।। তোমাতে আমার ঠিকানা (ষষ্ঠ পর্ব)।।
বারিত বরণ
আজ কলেজে নবীন বরণ।
ভোর থেকেই যেন অন্যরকম উচ্ছ্বাসে ভরে উঠেছে রামানন্দ কলেজের চত্বর।
গেটে রঙিন কাগজের ব্যানার—” নবীনবরণ উৎসব – ২০১০, স্বাগতম।”
কোথাও বেলুন, কোথাও রঙিন আলপনা,কোথাও আবার সিনিয়রদের হৈচৈ—
সব মিলিয়ে যেন ছোট্ট একটা মেলার মতো।
সুচি আজ সেজেছে খুব সাধারণভাবে—
সাদা-হালকা নীল বর্ডারের সালোয়ার কামিজ,চুলে খোপা, কানে ছোট্ট দুল।অন্য মেয়েদের মতো ঝলমলে সাজ নয়,কিন্তু তার সরলতাই যেন আলাদা করে চোখে পড়ে।
অন্যদিকে ছেলেরা পরেছে রঙিন শার্ট, জিন্স, কারও মাথায় সানগ্লাস,কেউ আবার জোর গলায় গান ধরছে করিডোরে।মেয়েরা শাড়ি পরে রঙের বাহার এনেছে চারদিকে।
অডিটোরিয়ামে ঢুকতেই মঞ্চের ওপর মাইক্রোফোনে একজন সিনিয়র ঘোষণা করছে,
“আজকের দিনটা আমাদের নতুন বন্ধুদের জন্য।তাদের স্বাগত জানাই এই পরিবারে।”
অডিটোরিয়ামে তখন ভীষণ কোলাহল।তালে তালে গান শুরু হলো, তারপর নাচ। কেউ কবিতা পড়ছে,আবার কেউ বা মঞ্চ থেকে নামতেই হাততালির ঝড় উঠছে।সবাই যেন আনন্দে ভেসে যাচ্ছে।একদল সিনিয়র মিলে অভিনয় করছে মজার একটা নাটিকা।হাসির রোল উঠছে বারবার।
সুচি এক কোণে বসে মুগ্ধ হয়ে দেখছে চারপাশ।মাঝে মাঝে অনূমিতা ও আরও কয়েকটি মেয়ে তার হাত টেনে বলছে,
“চল, একটু সামনে যাই।”
কিন্তু সে ভিড় থেকে একটু দূরেই থাকতে চাইছে।তার চোখ হঠাৎ গিয়ে থামে করিডোরের দরজার পাশে,
সেখানে অভি দাঁড়িয়ে।
অভির কোনো সাজ নেই,একেবারে সাদাসিধে—
সাদা মলিন একটা জামা, কালো প্যান্ট, আর কাঁধে ব্যাগ।
ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়েও সে আলাদা,কারণ তার চোখে হাসি নেই,চুল একটু এলোমেলো, চোখ দুটো গভীর অথচ অস্বস্তিতে ভরা।
যেন সে এই উৎসবের অঙ্গই নয়—বরং কোথাও দাঁড়িয়ে, নিজের জায়গাটা খুঁজে বেড়াচ্ছে।তার সাদামাটা পোশাক যেন আরও স্পষ্ট করে দেয় তার একাকিত্ব।
সুচি অনেকক্ষণ ধরেই তাকিয়ে আছে তার দিকে।অন্য মেয়েরা ঝলমলে শাড়ি, চুলে ফুল, হাতে কড়া মেকআপে ব্যস্ত,কিন্তু সুচির চোখে বারবার পড়ছে সেই এককোণে দাঁড়ানো অভি।
এক মুহূর্তের জন্য সুচির চোখে চোখ পড়ল অভির।
সুচি হেসে নিল হালকা, অভি মাথা নাড়ল।সেই ছোট্ট মুহূর্তে যেন ভিড়, কোলাহল, সব মিলিয়েএকটা অদ্ভুত সেতুবন্ধ তৈরি হলো দুজনের মধ্যে।
সে স্পষ্ট বুঝতে পারছে—
অভি আড়ষ্ট, স্বাভাবিকভাবে ভিড়ে মিশতে পারছে না।তবুও তার ভেতরে একটা নীরব দৃঢ়তা আছে,যা তাকে অন্যদের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা করে দিচ্ছে।
সুচির বুকের ভেতর হালকা একটা টান খেলে গেল।নিজেকেই প্রশ্ন করল,
“কেন যেন ওই ছেলেটাকে আলাদা করে দেখছি?
যেন… ওর মধ্যে লুকিয়ে আছে এক অচেনা শক্তি।”
সুচি কিছুক্ষণ দ্বিধায় ছিল,
তারপর হঠাৎ উঠে দাঁড়াল।
নিজের ভেতর এক অদ্ভুত টান অনুভব করল—যেন না গিয়ে থাকা যাচ্ছে না।
সুচি ধীরে ধীরে ভিড় ঠেলে এগিয়ে গেল অভির দিকে।
অভি মাথা নিচু করে দাঁড়িয়েছিল,পাশে কেউ নেই।
হঠাৎ সামনে এসে দাঁড়ানো সুচিকে দেখে সে একটু চমকে গেল।
সুচি হাসি দিয়ে, নরম গলায় বলল,
“আপনি তো বেশ চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছেন…
ভিড়টায় কি একেবারেই ভালো লাগছে না?”
অভি প্রথমে একটু অস্বস্তি বোধ করল।চোখ নিচু করেই বলল,
“ভিড় আমার অভ্যাস নয়।
আর আমি… এভাবে সেজেগুজে মিশতেও জানি না।”
সুচি তার দিকে এক মুহূর্ত তাকিয়ে রইল।তার ঠোঁটে হালকা হাসি খেলে গেল,
“সেজেগুজে নয়, আপনি যেমন আছেন তেমনই ঠিক।সবাই মিলে একরকম হলে তো আসল মানুষটাকেই হারিয়ে ফেলতাম।”
অভি চোখ তুলে একবার তাকাল সুচির দিকে।তার চোখে কোনও বিদ্রূপ নেই, নেই মজা করার ছাপ—বরং আছে আন্তরিকতা।
মুহূর্তটা দুজনের কাছেই নতুন,
কিন্তু সেই ছোট্ট কথোপকথনেই
মনে হলো ভিড়ের মধ্যে যেন একটা অদ্ভুত সেতু তৈরি হলো তাদের মাঝে।
সিনিয়রদের নাটক টা শেষ হতেই অডিটোরিয়ামে হাততালির গুঞ্জন। এই সময় হঠাৎ সুচি লক্ষ্য করলো সামনের সারি থেকে সেই ছেলেটা—যে প্রথম দিন করিডোরে অভিকে অপমান করতে চেয়েছিল—চোখ টিপে পাশের এক সিনিয়রকে কিছু বলল।
সিনিয়ররা একটু হেসে ফিসফিস করল।তারপর এক জন মাইক্রোফোন হাতে ঘোষণা করল,
“এবার আমাদের নতুন বন্ধুদের মধ্যে থেকে…অভি নামের একজনকে অনুরোধ করছি মঞ্চে আসতে।
গ্রামের ছেলে বলে শুনেছি—চলুন দেখি, শহুরে কলেজের মঞ্চে ও কি বলতে পারে।”
পুরো অডিটোরিয়ামে হালকা গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ল।কারও ঠোঁটে চাপা হাসি, কারও চোখে কৌতূহল।
ঘোষণা শোনার পর অভির বুকের ভেতর ধক্ করে উঠল।
মুহূর্তের জন্য সে দোটানায় পড়ল,
“যাবো? নাকি ওদের বিদ্রূপকে উপেক্ষা করব?”
