” আলেয়ার ওপারে “
ডাঃ রঞ্জন কুমার দে
মফস্বল শহরের এক গলির ভাঙা টালির ঘরে সন্ধ্যা নেমেছে। বাইরে কচি আলোর ঝাঁপ, ভেতরে কেরোসিনের লন্ঠন টিমটিম করছে।
ঘরের কোণে বসে আছে অভিষেক। টেবিলের ওপর খোলা খাম, ভেতরে সাদা কাগজ—সরকারি চাকরির পরীক্ষার ফলাফল। বড় বড় অক্ষরে লেখা “Not Selected.”
অভিষেকের বুকটা কেঁপে উঠল। এটা তার প্রথম নয়, পরপর পঞ্চমবার। প্রতিবারই স্বপ্ন ভেঙে যায় যেন কাঁচের মতো।তার আঙুল কাগজের ওপর শক্ত হয়ে চেপে আছে।মনে হচ্ছে যেন ওই কাগজটাকে মুড়ে ফেলে ছিঁড়ে ফেলবে। কিন্তু পারে না।
এই কাগজটাই তার লড়াইয়ের প্রতিচ্ছবি, তার পরাজয়ের সাক্ষী। কাগজের অক্ষর গুলি ঝাপসা হয়ে আসছে ধীরে ধীরে কিন্তু চোখে জল নেই তার , শুধু আছে চোখের ভিতর লুকানো ব্যথা। সে শিখে গেছে, দুঃখ প্রকাশ করতে নেই, শুধু ভেতরে জমিয়ে রাখতে হয়।
এমন সময় দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকলেন বাবা। সারাদিন রিকশা চালিয়ে ঘামে ভিজে গিয়েছেন। কপালে ঘাম, চোখে লাল রেখা। কাঁধ থেকে গামছা নামিয়ে বললেন,
“কি রে অভি, আবার খবর এল?”
অভিষেক মাথা নিচু করে চুপ করে বসে রইল।
কিছুক্ষণ পর মা ঢুকলেন। তাঁর হাতে বাজারের ঝুড়ি, ভেতরে দুটো সবজি। তিনি কাজ থেকে ফিরেছেন—অন্যের বাড়ীতে থালা-বাসন মাজা শেষ করে। চোখে মুখে ক্লান্তি, তবু ছেলের দিকে তাকিয়ে হেসে বললেন,
“আবার কিছু হল না?”
অভিষেক কোনো উত্তর দিল না।খামটা গুটিয়ে একপাশে রেখে দিল।
মা কাছে বসে কাঁধে হাত রাখলেন। মায়ের চোখে অশ্রু জমেছে, কিন্তু মুখে হাসি।
“চিন্তা করিস না রে বাবা। তুই হারবি না। তুই তো ছোটবেলা থেকে সবার থেকে বেশি মেধাবী। একদিন নিশ্চয়ই হবে।”
অভিষেকের গলাটা শুকিয়ে গেল। বুকের ভেতর জমে থাকা কথা বেরিয়ে এল হঠাৎ,
“মা, মেধা থাকলেই হয় না গো, চাকরি না থাকলে মানুষ কিছুই নয়। সমাজের কাছে আমি আজ শুধুই এক বেকার ছেলে।”
ঘরটা যেন হঠাৎ ভারী হয়ে গেল। লণ্ঠনের শিখাটা দুলে উঠল বাতাসে। মনে হলো, আলোটা যেন নিভে যাবে,ঠিক যেন অভিষেকের বুকের ভেতরের আলোও নিভে যেতে চাইছে।
বাবা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মেঝেতে বসে পড়লেন। তিনি ধীরে বললেন,
“হয়তো এভাবে ভাবা ঠিক নয় রে অভি। জীবন একদিন না একদিন তোকে সুযোগ দেবে।”
অভিষেক মুখ তুলল না। চোখ স্থির সেই কাগজের ওপর।
চোখে শুধু ক্ষোভ আর অদ্ভুত এক দৃঢ়তা। যেন বুকের ভেতর জন্ম নিচ্ছে নতুন এক আগুন,
এক অদম্য জেদ, যা তাকে হারতে দেবে না।
অভিষেক ছোটবেলা থেকেই মেধাবী।গ্রামের সরকারি স্কুলে পড়লেও প্রতিটি পরীক্ষায় সে সবসময় প্রথম হতো। হেডস্যার থেকে শুরু করে প্রতিবেশী সবাই বলত,
“ছেলেটার মাথায় বিদ্যা আছে, একদিন বড় হবে।”
কলেজে উঠে দর্শন নিয়ে পড়াশোনা করে সে আরও উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। বই ছিল তার নেশা—দিনে যতটা পারে বই পড়ত, রাতে লন্ঠনের আলোয় খাতা ভরে লিখত।ক্লাসে যে বিষয় বন্ধুরা বুঝতে পারত না, অভিষেক সহজ করে বোঝাত। তার সহানুভূতি আর সহজভাবে বোঝানোর ক্ষমতা সবাইকে মুগ্ধ করত।
অভিষেকের সবচেয়ে বড় গুণ তার সততা।সে কখনও শর্টকাট খুঁজে নেয়নি, কারও খারাপ পথে সঙ্গ দেয়নি।যা পেয়েছে নিজের মেধা আর পরিশ্রমের জোরেই।অভাবের সংসারেও সে লোভ করেনি, বরং মানুষের প্রতি সহমর্মিতা ছিল প্রবল।
বন্ধুরা যখন তাকে ঠাট্টা করত,
“তুই শুধু বই নিয়ে পড়ে থাকিস, চাকরি না পেলে সব বৃথা।”
