটকি মাছ…।
গাড়ি বলতে শুধু মানুষে টানা প্রচুর রিক্সা। শিশু শ্রমিক। ঘাড় সাদা কাক । রাখাল, সাদা- কালো গরু, ছাগল । এখানকার গরু, ষাড়ের ঘাড়ে কুঁজ দৃষ্টি কাড়ে। এখানেও শিশু কোলে ছেলে মেয়েদের যাতায়াত। কিশোর কিশোরীরা কুড়িয়ে বাড়িয়ে সামগ্রী নিয়ে সংসারে ফিরছে। ধুলো মাখা সূর্যাস্ত। তবু জঙ্গল ভীষণ ভীষণ ন্যাচারাল ঠেকে। কথায় কথায় পরাগ সৃজন গবেষক ডক্টর মধুদা জানায় পবিত্র বাহবাব গাছ কে বাংলায় কল্পতরু বলা হয়।
দেখতে দেখতে রাস্তা ডুবে যায় চটচটে অন্ধকারে। জনমানব শূন্য। ধুলো মাটির এই রাস্তা যে কত খারাপ ও মারাত্মক, হাড়ে হাড়ে অনুভব করলাম। কোনো রোড লাইট নেই। নেই আশপাশের বাড়ির আলো। অন্ধকারের ঘনত্বের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়তে থাকা অরণ্যের প্লবতা। আমাদের গাড়িরও ব্যাকলাইট নেই। ক্যামেরায় ছবি বন্দী করতে গিয়ে আমরা ভয়ানক পিছিয়ে গেছি। কোথায় যে গ্রাম,জনপদ কিছুই ঠাহরে আসে না। আমার ক্লান্তি ঘুচে তখন বুক টিপ টিপ। আফ্রিকার আতঙ্ক বুকের মধ্যে মাথা চাগাড় দিতে থাকে। পিছনে পল্টুদা, মধুদা হয়তো ক্লান্তিতে আচ্ছন্ন। আলো বলতে এখানে সোলার টিম টিম আলো দেখেছি। এখানে তাও চোখে পড়ে না। মন হয়ে ওঠে বিশ্লেষণ ধর্মী। ছড়িয়ে ছিটিয়ে শুধু গরীবী ও দারিদ্রতা। বিশেষ করে গ্রামে। শুনেছি ধনীরা এখানে গরীবের দিকে হাত বাড়িয়ে দেয় না। ধনীর দিকেই হাত বাড়ায়। যাকে বলে তেলা মাথায় তেল দেওয়া।
লোকালয় বুঝতে পারি টিম টিম সোলার আলো দেখে। ভিতরে ভিতরে ভীষণ ভয় পেয়ে বসে। একসময় গভীর অরণ্যের মধ্যে দিয়ে গাড়ি চলতে থাকে।
ঘড়িতে সন্ধ্যা সাতটা। গাড়ি থামে অরণ্যে ঘেরা সোলার আলোর মাঝে। অপর তিনটে গাড়ি নজরে আসে। দেখতে চিনতে না পারলেও ভেসে আসে পরিচিত গলার কথাবার্তা। কান পাতলেই পথের ভয়ংকরতার করচা। এটাই আজ রাত কাটাবার উপাদেয়। পৃথক পৃথক কটেজ। পুরোটাই কাঠের তৈরী। অনেকটাই শান্তিনিকেতনের সোনা ঝুরির মতো। স্টার হোটেল। সুইমিং পুল থেকে শুরু করে সব ই বর্তমান। ফ্রেঞ্চ ছোঁয়া নাম তার। Le Relais Des Krinindy.
ডিনার খেতে এসে ব্যর্থ হলাম। অর্ডার অনুযায়ী সার্ভ করতে ঘণ্টা খানেক লেগে যাবে যদি উৎকৃষ্ট খাবার খেতে চাই। ঠিক হলো তাই – এখন কিরিন্ডি। নাইট সাফারি। কেননা গাড়িতে এখান থেকে বেশি দুর নয়। আগেই বলেছি কিরিন্ডি মানেই মাদাগাস্কার। আবার মাদাগাস্কার মানেই কিরিন্ডি।
কিরিন্ড ফরেস্ট বা কিরিন্ডি প্রাইভেট রিজার্ভ হল পশ্চিম মাদাগাস্কারে অবস্থিত একটি ব্যক্তিগত উদ্যান। আরও স্পষ্ট করে বললে, রিজার্ভ টি মরণডোভা শহরের ৫০ কিমি উত্তর পূর্বে অবস্থিত। এই নামের কারণ – মালাগাসি ভাষায় কিরীন্ডি মানে বন্য প্রাণীর সাথে ঘণ বন। এই নাম করণের আগে সুইস জনগণের বন বলা হত। আপাত দুটি ঋতুর মধ্যে দিয়ে যায় বনটি। মার্চ থেকে ডিসেম্বর শুষ্ক ঋতু এবং ডিসেম্বর থেকে মার্চ বর্ষা ঋতু। জঙ্গল প্রাণী ও উদ্ভিদ উভয়েরই বিস্তৃত আবাসস্থল। লেমুর থেকে যে কোন স্থানীয় গাছের অনেক প্রজাতির গাছও দেখা যায়। এটিকে কিরিন্ডী নর্ড ও বলে।
মোট এলাকা প্রায় ১.২৫ কিমি বা ৪৮ বর্গ মাইল । জলবায়ু ক্রান্তীয়। প্রাণীকুলের মধ্যে পয়ষট্টির বেশী প্রজাতির সরীসৃপ এবং উভচর প্রাণী রয়েছে। পঞ্চান্ন প্রজাতির পাখির সাথে একত্রিশ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণীও শনাক্ত করা হয়েছে। বাঁদর তো আছেই। লেমুর, নিশাচর লেমুর’ এর দেশ এটি। ম্যাডাম বার্থের মাউস লেমুর। লাল লেজ যুক্ত স্পোর্টিভ লেমুর। পিগমি লেমুর। ধূসর লেমুর। ফ্যাকাশে কাঁটা যুক্ত দৈত্যকার ক্রোকোডাইল। লাল বাদামী, চর্বি যুক্ত, লেজযুক্ত বামন লেমুর। এগুলো সব নিশাচর। এছাড়াও জায়ান্ট জাম্পিং লেমুর।
এই বনে প্রায় ৫০ প্রজাতির সরীসৃপ আছে। যার মধ্যে ১১ প্রজাতির সাপ এবং ৭ প্রজাতির গিরগিটি। লেবারডস , বিভিন্ন প্রলেপ যুক্ত, হেনকেলের পাতা লেজ গকো, বড় মাথার গকো। সাপের মধ্যে গ্রাউন্ড বোয়া , দৈত্য হগ – নাক যুক্ত, বর্শা নাক যুক্ত সাপ এবং কাপিডেলো। এছাড়া নানারকমের ব্যাঙ, উভচর প্রাণীও বর্তমান। কিরীন্ডি বন অনেক স্থানীয় বনের আবাস স্থল।
জীবনে এই প্রথম রাতের অন্ধকার ফরেস্টে। পল্টুদা, মধুদা ‘এ ব্যাপারে মাস্টার। সঙ্গে হেড লাইট। আমার শুধু ছোট টর্চ। সঙ্গীর মিষ্টি ভর্ৎসনা। নো আক্ষেপ। পরের বার হেড লাইট হয়ে যাবে। এখন অন্ধকার কে উপভোগ করার সময় । অন্ধকারের অরণ্য , নীরবতা, ঝিঁঝিঁর ডাক, বাতাসের শিষকে এনজয় করো। এ যে রাতের রামধনু। এ এক বিরল পাওনা। একদম ঠিক কথা বলেছে সঙ্গী। রাতের অরণ্যের যে কত রূপ ! যথার্থ বিশেষণ রামধনু । অনেকগুলো গাড়ি পাশাপাশি থাকায় গা ছমছমে আতঙ্ক বা শিহরণ না থাকলেও ছিল একটা রোমান্টিক আধার সৌন্দর্য । জঙ্গলের সাগরে ডুবুরির মত যেন আহরণ করে চলেছি মুক্তো – প্রবাল – শঙ্খ। যেন অরণ্য নয়, অরণ্যের খনি।
ঘড়িতে তখন রাত্রি ৭ টা বেজে চল্লিশ । গাড়ি এসে থামলো ফরেস্টের গেটের কাছে। একটা ফলক চোখে পড়ল। টর্চের আলো ফেললাম। লেখা Alan I Kirindy Central National Forestation।
লোকাল গাইড সোলোং কে সঙ্গে নিয়ে বনে ঢুকলাম। এবার মনের মধ্যে চেপে বসলো একরাশ ভয় । মশার – সাপের সঙ্গে অজানা আফ্রিকান জঙ্গলের হিংস্রতা। নাইট সাফারির আনন্দে ভুলেই গিয়েছিলাম Odomos মাখতে।