কিন্তু পরক্ষণেই মনে পড়ল প্রথম দিনই সে বলেছিল,
“আমি গরীব হতে পারি, কিন্তু যোগ্যতা দিয়ে এসেছি এখানে।”
একবার সুচির দিকে তাকালো সে, এক আশ্চর্য শক্তি পেলো যেনো,ধীরে ধীরে সে এগিয়ে গেল মঞ্চের দিকে।
চোখ নিচু, কিন্তু পদক্ষেপ দৃঢ়।
মাইক্রোফোন হাতে নিতেই অডিটোরিয়ামে অস্বস্তিকর নীরবতা নেমে এলো।কিছু ছেলে ফিসফিস করছে,
“দেখি এখন কি বলে।”
অভি গলাটা সোজা করে নিল।
তার চোখে এক ঝলক দৃঢ়তা ঝলমল করল।
অভি সাবলীল কিন্তু দৃঢ় কণ্ঠে বলতে শুরু করলো,
“হ্যাঁ, আমি গ্রামের ছেলে।
আমার বাড়ি কাঁচা মাটির ঘর, বৃষ্টির সময় ছাদ চুঁইয়ে জল পড়ে।আমার বাবা ভ্যান চালান, মা পরের জমিতে কাজ করেন।আমার হয়তো দামি পোশাক নেই, হাতে স্মার্টফোন নেই—কিন্তু স্বপ্ন আছে।
এই মঞ্চে দাঁড়ানোর যোগ্যতা আমি কারও দান বা দয়া করে পাইনি।দিন রাত পড়ে, লড়ে, অগণিত বাধা পেরিয়ে এখানে পৌঁছেছি।আপনারা হাসতে পারেন আমার দারিদ্র্য দেখে,কিন্তু আমি গর্ব করি,কারণ আমার গরিব বাবা-মা কষ্ট করে উপোস থেকেও আমাকে পড়াশোনার সুযোগ দিয়েছেন।তাদের চোখের জলই আমার অনুপ্রেরণা।
আমি জানি, গরিব হলে মানুষের ভিড়ে প্রায়ই মাথা নিচু করতে হয়।কিন্তু আমি ঠিক করেছি—
জীবনের প্রতিটি অপমানকে শক্তিতে রূপান্তর করব। আমি প্রমাণ করব, মানুষকে তার পোশাক দিয়ে নয়,তার মনের শক্তি আর জ্ঞানের আলো দিয়ে বিচার করা উচিত।
অডিটোরিয়ামে চাপা নিস্তব্ধতা।
কিছুক্ষণ আগেও যারা হেসেছিল, তাদের মুখ থমথমে।
“আমি এসেছি পড়াশোনা করতে, মানুষ হতে।আমার গ্রাম আমাকে শিখিয়েছে,কঠোর পরিশ্রমই সবচেয়ে বড় অলঙ্কার।আজ যদি এখানে দাঁড়াতে পারি, সেটা টাকার জন্য নয়, যোগ্যতার জন্য।”
অভি একটু থেমে আবার বলল,
“আজ হয়তো আমি সাদামাটা এক ছাত্র,কিন্তু একদিন আমি এমন জায়গায় দাঁড়াব—যেখানে আমাকে আর গ্রামের ছেলে বলে নয়,যোগ্য মানুষ বলে চিনবে।”
টানা কথা গুলো বলে অভি একটা বড় শ্বাস নিয়ে থামলো।
তার কথার শেষে পুরো হল কয়েক মুহূর্তের জন্য নিস্তব্ধ। তারপর কোথাও থেকে হাততালি শুরু হলো।
প্রথমে দু-একজন, তারপর ধীরে ধীরে পুরো অডিটোরিয়াম হাততালিতে কেঁপে উঠল।
সিনিয়ররা, যারা একটু আগে মজা করছিল, তারাও চুপচাপ বসে আছে।কেউ কেউ আবার মাথা নেড়ে সম্মতি জানাচ্ছে।
সুচি সামনের সারি থেকে তাকিয়ে আছে—চোখে এক অদ্ভুত আলো।মনে মনে ভাবছে,
“আমি ঠিকই ভেবেছিলাম… ও অন্যরকম। ও সত্যিই আলাদা।”
অভি ধীরে ধীরে মঞ্চ থেকে নামল।পা কাঁপছিল সামান্য, কিন্তু বুকের ভেতর এক অদ্ভুত দৃঢ়তা।
তার মনে হচ্ছিল—আজ হয়তো প্রথমবার, সে নিজের কণ্ঠে সবার সামনে দারিদ্র্যের গ্লানি ভেঙে দাঁড়িয়েছে।
ঠিক সেই সময়,ভিড়ের মাঝেই সুচির চোখে চোখ পড়ল অভির।
সুচির চোখ ভিজে উঠেছে অল্প।
কিন্তু সেখানে দুঃখ নয়, ছিল গভীর শ্রদ্ধা আর অদ্ভুত টান।
তার ঠোঁট নরমভাবে ফিসফিস করে উঠল—
“ভালো বলেছেন…”
শব্দটা ভিড়ের আওয়াজে হারিয়ে গেল,কিন্তু অভি ঠোঁট পড়ে বুঝে নিল।অভির চোখে ফুটে উঠল এক ঝলক হাসি—খুব সূক্ষ্ম, খুব লাজুক, কিন্তু অসীম কৃতজ্ঞতায় ভরা।
সে যেন চোখের ভাষায় বলল,
“আমাকে বুঝেছেন, এটাই আমার শক্তি।”
সুচি আর কিছু বলল না।
তাদের মাঝের দূরত্বটা তখনও রয়ে গেল,কিন্তু সেই নীরব চোখাচোখিই যেন অদৃশ্য সেতুর প্রথম ইট গেঁথে দিল।
মঞ্চের আলো খানিকটা ম্লান হলো।
ঘোষণা এলো,
“এবার নবীন ছাত্রী সুচরিতা সেন আমাদের শোনাবে একটি রবীন্দ্রসঙ্গীত।”
চারদিকের কোলাহল হঠাৎ স্তব্ধ হয়ে গেল।সুচি ধীরে ধীরে মঞ্চে উঠল—সাদা-নীল সালোয়ার কামিজে, মুখে শান্তির আভা,
হাতে শুধু মাইক্রোফোন।
কোনও বাড়তি সাজ নেই, কিন্তু উপস্থিত সবাই যেন একসাথে তার দিকে তাকাল।
সুর বাজতেই সুচির কণ্ঠ মঞ্চে ছড়িয়ে পড়ল।
“আগুনের পরশমণি ছোঁয়াও প্রাণে”
গানের প্রতিটি শব্দে যেন ছিল তার নিজের বিশ্বাস, নিজের স্বপ্ন।স্বচ্ছ, প্রশান্ত, গভীর কণ্ঠস্বর যেন মুহূর্তেই ভিড়কে আবিষ্ট করে তুলল। হাসি-ঠাট্টা করা ছেলেমেয়েরাও একে একে চুপ হয়ে গেল।
অডিটোরিয়ামের কোণে দাঁড়িয়ে অভি বিস্ময়ে তাকিয়ে রইল।
মঞ্চে যে মেয়েটি গান গাইছে—
সে-ই তো একটু আগেই এসে বলেছিল,
“আপনি যেমন আছেন, তেমনই ঠিক।”
তার গলায় রবীন্দ্রসঙ্গীত যেন শুধু গান নয়,বরং এক বিশ্বাসের উচ্চারণ।অভির বুকের ভেতর হঠাৎ একটা অচেনা আলোড়ন জাগল।
মনে মনে বলল,
“অদ্ভুত মেয়ে…
এত বড়লোকের ঘরে জন্ম নিয়েও এ যেন ভেতরে একেবারে অন্যরকম।যদি সত্যিই এর মনটা এমন হয়,তাহলে ওকে ভুল বোঝা যাবে না।”
গান শেষ হতেই হাততালির ঝড় বয়ে গেল অডিটোরিয়ামে।
অনেকে উঠে দাঁড়িয়ে হাততালি দিল।সুচি মাথা নিচু করে মঞ্চ থেকে নেমে এলো।
চোখাচোখি হলো অভির সঙ্গে।
দূর থেকেই অভি মাথা নাড়ল—
যেন নীরবে স্বীকার করল তার মনের গভীর প্রশংসা।সুচি হালকা হাসল, তারপর ভিড়ের মধ্যে হারিয়ে গেল।
নবীনবরণের অনুষ্ঠান শেষ।
কেউ দল বেঁধে ক্যান্টিনে যাচ্ছে, কেউ আবার ক্যাম্পাসে গল্পে মেতে উঠেছে।
অভি একা, হাতে বই, নীরবে করিডোর ধরে হাঁটছিল।
হঠাৎ পেছন থেকে ডাক শোনা গেল,
“শুনছেন… অভি?”