তখন অভিষেক কেবল হেসে বলত,
“চেষ্টা করলে একদিন না একদিন হবেই।”
তার ভেতরে ছিল এক অদ্ভুত ধৈর্য আর জেদ—যতই বিপদ আসুক, সে হাল ছাড়ত না।
অভিষেকের বাবা রিকশা চালিয়ে সংসার চালান, মা অন্যের বাড়িতে কাজ করেন। কলেজে পড়ার সময় টিউশনি করে নিজের খরচ জোগাড় করেছে সে।চাকরির ফর্মের টাকা জোগাড় করতে অনেক সময় নিজের দুপুরের খাবার ছেড়ে দিত।
পাঁচবার বিভিন্ন পরীক্ষায় বসেও সফল হতে পারেনি।প্রতিবার ফলাফলের পর হতাশা তাকে ঘিরে ধরত, তবুও আবার নতুন করে পড়া শুরু করত।কখনও কোনো আত্মীয় বিদ্রূপ করেছে, কখনও প্রতিবেশীরা বলেছে—
“মেধা থাকলেই কি হয়? চাকরি না পেলে সব ব্যর্থ।”
তবুও অভিষেক মাথা নিচু করেনি।তবে আজ এই কথা গুলোই বার বার তার কানে বাজছে যেনো।ভেতরে ভেতরে কষ্ট তাকে ভাঙছে ঠিকই, কিন্তু আবার উঠে দাঁড়াবার অদম্য ইচ্ছাশক্তিও সে জুগিয়েছে।
সন্ধ্যা নেমেছে। আকাশের শেষ লাল আভা গঙ্গার জলে পড়ে ঝিকমিক করছে।অভিষেক চুপচাপ বাড়ি থেকে বেরিয়ে গঙ্গার ঘাটে সিঁড়িতে গিয়ে বসলো। আবার নতুন করে লড়াই করার শক্তি সঞ্চয় করছে যেনো। পাশে এসে বসলো তার ছোটবেলার বন্ধু শ্যামল—যে সবসময়ই ওর সুখ-দুঃখের সঙ্গী।
শ্যামল আড়চোখে তাকিয়ে বলল,
“চুপ করে বসে আছিস কেন রে? আবার পরীক্ষার ফল…..?”
শ্যামল উৎসুক হয়ে তাকালো অভির দিকে।
অভিষেক মাথা নামিয়ে মৃদু হেসে বলল,
“হ্যাঁ রে, আবারও ব্যর্থতা। মনে হচ্ছে জীবনে কিছুই পারব না।”
শ্যামল কাঁধে হাত রেখে বলল,
“তুই কি সত্যিই তাই মনে করিস? ছোটবেলা থেকে আমি তোকে দেখেছি। পঞ্চম শ্রেণি থেকে দ্বাদশ—সব পরীক্ষায় তুই প্রথম হয়েছিস। গ্রামের সবাই বলত, তুই একদিন বড় অফিসার হবি। কলেজে গিয়েও প্রফেসররা তোকে সম্মান করত।”
অভিষেক গভীর নিশ্বাস ফেলল।
“হ্যাঁ, পড়াশোনায় আমি সবসময় এগিয়েছিলাম। কিন্তু আজকাল মনে হয় মেধা দিয়েও সব হয় না। টাকা, চেনাজানা, ভাগ্য—সবকিছু লাগে। আমি তো শুধু পরিশ্রমই করতে জানি।”
কিছুক্ষণ চুপ থেকে আবার বলল,
“তুই জানিস, টিউশনি করে পড়াশোনার খরচ চালিয়েছি। চাকরির ফর্ম কেনার টাকাও অনেক সময় জোগাড় করতে কষ্ট হয়েছে। দুপুরে না খেয়ে থেকেছি, তবু ফর্মটা কেটেছি। কিন্তু শেষে বারবার Not Selected।”
শ্যামল ধীরে বলল,
“তুই যতই বল, আমি জানি তুই ভেতরে ভেতরে অন্যরকম মানুষ। সৎ, সহমর্মী, পরিশ্রমী। আজকে সমাজ তোকে বেকার বলে ডাকে, কিন্তু একদিন তোর এই জেদ আর মেধাই তোকে ওপরে তুলবে। আমি সেটা চোখ বন্ধ করে বিশ্বাস করি।”
অভিষেক জলের দিকে তাকাল। গঙ্গার ঢেউ যেন মনের অস্থিরতা বুঝতে পারছে।চোখের ভেতর ব্যথা থাকলেও ঠোঁটে ভেসে উঠল একরাশ দৃঢ়তা—
“হয়তো ঠিকই বলছিস, শ্যামল। আমি হেরে যেতে চাই না। আমি প্রমাণ করব, মেধা আর পরিশ্রমই যথেষ্ট। শুধু সময়ের অপেক্ষা।”
রাত নামছে।শ্যামল চলে যাওয়ার পরও অভিষেক কিছুক্ষণ গঙ্গার ঘাটে দাঁড়িয়ে রইলো। ঢেউয়ের কুল কুল আওয়াজ, স্নিগ্ধ বাতাস আর একাকী সে।
আজ অনন্যার কথা খুব মনে পড়ছে তার।অভির চোখের সামনে ভেসে উঠল অনন্যার মুখ।কলেজে পড়ার সময় অনন্যার সঙ্গেই তার পরিচয়। মিষ্টি হাসি, গভীর চোখ—প্রথম দেখাতেই যেন বুকের ভেতর ঢেউ তুলেছিল।
অল্পদিনের মধ্যেই দু’জনের বন্ধুত্ব প্রেমে রূপ নিল।একসঙ্গে বই পড়া, পরীক্ষার প্রস্তুতি,স্বপ্নের গল্প—সব কিছুতেই তারা ছিল সঙ্গী।
অনন্যা বলত,
“অভি, তুই একদিন বড় অফিসার হবি। আমি তোকে নিয়ে শহরে ছোট্ট একটা বাসা বানাব, মা-বাবাকে নিয়ে যাব। আমরা দু’জন একসাথে আমাদের স্বপ্নগুলো পূরণ করব।”