বনের ভেতর ঢুকতেই নাকে আছড়ে পড়ল ইউক্যালিপটাস আবার ভিক্সের গন্ধ। তার মাঝে নানান পোকা মাকড়ের আবহসংগীত। সোলং হঠাৎ সকলকে ফিস ফিস করে ডাকে। গাছে লেজার আলো ফেলে কি একটা দেখতে বলে। লেমুর। জ্বল জ্বল করছে লাল চোখ। কোন যেন হেলদোলই নেই। কি যেন একটা নাম বললো লেমুরের। আমরা দেখতে ও ছবি তুলতে ব্যস্ত। নোট করা হয়ে ওঠেনি। সোজা সাপটা বুঝলাম লেমুর মানে ইঁদুর। তবে গবেষকের দৃষ্টি / গবেষণার ছাত্র হলে এই বোঝাটা শেষ বোঝা নয়। আরো অনেক বোঝার আছে।
সোলং তরুণী। পরনে জিন্স শার্ট। অরণ্যের ভাষা নখ দর্পণে। মুখে আওয়াজ করে ডেকে আনে লক্ষ্য পথে লেমুর। গাছের তলায় কোথায় থাকতে পারে সে অনুমানও তীক্ষ্ম। অভিজ্ঞতা তার প্রশংসার দাবি রাখে। আমাদের সর্বক্ষণের গাইডও কোনো অংশে কম না। তবে খুব বেশি কিছু দেখতে পেলাম না । আরো একটা লেমুর, কটা গিরগিটি দেখলাম। একটা হতাশার সাথে সাথে কৌতুক ও ফুটে ওঠে অনেকের মুখে। সেই কৌতুক কে কিছুটা স্ফীত করে ভিক্সের গন্ধ। গন্ধটা ইউক্যালিপটাসের নয়। সাথী দি ঢোকার সময় Odomos মেখেছিল। তারই গন্ধ। তবে মশার যথেষ্ট উৎপাত ছিল। আসার সময় খেয়াল করলাম শঙ্খ শামুকের খোল পড়ে থাকতে। চেষ্টা করেও অরণ্যের গাছ গুলোর নাম জানা গেল না। পর্ণমোচী তো বটেই। বৈশিষ্ট্যে তার গুঁড়ি গুলো খুব বেশি মোটা নয়। লম্বা লম্বা সরু সরু। পাতাহীন শুষ্ক প্যাকাটির মতো সরু সরু গাছের সারি। তবে গাছ গুলো কোনো না কোনো সারির মধ্যে আবদ্ধ। ঘনত্ব এবং গভীরতা সুস্পষ্ট। একা থাকলে অবশ্যই তা গা ছমছমে ব্যাপার। ফেরার পথে দেখলাম ডেকো। আমরা যাকে চিনি তক্ষক বলে।
ঘণ্টা দেড়েক চললো নাইট সাফারি। এবার ফেরার পালা। পেটেও পড়েছে টান। আগামীকাল সকাল বেলাও এখানে সফর হবে জানালো গাইড।
অতঃপর ডিনার মিটতে মিটতে দশটা পার। মোটামুটি চলনসই ডিনার। মেনু লিস্টের ভাষা মালাগাসি না হয় ফ্রেঞ্চ। ইংরাজীর কোনো গন্ধ নেই। গাইডের সাহায্য নিয়ে অর্ডার পেশ করা। রীতিমত এটা একটা কঠিন কাজ। সমস্যা এই কারণে , এক এক গ্রুপের এক এক রকম খাবার। সে সেট ভেঙে খাবার খাওয়া যাবে না। যাই হোক , আজকে ডিনারে শিখলাম egg plant fry মানে বেগুন ভাজা। অবশ্যই পরিবেশনের থালায়। এতো দামী হোটেলে ভালো নিশ্চয়, তবে আমাদের চটি বেগুনীর মতো নয়। যে কথাটা না বললেই না – খদ্দের এখানেও গ্লাস মদের। জলের ব্যবহার নেই। আমরাও জল পাই না। চাইলেও না। সঙ্গে জলের বোতল নিয়ে চলতে হয়। মাংস মদের ওঠে ফোয়ারা।
আজ বুধবার। তারিখ ০৬.০৯.২০২৩। মোরগের ডাকে ঘুম ভাঙ্গলো। খুব ভালো লাগলো। গ্রাম কে ফিরে পেয়ে। সবচেয়ে বড় কথা – যেখানে ষ্টার হোটেল, সুইমিং পুল- সেখানে মোরগের ডাক।
লোড শেডিং । ধুর, ইলেকট্রিক তো নেই এখানে। সব সোলার।
সকালে বিপরীত কিছু ভাবতে ইচ্ছে করে না। টিকটিকির ডাকের সাথে মনে করিয়ে দেয় ।
একসময় ঢাকের মত একটা শব্দ ভেসে এলো। রাত্রে দেখা হয়নি। কটেজের বারান্দায় এলাম। ভারি সুন্দর গাছ গাছালি পরিবেশ। রাস্তা সব কাঁচা। সেই সঙ্গে প্রচুর ধুলো। তবু অদ্ভুত একটা স্নিগ্ধতা , শুভ্রতা । পল্লী বধূর মতো ঠিক । সে যে রিক্ততার স্নিগ্ধতা।
প্রথম অসুবিধায় পড়লাম মোবাইল চার্জ দিতে গিয়ে। ইন্টারন্যাশনাল অ্যাডাপ্টার ছাড়া বিদেশের হোটেলের মোবাইলে চার্জ দেওয়া যায় না , আমার পূর্ব অভিজ্ঞতা ছিল না। মধুদা সেই অভিজ্ঞতায় পুষ্ট। আপাতত শেয়ার করে চার্জ এর সমাধান। সাথী আমার এসব বিষয়ে সদা শশব্যস্ত। এই সব খুঁটিনাটিতেই আলাদা মাত্রা পায় ভ্রমণ।
আজকে সাতটায় ব্রেকফাস্ট খেয়ে বেরোনো। সাইট সিন করে সোজা বেকোপাকা । সাইট সিনে পুনরায় দিনের কিরিন্ডি ফরেস্ট — লেমুর, জঙ্গল। কফি , টোস্ট, ব্রেড, জুস, ফ্রুট স্যালাডে ব্রেকফাস্ট সারলাম। তারপর ফটাফট ছবি তুলে গাড়িতে উঠলাম। মাইফ আগে থেকেই রেডি। এখানেও একটা লক্ষ্যনীয়। সব গাড়ির স্টিয়ারিং বাঁ দিক। ওভারটেক ও বাঁ দিক দিয়ে। ভট্টাচার্য দা কারণ হিসেবে জানালেন এটা ফ্রেঞ্চ প্রভাব বা সংস্কৃতি। ইউরোপিয়ান প্রভাব ডান দিকে ।
নিশান চলতে শুরু করলো। রাস্তা এখনও ঢেউয়ের মতো । ক্রমশঃ এগিয়ে যেতে লাগলাম। কাল রাতের অন্ধকারে ফরেস্ট টাকে হারিয়ে ফেলেছিলাম। এখন তার গভীরতা ও প্রসারতা মন ও চোখ কাড়ে। যেহেতু ড্রাই সির্জন গাছ সব শুষ্ক। পাতাহীন ডালপালা সূর্যের আলোকে ঢাকতে পারেনি।
গাইড সোলাং কে নিয়ে যখন বনে ঢুকলাম রীতিমত পর্যটকদের ভিড়। কত বুড়ো – বুড়ি বয়স্ক পর্যটক ও এসেছে। দিব্যি ঘুরে বেড়াচ্ছে। গাছ গুলো সব সরু – গগনচুম্বী। গায়ে গায়ে। আমার তো মনে হচ্ছিল আমি যেন ছেলেবেলার পাটক্ষেতে ঘুরে বেড়াচ্ছি। কখন আবার পান বরজে আছি। বনের মধ্যেই সরু সরু পথ। মাঝে মাঝে পথে প্রতিবন্ধকতা করেছে গাছ পড়ে। হলে কি হবে,নতুন নতুন পথ বের করে নিয়েছে পর্যটক। এ অরণ্য এনডেমিক অরণ্য। নিত্য নতুন খোঁজ পাওয়ার অরণ্য। গবেষকদের বৃন্দাবন। এখন বুঝতে পারলাম সোলং এর হাতে জলের বোতল ও শামুক খোলের কারণ । তাতে জল খেতে লেমুর কে ডাকছে। সে দিব্যি গাছ থেকে নেমে এসে খেয়ে যাচ্ছে। আর আমরা এখন হুমড়ি খেয়ে পড়ছি ছবি তুলতে। কাল রাতের অতৃপ্ত তৃষা মিটলো আজ। কী রঙের বৈচিত্র্য লেমুরের মধ্যে !
অনেক অপরিচিত গিরগিটিও দেখলাম। গিরগিটি এখানে ক্যামেলিয়ান বলে পরিচিত। অরণ্য কে তোলপাড় করছে বাঁদর। এরা নাকি মানুষের ক্ষতি করে না। স্বচক্ষে সেটা দেখলামও। বন থেকে যেন কিছুতেই বেরুতেই ইচ্ছে করছিল না। তবু বেরুতে তো হয়। এখন আবার পরবর্তী ভ্রমণের জন্যই বেরুতে হবে। কিরিন্ডি ফরেস্ট কে যখন বিদায় জানালাম , ঘড়িতে সকাল সাড়ে নটা।
অরণ্য কে ছাড়িয়ে এবার আফ্রিকান আকাশ। আমার দেশের আকাশের সঙ্গে ফারাক খুঁজতে ব্যর্থ হলাম। তখনই আমার জোড় সঙ্গীর বড় বড় চোখের ভর্ৎসনা।
তার মানে এখনও মন বসেনি ভ্রমণে। মানে?
