হরিদাসের দৃষ্টি
চিত্রশিল্পী তপন কর্মকার
একজন গ্রাম্য মানুষ—হরিদাস। চাষাভুষো, দিনমজুর, লেখাপড়া কম; কিন্তু তার চোখে পৃথিবী ধরা দেয় অন্যভাবে। সে জল, মাটি, আকাশের মতো সাধারণ জিনিসে খুঁজে পায় জীবনের শিক্ষা। আবার শহরের রাজনীতি, ভোগবাদী দুনিয়া, ধর্মের ভণ্ডামি দেখে সে ব্যঙ্গ করে। গ্রামবাসীরা ভাবে—হরিদাস পাগল! কিন্তু সত্যি বলতে—হরিদাস আসলে এক আয়না, যেখানে সমাজ নিজের বিকৃত মুখ দেখতে পারে।
হরিদাস বলত—
“মাটি সবকিছু নেয়, তবু চুপ করে থাকে। অথচ মানুষ সামান্য গালি শুনলেও আগুন হয়ে ওঠে।”
একবার গ্রামে রাস্তা বানানোর নাম করে জমি দখল হলো। সরকারী বাবুরা বলল—“এটা উন্নয়ন।”
চাষীরা চিৎকার করল—“এটা আমাদের পেট কেটে নেওয়া।”
হরিদাস শান্তভাবে বলল—
“দেখেছো, উন্নয়নের নামে মাটি কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। অথচ মাটিই তো আমাদের জীবন। রাজনীতি আসলে মাটির প্রতি অকৃতজ্ঞতার শিক্ষা।”
শহরে গিয়ে হরিদাস একদিন দেখল—বড় বড় ফ্ল্যাট, শপিং মল, ঝকঝকে গাড়ি।
মানুষের মুখে হাসি নেই, আছে কেবল হিসেব-নিকেশ।
সে মনে মনে বলল—
“জল যেমন বাঁধ দিয়ে আটকালেই পচে যায়, তেমনি শহরের মানুষও ভোগের বাঁধে নিজেদের আটকে রেখেছে। তাদের হাসি শুকনো, জীবন নিস্তেজ।”
একবার এক ব্যবসায়ী তাকে বলল—“টাকা থাকলেই সব পাওয়া যায়।”
হরিদাস হেসে বলল—“না দাদা, টাকা দিয়ে জল কেনা যায়, কিন্তু তৃষ্ণা মেটানো যায় না।”
গ্রামে পূজা-পার্বণের সময় মানুষ একসঙ্গে আনন্দ করত। কিন্তু শহরে গিয়ে হরিদাস দেখল—একই ঈশ্বরের নামে বিভাজন। কেউ বলে—আমার ধর্ম শ্রেষ্ঠ, কেউ বলে—তোমার ধর্ম ভ্রান্ত।
হরিদাস আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল—
“আকাশ কি কোনোদিন ভাগ হয়? আকাশ তো সবার মাথার উপর একসাথে ছায়া ফেলে। যদি আকাশ কারও ধর্ম মানত, তবে আজও অর্ধেক আকাশ অন্ধকার, অর্ধেক আলোয় থাকত।”
একজন পণ্ডিত তাকে তাচ্ছিল্য করে বলল—“তুমি নাস্তিক!”
হরিদাস উত্তর দিল—“না, আমি প্রকৃতিকে মানি। ঈশ্বর যদি সত্যিই থাকেন, তবে তিনি নিশ্চয়ই আকাশের মতোই—সবার জন্য সমান।”
এক নির্বাচনের সময় গ্রামে প্রার্থী এলেন। চায়ের দোকানে সবাইকে খাওয়ালেন, প্রতিশ্রুতির বন্যা বইয়ে দিলেন।
হরিদাস শুনে হেসে উঠল—
“রাজনীতি হচ্ছে সেই নৌকা, যা মাঝ নদীতে ফুটো। তবু মানুষ উঠতে চায়, কারণ প্রত্যেকে ভাবে—আমি বাঁচব, অন্যরা ডুবে যাক।”
চায়ের দোকানের রমেশ বলল—“হরিদাসদা, তোমার কথা শুনলে ভোট দিতে ইচ্ছাই করে না।”
হরিদাস জবাব দিল—“ভোট দেওয়া চাই, তবে চোখ খোলা রেখে। নইলে রাজনীতির নাম করে শেয়ালকে রাখাল বানানো হয়।”
একবার হরিদাস শহরে গিয়ে দেখল—একজন ধনী লোক কুকুরকে খাওয়াচ্ছে মুরগির মাংস, আর পাশেই ভিখারি ক্ষুধায় কাঁদছে।
সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল—
“মানুষ এখন কুকুরকে ভালোবাসে, মানুষকে নয়। প্রেম এখন ব্যবসা, সম্পর্ক এখন চুক্তি।”
সে আবার মনে করল—
“নিধনের জীবন দেখি যেন কুকুরছানা।
এর চেয়ে অনেক সুখী অন্ধ, বধির, কানা।”
কারণ অন্ধ মানুষ দেখে না এই ভোগের অসাম্য, বধির শোনে না শাসকের মিথ্যা প্রতিশ্রুতি, কানা দেখে না হিংসার খেলা।
গ্রামের শিশুরা তাকে প্রায়ই বলত—“দাদু, তুমি সবকিছু এত অদ্ভুতভাবে দেখো কেন?”
হরিদাস উত্তর দিত—
“আমি কিছুই অদ্ভুত বলি না। জল, মাটি, আকাশ—এরা প্রতিদিন আমাদের শিক্ষা দেয়। কিন্তু আমরা শুনতে চাই না, দেখতে চাই না। আমরা শুধু টাকা, ভোট আর ধর্মের নাম শুনতে চাই। এজন্যই আমরা দুঃখী।
শেষ বয়সে হরিদাস নদীর ধারে বসে বলেছিল—
“যেদিন মানুষ প্রকৃতিকে গুরু মানবে, সেদিন রাজনীতি, ভোগবাদ, ধর্মের বিভাজন সব মুছে যাবে। ততদিন আমরা শুধু ভোগের খেলায় ডুবে থেকে নিজেদের ধ্বংস করব।”
হরিদাসের জীবন আসলে আমাদের সমাজের প্রতিচ্ছবি। সে শিখিয়েছে—মাটি = ধৈর্যের শিক্ষা।
জল = প্রবাহিত জীবনের শিক্ষা।
আকাশ = মুক্তির শিক্ষা।
কিন্তু রাজনীতি আমাদের লোভ শেখায়, শহরের ভোগবাদ আমাদের খাঁচায় বন্দি করে, ধর্মের সংকীর্ণতা আমাদের বিভক্ত করে।
তবুও প্রকৃতির দরবারে এই সব ভোগবাদী আস্ফালনের কোনো মূল্য নেই। কারণ মাটির ধৈর্য, জলের প্রবাহ আর আকাশের মুক্তিই একমাত্র সত্য।
—oooXXooo—
![]()