এই কথাগুলোই অভির শক্তি হয়ে উঠত।যত ব্যর্থতাই আসুক, অনন্যার হাসি দেখলেই মনে হতো—“আমি হারব না।”
অভিষেক বিশ্বাস করেছিল। সে তার পড়াশোনা, ত্যাগ, পরিশ্রম—সবকিছুই অনন্যার জন্য।প্রতি পরীক্ষায় ব্যর্থতা আসলেও অনন্যার চোখে ভরসা দেখলে মনে হতো,
“আমি একদিন হবই।”
তার প্রতিটি দিন, রাত, টিউশনি, খরচ, হতাশা—সবই যেন অনন্যার জন্য সহজ হয়ে যেতো।
কিন্তু দিনগুলো বদলাতে লাগল।
অভির একটার পর একটা পরীক্ষায় ব্যর্থতা, সংসারের টানাটানি, আর চারপাশের চাপ,এসবের মধ্যে অনন্যার আচরণও ধীরে ধীরে পাল্টাতে লাগল।
আগে যে মেয়েটি অভির পাশে দাঁড়িয়ে বলত—“চিন্তা করিস না, একদিন হবেই”—আজ সে অকারণ নীরব থাকে।
কথায় কথায় ঝগড়া বাঁধে।
কখনও বলে,
“অভি তুই ভালো ছেলে।কিন্তু তুই যতই মেধাবী হ, হাতে চাকরি না থাকলে সমাজ তোকে কিছুই মনে করবে না।”
অভি কষ্ট পেলেও চুপ থাকে। সে জানে, অনন্যা তার স্বপ্নের অংশ, তাই তাকে হারাতে চায় না সে।
কিন্তু ভেতরে ভেতরে সে টের পায়, সম্পর্কের ভিত্তি যেন নড়ে যাচ্ছে।এক সন্ধ্যায় অনন্যা তাকে ডাকল।
ঘাটের সিঁড়িতেই দাঁড়িয়ে বলল,
“অভি, আমি আর পারছি না। আমি এমন ভবিষ্যৎ চাই যেখানে নিশ্চয়তা আছে, অভাব নেই। তুই যতই ভালো হ, তোর হাতে কিছুই নেই। আমি… আমি অন্যরকম জীবন চাই।”
অভির বুকের ভেতর যেন ঝড় বয়ে গেল।শুধু কথা নয়—তার চোখ, তার হাতের অস্থিরতা, তার দূরত্ব—সবই অভিষেককে বুঝিয়ে দিল যে, অনন্যা আর একই পথে নেই।যে মেয়েটি প্রতিজ্ঞা করেছিল—সকল বাধা অতিক্রম করে তার পাশে থাকবে, আজ সেই মেয়েটি তার ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে অন্য স্বপ্নের দিকে এগোচ্ছে।আর সেখানে আজ আর অভির কোনো জায়গা নেই।
কিছুক্ষণ চুপ থেকে ধীরে বলল,
“তাহলে চলে যা অনন্যা। আমি তোকে আটকাতে চাই না। তবে মনে রাখিস—আমাকে একদিন এই পৃথিবী চিনবেই, শুধু আমার পরিশ্রমের জোরে।”
অনন্যার চোখে এক মুহূর্তের জন্য দ্বিধা ফুটল,কোনোরকম বাক্য ব্যয় না করে সে চলে গেল।যেনো চলে যাওয়ার জন্যই এই প্রেক্ষাপট রচনা, সবই ছিল পূর্ব পরিকল্পিত।
অভিষেক বুঝল, শুধু ভালোবাসা যথেষ্ট নয়—সমাজ, অর্থ, নিরাপত্তা, স্বপ্নের বাস্তবতা, এসবের কারণে অনন্যা তাকে ত্যাগ করেছে।হৃদয় ভেঙে গেলেও অভিষেক একবারও কেঁদে রক্তঝরানো দুঃখ প্রকাশ করল না। তার চোখে শুধু এক অদম্য দৃঢ়তা জমল,
“যে আমাকে ছেড়ে গেল, তার জন্য আমি কাঁদব না। আমি প্রমাণ করব, নিজের যোগ্যতায়। কেউ আমাকে অবমূল্যায়ন করতে পারবে না। আমি সমাজে মাথা উঁচু করে দাঁড়াব। এই ব্যথাই আমার শক্তি।”
অভি স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল গঙ্গার ঘাটের সিঁড়িতে।গঙ্গার জলের ঢেউ যেন তার মনকে বুঝতে পারছিল। ভেঙে যাওয়া স্বপ্নের ঢেউয়ে জন্ম নিল এক নতুন লক্ষ্য।আকাশের দিকে তাকিয়ে বুকের ভেতর প্রতিজ্ঞা করল,
“আমার জীবন আমি গড়ব। ভালোবাসা হারিয়েছি, কিন্তু হার মানব না। এটাই হবে আমার নতুন শুরু।”
রাত গভীর, ঘরের ভেতর নিস্তব্ধতা।
মেঝেতে পাতলা চাদর বিছিয়ে শুয়ে আছে অভিষেক।বাবা-মা ঘুমিয়ে পড়েছে, কিন্তু তার মন জেগে আছে। বাইরে শহরের দূরদূরান্তের শব্দ ভেসে আসছে।
কিন্তু অভিষেকের চোখ খোলা। চোখের কোণ ভিজে আছে, চোখের জলে নয়, বরং হৃদয় থেকে উঠে আসা ব্যথা জমে আছে। মনে অগণিত প্রশ্ন,
“আমি কি কখনও সফল হব? আমি কি সত্যিই হারব?”