অভি থমকে দাঁড়াল।
সুচি এগিয়ে এলো, মুখে শান্ত হাসি।
“আজকের আপনার বক্তব্য… অসাধারণ ছিল।প্রথম দিন যতটা ভেবেছিলাম, তার থেকেও অনেক বড় মনে হলো আজ আপনাকে।”
অভি একটু সংকোচে মাথা নাড়ল।
“ধন্যবাদ… তবে আমি শুধু সত্যিটাই বলেছি।এখানে সবাই হাসছিল, কিন্তু আমি ভেবেছি—
আজ যদি চুপ করে থাকি, কাল হয়তো আর মুখ তুলে দাঁড়াতে পারব না।”
সুচি চোখে তাকাল গভীর কৌতূহল নিয়ে।
“আপনি গ্রামের ছেলে—এটা গর্বের কথা, লজ্জার নয়।
কিন্তু আজ যারা আপনাকে নিয়ে হাসছিল, তারা নিশ্চয়ই বুঝতে পারল আসল মানুষ কাকে বলে।”
অভি একটু চুপ করে রইল, তারপর বলল,
“আমাকে নিয়ে হাসাহাসি আমি নতুন করে শিখিনি।গ্রামে থাকতে হলে, স্কুলে যেতে হলে, প্রতিদিন এটার মুখোমুখি হতে হয়।
কিন্তু আমি মনে করি,একদিন যদি আমি সত্যিই কিছু করতে পারি, তাহলে সেই হাসির মানুষগুলোই হাততালি দেবে।”
সুচি হালকা হেসে বলল,
“আজই তো সেটা ঘটলো। আপনি কি খেয়াল করেননি?”
অভি প্রথমবার সুচির চোখে তাকাল।চোখ দুটোতে ভরপুর আন্তরিকতা।তার বুকের ভেতর হঠাৎ এক অচেনা উষ্ণতা জেগে উঠল।
অভি ধীর স্বরে বলল,
“আপনি… আলাদা।
এত বড়লোক ঘরের মেয়ে হয়েও এমন করে ভাবেন—এটা আমি কল্পনা করিনি।”
সুচি মৃদু হেসে উত্তর দিল,
“আমি বড়লোকের মেয়ে ঠিকই, কিন্তু আমার নিজের স্বপ্ন আছে।
বাবার ব্যবসায়, টাকার পাহাড়ে আমার মন নেই।আমি চাই… মানুষ গড়তে, পড়াতে, আলোর দিশা দিতে।এটাই আমার পথ।”
অভি বিস্ময়ে তাকিয়ে রইল।
তার মনে হলো—আজ মঞ্চে সে একা লড়েনি,একজন সঙ্গীও খুঁজে পেয়েছে,যে একইভাবে অন্যদের জন্য বাঁচতে চায়।
অভি কিছুটা লাজুক ভঙ্গিতে হাসল।তারপর ধীরে ধীরে বলল,
“আপনি তো বললেন আমার বক্তব্যের কথা…
কিন্তু আমি কিছু না বললে অন্যায় হবে।আজ আপনার গান… সত্যিই মন ছুঁয়ে গেল।
আমি ছোটবেলায় গ্রামে মেলা-উৎসবে রবীন্দ্রসঙ্গীত শুনেছি,কিন্তু আজ আপনার গলায় শুনে মনে হলো—
গানটা যেন কেবল সুর নয়, এক ধরনের প্রার্থনা।”
সুচির চোখে বিস্ময় আর আনন্দের মিশ্র ঝিলিক ফুটল।
সে একটু হেসে বলল,
“সত্যি? আপনি গান বোঝেন?”
অভি মাথা নাড়ল,
“আমি সুরের বড় জ্ঞানী নই।
কিন্তু আমার কাছে গান মানে—হৃদয় ছুঁয়ে যাওয়া।
আজ আপনার গান শুনে মনে হয়েছে,আপনি শুধু গাইছিলেন না,আপনি যেন আমাদের সবার ভেতরের কণ্ঠকেই প্রকাশ করছিলেন।”
সুচির গাল হালকা লাল হয়ে উঠল, তবু তার চোখে প্রশান্তির আলো।
সে শান্তভাবে উত্তর দিল,
“ধন্যবাদ… আমি গানকে প্রার্থনা বলেই দেখি।হয়তো সেজন্যই আমার সবটা ঢেলে দিই।”
অভি একটু থেমে তাকাল সুচির দিকে,
“তাহলে আপনার স্বপ্নও কি গান নিয়ে?”
সুচি মাথা ঝাঁকাল।
“না, গান আমার ভরসা, কিন্তু স্বপ্ন অন্য।আমি চাই মানুষ গড়ার কারখানা বানাতে—শিক্ষার আলো পৌঁছে দিতে সবার কাছে।”
অভির চোখে হঠাৎ এক ঝলক বিস্ময় আর শ্রদ্ধা ফুটল।
সে গভীর গলায় বলল,
“তাহলে আমাদের পথ আলাদা নয়।আমি-ও প্রমাণ করতে চাই, গরিব মানেই ব্যর্থ নয়।
একদিন আমিও চাই সমাজে কিছু পরিবর্তন আনতে।”
দুজনের চোখ এক মুহূর্তের জন্যে একে অপরের সঙ্গে আটকে গেল।
এবার আর নীরবতা নয়—
এক অদৃশ্য বন্ধনের সূচনা হলো।
ক্যান্টিনের কোণের টেবিলে দু’জনে মুখোমুখি বসে।
চা-জলখাবারের ভিড়ে চারপাশ সরগরম, কিন্তু তাদের ছোট্ট কথোপকথন যেন অন্য জগৎ।
সুচি করে হালকা হাসি দিয়ে। বলল,
“আপনার গ্রামের নাম কী?”
“কিনঝাকুরা… বাঁকুড়ার জয়পুরের ধারে।ডাক দিলে সবাই চেনে না, মানচিত্রে খুঁজতে হয়।”
সুচির চোখ বড় হয়ে উঠল—
“ওরে বাবা! কলকাতার কোলাহল থেকে একেবারে অন্য জগৎ।
গ্রামটা কেমন?”