মানে আর কি …, বলেছিলাম না পাঁঠার চোখে সব দেখতে।
এটুকু বিশ্বাস আছে ও কখনও ভুল বলে না। পুনরায় তাকালাম আকাশের দিকে । বড্ড বেশি নীল,সাদা আকাশ টা। আমাদের আকাশ টা যেন এত ক্রিস্টাল স্বচ্ছ নয়। বুঝলাম এই আকাশটা দূষণ মুক্ত সবুজ নির্মল আকাশ। আমাদেরটা দূষণযুক্ত। এখানকার দিগন্ত বলয় বড্ড বেশী বিস্তৃত। লম্বা লম্বা ঘাস । লম্বা লম্বা ঘাসের রাস্তা। সেই সঙ্গে অদ্ভুত সব লম্বা লম্বা গাছ। এখানে সবেতেই যেন একটা লম্বার বৈভব। রাস্তার লম্বা দোলনে কিংবা লম্বা রিক্ততার দোলনের মধ্যেও প্রকৃতির অকৃত্রিম একটা লম্বা সৌন্দর্য।
আমরা এখন গ্রামের পথে। খড়ের চাল। কাঠের ছিটেবেড়ার দেওয়াল। লাল,কালো,সাদা,সবুজ পোশাকের আধিক্য। তেমনি আধিক্য জিন্স,প্যান্ট,গেঞ্জির। বধূদের ব্লাউজহীন পোশাক। ধূ – ধূ প্রান্তর কোথাও কোথাও। শুকনো পাতার মতো সকলেই যেন বৃষ্টির অপেক্ষায়। রুরাল ডেভেলপমেন্ট চোখেই পড়ে না। কি করেই বা হবে। ডেভলপমেন্টের জন্য দরকার জল – বিদ্যুৎ – রাস্তা। তিনটেই এখানে নেই। নেই কোন রানিং ওয়াটারের ব্যবস্থা। নালা নদীর জলেই খাওয়া – দাওয়া, স্নান,শৌচ করতে বাধ্য। ম্যালেরিয়া তাই চির সঙ্গী। যাদের পয়সা আছে তারাই সোলার আলো উপভোগ করে। আর রাস্তা মানে মারণ ফাঁদ। বর্ষা কালে এক কোমর কাদা। দেশের ১৬ শতাংশ মাত্র পাকা সড়ক। আজকের দিনে ভাবাও যায় না। শুধু তাই না, কার্যকরী রেশনিং সিস্টেম ও নেই। ভোট এলে নেতারা কিছু ছড়িয়ে ছিটিয়ে দেয়।
পথে সঙ্গী হলো একটা নদী। নাম সিরিবিনা (Tsiribihina)। মাথার ওপর প্রচন্ড রোদ্দুর। শাণিত রোদ্দুর। যেন রোদের শলাকা। ঘাটের নাম Tsimafam ( সীমাফাম) । ছোটো বড় গাড়ি এপার ওপার করে। বিশেষ স্থানীয় প্রযুক্তিতে। পুরোটাই ম্যানুয়ালি। ঘাট যথেষ্ট বড়। কিন্তু নামেই বড়, বিন্দুমাত্র কংক্রিটের ছোঁয়া নেই। দুপাশে ছোটো দুটো ডিঙির ওপর তৈরী হয়েছে জেটি। একসঙ্গে পাশাপাশি চারটে নিশান গাড়ি যেতে পারে। ওঠার সময় সাইকেল চেনের মত খাঁজ কাটা পাটাতনের ওপর দিয়ে ড্রাইভার চালিয়ে নিয়ে যায়। নামাটাও একই ভাবে। নদীর স্রোতের টান যথেষ্ট। জল গঙ্গার মত ঘোলা। সাধারণ লোকও তাতেই পারাপার করে। ঘাটের দুপারে ছাউনি ঘেরা অস্থায়ী দোকান। খাবারের। ভাজা মাছ, পাউরুটি, চাটনি,স্যালাড আর মদ। ভাড়া স্থানীয় মুদ্রা আরিয়ারীতে । পারাপারের নৌকা ছেড়ে দিলো। জেনারেটরে চলে। নদীর পার ঘেঁষে চলে। পার গুলো ধ্বসে গেছে। স্পষ্ট স্তরে বিন্যস্ত পার । গাছের শিকড় ও বর্তমান। আমি ইরোশন বলতে বিদ্যুৎদা সংশোধন করে দিলেন – ওটা ইরোশন নয়, ডেস্টোরেশন । উনি একজন জিওলোজিস্ট অবসর প্রাপ্ত অধ্যাপক।
নদীর ভিউটা বড়ই মন কেমন করা। আজকের লাঞ্চ কোম্পানির তরফে। কে কেমন ডিস খাবে গাইড তা নোট করতে ব্যস্ত। যাতে সময় নষ্ট না হয়। কেননা বেকোপাকা যেতে সময় নেবে। অপর পারের নাম বেলো। অনেকটাই জমজমাট ও পরিপাটি। পাকাপোক্ত কিছু দোকান ও আছে।
মিনিট দশেকের মধ্যেই গাড়িতে করে একটা রেস্টুরেন্ট ‘এ পৌঁছে গেলাম। যথেষ্ট আভিজাত্য ও পরিপাটি ব্যবস্থা। নাম Mad Zebu , উপাদেয় খাবার । তবে সেই একই। জল নয়, ড্রিংক। নতুন করে এখানে শিখলাম জল ছাড়াও এখানে লাঞ্চ, ডিনার দিব্যি চলতে পারে। রা ‘ টি পর্যন্ত কাটে না কেউ। এই যেমনটি আমরাও পারলাম না। আমি আবার বিশেষভাবে বোকা বনে গেলাম। ড্রিংক তো দূরের কথা, বিয়ার ও মুখে নিই না বলে। তাই দেখে আমার সঙ্গীর টোল পড়া দুস্টু হাসি।
ঠিক হয়েছে মশাই।
আমি চুমুক দিলে মুখে ঐ হাসিটা থাকতো তো?
কেন মানা করি,জানো ভ্রমণের পক্ষে সেটা মঙ্গল নয়।
আমরা এবার দীর্ঘ ট্রাভেলের জন্য প্রস্তুত। পুনরায় পাঁচ ঘন্টার ওপর । সব চেয়ে বড় কথা – ভীষণ রকম খারাপ রাস্তা। আমার তো গোপাল ভাঁড়ের গল্প মনে পড়ে গেল। যে রাস্তা দিয়ে কিরিন্ডি থেকে এলাম , তার থেকেও নাকি আরও দুরবস্থা। আদৌ সে রাস্তা দিয়ে যাওয়া যাবে তো!
মাইফ স্টিয়ারিং এ হাত রাখলো। অবশ্যই বাঁ দিকে। গাড়িতে আমরা সেই তিনজন সওয়ারী। খানিকটা যাওয়ার পরই বুঝলাম – পর্যটনের রাস্তা , ইউনেস্কোর ‘ হেরিটেজ ‘ সাইট দেখতে যাওয়ার রাস্তা,এত বেহাল হতে পারে কি করে! মেটাল রাস্তা ছেড়েছি মরণ ডোভার বাহবাব এভিনিউ তে। সঙ্গী আমার ঠিকই বলেছিল, বেড়াতে বেরিয়ে রাস্তা নিয়ে অত ভেব’ না। নিশ্চয় এমন কিছু আছে সেখানে পুষিয়ে দেবে। কষ্টকে আর কষ্ট বলে মনে হবে না।
টিভির কিছু অনুষ্ঠান, সিরিয়াল, খেলা যেমন কিছুক্ষণের জন্য খিদেকে ভুলিয়ে দেয় পথের বৈচিত্র্যময় সিনারি, প্রাকৃতিক দৃশ্য তেমনি ভুলিয়ে দেয় রাস্তার বেহাল অবস্থা। কে যেন এখানে উজাড় করে দিয়েছে প্রকৃতিকে। কখনও ধূ – ধূ প্রান্তর । কখনও অরণ্য। কত ধরনের ঘাস। কত ধরনের ফুল। শুষ্কতার ও যে এমন রূপ থাকে, সরসতার রূপ – রস – গন্ধে ভরা , মাদাগাস্কারকে না দেখলে ভাবা যায় না। বুনো আখের ক্ষেত চোখে পড়ে। লাইন দিয়ে আবার শিরিষ, কুর্চি গাছ। প্রচুর নাম না জানা সাদা সাদা ফুল। মাথার চুলের মতো এখানকার গাছ গুলো। নীচের দিকে ডালপালা কাটা বা ছাঁটা। হয়তো এর পেছনে আছে আর্থ সামাজিক কারণ। এখানকার অর্থনীতির ভিত গাছের ওপর নির্ভরশীল। ডালপালা সেই কারণে ছেঁটে নেয়। হয়তো ঘর বানাতে, আগুন জ্বালাতে, বেড়া দিতে। ভালো লাগে এই ভেবে – দেখে যে,ডালপালা গুলো ছেঁটে নেয় – কিন্তু পুরো গাছ কে কেটে ফেলে না। বাঁচিয়ে রাখে। গাছের প্রতি তাদের অগাধ শ্রদ্ধা,ভক্তি,ভালোবাসা,ঠিক কেরালার নারকেল গাছের মতো।
রাস্তা এখন ভ্রমণের আবহ সঙ্গীত। রীতিমত উপাদেয় , উপভোগ্য হয়ে ওঠে সে ভ্রমণ পথ পল্টুদা, মধুদার খুনসুটি তে। এই প্রথম আমি ভ্রমণ সঙ্গী ওনাদের। খুব আন্তরিক সম্পর্ক থাকলেও বেশ একটা আটপৌরীয় দূরত্ব অনুভব করতাম। সেই দূরত্ব ক্রমশঃ খসে যেতে লাগলো। ততই আমি নতুন করে পেতে থাকলাম মধুদা ও পল্টুদাকে। এ বিষয়ে সঙ্গী আমার এক কাঠি বাড়া। তার কথায় এটাই নাকি ভ্রমণের জ্যোৎস্না।
হঠাৎ কাঁখে চিমটি আমার সঙ্গীর । মন দিতেই পিছনের দিকে ইশারা করে কী বলছে শোনো। রীতিমত লেগে গেছে – মধু দা , পল্টু দা। কারণটা শিরিষ – শিমুলের সারি সারি অরণ্য দেখে মধুদার কথা – ন্যাচারাল ফরেস্ট। আপনা থেকেই হয়েছে। ম্যান মেড না। অতি উৎসাহে পল্টুদা তখন বলে – হ্যাঁ , ঝড়ে হাওয়ায় ছড়িয়ে পড়া বীচি থেকে এই সব গাছ জন্মেছে। সঙ্গে সঙ্গে মধুদার প্রতিবাদ – বীচি থেকে নয় – ‘ বীজ ‘ থেকে গাছ জন্মেছে। তারপর রসালো বাদ – প্রতিবাদ ক্রমশঃ ইলাস্টিকের মত বাড়তে থাকে। বাড়তে থাকে হাসি ঠাট্টা। আর কমতে থাকে রাস্তার দূরত্ব। সাথে সাথে রাস্তা হয়ে ওঠে রামধনু। এক অন্যরকম বৃষ্টির পর।