তার হাতের খামে পড়ে থাকা “Not Selected” চিঠি,হাত তার কাঁপছে। তিনবার, চারবার, পাঁচবার… প্রতিটি ব্যর্থতা যেন তার মস্তিষ্কে কাঁটা মেরে দাঁড়িয়েছে।প্রতিটি চিঠি পড়ার সময় যেন তার ভেতর এক অচেনা শূন্যতা বিস্তৃত হয়।
বছরের পর বছর, রাতের পর রাত চেষ্টা, আর অবশেষে ফিরে আসে সেই একই শব্দ, অসফল।
আর ভালবাসা?
অনন্যার মুখ ভেসে উঠল—তার প্রথম হাসি, চোখের মায়া, প্রথম হেসে চোখ মেলানো,ছোট ছোট প্রতিশ্রুতি।
“অভি, আমরা একসাথে বড় হব। আমি সবসময় তোর পাশে থাকব।”
আজ সেই কথাগুলো কেবল শূন্য শব্দ। প্রতিশ্রুতির বদলে এসেছে নির্জনতা, প্রত্যাখ্যান, ও কষ্ট।
অভিষেক মেঝেতে শুয়ে হাত দিয়ে মুখ চাপড়াচ্ছে। চোখের কোণে জল না থাকলেও বুকের ভেতর অগ্নিসংযোগ।
মনের ভেতর চিৎকার করছে—
“আমি কি এত অক্ষম? আমি কি যথেষ্ট নয়? আমি কি হারব?”
শরীর ক্লান্ত, মাথা ভারী, কিন্তু হৃদয় জ্বলে যাচ্ছে।প্রতি শ্বাস যেন যন্ত্রণার ঢেউ বয়ে আনে।
চোখের সামনে ঘুরছে সেই সকল দিন—পড়াশোনা, টিউশনি, ব্যর্থতা, ত্যাগের প্রতিটি মুহূর্ত।সবই যেন আজ তার উপর পাহাড়ের মতো চাপিয়ে বসেছে।
নীরবতার মধ্যে অভিষেক বুঝতে পারল—এই যন্ত্রণা শুধু কষ্ট নয়।
“এই ব্যথাই আমাকে তৈরি করবে। এই যন্ত্রণার আগুনই একদিন আমাকে সমাজে দাঁড় করাবে।”
মেঝেতে শুয়ে শুয়ে সে চোখ বন্ধ করে বলল, কণ্ঠে কেবল হাহাকার নেই, বরং দৃঢ় সংকল্পের প্রতিধ্বনি—
“আমি হারব না। আমি প্রমাণ করব, শুধু আমার মেধা আর পরিশ্রমের জোরেই। কেউ আমাকে কখনো ছোট করতে পারবে না।”
ভোরের আলো ফুটার সঙ্গে সঙ্গে অভিষেক ঘুম ভেঙে উঠে।চোখে ঘুমের রেশ, কিন্তু মনে এক অদম্য সংকল্প।প্রথম কাজ—প্রতিদিনের পেপার ডেলিভারি।
ঘর থেকে বেরিয়ে শহরের প্রতিটি ছোটবড় রাস্তায় ঘুরে প্রতিটি বাড়িতে পত্রিকা পৌঁছে দেওয়া।সে মনে মনে বলত,
“পেপারের টাকা কম, কিন্তু এতে আমার পড়ার খরচ কিছুটা তো সুরাহা হয়,”
সকাল শেষ হলে শুরু হতো দিনের ডেলিভারি কাজ।
শহরের দোকান, বাজার, এবং বাড়ি বাড়ি ছোটখাটো ডেলিভারি—খাবার, সামান্য সামগ্রী, কখনও ডাক।
রোদ, ধুলা, মানুষজনের চাপ—সব কিছু সহ্য করতে হত।
ক্লান্তি, ঘাম, ক্ষুধা—তবুও অভিষেক থেমে থাকত না।
প্রতিটি টাকাই তার পড়াশোনার খরচের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। শুধু পড়াশুনা বা হাত খরচ নয়, বাবার বয়স হয়েছে, আর খাটতে পারেনা সেরকম।তিনটে মানুষের দুবেলা খাবার সংস্থানও
তো দরকার।
দুপুরের পর বাড়ি ফিরতেও বিশ্রাম কম।সন্ধ্যায় শুরু হতো দুটি টিউশন।
দিনের শেষে ছোট্ট ঘর, সামান্য আলো, ক্লান্তি ভরা চোখ,দুর্বল শরীর আর নুয়ে পরা মাথা।কিন্তু অভিষেক নিজেকে বলত,