অভির চোখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল, কণ্ঠে মিশল গর্ব,
“নদী আছে, ধানক্ষেত আছে, আকাশটা এত বড়…কিন্তু খিদে আছে, অপমান আছে।
তবু আমি সেই মাটির গন্ধ নিয়েই বাঁচি।সেই গন্ধই আমাকে এখানে এনে বসিয়েছে।”
সুচি চুপ করে শুনছিল।
তারপর নরম গলায় বলল—
“আপনার ভেতরে আমি একটা আলাদা শক্তি দেখছি।
আমার চারপাশে সবাই শুধু টাকার কথা ভাবে, সাজগোজ, প্রতিযোগিতা…
কিন্তু আপনি যেন একেবারে অন্য।”
অভি এক মুহূর্ত থেমে মৃদু হেসে ফেলল—
,“আপনিও তো অন্য রকম।
আপনার মতো পরিবার থেকে মেয়েরা সাধারণত কফি-শপ, বিদেশ পড়াশোনা, ফেসবুক লাইভে ব্যস্ত থাকে।
কিন্তু আপনি বলছেন—মানুষ গড়তে চান।
সুচি চোখ নামিয়ে নিল, ঠোঁটে সামান্য হাসি—
“হয়তো আমি একটু অন্যরকমই।
ছোট থেকে বস্তির বাচ্চাদের দিকে তাকালে মনে হয়েছে—ওদের ভেতর কত প্রতিভা, অথচ সুযোগ নেই।
আমি চাই ওদের জন্য লড়তে।”
অভি হঠাৎ গভীরভাবে তার দিকে তাকাল।
চোখে ভরপুর শ্রদ্ধা, মিশে আছে অচেনা টান।
অভি ধীরে ধীরে বলো
“আমরা দুই দিক থেকে এলেও…
মনে হয় একই পথে হাঁটছি।”
সুচি এক মুহূর্ত চুপ করে থেকে মাথা নাড়ল।
“হ্যাঁ।
হয়তো এটাই বন্ধুত্বের শুরু।”
দু’জনের মুখে নিঃশব্দ হাসি।
ক্যান্টিনের কোলাহল ম্লান হয়ে গেল,শুধু ভেতরে ভেতরে জন্ম নিল এক অদৃশ্য বন্ধন—
যেটা ধীরে ধীরে বড় গল্পের ভিত্তি হয়ে উঠবে।
ক্যান্টিনের কোণে এখনো ভিড়, হাসি, গল্পের রোল।কিন্তু অভি আর সুচির আলাপ যেন অন্য এক আবহ তৈরি করেছে।
সুচি এক মুহূর্ত চুপ করে অভির দিকে তাকাল—চোখে ভরপুর উষ্ণতা।
মনে হচ্ছিল, ইচ্ছে করলে সে আরও অনেকক্ষণ বসে থাকতে পারে।অভির কথাগুলোতে অদ্ভুত এক শক্তি আছে,
যা তাকে টেনে রাখছিল।
কিন্তু মনে পড়ল—আজও তাকে বস্তিতে যেতে হবে।সেখানে বাচ্চারা অপেক্ষা করছে।
সুচি ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল।
“আজকের আলাপটা আমার ভীষণ ভালো লেগেছে…
কিন্তু এখন আমাকে উঠতে হবে।
বস্তির বাচ্চাদের কাছে যাবার কথা দিয়েছি।”
অভি অবাক হয়ে তার দিকে তাকাল,
“আপনি প্রতিদিন যান?”
“যতটা পারি… ওরা আমার নিজের মতো।পড়াশোনার আলোটা ওদের চোখে জ্বালাতে পারলেই মনে হবে আমি বেঁচে আছি।”
অভি মাথা নাড়ল, চোখে শ্রদ্ধার ঝিলিক,
“আপনি আলাদা… সত্যিই আলাদা।”
সুচি হালকা হেসে অভির দিকে তাকাল।
অভি কিছুক্ষণ থেমে রইল।
তারপর সুচি হাত নেড়ে বিদায় জানাল।
অভি তাকিয়ে রইল তার চলে যাওয়া পথের দিকে— মনে মনে এক অদৃশ্য বন্ধন যেন আরও দৃঢ় হয়ে উঠল।
সন্ধ্যা নামছে। আকাশে অল্প চাঁদের আলো, রাস্তায় ল্যাম্পপোস্টগুলো জ্বলে উঠেছে।সুচি তাড়াহুড়ো করে রিকশা থেকে নামল।বস্তির মোড়েই আজ কেমন যেন অস্বাভাবিক নীরবতা।
সাধারণত এই সময়ে বাচ্চারা হৈচৈ করে খেলাধুলো করে, মায়েরা চুলোর ধোঁয়া তুলতে থাকে।কিন্তু আজ সবাই একজায়গায় জটলা বেঁধেছে।
সুচিকে দেখে বাচ্চারা ছুটে এলো, কিন্তু মুখগুলো অদ্ভুত গম্ভীর।একটি মেয়ে চোখে জল নিয়ে বলল,
“দিদি, শুনেছেন?… আমাদের ঘর যাবে…”
সুচির বুক ধক করে উঠল।
“কী বলছিস?”
একজন বৃদ্ধা সামনে এসে দাঁড়ালেন,
“আজ সকালে কয়েকজন দালাল এসে গেছে।
বলেছে, সাত দিনের মধ্যে সবাইকে জায়গা খালি করতে হবে।এখানে বড় বড় বাড়ী হবে।
যদি না যাই, জোর করে উচ্ছেদ করবে।”
হাহাকার ছড়িয়ে পড়ল ভিড়ের মধ্যে।কেউ কাঁদছে, কেউ চুপচাপ মাথা নিচু করে আছে।
একজন তরুণ বলল,
“প্রতিবাদ করলে ওরা মারধর করবে… পুলিশ-প্রশাসনও ওদের সঙ্গে।”
সুচির শরীর কেঁপে উঠল।
তার মনে পড়ল— সেই স্যুট পরা লোকটা, যাকে সে একদিন বাবার ড্রয়িং রুমে দেখেছিল।
আজ এখানেও এসেছিল তাহলে, মাস্তানদের সঙ্গে সঙ্গে নিয়ে এসেছিল তাহলে!
হৃদয়ে সন্দেহের তীর বিঁধল,
“এত বড় চক্রান্তের পেছনে কি বাবা কোনোভাবে জড়িত?”
সুচি গলার স্বর শক্ত করল।
“তোমরা ভয় পেয়ো না।
আমি আছি তোমাদের সঙ্গে।
যতটা পারি, লড়ব তোমাদের জন্য।”
কিন্তু ভেতরে ভেতরে সে ভীষণ ভেঙে পড়ল।তার চোখের কোণে জল জমলো। সকালের নবীনবরণ উৎসব, অভির সাথে কাটানো ভালো মুহুর্ত গুলো এক নিমেষে কোথায় যেনো হারিয়ে গেলো।
এই বস্তি, যেখান থেকে প্রতিদিন জীবনের হাসি আর টানটান লড়াইয়ের গল্প ভেসে আসে—
আজ চোখে পড়ছে শুধু এক অজানা অন্ধকার।
সুচির বুকের ভেতর হঠাৎ শূন্যতা তৈরি হলো।মনে হচ্ছে সবকিছু যেন হাতের বাইরে চলে যাচ্ছে।
“আমার এতটুকু শক্তি নেই কি?
আমি কি সত্যিই কিছু করতে পারব?”
আজ আর বস্তির বাচ্চাদের মুখোমুখি হতে ইচ্ছে করছে না।যাদের প্রতিদিন নতুন গল্প শোনায়, আঁকতে শেখায়, অক্ষর চিনতে শেখায়—তাদের সামনে দাঁড়ানোর মতো শক্তিই খুঁজে পাচ্ছে না সে।
মনে হচ্ছে যেন জীবনের সব রঙ মুছে গেছে এক নিমেষে।তার মনে শুধু একটা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে,
“এ লড়াই আমি একা পারব তো?”
সন্ধ্যা নেমে গেছে।
রাস্তার বাতিগুলো একে একে জ্বলে উঠছে, গলির মোড়ে দুটো কুকুর খাবারের দখল নিতে উচ্চস্বরে চেঁচিয়ে যাচ্ছে।
হাজারো চিন্তা মাথার ভেতর কিলবিল করছে—বস্তির কান্না, ভয়, আর তার নিজের অসহায়তা।
অবচেতনে মনে হচ্ছিল, এই লড়াইয়ের শিকড় হয়তো তার নিজের বাড়ির ভেতরেই কোথাও লুকিয়ে আছে।
ক্লান্ত, ভারাক্রান্ত মনে গেট খুলে ভেতরে ঢুকল সুচি।দরজার ভেতরে পা রাখতেই থমকে গেল।
ড্রয়িং রুমের বড় ঝাড়বাতির আলোয় বসে আছেন সেই স্যুট পরা লোকটা।সামনে চা, বিস্কুট সাজানো।আর তার বাবা সেন সাহেব গম্ভীর মুখে ব্যবসায়িক ভঙ্গিতে কথা বলছেন।
লোকটার চোখে-মুখে কৃত্রিম হাসি,কিন্তু ভেতরের কুটিলতা যেন লুকোতে পারছে না।
সুচির বুকের ভেতর কেমন হিমশীতল হয়ে গেল,
“এই লোকটাই তো!সেদিন যাকে মাস্তানদের সঙ্গে দেখেছি বস্তিতে…”
এক মুহূর্তের জন্য দিশাহারা হয়ে দাঁড়িয়ে রইল সে।তার মনে হচ্ছিল, সত্যিই কি বাবার ব্যবসার অন্ধকার জাল এই দুঃখী মানুষগুলোর ঘরবাড়ি গ্রাস করতে চাইছে?