উপকূলীয় সমতল প্রান্তর। দুদিকে উন্মুক্ত রিক্ত, জীর্ণ ভূমি। তবে একেবারে ন্যাড়া মাঠ নয়। লম্বা লম্বা উলু খাগরা আর ঘাস। এতটুকু সবুজতা নেই। রোদে পোড়া ঘাস। সঙ্গী তাদের নাম দিয়েছে – রৌদ্র সোনা,শূন্য ভরা আলো, কালি সোনা ধোলো, সবুজ মিতা, লাজ রাঙ্গা, ধুলো সোনা, রিক্ত হাসি, আদর ছোঁয়া। এই রকম সব গাছের নাম। পর্যটক হিসেবে আমারও তাই বলতে ইচ্ছে করে ।
পাখিও দৃষ্টি এড়ায় না। হঠাৎ ই মসিফ গাড়ি থামিয়ে দিলো। ও বুঝে গেছে সওয়ারীর হার্ট বিট। মধুদা, পল্টুদা, ঈগলের ছবি তুললো। পাখিটাও বেশ বড়। মধুদার মন ক্যামেলিয়ানে। তার সঙ্গেও দেখা হলো। অপূর্ব তাদের রঙ। এখানকার মানুষ গুলিগুলো একটু খাটোই। ভুট্টা তুলে ফিরছে । অভিবাদন জানায় আমাদের হাসতে হাসতে। রাখালেরা ফিরছে গরু ছাগল নিয়ে। জলের বালতি মাথায় অল্প বয়সী মেয়ে। ধীরে ধীরে সূর্য নীচে নেমে চাঁদ হচ্ছে। দেখা হলো মিলিটারি ক্যাম্প। এতক্ষণ পর্যন্ত আশেপাশে বসবাসের কোনো ঘর চোখে পড়েনি রাস্তার ধারে। অনুমান করতে পারি বাচ্ছা ছেলেমেয়েদের দেখে – হয়তো আশেপাশে কোনো গ্রাম আছে। জানি না সে গ্রাম কত দূরে।
এখানে সাপের সঙ্গে দেখা হয় রাস্তায়। অল্পবয়সী কিশোর- কিশোরী কোনো না কোনো পরিশ্রম করে ফিরছে। এখানে মেয়েরাই বাইরে কাজ করে। ছেলেরা কুঁড়ে। দু ‘ এক ঘন্টা কাজ করেই নেশায় ডুবে যায়। সেই রকম পুরুষের সঙ্গেও দেখা হয়েছে পথে।
সন্ধ্যে হয়। গাড়ি এসে থামলো একটা চরায় । ছোটো ছোটো ছেলে মেয়েরা ছুটে এলো গাড়ির কাছে। সেই একইরকম হাত নেড়ে অভিবাদন । এখন বুঝে গেছি ওদের ভাষা। ফাজা – বিস্কুট – ক্যান্ডি – আর জলের খালি বোতল। পল্টুদা বাদাম দিল। আমি দিলাম চকলেট। কিছুক্ষণের মধ্যেই কোথা থেকে পিল পিল করে ছুটে এলো অনেক বাচ্ছা। এখন যুবক যুবতী। খুব লজ্জায় পড়ে গেলাম আমি। কজন কেই বা আমি দিতে পারি। নিজের পথের জন্য আনা যে তা। বিশেষত যখন পানীয় জল অধরা। ভীষণ ভাবে মর্মাহত হলাম।
ওপর তিনটি গাড়ি এসে হাজির হলে সিরিবিনিহিমা নদীর মতোই বেকোপাকা নদী পার হলাম। এতই ছোট যে দড়ি টেনে টেনেও পারাপার করা হয়।
এবার রীতিমত বনের ভেতর দিয়ে গাড়ি চলতে লাগলো। আজকে নাইট স্টে এখানেই। জানিনা সে হোটেল কেমন হবে।
হোটেলে যখন পৌঁছলাম , সব শঙ্কা ভয় কেটে গেল। ভাবাই যায় না এমন জায়গাতে এত বড় স্টার হোটেল থাকতে পারে। প্রচুর বিদেশী পর্যটক। খেলার গ্রাউন্ড। সুইমিং পুল। গেস্ট রুম সব রকম পাকাপোক্ত ব্যবস্থা। প্রচুর ফরেনার পর্যটকের সমাগম। ঘর সব বুকড। কটেজ কাম রিসর্টের মতো। চোখে পড়লো Wifi ডিভাইসের সাথে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে পাসওয়ার্ড। ফোনটা সেট করে বাড়িকে ধরলাম। সকলের শঙ্কা দূর করে পছন্দের ডিনার জানিয়ে দিয়ে আমাদের রুমের পথে পা বাড়ালাম।
স্তরে স্তরে ভিন্ন ভিন্ন ঘর বিরাট জায়গা নিয়ে। এখানকার ভূমিরূপ মালভূমি। ফলে ১৫ নম্বর রুম খুঁজে পেতে একটু দেরি হলো। ভালই হলো। হোটেল টাকে চিনলাম ভালো করে। এই যা, এতক্ষণ তো বলাই হয় নি হোটেলটার নাম Orchidee De Bemaraha.
ফ্রেশ হয়ে চারপাশটা একটু ঘুরলাম । লাল মোরামে ঢাকা। প্রচুর গাছ। সাজানো গোছানো। কেয়ারী। নানান পাম – ফুল ছাড়াও নাম না জানা অনেক গাছ। কতকগুলো স্তর নিয়ে পুরো হোটেলটা । এক একটা স্তরে এক একটা সেকশন । রেস্ট রুমে এসে বসলাম। পাশেই ছোটো একটা গ্রাউন্ড । চারিদিকে সোলার আলোর মেদুরতা।
রুমের বিছানায় মশারীর ভিতরে ছোটো ফ্যান। বেড সুইচ। প্লেট ফাইবারের কারণ সোলার পাওয়ার । না হলে ফ্যান ঘুরবে না।
রেস্ট রুমে বসলাম। সঙ্গীর ঠেলায় তথ্য সংগ্রহে মন দিলাম । এখানে ফুটবল খেলা আছেই। প্রিয় আরও একটা খেলা।Tang (টাং )। গুলির মতো বড় কালো কালো মেটাল বল ছুঁড়ে ছুঁড়ে খেলা হয়। যুবকদের মধ্যে দেখলাম এই খেলা খেলতে। এখানে আরও একটা পপুলার খেলা মুরুঙ্গি। এক কথায় কুস্তি। কোনরকম দস্তানা ছাড়া। এ খেলা এমনই খেলা যতক্ষণ না কেউ হার স্বীকার করছে, ততক্ষণ খেলা চলে। মৃত্যুও হতে পারে।
Tsiliva ( সিলিভা ) একজন জনপ্রিয় মালাগাসি মিউজিসিয়ান। Tance Mena ‘ র গানও সুর খুব জনপ্রিয়। যেমন M Pandresy Anao … বা Aleva Ambongadiny… । মাদাগাস্কারের ইয়ং দের প্রিয় সিনেমা স্টার Rajao.
ফুটবল জনপ্রিয় খেলা। আফ্রিকান কাপ 2023 ‘এ Angola ‘র রাঙ্ক দ্বিতীয় আর মাদাগাস্কারের স্থান চতুর্থ। এখানকার সংস্থার নাম মালাগাসি ফুটবল ফেডারেশন। ডাকনাম বা দলের নাম বারেয়া ( Barea) ফিফা কোড MAD
এক সময়ের নাম করা কোচ এরিক রুবেসান্দ্রাভাতানা। এবার শীর্ষ গোল দাতা ফানেভা ইমা আন্দ্রিয়াতসিসা পাওলিন ভোয়াভি । অধিনায়ক লুসো গোয়েৎস। মাঝ মাঠের খেলোয়াড় অনিকেত আবেল।
আজ ৭’ ই সেপ্টেম্বরের সকাল। বরং বলা ভালো সিঙ্গী বা চিঙ্গি ( Tsingy ) সকাল । ইউনেসকো দ্বারা স্বীকৃত ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট। The Great Tsingy। অ্যাডভেঞ্চারের সকাল। গতকালই দুটো দলে ভাগ হয়ে গেছে। কঠিন অ্যাডভেঞ্চারে নাম লিখিয়েছে আমাদের পল্টুদা। একজন পর্বত আরোহী ট্রেনার। সঙ্গে যাবে টুর ক্যাপ্টেন দেবাশীষ । আর কেউ সাহস দেখাতে পারলো না যাবার। কেননা ক্যারাবিনা, পিটন,ল্যাডার, হারনেস, রোপ চড়ে ওপরের চূড়ায় ওঠা। খুবই রিস্ক।ঐ দল বেরোবে সকাল সাতটায়। ব্রেকফাস্ট শুরু হবে সকাল ছয়টায়। আর বাদবাকি এগারো জনের প্রবীণ দল বেরুবে সকাল সাড়ে আটটায়। দুটো দলে থাকছে স্পেশালিস্ট গাইড।
গাড়ি ঠিক সময়েই ছাড়ে। ঠাণ্ডা উষ্ণতা নিতে নিতে গাছে ঘেরা লাল ধুলো ভরা মাটির রাস্তা দিয়ে ঢেউয়ের মত এগিয়ে চলে গাড়ি। চলতে চলতেই আবারও দেখা হয়ে যায় এক নদীর সঙ্গে। নাম তার মানামবোলো।
নদী মানেই সভ্যতার ধারক ও বাহক। মানামবালোর ও ইতিহাস বর্তমান। গাইড এর মাধ্যমে যেটুকু জানলাম নদীর ইতিহাস তা, মানুষের দৈনন্দিন জীবনে এই নদীর ভূমিকা আজও উজ্জ্বল। এই নদীকে নিয়ে বংশ পরম্পরায় প্রবাহিত হয়ে চলেছে কাল।
এমনই একটি গল্পের সঙ্গে ঘটে আমাদের পরিচয় । এই নদী মানুষের কাছে অত্যন্ত পবিত্র। ছেলে শিশু জন্মালে নদী তটে মা সহ পরিবার প্রতিবেশী জড়ো হয়। উৎসবের আতিশয্যে আতিথেয়তার জন্য থাকে উপাদেয় খাদ্য, সঙ্গে মদ অবশ্যই। আমন্ত্রিত কিনা জানি না। তবে পথচারী শিশুকে আশীর্বাদ করে মায়ের হাতে উপহার তুলে দেয়। কোনো জাত পাত নেই। বেশির ভাগ ই টাকা পয়সা দেয়। মধুদার কাছে মাদাগাস্কার মুদ্রা আরয়ারি ছিল না। পরিবর্তে ভারতীয় মুদ্রাই দেয়। সেখানে আবার তা ভাঙ্গানোর ব্যবস্থাও আছে। পরিবর্তে অফার করে খাদ্য ও মদ। এটাই সংস্কৃতি।
এই মানামবোলো নদী উচ্চ পশ্চিম মাদাগাস্কার অঞ্চলের একটি নদী। এই নদী Tsingy de Bemaraha Strict Nature Reserve and Maingoza Reserve কে অতিক্রম করে গেছে। এর অভিমুখ ভারত মহাসাগর। অঞ্চল Malany, Bangolava.