“এই সামান্য পরিশ্রমই আমার ভবিষ্যৎ গড়বে।”
রাত হতেই শুরু হত তার মূল পড়াশোনা।লন্ঠনের আলো, খাতা-কলম, পুরোনো বই।
প্রতিটি নোট, প্রশ্নপত্র, অনুশীলন—সবই মনোযোগ দিয়ে।
শরীর ক্লান্ত, চোখ ভারী, কিন্তু মনোভাব অটল।প্রতিটি ব্যর্থতার স্মৃতি, অনন্যার প্রত্যাখ্যান—সবকিছু তার পড়াশোনার শক্তি হয়ে উঠতে লাগলো।
এইভাবে দিন চলে যায়—ভোরের পেপার ডেলিভারি, দিনের মাল ডেলিভারি কাজ, সন্ধ্যার দুটি টিউশন, রাতের পড়াশোনা।
প্রতিটি দিনই যেন অভিষেকের ধৈর্য, পরিশ্রম, এবং অদম্য মনোবলের প্রতীক।
তার এই পরিশ্রম আর সংগ্রামের ধাপগুলোই ধীরে ধীরে তাকে তৈরি করতে লাগলো সমাজে দাঁড়ানোর জন্য।
দিনের প্রতিটি ক্লান্তি, রাতের প্রতিটি পড়াশোনা—সবই তার ফল দিতে শুরু করলো।ভোরবেলার পেপার ডেলিভারি আর দিনের ডেলিভারি কাজের সঙ্গে সন্ধ্যার টিউশন, রাতের দীর্ঘ পড়াশোনা—সবই তাকে ধাপে ধাপে শক্তিশালী করেছে।অনেক লড়াই, অগণিত রাত জাগা, পরীক্ষার পর পরীক্ষা দেওয়া, একদিন ডাকপিয়ন আনল খামের প্রতীক—সরকারি চাকরির অফার। একটি নয় দু দুটো চিঠি।
হৃদয় রুম্বলে উঠল। তিন বছর দিনের পর দিন কঠোর পরিশ্রম, ব্যর্থতা, অনন্যার প্রত্যাখ্যান—সবকিছু এক মুহূর্তে অর্থ পেল।
একটি ব্লক অফিসে ক্লার্কের চাকরি ও দ্বিতীয়টা স্কুলের করণিক।দুটো চাকরিই খুব বড় নয়, বেতনও সামান্য।তবু চিঠিটা হাতে নিয়ে অভিষেকের বুক ভরে উঠল অদ্ভুত এক তৃপ্তিতে।
মা চোখে জল নিয়ে বললেন,
“বাবা, এইটুকুই অনেক… তুই তো আমাদের মুখ উজ্জ্বল করলি।”
অভিষেক নিজের মনে বলল,
“আমি হারিনি। ব্যথা, প্রত্যাখ্যান, দারিদ্র্য—সবই আমাকে শক্তি দিয়েছে। আজ আমি দাঁড়াতে পেরেছি, শুধু নিজের যোগ্যতা আর পরিশ্রমের জোরে।”
অভিষেক বেছে নিলো প্রথম চাকরিটিকে।অফিসের প্রথম দিনটা যেন স্বপ্নের মতো। এ যেনো এক নতুন জীবন।
পুরোনো, খানিকটা ভাঙাচোরা টেবিল, চারদিকে স্তূপ করে রাখা ফাইল, অগোছালো পরিবেশ—
তবু অভিষেকের চোখে সবই অমূল্য।
সে মনে মনে বলল,
“এটাই আমার শুরু… এখান থেকেই আমি প্রমাণ করব, আমি পারব।”
অফিসের অন্যরা তাকে অবহেলায় দেখত।কারো কাছে সে “নতুন ছোকরা”, কারো কাছে “ক্লার্ক মাত্র”।কিন্তু অভিষেক সেই তাচ্ছিল্যের তোয়াক্কা না করে কাজে মন দিল।যে কাজ অন্যরা মাসের পর মাস ফেলে রাখত,
সে রাত জেগে তা শেষ করে সকালে অফিসে জমা দিত।
ধীরে ধীরে সাধারণ মানুষও তার নাম মুখে আনতে লাগল,
“অভিষেক বাবুর কাছে গেলে কাজ আটকে থাকে না।”
লোকের ভিড়ে ক্লান্ত হলেও সে এক মুহূর্তের জন্য বিরক্তি দেখাত না।প্রশাসনিক করতে রাও তাকে ধীরে ধীরে ভরসা করতে শুরু করলো।
আর ভেতরে ভেতরে?