বাবা হঠাৎ সুচিকে দেখে ডেকে উঠলেন,
“আরে সুচি, আয় আয়।
এই ভদ্রলোক মিস্টার রায়।
একটা বড় প্রজেক্টের কথা হচ্ছে।”
মিস্টার রায় ভদ্রতাসূচক হাসি দিলেন,
কিন্তু সেই হাসির আড়ালে সুচি স্পষ্ট চিনতে পারল—এই মানুষটাই ওদের ভয় দেখিয়েছে, বাড়ি ছাড়তে বলেছে।
সুচির বুকের ভেতর রাগ, ঘৃণা আর হতাশা মিলেমিশে ঢেউ তুলল।
কিন্তু সে জানত, এখনই কিছু বললে বাবার সামনে চরম অশান্তি তৈরি হবে।তাই মাথা নিচু করে ঘরের বাইরে বেরিয়ে এলো–মনের ভেতরে যেন হাজারটা ঝড় বইতে শুরু করেছে।
সুচি দরজার বাইরে এসে থমকে গেল।মাথা নিচু করে সরাসরি নিজের ঘরে চলে যাওয়ার বদলে সে নিঃশব্দে পা টিপে টিপে এসে দাঁড়াল পর্দার আড়ালে।হৃদয়টা ধকধক করছে—কোনো অচেনা আশঙ্কা তাকে গ্রাস করেছে।
মিস্টার রায়, গলা নিচু কিন্তু চাপা দৃঢ়তায় বলে চলেছেন,
“সেন সাহেব, জায়গাটা দারুণ। একেবারে সোনার খনি।বস্তির ওই জায়গা পরিষ্কার হলে বিশাল কমপ্লেক্স তোলা যাবে।প্রতিটা ফ্ল্যাট হাত বদল হবে লাখে লাখে।”
সেন সাহেব চায়ের কাপ নামিয়ে রাখলেন,
“হুঁ… কিন্তু ওখানে তো অনেক পরিবার থাকে।ওদের সরানো সহজ হবে না।”
মিস্টার রায়ের ঠোঁটে কুটিল হাসি,
“সেটা আমাদের দায়িত্ব।
আমাদের ছেলেরা সামলে নেবে।
কিছু টাকার লোভ দেখালেই অর্ধেক চলে যাবে।আর বাকিদের ভয় দেখাতে বেশি সময় লাগবে না।”
এই কথাগুলো শুনে সুচির বুক হিম হয়ে গেল।তার চোখে ভেসে উঠল কাল রাতের দৃশ্য—
কাঁদতে থাকা মহিলারা, ভীত বাচ্চারা, দিশেহারা তরুণেরা।
বিমল বাবু চুপ করে থাকেন।
মিস্টার রায় নিশ্চিন্ত ভঙ্গিতে বলেন,
“চিন্তা করবেন না। সব ব্যবস্থা হয়ে যাবে।আপনার নাম সামনে আসবে না।আপনি থাকবেন শুধু ‘ইনভেস্টর’।কাগজপত্রে সব আমাদের নামে।”
সুচির মাথা ঘুরে গেল।সে মনে মনে ধরে নিলো—বাবা সরাসরি এই নোংরা খেলায় নেমে পড়েননি ঠিকই,কিন্তু পরোক্ষভাবে সব জানেন, সব মেনে নিচ্ছেন।এই চুপ থাকা, এই নীরব সম্মতি—এটাই তো তাদের ঘরবাড়ি ধ্বংস করার আসল হাতিয়ার!
পর্দার আড়াল থেকে ভেতরে তাকিয়ে থাকতে থাকতে
সুচির চোখ ভিজে উঠল।
তার মনে হচ্ছিল,
“আমি কি তবে সেই লোকের মেয়ে,যার টাকার লোভে অসহায় মানুষগুলোর মাথার ছাদ কেড়ে নেওয়া হচ্ছে?”
বিমল বাবু গম্ভীর হয়ে বসলেন।
চশমাটা টেবিলে রাখলেন ধীরে,
“রায়বাবু, ব্যবসা করার আমি নতুন নই।লাভের অঙ্ক কষতে আমিও পারি।কিন্তু একটা কথা বলি—ওই বস্তির মানুষেরা তো দশকের পর দশক ধরে ওখানে আছে।শুধু ভয় দেখিয়ে বা টাকা ছুঁড়ে দিয়ে তাদের ঘর ভাঙা—
এটা আমি মেনে নিতে পারব না।”
সুচির বুকটা হঠাৎ আলোয় ভরে উঠল।তার চোখ ভিজে উঠল অজান্তেই।যে বাবাকে সে এতক্ষণ সন্দেহ করছিল,
সেই বাবা এবার যেন তার চোখে এক অন্যরকম হয়ে উঠছেন।
মিস্টার রায় একটু চমকে গেল, তারপর হেসে বলল,
“আরে সেন সাহেব, এ তো ব্যবসার নিয়ম।কে কোথায় থাকবে, কোথায় থাকবে না—
এটা বাজার ঠিক করে, মানুষের আবেগ নয়।”
কিন্তু সেন সাহেব এবার দৃঢ় কণ্ঠে বললেন,
“বাজারেরও একটা সীমা আছে, রায়বাবু।আমি সারা জীবন গহনা বেচে মানুষের বিশ্বাস নিয়ে বেঁচেছি।সেই আমিই যদি অসহায় মানুষগুলোর মাথার ছাদ ভাঙার খেলায় নামি,
তাহলে আমার সব অর্জন শূন্য হয়ে যাবে।আমি এই কাজে কোনো টাকা দেব না।”
পর্দার আড়াল থেকে সুচির চোখ জলে ভরে গেল।
মনে হলো,
“হয়তো বাবার ভেতরে এখনও মানবিকতার আলো বেঁচে আছে…”
ড্রয়িং রুমে এক মুহূর্তের নীরবতা নেমে এল।
সেন সাহেবের দৃঢ় কথাগুলো বাতাসে যেন ভারি হয়ে ঝুলে রইল।
মিস্টার রায় সামলে নিয়ে চেয়ারটা একটু এগিয়ে এলেন।
চোখ সরু করে কণ্ঠে কূটবুদ্ধির সুর,
“সেন সাহেব, আবেগ দিয়ে ব্যবসা চলে না। আর বললাম তো আপনার নাম প্রকাশ পাবে না। আপনাকে তো বলছি,
কাগজপত্র সব আমার নামে,
আপনি শুধু টাকা দেবেন আর মুনাফা নেবেন।কোনো ঝামেলায় আপনার নাম আসবেই না।”
সেন সাহেব গম্ভীর মুখে বললেন
“কিন্তু ওই মানুষগুলো?”