নদীর সাথে মাঝে মাঝে উপরি পাওনা ফসিল রক। অতঃপর গাড়ি এসে থামলো বিস্তৃত একটা ফেরিঘাটে। সবটুকু ছুঁয়ে একরাশ নীরবতার স্নিগ্ধতা। বড় বড় গাছের শীতল ছোঁয়া। কিছু অস্থায়ী দোকান । ফেরিঘাটে যেমন থাকে। ঘাট হলেও নেই বিন্দুমাত্র কংক্রিটের স্পর্শ। নদীতে বোটিং করা যায়। সাধারণত এই পথেই পারাপার করে। দুটো কেভ দেখতে হলে এই নদী পথেই যেতে হয়।
জায়গাটা সেই ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট। ভ্রমণের ক্যাটালগে দেখেছি পাহাড়ের অরণ্য। একটা অফিস আছে। অনলাইনেও বুক করা যায়। প্রবেশের জন্য গাইডও বর্তমান। আমাদের ঝামেলা পোহাতে হয়নি। অনেক ফরেনারের আগমন।সঙ্গে দুজন গাইড তরুণ – তরুনী। উগাস্থা এবং ক্রিষ্টিনা। ভাষার মাধ্যম ইংরেজি। তবে ফ্রেঞ্চ প্রভাব। টি এর উচ্চারণে ত। থাকতে থাকতে কান সহে যায়। অভ্যস্ত হয়ে উঠি।
বেমাবাহা ন্যাশনাল পার্ক হলো উত্তর পশ্চিম মাদাগাস্কারে অবস্থিত একটি জাতীয় উদ্যান। এটি মূলত আন্তসালোভা জেলার সীমানার মধ্যে । এছাড়াও উত্তর পূর্বের একটি ছোট অংশ মরাফেনোবে জেলার মধ্যে পড়ে। গঠন অনুযায়ী দুটি ভাগ। গ্রেট সিঙ্গি এবং লিটল সিঙ্গি। অনন্য ভূগোল, সংরক্ষিত ম্যানগ্রোভ বন এবং বন্য পাখি ও লেমুরের জন্য ( ১১ প্রজাতি ) এই অঞ্চল টি ১৯২৭ সালে ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্য বাহী স্থান হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।
বেমারাহা মানে ছুচালো বা তীক্ষ্ণতা। সিঙ্গি মানে সেই ছুঁচালো পাহাড়ের অরণ্য। মালাগাসি ভাষায় চিঙ্গী নামে পরিচিত। চিঙ্গি নামের পিছনের কারণটা এই রকম।
সৃষ্টির প্রথম পর্বে মাদাগাসি লোকজন পাহাড়ে উঠতো খালি পায়ে। তখন জুতোর ছিল অভাব। তবু ওপরে উঠতো নিজেদের কৌশলে। পায়ের পাতায় ভর করে লাফিয়ে উঠতো। ইংরেজিতে বললে টিপ – টো – টিপ – টো , যা মালাগাসি ভাষায় তিপ – তো – তিপ – তো । ক্রমে ক্রমে লাফানোর দ্রুততায় হয়তো তিপ -তো, তিপ -তো থেকে চিপ -তো, চিপ -তো থেকে সংক্ষেপে চিঙ্গিতে রূপ নিয়েছে।
চিঙ্গীর এই গঠনেরও একটা ইতিহাস পাওয়া যায় গবেষক , বিজ্ঞানী , জুলজিস্টদের কাছ থেকে। চিঙ্গি শক্ত চুনা পাথর। চুনা পাথরে আমার অভিজ্ঞতা ঐ বেনারসের চুনারের ফুলদানি,কাপ,প্লেটে। এ একেবারে গ্রানাইট পাথর যেন। প্রাগৈতিহাসিক যুগে যুগে নানান ভৌগোলিক উত্থান পতনের মধ্যে দিয়ে সমুদ্রের তলদেশে প্রাণিজ, খনিজ উদ্ভিজ্জ , যেমন মাছ,ঝিনুক, কোরল, শ্যাওলা,প্রবালের সমন্বয়ে স্তরে স্তরে গঠিত হয় চুনা পাথর। একদিন আবার সেই ভৌগোলিক কারণেই তা মাথা তুলে দাঁড়ায়। তখন চুনা পাথরের পাহাড়। এখানেই শেষ নয়। গবেষক ও জিওলজিস্টদের মতে, এরপরেও ঘটে দুটি ভয়ানক প্রাকৃতিক ঘটনা।
জেগে ওঠে আগ্নেয়গিরি। সৃষ্টি হয় লাভা উদগিরণ। বাষ্পীভূত হয়ে আকাশে ওঠে। সেখানে রাসায়নিক বিক্রিয়ায় সৃষ্টি হয় অ্যাসিড বৃষ্টি। সেই বৃষ্টিতেই রূপ নেয় চিঙ্গি বা ছুঁচালো তীক্ষ্ণ। একদিন মৃত হয়ে যায় আগ্নেয়গিরি। ফলে পাহাড় থেকে যায় পূর্ববৎ গঠনে।
এমনই ইতিহাস শোনালো উগিস্থা। মিনিমাম দু ‘ ঘণ্টার অ্যাডভেঞ্চার। ক্লাইম্ব শুরু। আমাদের অবস্থা তখন হাঁটবো – উঠবো – না দেখবো। সামনে তখন আরব্য উপন্যাস। উগাস্তার চিচিং ফাঁক মন্ত্রে যেন রুদ্ধ দুয়ারটা খুলে গেল। কাশিমবাবার মতো আমরা তখন হুমড়ি খেয়ে ছবি তুলতে ব্যস্ত। তাই দেখে গাইডের সতর্ক বার্তা। এখানে পদে পদে বিপদ ছোবল উঁচিয়ে আছে। একটু বে-খেয়াল হলেই মারাত্মক কিছু ঘটে যাবার সম্ভাবনা । ছবি তোলার সময় হাঁটা নয়। আবার হাঁটার সময় ছবি তোলা নয়।
অতঃপর অ্যাডভেঞ্চার শুরু। ধূসর সাদা পাথর অরণ্যের গলিপথ ধরে হাঁটা। কয়েকটা গাছের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয় উগিস্থা। তারমধ্যে একটি গাছ এটামারিয়ে ইন্ডিকা। কী ‘ভীষণ উৎসাহ নিয়ে বলে ‘ ইণ্ডিকা মানে ইন্ডিয়া । আমরাও কম উৎসাহ অনুভব করলাম না। যত ভেতরে ঢুকতে লাগলাম আলোছায়ার মধ্য দিয়ে পাহাড় গাছের যুগলবন্দী । মূর্ত হয়ে ওঠে পাখির কলতান ও গভীর নীরবতার মধ্য দিয়ে। একা একা গেলে নিশ্চিত তখন মূর্ছা যেতাম। স্বীকার করতেই হয় বুক দুরু দুরু ভয়ংকর রূপ ও এত সুন্দর হতে পারে ! ( Tyger by William Blake — Fearful Symmetry) চলার পথের ধারে ধারে এমন সব ভয়ংকর খাদ পেরোতে বা লাফাতে হয় – সাধারণের পক্ষে যা অসম্ভব । বলা ভালো যাদের চোখের ভিশন এবং চশমা ঠিক নেই, তাদের ঝুঁকি না নেওয়াই ভালো। পায়ের জুতো ভীষণ ভীষণ ভাবে ঠিক হওয়া চায় । এই অরণ্যে হিংস্র জন্তু জানোয়ার নেই বটে, তবে পথ আরোহণ বা হাইকের হিংস্রতার প্রাবল্য ঢেউয়ের মতো উপর্যুপরি। হাড় হিম করার পক্ষে যথেষ্ট। গ্রেট সিঙ্গির অ্যাডভেঞ্চারই আলাদা। দেখা হয়ে গেল বিরল বিহঙ্গ প্যারাডাইস ক্যাচার। চিঙ্গির চরম চূড়ায় ওঠার জন্য পরিচিত ও অভ্যস্ত থাকলে ভালো হয় এই সব বিষয়ে – ক্যারাবিনার, হারনেস , পিস্টন,হ্যামার, লেডার, রোপ ইত্যাদির ব্যবহারের সঙ্গে । তবে শারীরিক এবং মানসিক শক্তি থাকলে এসবের প্রয়োজন হয় না। হ্যাঁ, বয়স একটা ফ্যাক্টর। দেবাশিষ তাই অনায়াসে উল্লঙ্ঘন করতে পেরেছে। চিঙ্গী অভিযান এতটুকু কার্পণ্য করেনি। সব ইন্দ্রিয় ভরে দিয়েছে ।
শেষ পর্যন্ত শেষটা আর ভালো হলো না। চোনা একটু পরেই গেল। পল্টুদা মারাত্মক একটা দুর্ঘটনায় পড়ে। যে পল্টুদার ঝোলায় বহু শৃঙ্গ অভিযানের ‘ অভিজ্ঞতা ‘। এক্ষেত্রে তিনি একজন ট্রেনার। এমনই এক খাদে পড়ে গিয়ে ভীষণভাবে পায়ে জখম ও রক্তপাত। শেষমেশ স্থানীয় গাইডের তৎপরতায় দেবাশিষ সামাল দেয়। কিন্তু ফুটে ওঠে মাদাগাস্কারের করুন চিকিৎসা ব্যবস্থা। স্থানীয় হেলথ সেন্টারে স্টিচ ছাড়াই শুধু ড্রেসিং করা হয়। যেখানে সেলাই এর প্রয়োজন। বাজারে , দোকানে , হেলথ সেন্টারে টিটেনাসের খোঁজ করেও পাওয়া গেল না। এদিকে ক্ষত মারাত্মক। দেখা যায় না। অনেক কষ্টে ৫০ ডলার ও দীর্ঘ সময় ব্যয় করে দুদিন পর চারটে সেলাই হয়। টিটেনাস প্রেসক্রিপশন করলেও সর্বত্রই অমিল।
এখানকার ছোট গ্রামে স্বাস্থ্য কেন্দ্রে একজন নার্স। বড় গ্রামে একজন ডাক্তার , একজন নার্স এবং চারটি বেড। জেলায় তিনজন ডাক্তার , তিনজন নার্স। গ্রামে থাকে একটি করে সিটি সেন্টার। মাইফ এমনই জানায়।
ফলে সাত তারিখের রাত টা Orchides De Bemaraha ‘য় আমাদের খুব দুশ্চিন্তায় কাটে। খানিকটা ছন্দহীন যতিও বলা যায় ।
পরদিন সকালেই ব্রেকফাস্ট করে পিছনে ফেরা। আবার মরণডোভা । দীর্ঘ পথ। আজকের সাইট বাহবাব এভিনিউ এর সূর্যাস্ত।