প্রতিদিন রাতে অফিস থেকে ফিরে,একটুকু ভাত খেয়ে আবার বই খুলে বসত সে,
কারণ সে জানত, এই ছোট চাকরি তার শেষ গন্তব্য নয়,এটা কেবল এক শুরু।
ব্লক অফিসে অভিষেক যতদিন কাজ করছে, ততই তার আলাদা পরিচিতি তৈরি হচ্ছে।অন্য কর্মচারীরা যেখানে ফাইল ফেলে রেখে “কাল করে দেব” বলে গড়িমসি করত,অভিষেক সেখানে সেই কাজ রাত জেগে শেষ করে সকালে সবার আগে জমা দিত।
কোনো গরিব কৃষক জমির খতিয়ান বা সার্টিফিকেট পেতে আসলে বেশিরভাগের উত্তর হতো,
“ফি দাও, না হলে মাসের পর মাস লেগে যাবে।”
কিন্তু অভিষেক একটাকা বাড়তি নিত না।সে বলত,
“আপনাদের টাকায় নয়, আপনাদের আশীর্বাদে আমি বাঁচব।”
গ্রামের মানুষ অবাক হতো,
এমনও কি কর্মচারী আছে, যে ঘুষ নেয় না?ধীরে ধীরে খবর ছড়িয়ে পড়ল,
“অভিষেক বাবুর কাছে গেলে কাজ পাকা।”
একদিন ব্লক অফিসে উচ্চপদস্থ অফিসার এসেছিলেন পরিদর্শনে।অভিষেকের জমা দেওয়া ফাইল দেখে তিনি অবাক।কোনো ভুল নেই, সবই সঠিক ও পরিপাটি।
অন্য কর্মচারীদের দিকে তাকিয়ে তিনি হেসে বলেছিলেন,
“তোমাদের সবাইকে এই ছেলেটার কাছ থেকে শেখা উচিত।”
সেদিন অফিসে প্রথমবার অভিষেক মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছিল।যে ছেলেকে একসময় সবাই তুচ্ছ করত,
আজ তার সততাই তাকে আলাদা করে তুলছে।
দিনের বেলা অফিস,সন্ধ্যায় দুটো টিউশন,তারপর বাড়ি ফিরে মায়ের হাতের ভাত।
তবু রাত নামলেই খাতা-কলম খুলে বসে পড়ত অভিষেক। শুরু হতো রাতের অদম্য সংগ্রাম।
চোখ লাল হয়ে যেত, শরীর ভেঙে আসত,তবু মনে মনে বলত,
“এই ছোট চাকরি আমার শেষ গন্তব্য নয়… আমি বড় হবই।”
মাঝরাতে কেরোসিনের আলোয় পড়তে বসে,কখনো এক চিলতে খোলা আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকত।তার বুকের ভেতর গুমরে উঠত পুরোনো ক্ষত—
অনন্যার বিশ্বাসঘাতকতা,চাকরি না পাওয়ার অপমান।সেই কষ্টই তার জ্বালানি হয়ে উঠেছিল।
সারা দিন অফিসের কাজ শেষ করে, সন্ধ্যায় টিউশন সেরে বাড়ি ফিরেছিল অভিষেক।রাতে মা ভাত বেড়ে দিতে দিতে বললেন,
“বাবা, কাল তোকে ভোরে বেরোতে হবে। আজ দেরি করে পড়াশোনা করিস না।”
কিন্তু অভিষেকের চোখে ঘুম ছিল না।পোড়া কেরোসিন লণ্ঠনের আলোয় টেবিলে ছড়িয়ে ছিল নোটস আর প্রশ্নপত্রের খাতা।একদিকে ছিল অনন্যার বিশ্বাসঘাতকতার স্মৃতি , অন্যদিকে চাকরির স্বপ্ন।
সে গঙ্গার ঘাটে গিয়ে দাঁড়ালো। তারাভরা আকাশের দিকে তাকিয়ে নিজেকেই বলল,
“কালকের দিনটাই আমার পরীক্ষা নয়,আমার এত বছরের সংগ্রামের হিসেব।”
ভোরেই মা মুড়ি আর গুড় বেঁধে দিলেন ছোট্ট পুটলিতে।
অভিষেক শ্যামলের সঙ্গে বেরিয়ে পড়ল পরীক্ষাকেন্দ্রের পথে।
কেন্দ্রের ফটকে দাঁড়িয়ে বুক কেঁপে যাচ্ছিল।কোচিং সেন্টারের দামী বই হাতে ছেলেমেয়েরা ঢুকছে দলে দলে।
অভিষেকের হাতে শুধু এক পুরোনো খাতা, আর মায়ের দেওয়া কলম।
কিন্তু পরীক্ষার হলে ঢুকতেই যেন বদলে গেল সে।প্রশ্নপত্রের প্রতিটি লাইন যেন তার বহুদিনের চেনা।কলম ছুটল, উত্তর ভরতে ভরতে সে ভুলেই গেল সময়ের হিসেব।শেষ ঘণ্টা বাজার সময় মনে হলো,
“আমি লড়াইটা দিয়েছি, বাকি সিদ্ধান্ত ভাগ্যের।”
মাস কয়েক পরের এক বিকেল।
অভিষেক অফিস থেকে ফেরার পথে পাড়ার দোকান থেকে খবর পেল ইউপিএসসি পরীক্ষার ফল বেরিয়েছে।