মিস্টার রায় হাসতে হাসতে বললেন,
“মানুষ? আরে ওরা কি আসলেই মানুষ, সেন সাহেব?গোটা শহরের চোখে ওরা ‘অবৈধ দখলদার’।আজ আছে, কাল থাকবে না।তাদের জায়গায় উঁচু দালান উঠবে,ফ্ল্যাট কিনতে লাইনে দাঁড়াবে শহরের নামকরা লোকজন।আপনার নাম হবে, সম্মান হবে,তার সাথে কোটি কোটি টাকার খেলাও।”
সেন সাহেব চুপ করে রইলেন।
চোখের ভেতর একটা দ্বিধা স্পষ্ট ফুটে উঠল।
মিস্টার রায় এবার সামনে ঝুঁকে ফিসফিস করে বললেন,
“শুনুন, শহরে এখন অনেক প্রজেক্ট চলছে।সবাই চাইলে সুযোগটা নিয়ে নেবে। আপনি যদি পিছিয়ে যান,এই সুযোগ আর পাবেন না।ভাবুন, আপনার একমাত্র মেয়ের ভবিষ্যৎ—বিদেশে পড়তে যাবে, সম্মান পাবে,সবই তো এই টাকার ওপর দাঁড়িয়ে।”
পর্দার আড়ালে দাঁড়িয়ে সুচির বুকের ভেতর আগুন জ্বলে উঠল।সে যেন শিউরে উঠল—
“আমার স্বপ্নকে পর্যন্ত এই লোক ব্যবহার করছে বাবাকে ফাঁদে ফেলতে!”
সেন সাহেব কোনো উত্তর দিলেন না।চোখেমুখে দোটানার ছাপ,হাতের আঙুলগুলো অন্যমনস্কভাবে চায়ের কাপের কিনারা ছুঁয়ে যাচ্ছিল।
সুচির মনে হচ্ছিল,
“বাবা কি ভেঙে পড়বেন?
নাকি এখনও তার ভেতরে মানবিকতার আলো বেঁচে আছে?”
ড্রয়িং রুমে অস্বস্তিকর নীরবতা নেমে এল।
মিস্টার রায়ের চাপা গলা যেন পুরো ঘরটাকে ঢেকে দিল।
মিস্টার রায় চতুর ভঙ্গিতে বললেন,
“ভাবুন সেন সাহেব… কোটি কোটি টাকা, সম্মান, নাম—
সব একসাথে আপনার হাতে চলে আসবে।একটু দ্বিধা করবেন না, এটা ব্যবসার নিয়ম।”
সেন সাহেব এবার কোনো উত্তর দিলেন না।চোখ স্থির হয়ে রইল টেবিলের ওপর রাখা চায়ের কাপে।আঙুলের ডগা দিয়ে ধীরে ধীরে কাপের কিনারায় ঘুরিয়ে চলেছেন—যেন ভেতরের দ্বন্দ্বটা লুকোতে চাইছেন।
তার নীরবতা ঘরের বাতাসকে আরও ভারি করে তুলল।
মিস্টার রায় হেসে উঠল, আত্মবিশ্বাসে ভরা সেই হাসি,
“চুপ থাকা মানেই সম্মতি, সেন সাহেব।আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন,সব ব্যবস্থা আমি করে নেব।”
সেন সাহেব এবারও কোনো প্রতিবাদ করলেন না।মুখটা গম্ভীর, চোখে ক্লান্ত ছায়া, ঠোঁট শক্তভাবে চেপে ধরা।
কিন্তু তবুও ‘না’ শব্দটা বেরোলো না মুখ থেকে।
পর্দার আড়াল থেকে দাঁড়িয়ে থাকা সুচির বুক ধকধক করতে লাগল।
তার মনে হচ্ছিল,
“এই নীরবতাই কি বাবার সম্মতি? তাহলে বাবার ভেতরের সেই মানবিক আলো কি নিভে গেল?”
চোখে জল এসে ভিজে উঠল,মনে হলো গোটা পৃথিবীটা যেন ধ্বসে পড়ছে।
অবশেষে মিস্টার রায় উঠে দাঁড়াল, হাত মেলাল,
“চিন্তা করবেন না, সেন সাহেব।
সব আমার হাতে ছেড়ে দিন।
খুব তাড়াতাড়ি এই শহরের সবচেয়ে বড় প্রজেক্টের অংশীদার হবেন আপনি।”
দরজা বন্ধ হওয়ার পরও ঘরের ভেতর নিস্তব্ধতা জমে রইল।
সেন সাহেব একা বসে আছেন চুপচাপ।আর পর্দার আড়ালে দাঁড়িয়ে সুচি বুঝতে পারল,
তার জীবনের লড়াই আরও কঠিন হতে চলেছে। সে নিজের ঘরে গিয়ে বিছানায় মুখ গুজলো।
রাত তখন গভীর।
অট্টালিকার বড় ঘরগুলোতে নীরবতা, শুধু ঘড়ির কাঁটা টিকটিক করছে।সুচি চোখে জল নিয়ে ধীরে ধীরে ঠাকুমার ঘরের দিকে এগোল।
কাঠের দরজাটা ঠেলতেই ভেতর থেকে মৃদু আলো বেরোল।
ঠাকুমা তখন বিছানায় বসে রামায়ণ পড়ছিলেন।
সুচিকে দেখে তিনি বই বন্ধ করে বললেন,
“কি রে, এই রাত্তিরে? চোখটা লাল কেন?”
সুচি দৌড়ে গিয়ে ঠাকুমার কোলে মুখ গুঁজে দিল।
গলা ভারী হয়ে এল,
“ঠাম্মি… আমি সব শুনলাম।
ওই লোকটা—মিস্টার রায়,
বস্তি ভাঙার কথা বলতে এসেছিল বাবাকে।
আর বাবা… কিছুই বললেন না।
না বলেননি, চুপ করে রইলেন।
এই নীরবতা কি মানে দাঁড়াল না, ঠাম্মি?”
ঠাকুমা এক হাত দিয়ে সুচির মাথা টিপে দিলেন।
মৃদু কণ্ঠে বললেন,
“চুপ থাকা সবসময় মানে রাজি হওয়া নয় রে, মা। কখনো কখনো মানুষ ভেতরে দ্বন্দ্বে পড়ে যায়।তোর বাবা ব্যবসাদার, কিন্তু সে যে আমার ছেলে।
সেই মানুষটার ভেতরে যে মানবিকতা আছে, তা একদিন জেগে উঠবেই।”
সুচি মাথা তুলে কাঁপা গলায় বলল,
“কিন্তু যদি না জাগে?
যদি টাকার লোভে উনি ওদের মাথার ছাদ ভেঙে দেন?
ওরা তো কোথাও যাবে না ঠাম্মি… তাদের ভবিষ্যৎ?”
ঠাকুমা দীর্ঘশ্বাস ফেলে জানলার দিকে তাকালেন।
রাতের আকাশে একফালি চাঁদ,
“তাহলে তুই লড়বি, সুচি।মানুষের পাশে দাঁড়ানোর সাহস যদি থাকে,তাহলে বাবার বিপরীতেও দাঁড়াতে হবে।
মনে রাখ, সংসারে আমি একদিন একই দ্বন্দ্ব দেখেছি।
তোর দাদুর ব্যবসার লোভে কত অন্যায় কাজ আমার চোখের সামনে হয়েছে,কিন্তু আমি নীরব থেকেছি, সংসার বাঁচানোর তাগিদে।আজও সেই নীরবতার জন্য অনুতাপ করি। তুই যেন আমার মতো ভুল না করিস।”
সুচির বুক কেঁপে উঠল।
ঠাকুমার হাত শক্ত করে ধরে বলল,
“তাহলে আমি একাই লড়ব, ঠাম্মি?”