দীর্ঘ সময়ের পরিচিত দৃশ্য প্রাকৃতিক – অর্থনৈতিক – সামাজিক – ভৌগোলিক – রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বিবরণ গুলির সাথে ইতিমধ্যেই ঘটেছে পরিচয়। প্রকৃতি উজাড় করে দিলেও বৃষ্টি তেমন দেয়না । সমাজ স্বস্তি দিলেও ক্ষুধা মেটানোর শান্তি দেয়নি। সরকার খাদ্য – বস্ত্র – আশ্রয়ে উদাসীন। রাজনীতি ভোট সর্বস্ব। তাই হয়তো মদের সংস্কৃতিতে শান্তি খোঁজে পুরুষেরা। এসবই আলোচনা চলে গাড়ির ভেতরে । সাথে সাথে এসে যায় কত ঘটনার সঙ্গ অনুসঙ্গ। ভাবতে ভাবতেই কেটে যায় দীর্ঘ পথের ক্লান্তি।
হাসপাতালের কথা বলতে বলতে এক সময় এসে যায় সন্তান প্রসব এর কথা। এখন নাকি তিথি- দিন- ক্ষণ দেখে সন্তানের জন্ম হতে পারে। অবশ্য পয়সা খরচ করতে পারলে। যখন সিজারে জন্ম। এখন সময় আর মানে না। মধুসূদনদা ডাক্তার নওয়াজের এমনই এক অভিজ্ঞতার কথা পরিবেশন করে।
মক্কা থেকে ডাক্তারবাবুকে ফোন। পরিচিত এক অর্থবানের । আবদার ঈদের দিন বৌমার সন্তানের জন্ম দিতে হবে। যাতে নাকি সে নবি হয়। জন্মাষ্টমী তে কেউ আবার যাতে কৃষ্ণ হয়। আড্ডায় ডাক্তারবাবুর খেদোক্তি – শালা নবি – কৃষ্ণ হবে,হবে তো ডাকাত ।
দেখেছ’ ভ্রমণে কত গল্প, অনুগল্প আছে। সে গল্পে কত চরিত্র । আমি তখন বললাম সঙ্গীকে। এই জন্যই ভ্রমণ কে তুমি বলো রামধনু!! বুঝলাম ঐসব বর্জ্য, পচা বিষয় গুলোও ভ্রমণের মাটিতে বেমালুম মিলে মিশে হয়ে যায় উর্বর। তখন ক্লান্তি , ধুলো আর কষ্টের কারণ হয়ে ওঠে না। আমাদেরকে তো বটেই , পল্টুদা কেও ভুলিয়ে দেয় এক্সিডেন্ট এর কথা।
এই কী শুধু ! যেতে যেতে দেখলাম মাঝে মাঝেই একাকী পথচারীকে ছুটতে। পরে কারণটা জানলুম। একাকী গেলে মানুষ ছুটেই যায়। কেননা পরিবহন বলে কিছুই নেই। সময় কমাতে হাঁটার বিকল্প দৌড়। অপরের সাথে গুলতানি করলে ( গল্প করার বা কথা বলার সুযোগ পেলে ) হেঁটে যায়।
এই সব দেখতে দেখতে কখন যেন পৌঁছে গেলাম বাহবাব এভিনিউ।আইটিনারি স্বীকৃত ও বাস্তব পথের দুরবস্থা তেমন কোনো প্রভাবই ফেলতে পারেনি। তাই বলে ড্রাইভার মাইফ এর দক্ষতা কে বিন্দুমাত্র খাটো করা উচিত নয়। এই দীর্ঘ সময়ে দীর্ঘ পথে তাকে শুধু জল ছাড়া কোনো নেশার জিনিস মুখে পুরতে দেখিনি।
তখনও সূর্যাস্তের কিছুটা বাকী। সেই মুহূর্তে সেখানে এমন কিছু দেখতে পেলাম না যার জন্য এভাবে গাড়ি টেনে আসা যায় দীর্ঘ পথ । বরং চারিদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে জরা জীর্ণ রিক্ততার ধুলো আর্দ্রতা। এমন কি ধূ ধূ প্রান্তরে জলে ভেজা ঘাস গুলো যেন ভেজা চোখের আর্দ্রতা। তবে যে টুকু ভালো – একরাশ স্নিগ্ধ নীরবতা। আর বাহবাবের মন কেমন করা।
এ এক অবাক করা অত্যাধুনিক দৃষ্টিনন্দন কাঠে মোড়া সৌখিন নির্মাণের রেস্টুরেন্ট। কি নেই সেখানে?
ধীরে ধীরে ভিড় জমতে থাকলো। বিদেশী পর্যটক,তরুণ – তরুণী, ইয়ং, বৃদ্ধ – বৃদ্ধা। চললো পয়েন্ট নির্বাচন করে ক্যামেরা স্ট্যান্ড স্থাপন করা। লক্ষ্য করলাম কত রকমের ক্যামেরা, কত রকমের ফোকাস। ক্রমে ক্রমে উত্তেজনা বাড়তে লাগলো। বাড়তে লাগলো সময়। আর ক্রমশঃ কমতে লাগলো আলো। একসময় বাহবাবের বাম পাশে সূর্য টা নেমে এলো। কী তার সান্ধ্য রাঙা রঙ ! না, ভাষায় প্রকাশ করার চেয়ে না বললেই যেন বেশি বলা হবে। কেননা ভাষায় প্রকাশ করা তা অসম্ভব । এটুকু বলতে পারি এমন দৃশ্যের জন্য হাজার মাইলও হেঁটে আসা যায়। অবশ্যই কিছু হারাতাম যদি বাহবাবের সূর্যাস্ত না দেখতাম। এই সূর্যাস্ত প্রকৃতপক্ষেই বাহবাবের উজ্জ্বল সান্ধ্য প্রদীপ।
এই অপূর্ব সুন্দর অন্ধকারে হারিয়ে গেলে,শুনতে পেলাম মিহি রেশমি সুতোর মতো তার কান্না। সে কান্না টা হোটেল – হোটেল, বিছানা – বিছানা কান্না । কখন কোরাস হয়ে গেল কান্নাটা , গলা মেলালো প্রায় সকলেই।
অতঃপর সে বিছানা মিলালো Laguna Beach Hotel ‘এ।
পরদিন শেষরাতে পাতলা ঘুমের মধ্যে কানে আসে একটা সুরেলা গলা। বুঝলাম সেই নীল বসনা সাদা ওড়নায় যাকে দেখেছিলাম অক্ষরের সিক্ত ঝর্ণায়। হ্যাঁ সেই ‘ লেগুনা বীচ ‘ মালাগাসি ভাষায় সাতরা বীচ। সাগ্নিকদাকে সঙ্গে নিয়ে বীচে নেমে পড়লাম।
জয়শ্রীদি তখন শরীর ছেড়ে দিয়েছে বীচ ভিউ হোটেলের রঙীন ছাতার নিচে ইজি চেয়ারে। বিদেশিনীদের মতো ।
কচি রোদ্দুরে নীল স্বচ্ছ জলে মৃদুমন্দ তরঙ্গে ঠোঁট ঠেকিয়েছে আর এক নীল সাদা আকাশ। আর দিগন্ত বিস্তৃত দুধ সাদা বালির চরাচর ফিসফিস করে যেন কথা বলে চলেছে দয়িতার সাথে। একটা উড়ন্ত চিল দু ‘ডানায় মেখে নিচ্ছিল সে কথার রেণু। একরাশ নীরবতা তখন উথলে পড়ছে চরাচরে। সাগ্নিকদার আমার ফোন তখন চলকে ওঠে। ক্লিক এর পর ক্লিক। কত যে ছবি তুললাম। নীল বসনার পায়ের কাছে কালো একটা বিন্দু দেখে এগিয়ে গেলাম। কিছুটা এগিয়ে টের পেলাম জেলে নৌকা। সঙ্গী তখন আমাকে নিয়ে শুরু করে দিল বোটিং। আমি দাঁড় টানতে লাগলাম। সঙ্গী ধরলো হাল। স্বার্থক এ ভ্রমণ।
আজ মরণডোভা থেকে আরো ওপরে উঠবো – মেনডিভাজো। (Mainderazo)।
ক্রমশঃ ওপরে উঠতে উঠতে পালটে যায় ল্যান্ডস্কেপ। পূর্বের আর পশ্চিমের মধ্যে কত বৈচিত্র্য। বিশেষত ভূমিরূপের। বৃক্ষহীন টিলা। বড্ড শুষ্ক। চোখে পড়ে ক্ষেত। পাহাড়ে ঝুম চাষের মতো এখানে ধাপে ধাপে চাষ। জলের অভাবে। ওপরের ক্ষেত থেকে ক্রমশঃ জল নীচের ধাপে গড়িয়ে আসে । যুবতীর কোমরে শাড়ির পাড়ের মত। মাঝে মাঝে দেখা হয়ে যায় সিরিবিহিনা ( Tsiribihina) নদীর সাথে । এখানে গাছ যেন বড্ড কম। নীরস মাটি। তবে দেখে বোঝা যায় জল পেলেই সরস সোনার ফসল ফলবে। মাঝে মাঝে আবার দেখা হয়ে যায় কফি বাগানের সঙ্গে। রাস্তায় ধান শুকোতে দেওয়া যেমন চোখে পড়ে, চোখে পড়ে বস্তা করে কাঠ কয়লা , শুটকি মাছ , কুল, তেঁতুল , স্ট্রবেরি বিক্রি করতে।
সঙ্গীর চিমটিতে জানালা থেকে গাড়িতে ফিরলাম। ভেতরে তখন মধুদার অভিজ্ঞতা। কুমিরের একটা বাচ্চাকে পারের ঘাটের কাছে মুখ বেঁধে একজন কে নিয়ে যেতে দেখে। পুষবে, বড় করবে, প্রয়োজনে খাবে কিংবা মেরে সাজিয়েও রাখতে পারে ঘরে । পল্টুদা তখন ইজিপ্টের কথা টেনে আনে। ওখানে নাকি প্রতি বাড়িতে কুমির পোষে খাওয়ার জন্য।
এখানকার গাছ গুলোর মাথাও যেন ছাতা। স্থানীয় মানুষের দুঃখ নিয়ে গড়া সে ছাতা। বুঝতে বিশেষ অসুবিধে হয় না। জলের অভাবে লাল মাটি এখানে শুষ্ক অনুর্বর। স্থানীয় বাজারের সঙ্গে পরিচয় ঘটে শস্য, সব্জি, মাংস, মাছের অভাব নেই। সুতির গেঞ্জি। জামা খুব একটা চোখে পড়ে না। জিন্স পড়তে খুব দেখা গেলেও বাজারে চোখে পড়ে না। বিক্রেতার সঙ্গে খুব কথা বার্তা না হলেও ঝগড়া প্রিয়, দর কষাকষি বা ঠকানোর প্রবণতা কম বলে মনে হয়। কিন্তু কেন যে মনে হয় – সেকথা বলতে পারবো না।
এই মেনডিভাজো একটি গ্রাম। মরণডোভা থেকে দূরত্ব প্রায় ৩০৫ কিমি। ৭ ঘণ্টার বেশি বাস জার্নি। দীর্ঘ জার্নির পর অতঃপর নীড়ে (অস্থায়ী )ফেরা। SOA LIA HOTEL.