তড়িঘড়ি ছুটল সাইবার ক্যাফেতে।কাগজে নাম খুঁজতে খুঁজতে বুক ধুকপুক করছিল।
প্রথমে কোথাও নিজের নাম খুঁজে পেল না। একটা অজানা ভয়, উত্তেজনা, আবার ব্যর্থতার আশঙ্কার এক চোরাস্রোত যেনো শিরদাঁড়া দিয়ে নেমে গেলো।নিজেকে সামলে নিলো সে। আবার শুরু থেকে খুজতে লাগলো।
হঠাৎ চোখ আটকে গেল,
“অভিষেক দাস – আইএএস ”
মুহূর্তে যেন পৃথিবী থেমে গেল।
চোখ ভিজে এল, হাত কাঁপতে লাগল।তারপর পাগলের মতো বাড়ি দৌড়ে গেল।
দরজা খুলতেই মাকে জড়িয়ে ধরে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল,
“মা, আমি পেরেছি… আমি সত্যিই পেরেছি।”
মা আঁচল দিয়ে চোখ মুছে বললেন,
“আমি জানতাম বাবা, তুই একদিন না একদিন সফল হবিই।এই মাটির ঘর একদিন আলোয় ভরে উঠবেই।”
সেদিন থেকে অভিষেক আর আগের অভিষেক নয়।সে এখন এক তরুণ জেলা শাসক,যে সিদ্ধান্ত নেয়, মানুষের পাশে দাঁড়ায়,আর যার প্রতিটি সইয়ে বদলে যায় গ্রামাঞ্চলের সাধারণ মানুষের জীবন।যে ছেলে একদিন খবরের কাগজ বিলি করত,আজ গ্রামের ছেলে মেয়েরা তাকে আদর্শ হিসেবে দেখে, তার নাম উচ্চারণ করতে গর্ব বোধ করে।সেই নাম, সেই মর্যাদা, সেই অবদান—সবই তার কঠোর পরিশ্রম, অধ্যবসায় ও সততার ফসল।
গ্রামের মাঠে আজ বিরাট শুনানি বসেছে।সরকারি প্রকল্পের উদ্বোধন আর মানুষের অভিযোগ শোনার জন্য জেলাশাসক সাহেব নিজে উপস্থিত।মঞ্চে টেবিল সাজানো, সামনে ভিড়,চাষি, ব্যবসায়ী, বিধবা মা, সাধারণ মানুষ সবাই সমস্যার সমাধানের আশায় এসেছে।
হঠাৎ ঘোষক মাইকে বলল,
“জেলা শাসক মহাশয় এসে গেছেন।আমরা ওনাকে অনুরোধ করছি মঞ্চে আসন গ্রহণ করার জন্য।”
গাড়ি থেকে নামলেন অভিষেক।
সাদা খদ্দরের পাঞ্জাবি, কাঁধে পাটের ব্যাগ, সঙ্গে নিরাপত্তারক্ষী।তার পদক্ষেপে ভিড় চুপ হয়ে গেল,ছোটবেলার সেই ছেলেটি, আজ গ্রামে ফিরেছে জেলাশাসক হয়ে।
মঞ্চে চেয়ারে বসতেই তার চোখ পড়ল সামনের সারিতে।সেখানে বসে আছে অনন্যা, সাথে তার বাবা-মা ও বোন।অভিষেকের চোখ মুহূর্তের জন্য আটকে গেল,কিন্তু মুখে কোনো পরিবর্তন নেই।চোখে কেবল সংযত দৃঢ়তা আর আত্মবিশ্বাস।একসময়ের প্রেমিকা, যাকে সে ভাঙা স্বপ্নের মতো মনে রেখেছিল।সাজগোজ করা, ব্যয়বহুল পোশাকে,কিন্তু চোখে আর সেই আগের উজ্জ্বল আত্মবিশ্বাস নেই।এক মুহূর্তের জন্য যেন সময় থেমে গেল।
অনন্যা অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল।
যাকে একদিন দারিদ্র্য আর ব্যর্থতার জন্য প্রত্যাখ্যান করেছিল,আজ সেই ছেলেটিই গ্রামের মঞ্চে বসে আছে সর্বোচ্চ সম্মানের আসনে।গ্রামের মানুষ তার জন্য হাততালি দিচ্ছে,
আর অনন্যা নীরবে বসে আছে, মাথা নত করে।
অভিষেক মাইকের সামনে দাঁড়িয়ে শান্ত গলায় বলল,
“আমি এই গ্রামের সন্তান।
আজকের এই আসনে আমি শুধু আমার নয়, আপনাদের প্রত্যেকের প্রাপ্য সম্মান নিয়ে দাঁড়িয়ে আছি।এখন থেকে এই মাটি, এই মানুষ—এদের সেবাই আমার একমাত্র দায়িত্ব।”
তার কথা ভিড়ের মধ্যে ঢেউ তুলল।মানুষ হাততালি দিল, চোখ ভিজে উঠল আবেগে।
অনন্যা স্থির চোখে তাকিয়ে রইল—সে বুঝতে পারল, যে ছেলেকে একদিন তুচ্ছ করেছিল,আজ সেই ছেলেই তার সবচেয়ে বড় আফসোসের নাম।