ঠাকুমা চোখ ভিজে গিয়ে হাসলেন,
“না রে মা, আমি তোকে আছি,
আর মানুষ যদি সত্যিই তোর পাশে দাঁড়ায়,তাহলে একা শব্দটার কোনো মানে নেই।”
সুচির চোখে দৃঢ়তার ঝিলিক জ্বলে উঠল।আজ যেন সে নিজের প্রথম যোদ্ধার পাঠ পেল।
সকালবেলাটা সুচির কাছে সবসময় নতুন আশার মতো।
বারান্দার কোণে বসে চায়ের কাপ হাতে বস্তির দিকে তাকিয়ে থাকা, এটাই ছিল তার প্রতিদিনের প্রিয় অভ্যাস।কিন্তু আজ যেন আকাশের আলোও মলিন।
চায়ের স্বাদ বিস্বাদ লাগছে, মনে হচ্ছে কাপটা যেন কাঁচের বদলে ভারি পাথরের।গত রাতের দৃশ্যগুলো বারবার ফিরে আসছে মনে—
মেয়েদের কান্না, ছেলেদের অসহায় প্রতিবাদ, দালালদের হুমকি।আর সেই স্যুট পরা লোকটা… বাবার সঙ্গে দেখা হওয়া মানুষটা।
যে সকালটা প্রতিদিন তাকে হাসি এনে দিত,
আজ সেটাই অদ্ভুত বিস্বাদ আর দিশাহারার মতো লাগছে।
সুচি বিছানার ধারে বসে থাকল—বইয়ের পাতা খোলা, কিন্তু চোখ সেখানে নেই।
সকালবেলায় আবার বস্তিতে পা রাখল সুচি। আজ কলেজে যেতেও ইচ্ছা করছে না।
কাল রাতের ঘটনার পর মনে হচ্ছিল অন্তত সকালের আলোয় হয়তো কিছুটা স্বস্তি মিলবে।
কিন্তু না—এখানকার পরিবেশ আরও ভারী হয়ে আছে।
চৌকাঠে বসা মহিলাদের চোখ লাল কান্নায়,পুরুষেরা চুপচাপ বিড়ি টানছে, মুখে অসহায়তার ছাপ।শিশুরা খেলছে ঠিকই, কিন্তু তাদের হাসিতে আজও যেন অদ্ভুত শূন্যতা।
সুচির বুকের ভেতরটা হু-হু করে উঠল।সে ভেবেছিল বাচ্চাদের পড়াতে গিয়ে মনটা হালকা হবে,
কিন্তু আজ যেন বইখাতা খোলার শক্তিই পাচ্ছে না।
মেয়েরা তাকে ঘিরে দাঁড়াল, কেউ আশায়, কেউ ভয়ে।
একজন তরুণী বলল,
“দিদি, আপনারা তো বড়লোক, কিছু একটা করবেন না?
আমাদের কি সত্যিই বাড়িঘর ছেড়ে দিতে হবে?”
প্রশ্নটা যেন সুচির বুক ভেদ করে গেল।সে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল, তারপর ধীরে বলল,
“আমি আছি তোমাদের সঙ্গে… কিন্তু…”
কথাগুলো গলায় আটকে গেল।
চারপাশের কান্না, দুশ্চিন্তা আর আতঙ্ক যেন তাকে গ্রাস করছিল।এমনকি বাচ্চাদের চোখেও এখন অস্থিরতা—
যারা প্রতিদিন অক্ষর আঁকতে বসে খিলখিল করে হাসত,
তারা আজ গুমরে আছে।
সুচির ভেতরে ভেতরে কেমন অদ্ভুত ভয় কাজ করতে লাগল।
মনে হচ্ছিল, এই সংগ্রাম তার সাধ্যের বাইরে।আজ বাচ্চাদের পড়ানো দূরে থাক,নিজেকেই সামলানো দায় হয়ে দাঁড়াল।
সে হঠাৎ মনে মনে বলল,
“এ লড়াই একা আমি পারব না… কারও পাশে দাঁড়াতে হবে।”
সেদিন বিকেল। কলেজের ক্লাস শেষ হয়েছে।ক্যান্টিনের ভিড় এড়িয়ে সুচি একাই বারান্দার ধারে দাঁড়িয়ে ছিল।
মনে হচ্ছিল, বুকের ভেতরটা যেন পাথরের মতো ভা গুরী হয়ে আছে।
ঠিক তখনই দেখল, অভি হাতে কয়েকটা পুরোনো বই নিয়ে করিডোর দিয়ে হাঁটছে।চোখে ক্লান্তি থাকলেও মুখে সেই চিরচেনা দৃঢ়তা।
সুচি নিজেকে আর আটকাতে পারল না। ডেকে উঠল,
“শুনুন… একটু দাঁড়াবেন?”
অভি অবাক হয়ে থেমে গেল।
চোখে প্রশ্ন,
“হ্যাঁ, কিছু বলবেন?”
সুচি হালকা হাসল, কিন্তু সেই হাসি চাপা দুঃখে মলিন।
কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
“আপনি সবসময় এত দৃঢ় থাকেন কিভাবে?যেন কোনো ভয়ই আপনাকে স্পর্শ করে না।”
অভি মৃদু হেসে বলল,
“ভয় তো হয়, তবে ভয় পেলে চলবে না।*
একটু থেমে বলল,
“আমি তো শূন্য হাতে এসেছি এখানে,ভরসা শুধু নিজের যোগ্যতা আর মনের শক্তি।
যদি সেটাকেও হারাই, তাহলে আর কিছুই থাকবে না।”
এই দৃঢ়তা সুচির ভেতরের বাঁধ ভেঙে দিল।
সে নিচু গলায় বলল,
“কাল রাতে একটা কথা শুনে…
আমার ভেতরটা ভেঙে গেছে।
আমাদের বাড়িতে যে লোকটা এসেছিল—সে বস্তি ভাঙার পরিকল্পনা করছে।
আর… আমার বাবা কিছু বললেন না।
না রাজি, না অরাজি—শুধু নীরবতা।আমি ভয় পাচ্ছি অভি,
আমার নিজের পরিবারই হয়তো তাদের মাথার ছাদ ভেঙে দেবে।”
অভি চমকে উঠল।
কিছুক্ষণ চুপ করে গভীরভাবে সুচির দিকে তাকাল।
আস্তে আস্তে বলল,
“আপনি নিজের বাবার বিরুদ্ধে কথা বলতে পারছেন—
এটাই প্রমাণ, আপনি ওদের মতো নন।আপনার মনের শক্তিটাই আপনাকে আলাদা করে রেখেছে। আপনি যদি সত্যিই চান,তাহলে এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারবেন।”
সুচির চোখ ভিজে উঠল, কিন্তু ঠোঁটে একটুখানি দৃঢ় হাসি ফুটল।
“আমি একা পারব তো?”
অভি চোখ সরাসরি তার চোখে রাখল।ও,
“একজন মানুষও যদি সত্যি হয়ে লড়ে,সে একা নয়।
কারণ সত্যি কখনও একা থাকে না।”
সূচি হঠাৎ করে বলে উঠলো,
” আপনি আমার পাশে থাকবেন তো?”