যথারীতি সেই একই অভিজ্ঞতা ডিনারে। পুরোপুরি পছন্দের না হলেও মুখরোচক খাবার মেলে। নিঃসন্দেহে স্বাস্থ্যকর খাবার। স্বাদের পরিবর্তন টা খুবই স্বাভাবিক। ওয়াইন পর্যাপ্ত। কিন্তু যথারীতি – জলের দেখা নাইরে জলের দেখা নাই। Wifi লাউঞ্জ পর্যন্তই, রুমে নয়।
আজ দশ তারিখের রবিবার। মন কেমন করার দম্বলে দই জমতে শুরু করেছে। কেননা অদ্য মাদাগাস্কারের শেষ রজনী। সাড়ে সাতটায় ব্রেকফাস্ট শেষ। সানি মর্নিং । গাড়ির অভিমুখ পাহাড়ি চূড়ার পথে। আজকের ঠিকানা Antsirabe ( আন্টসিরাবে )। মাদাগাস্কারের তৃতীয় বৃহত্তম শহর এটি। এটিকে লবণের শহর বলে। আবার রিক্সার শহর ও বলে। এখানকার তিনটে লেক Tritriva, Andrano Mafama এবং Andrikiba. এটি স্পা খ্যাত শহরও।
এই হিল শহরটি বেশ ঠান্ডা। সেই সঙ্গে সাইক্লোন প্রবণ। তিনমাস বৃষ্টি – নভেম্বর , ডিসেম্বর , জানুয়ারী। বর্ধিষ্ণু গ্রাম চোখে পড়ে। মাটি তো জল পেলেই সোনা। এখানে ওপরে উঠতে উঠতে আর গাছের সারিতে সারিতে উত্তরবঙ্গকে খুঁজে পাই। এখানকার অধিবাসীর অর্থনৈতিক জীবন মাছের ওপর বহুলাংশে নির্ভরশীল। মাছ ধরে শুকিয়ে মরণডোভা, আন্তানানারিভো তে চালান দেয়। যদিও পরিবহনের অবস্থা শোচনীয়। এই অঞ্চলের অধিবাসীরা সাকালাভা নামে পরিচিত।
সাকালাভাই প্রথম প্রধান মালাগাসি রাজ্য গঠন করেছিল, যা ১৬ শতকের শেষ দিকে দক্ষিণ পশ্চিম উপকূল বরাবর গড়ে উঠেছিল। ১৭ শতকের মাঝামাঝি দুটি মিত্র রাজ্যে বিভক্ত হয়ে পরের শতাব্দীতে সাকালাভা তাদের ক্ষমতার উচ্চ শিখরে পৌঁছে ছিল। সমগ্র দ্বীপের প্রায় অর্ধেক তাদের শাসনে ছিল। সেই সময় তারা বনজ ‘ এবং অন্যান্য উৎপাদিত পণ্যের বিনিময়ে ইউরোপীয়দের সাথে গবাদি পশু এবং ক্রীতদাসের ব্যবসা চালিয়েছিল। যদিও ১৮ শতকের শেষের দিকে সাকালাভার পতন ঘটে মেরিনার কাছে। ১৮৯০ সালে আবার ফরাসী মেরিনা এবং সাকালাভা দখল করে। এবং সেখানে ফরাসী উপনিবেশ কায়েম করে।
সাকালাভারে মূলতঃ সেমিনোম্যাডিক পশুপালক যারা, তাদের পশুপালকে আদি প্রদেশের তৃণভূমিতে অবাধে বিচরণ করতে দেয়। তারা সীমিত কৃষিকাজও করে, নদী গর্ভে ধান বপন করে।
দিনের শুরুতেই আজকের রবিবারের দিনটা,এখানকার অন্যান্য দিনের চেয়ে আলাদা।রাস্তাঘাটে সেন্ট দেওয়া রুমালের মতো ছড়ানো ছুটির সৌরভ। সকালের উজ্জ্বল রোদের মতো প্রাণবন্ত। এই প্রাণবন্ত ছুটি উথলে পড়েনা বেলা বাড়ার সাথে দোকানে বাজারে। তবে উথলে পড়ে দলে দলে চার্চ ‘এ চার্চ ‘এ। কিছু মসজিদও দেখা যায়। কাঁসরের মতো ঘণ্টা বাজে। হিল শহরের মত এখানেও মুগ্ধ করে ঝিঁঝিঁ ডাক। পার্থক্য এই – প্রচুর আম, কাজু, লিচু, কুল আর লম্বা ঘাসের অভিবাদন । শুকনো পাতায় রোদ্দুরের অবাক সুন্দর দুষ্টুমি । মুগ্ধ করলো মাটির একতলা, দোতলা আর তার ঘুগলি জানালা। গাড়ি ছোটে। পথে দেখা JEVONA পেট্রল পাম্প। পেট্রল , ডিজেল, গ্লিসারিন , জ্বালানি শক্তি হিসাবে ব্যবহৃত হয় এখানে।
ঘড়িতে তখন বারোটা কুড়ি। হঠাৎই আমার সেই মন কেমন করার কণ্ঠস্বর :
কি মশাই কি বুঝলে?
আমি এবার জানালা থেকে গাড়ির ভিতরে চোখ ফেরালাম।
তখন মারোয়ারীর বাঙালী পত্নী জয়শ্রীদির সঙ্গে সাগ্নিকদার মিসেসের কথোপকথন। জয়শ্রী দির অভিযোগ – কেন বেড়াতে এসে বাড়ির লোকের সঙ্গে ফোনে এতো কিসের কথা থাকে । আমি তো স্রেফ তিরিশ সেকেন্ডের বেশি সময় না দিয়ে কেটে দিলাম। সাগ্নিকদা ফ্যামিলি বন্ডিং নিয়ে প্রতিবাদ করায় স্পষ্ট দুটো পক্ষ হয়ে যায় গাড়িতে। আর তাতেই সঙ্গীর গলা । আমি হেসে বললাম :
যা মিন করছো , সব বুঝতে পারছি। তবে ওই যে – তুমি বলো না – নিশ্বাস – প্রশ্বাস , গ্রহণ – বর্জন। সঙ্গীও কিছু উত্তর না দিয়ে উপহার দিল টোল সিক্ত হাসি।
পুনরায় জানালায় চোখ। নাম না জানা বেগুনি বাহারি ফুল। উজ্জ্বল রোদ। ঝুম বা ধাপ চাষ। মাটি কোপানো আর না কোপানো ঘাসের রঙে উত্তরবঙ্গের ছোঁয়া।
. সাদা জামা প্যান্ট বা স্কার্ট ‘ এ স্কুলের ছাত্র ছাত্রী। অবাক লাগে রবিবারে। চোখে পড়ে পিচার ট্রি বা কলস উদ্ভিদ।
গাড়ি এবার পাহাড়ের শিখরে। ১৫০০ মিটার বা ৪৯০০ ফুট। প্রার্থনার স্থান গুলির মধ্যে চার্চ অফ জেসাস খ্রীস্ট ইন মাদাগাস্কার , মালাগাসি লুহেবন চার্চ , অ্যাসেম্বলিস অফ গড , এসোসিয়েশন অফ বাইবেল বাপটিস্ট চার্চচেস , রোমান ক্যাথলিশক দিয়োসে অফ আন্টসিরাবে এবং কিছু মুসলিম মসকোয়েস ।
রবিবারের ছুটির ঘনত্বটা কিছুটা ফিকে এবার। কিছু দোকানপাট খোলা। তবে রাস্তা ঘাটে লোকের জটলা উৎসব আনন্দের। গাড়ি এবার ভলক্যানিক লেকের উদ্দ্যেশ্যে একটা উন্মুক্ত প্রান্তরে প্রবেশ করে টিকিটের জন্য । বন্ধ টিকিট ঘর। কেননা আজ রবিবার। ছুটির বার। ফলে প্রত্যক্ষ করা গেল না আর সে প্রতীক্ষিত লেক। তবে দুধের স্বাদ ঘোলে মেটাতে গাড়ি রওনা দেয় অন্য লেকের উদ্যেশ্যে। কেননা এখানে আরও লেক বর্তমান। অদূরে এন্ড্রোনোমাফানা লেক। গাছে ঘেরা। উপত্যকা থেকে বেশ খানিকটা নেমে। স্বচ্ছ জল। বোটিং এর ব্যবস্থা আছে। লেকের ধারে ধারে টেবিল পাতা খাবার দোকান। স্থানীয় কুটির শিল্পেরও দোকান। বিক্রেতা সব মেয়েরা। ইয়ং মেয়েই বেশি। বিক্রি করতে করতেই ইয়ং মেয়েরা গাছের তন্তু দিয়ে বুনে চলেছে ব্যাগ,টেবিল ক্লথ এমনই আরো কত কি। দেখলাম রবিবারের ছুটি তখন উথলে পড়েছে লেকে। খাবার টেবিলে টেবিলে। মদের বোতল –
গ্লাস – মাছ আর মাংসের চাটে। দেখা পেলাম প্রেমিক প্রেমিকাদেরও – যেটা এ কদিন রাস্তাঘাটে তেমন চোখে পড়েনি।
অতঃপর সারাদিনের ক্লান্তি নিয়ে হোটেলে পা রাখলাম । আগের মতোই ফরেনাররা হোটেলের অতিথি। বৈভবে মোড়া। নাম AROTEL.