অভিষেকের নীরব উপস্থিতিই তার প্রতি সবচেয়ে বড় জবাব।
অনুষ্ঠানের শেষে, স্টেজের আলো কিছুটা ম্লান হলেও ভিড়টা কমেনি।অনন্যা ভয় পেয়ে এগিয়ে এলো, কণ্ঠে আগের মতো দৃঢ়তা নেই, চোখে অদ্ভুত হাহাকার।
“অভি… তুমি… এতদূর এলেও… আমি ভাবতেই পারিনি,” বলল, হাত কাঁপছে।
অভিষেক এক মুহূর্তের জন্য তার দিকে তাকাল।কোনো উত্তর না, কোনো অভিযোগ না, শুধু চুপচাপ।শুধু চোখের গভীরে ঝলমল করছে তার অতীতের ব্যথা,যে ব্যথা অনন্যার বিশ্বাসঘাতকতা দিয়ে তৈরি হয়েছিল।
অনন্যা কিছুটা এগিয়ে বলল—
“আমি ভুল বুঝেছিলাম… আমি চাইছি… আমাদের আবার…।”
একমুহুর্ত চুপ, তারপর অভি ধীরে ধীরে বলতে থাকে,
“অনন্যা, আমার ছোট চাকরি, ব্যর্থতা, অপমান—সবই আমাকে তৈরি করেছে।আমি আজ শুধু চাকরিই পাইনি,মানুষের আস্থা ও মর্যাদাও অর্জন করেছি।
তুমি আমার পাশে ছিলে না, কিন্তু আমার অধ্যবসায় আমাকে এই অবস্থানে নিয়ে এসেছে।
এখন আর কোনো শব্দের প্রয়োজন নেই—আমার কাজই আমার জবাব।”
অনন্যা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
চোখ ভিজে উঠল—হয়তো অপরাধবোধে, হয়তো হারানো ভালোবাসার নীরব কষ্টে।কিন্তু অভিষেক আর কিছু বলল না।সে শুধু মৃদু হেসে পেছন ফিরে চলে গেল।
অনন্যা চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল।
চোখে জল, মনে আফসোস।
অভিষেকের পেছনের দিকে তাকিয়ে সে বুঝল,
যে ছেলেটিকে একসময় ছোট করে দেখেছিল,আজ সে নীরবভাবে তার সবচেয়ে বড় জবাব দিয়েছে—কোনো ক্রোধ ছাড়া, শুধুই নিজের অর্জিত মর্যাদায়।
অভিষেকের নীরবতা অনন্যার কানে চিরস্থায়ী ধ্বনি হয়ে বাজল,
“যে সময়ে পাশে থাকা উচিত ছিল, তুমি সরে গিয়েছিলে।
আজ আমার অবস্থান, আমার মর্যাদা—সবই তোমার বিশ্বাসঘাতকতার জবাব।”
অভিষেক সোজা গ্রামবাসীর দিকে এগিয়ে গেল।লোকজন ভিড় করে তাকে ঘিরে ধরল। কেউ হাত মেলাল, কেউ আশীর্বাদ করল, আবার কেউ গর্ব ভরা চোখে তাকিয়ে রইল।
কেউ বলল,
“আমাদের গ্রামের ছেলেকে আজ গোটা জেলাই চিনবে।”
আবার কারও গলায় কেঁপে ওঠা স্বর,
“এমন সন্তান জন্ম দেওয়া মা-বাবার ধন্য হওয়া উচিত।”
অভিষেক বিনম্রভাবে হাত জোড় করে সবার শুভেচ্ছা নিল। তার মুখে কোনো অহংকার নেই, বরং এক অদ্ভুত শান্তি আর তৃপ্তি।
সত্যিই, এ মুহূর্তে যেন তার সারা জীবনের ত্যাগ আর পরিশ্রম অর্থ পেল।
কিন্তু অনন্যা! প্রতিটি প্রশংসার শব্দ যেন বিষ হয়ে তার কানে ঢুকছিল।গ্রামের সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে অভিজাত অতিথি পর্যন্ত—সবাই অভিষেককে মাথায় তুলছে।
আর সে?
সেই তো একদিন তাকে বলেছিল “তুমি আমার যোগ্য নও”, আজ সেই মানুষটাই হাজার হাজার মানুষের শ্রদ্ধার আসনে বসে আছে। আজ অনন্যাই যে তার অযোগ্য। বুক জ্বলে ছারখার হয়ে যাচ্ছে তার।
অভিষেক এবার ধীরে ধীরে সবাইকে শুভেচ্ছা জানিয়ে বিদায় নিল।তার চোখে আর আগের কষ্ট নেই,শুধু আত্মবিশ্বাস, শক্তি এবং সহানুভূতির উজ্জ্বলতা।
রাতের আকাশের নিচে,গাড়ির দিকে হাঁটতে হাঁটতে অভিষেক নিজে নিজেই বলল,
“প্রেম হারিয়েছি, অপমান পেয়েছি, কিন্তু সেই সবই আমাকে জিততে শিখিয়েছে।
আজ আমার প্রতিটি পদক্ষেপ সমাজের জন্য।এটাই আমার সত্যিকারের জয়।”
—oooXXooo—
![]()