ফ্রুট জুস দিয়ে অতিথি আপ্যায়ন। রুমের চাবির সাথে সাথে wifi এর পাসওয়ার্ডও বন্টন করে দেয় । এবার একটু অন্যরকম। শুধু লাউঞ্জ নয়, রুমেও wifi মিলছে। এতসব দামি দামি খাবারের মাঝে মনটা তো বটেই , চোখ ও কাঁদছে বাড়ির ডাল, আলু পোস্তর জন্য। প্রথমে ফোনে সে কথাই জানালাম। মধুদাও একই কণ্ঠ মেলালো।
নিজেদের মধ্যে আজকের ডিনার পার্টি টা বেশ জমে উঠলো। সকলেই উজাড় করে দিতে লাগলো নানান অভিজ্ঞতা। কোন দেশের কেমন খাদ্য পরিবেশন। দীর্ঘ সময় ধরে এ লেভেল কন্টিনেন্টাল খাবার খাওয়ার অভিজ্ঞতার কথা জানালেন মিসেস ভট্টাচার্য। মাঝে মাঝে স্মরণ করিয়ে দিলেন মিস্টার ভট্টাচার্য। আবার একজন চিনের সাপ,ব্যাঙ ,পোকা মাকড়ের সঙ্গে টেবিলের ওপর সুদৃশ্য কাঁচের জারে রাখা জ্যান্ত সাপের অর্ডার পেশ করলে খাবার টেবিলেও এসে যাবে সেই সাপ জানালেন।
এই কী শুধু,ইজিপ্টে কুমিরের মাংসের সাথে জাপান, ফ্রান্সের খাদ্যাভ্যাসের কথাও এসে পড়ে। ফাঁকতালে আমাদের নাগাল্যান্ডও মাথা ঢুকিয়ে দেয়। তবে শেষমেষ উপসংহারে এটা বুঝলাম ফ্রান্স,জার্মান,ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া ,কম্বোডিয়া,ভিয়েতনাম,দুবাই,আরব,উজবেকিস্তান,রাশিয়া যাই বলা হোক না কেন আমাদের দেশ অনেক অনেক ভালো। যদিও এটা ঠিক আমাদের অনেক কিছু নেই। কিছুটা হলেও তার আঁচ পেলাম। নিজের চোখে দেখলাম মাদাগাস্কারের চেয়ে আমরা সত্যিই কতটা ভালো আছি। অথচ দেশে থাকলে ভীষণ খারাপ বলতেই অভ্যস্ত।
আজ আন্টসিরাবের (Antsirable ) সকালে রোদ্দুর ছোঁয়া একটা বিষণ্ণতা। এগারোই অক্টোবর, সোমবার। ফেরার পালা।
কি মশাই, আজ তো বিসর্জন!!
জানি… কিন্তু…
আবার কিন্তু কেন …?
জোড় সঙ্গী অপাঙ্গ দৃষ্টিতে আমার মুখের দিকে তাকায়।
তুমি জানো না কেন?
না – তো …
মাদাগাস্কার কে জয় করলাম কই যে, বিসর্জন দেব?
ওঃ -এই কথা… ওটা চর্ম চক্ষুর বিসর্জন। মাদাগাস্কার এখন তোমার হৃদয়ে। যেখানেই থাকো না কেন, অন্তর্দৃষ্টি তে দেখতে পাবে তাকে। সে যে পরম আত্মীয় এখন থেকে।
কী সুন্দর করে মনের কথাটা তুমি দেখিয়ে দাও। এই জন্যই তুমি আমার…
থামলে কেন? কী তোমার ?
খুব যে… জানি না।
ধুর — তুমি না…
কী?
জানি না…
রিটার্ন দিলে ?
এরপর দুজনের হাসি ছাড়া কোনো উপায় ছিল না।
হোটেল থেকে বাস ছাড়ার আগেই জানালার কাছে আবার এসে দাঁড়ালো যুবতী মেয়েরা। হাতে কাঁধে পসরা। মূলতঃ মালাগাসি এবং ইংরেজি ভাষায় লেখা রং – বে – রঙের গেঞ্জি, বাচ্চাদের টয়, টেবিল ক্লথ। বিনিময়ের মাধ্যম ডলার অথবা ওদের কারেন্সি আরিয়ারি। আমি আগের দিন রাতেই হোটেলের কাছের মার্কেট থেকে বাড়ির জন্য গেঞ্জি কিনেছি।
ভট্টাচার্য দার সঙ্গে একজনের দর কষাকষি চলছিল। এমন একটা দাম বলায় হেঁচকা টান দিয়ে গেঞ্জিটা ছিনিয়ে নিতে গিয়ে তার হাতটা বিশ্রী ভাবে চোখের চশমা তে লাগে।
ইউ আর ব্যাড…।
ভট্টাচার্য দা বলে ।
ইউ তু ( টু না, ফ্রেঞ্চেরও প্রভাব ‘ত )
মেয়েটি বলে।
এর পর আমার কাছে ক্ষমা চায় মেয়েটি । একবার , দুবার নয়, অনেকবার।
দর কষাকষির মধ্যে , এদিক ওদিক বিক্রি করার মধ্যেও, কারেন্সি ফেরত দেওয়ার মাঝেও সেই ত ‘এর প্রভাব কানে মধু ঢালে। আমরা আরো প্রায় মিনিট পঁচিশ ছিলাম। কেননা পল্টুদা তার লাগেজ ফেলে এসেছিল।
অনেকের মধ্যে এই আচরণটা ও আমাকে মুগ্ধ করে।
বাস ছেড়ে দেয়। গন্তব্য টানা বা অন্টানানারিভো। কেননা ফেরার প্লেন আমাদের সেখান থেকেই। গাড়ি চলতে শুরু করে। মনের মুভি ক্যামেরায় তখন এক একটা ল্যান্ডস্কেপ সরে সরে যায়। সঙ্গী যথার্থই বলেছে। এ কোনদিন হারাবার নয়। এরই মধ্যে আছে মাদাগাস্কারের হৃদয়ের উষ্ণতা। আমাদের দরকার বিভূতিভূষণের সেই পাঁঠার চোখটার । সেটাই তো প্রকৃত বিজ্ঞানী বা গবেষকের চোখ।
গাড়ি থেমে গেল। জায়গা টা বেশ জমজমাট। বড় বড় দোকান – অফিস – হোটেল। একটু পাশেই সারি দেওয়া সবজি, মাংসের দোকান। ফল ও আছে। সাথীদি, জয়শ্রীদি স্ট্রবেরি কিনলো। জায়গার নাম আমবাতোলাম্পি । এই অঞ্চলের স্থানীয় বাসিন্দারা অ্যালুমিনিয়ামের বাসন পত্র তৈরী করে বিক্রী করে। দোকানে দোকানে সেই সব বাসন পত্র। কত ছোটো ছোট শৌখিন জিনিসও বর্তমান। অনেক কারখানা ও দেখা গেল। তবে আধুনিক প্রযুক্তি তেমন চোখে পড়ে না। দেশজ পদ্ধতি। অবাক লাগলো ছোটো ছোটো সুন্দর সিঁদুর কৌটো দেখে। অথচ সিঁদুর শাঁখার কোনো চলই নেই এখানে। কিনতে গিয়ে ব্যর্থ হলুম এখানকার কারেন্সি না থাকায়। ডলার নিচ্ছে না, ইউরো নেয়। জিনিসটার দাম ওদের মুদ্রায় দশ হাজার আরিয়ারি। আমাদের টাকায় যা আড়াই শো টাকা।
গাড়িতেই পিকনিক সারলাম । দু ‘ রকম আইটেম – স্যান্ডউইচ আর চিকেন কাবাবের মত একটা প্রিপারেশন।
যথা সময়ে পৌছে গেলাম আন্টানানারিভো এয়ারপোর্টে । কেনিয়া এয়ার ওয়েস KQ – 257 , ওখানকার সময় বিকাল 4.25 । নাইরোবি পৌঁছাবে সন্ধ্যা 7.45 , এর পর নাইরোবি থেকে মুম্বাই পৌঁছলাম অপর কেনিয়া বিমানে। মুম্বাই থেকে ফের দমদমে পৌঁছলাম পরের দিন স্পাইস জেট ‘এ। স্পাইস জেট বিমানের চাকায় গ্যাটিস দেখে অবাক হলাম । ভাবলাম এটাও দেখার ছিল ! কথার চিমটি সঙ্গীর :
হ্যাঁ , এটাও দেখার ছিল।
এবার আলু – পোস্ত-ভাত…
আহা!এই স্বাদের সঙ্গে কোন কিছুরই তুলনা হয় না।
—oooXXooo—
![]()