সেই মুহূর্তে তাদের মাঝে এক অদৃশ্য বন্ধনের শুরু হলো—যেন দু’জন মানুষ একই যুদ্ধে নামতে চলেছে, একজনের ভয় আরেকজনের সাহসে গলে যাচ্ছে।
অভি কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তার চোখে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল দোটানা—ক্লাস, টিউশন, মেসের দায়িত্ব।এসবের ভেতরেও
সুচির বলা কথাগুলো তার ভেতরকে কাঁপিয়ে দিয়েছে।
অবশেষে দৃঢ় গলায় বলল,
“আপনার যদি আপত্তি না থাকে, আমি আপনার সঙ্গে বস্তিতে যেতে চাই।বইয়ে তো অনেক ইতিহাস পড়েছি, অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের কাহিনি।
কিন্তু এখন বুঝতে পারছি, সত্যিকারের লড়াই বইয়ের পাতায় নয়,মানুষের জীবনের ভেতরে।”
সুচি অবাক হয়ে তার দিকে তাকাল।চোখে আনন্দের আভা ফুটে উঠল,যেন প্রথমবার সে কাউকে পেল যে সত্যিই তার অনুভূতি বুঝতে চাইছে।
সুচি মৃদু হেসে বলল,
“আপনার মতো একজন মানুষের যদি পাশে পাই,
তাহলে হয়তো আমি একা হব না।”
অভি মাথা নেড়ে বলল,
“আমরা সবাই একা শুরু করি,
কিন্তু সত্যি যদি থাকে,
পথে অনেকেই যোগ দেয়।
চলুন, আমরা যাই।”
সুচির চোখে কৃতজ্ঞতার আলো জ্বলে উঠল।সে মনে মনে প্রতিজ্ঞা করল–আজ থেকে শুধু নিজের স্বপ্নের জন্য নয়,
এই মানুষেরও পাশে দাঁড়াবে,
যে প্রথম দিন থেকেই তাকে সাহসের পাঠ দিচ্ছে।
বিকেলের ম্লান আলোয় শহরের কোলাহল পেরিয়ে, সরু গলির শেষে বস্তিতে এসে ঢুকলো ওরা দুজন।আজকে বাচ্চারা খেলছে না, মহিলারা নির্ভারভাবে গল্প করছে না—মুখে চাপা ভয়, চোখে অনিশ্চয়তা।
সুচি আর অভি যখন ভেতরে ঢুকল,মানুষজন একটু অবাক হলেও, চোখে একটুখানি স্বস্তি ফুটল।যেন সুচির ফিরে আসা মানে তাদের পাশে কেউ আছে।অভি চারদিকে তাকিয়ে নিঃশব্দে সব দেখছিল। কাঁচা ঘর, টালির চাল ভাঙা, হাওয়ায় পলিথিন কাঁপছে।তার বুকের ভেতর অদ্ভুত কষ্ট জমে উঠল।
রত্না মাসি এগিয়ে এসে কাঁপা গলায় বলল,
“মা, এবার আমাদের বাঁচাবি তো?ওরা বলছে সাত দিনের মধ্যে না গেলে সব ভেঙে দেবে…”
সুচি রত্না মাসির হাত ধরলো, মাসির শয্যাশায়ী স্বামীর মুখটা ভেসে উঠলো, চোখ ভিজে গেলেও দৃঢ় গলায় বলল,
“না গো মাসি, কেউ তোমার ঘর ভাঙতে পারবে না। আমি আছি।আমরা আছি।”
অভি এবার এগিয়ে এল।প্রথমবার, সে শুধু শ্রোতা থাকল না,নিজেকে ভেতর থেকে দায়বদ্ধ মনে হলো।
অভি গম্ভীর গলায় বলল,
“আপনারা ভয় পাবেন না।যতদিন আমরা আছি,এই বস্তি কেউ ভাঙতে পারবে না।আমাদের সঙ্গে সত্য আছে—
সত্য কখনো পরাজিত হয় না।”
তার কণ্ঠস্বর ভিড়ের ভেতর অদ্ভুত আগুন ছড়িয়ে দিল।
যারা এতদিন ভয়ে চুপ ছিল,তাদের চোখে সাহসের এক টুকরো ঝলক দেখা দিল।
কোথাও থেকে একজন যুবক বলে উঠল,
“তাহলে আমরাও একসাথে দাঁড়াবো!চুপ করে থাকলে কেউ আমাদের বাঁচাবে না।”
সুচি অভির দিকে তাকাল।দুজনের চোখে একই দৃঢ়তার প্রতিফলন।আজকের এই সন্ধ্যা—তাদের জীবনে শুধু একটা মুহূর্ত নয়,এটাই প্রথম প্রতিরোধের বীজ বপন।
আলো নিভে এসেছে।বস্তির ভেতর টালির চালের ফাঁক দিয়ে কুপকুপে বাতাস ঢুকছে।
সুচি আর অভির কথায় লোকজন একটু সাহস পাচ্ছিল,
ঠিক তখনই হঠাৎ গলির মুখে হইচই,
“আরে দাঁড়া, সবাই বেরো যা!”
প্রচণ্ড আওয়াজে ঢুকল স্থানীয় মাস্তান গোপাল আর তার লোকজন।দশ–বারোটা ছেলে, হাতে লাঠি, চোখে আগুন।
বাচ্চারা মায়ের আঁচলে মুখ গুঁজে কেঁপে উঠল।পুরুষরা ভয়ে পিছিয়ে গেলেও দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে।
গোপাল দাঁত চেপে চেঁচিয়ে উঠল,
“শোন, সাত দিনের সময় দিয়েছি।এরপরও যদি কেউ এখানে থাকে,নিজের দায় নিজে নিতে হবে।এখানে বড় কমপ্লেক্স হবে—বুঝেছ?”
চারপাশে সুনসান নীরবতা।কেউ উত্তর দিতে সাহস পেল না।ঠিক তখনই সুচি এগিয়ে এলো সামনে।চোখে ভয় নেই, কণ্ঠে দৃঢ়তা।
“এই মানুষগুলো কোথায় যাবে?
তাদের মাথার ছাদ ভাঙলে, বাচ্চাদের রাত কাটবে কোথায়? মানুষকে গায়ের জোরে উচ্ছেদ করা যায় না।”
গোপাল তাচ্ছিল্যের হাসি দিল।
“ও মা, সেন সাহেবের মেয়ে নাকি!তুই যদি এতই দয়া করিস, তবে সবাইকে তোর বাড়িতে নিয়ে যা।”
অভির বুক তখন আগুনের মতো জ্বলছিল।সে ধীরে ধীরে সামনে এসে দাঁড়াল সুচির পাশে।
গভীর কণ্ঠে বলল,
“এই বস্তির এদের ঘর।যতদিন আমরা আছি,এই ঘরগুলো ভাঙতে পারবে না।”
গোপাল রাগে লাল হয়ে উঠল।চোখ ছোটো করে অভির দিকে তাকাল,
“কে রে তুই? পুঁচকে ছেলে হয়ে এত বড় কথা বলিস?”
অভি শান্ত কিন্তু দৃঢ় স্বরে উত্তর দিল,
“আমি মানুষ।যে অন্যায়ের সামনে মাথা নোয়ায় না।”
চারপাশে নিস্তব্ধতা নেমে এল।
মাস্তানরা হুঙ্কার দিলেও, লোকজন এবার ফিসফিস করতে শুরু করল,
“না, আমাদের ভয় পাওয়া উচিত নয়।”
“ওরা ঠিক বলছে, আমরা একসাথে দাঁড়াবো।”
সুচি অভির দিকে তাকাল। চোখের ভাষায় বলার চেষ্টা করলো,
আজ শুধু প্রতিরোধের কথা নয়,আজ তা বাস্তবের আকার নিতে শুরু করছে যেনো।
গোপাল গলা চড়িয়ে আবারও চেঁচাচ্ছিল,
“চুপচাপ না গেলে মাথা ভাঙব!
এখানে আর তোমাদের থাকার জায়গা নেই—বুঝেছ?”
চারপাশে লোকজন ভয়ে কেঁপে উঠছিল।তখনই হঠাৎ ভিড়ের ভেতর থেকে এগিয়ে এলো চৌদ্দ–পনেরো বছরের এক কিশোর—বাবু।
হাত মুঠো করে দাঁড়িয়ে সে কাঁপা গলায়, কিন্তু দৃঢ়ভাবে বলল,
“এটা আমাদের ঘর! আমরা কোথাও যাব না।আমার মা দিনরাত কাজ করে এই চালের ঘর বানিয়েছে,এটা ভাঙতে দেব না!”
গোপাল থমকে গেল। মাস্তানদের ভিড় হঠাৎ থমথমে হয়ে উঠল।
গোপাল চোখ কুঁচকে বলল,
“আরে! এই ছোঁকরা আমায় শেখাচ্ছে? বড্ড বেশি উড়তে শিখেছিস দেখছি।তোর মতো ছেলেকে এখনই—”
সে এগিয়ে আসতেই সুচি ঝাঁপিয়ে বাবুর সামনে দাঁড়াল।
“ওকে হাত দেবেন না। ওর কণ্ঠস্বর আমাদের কণ্ঠস্বর।
আপনারা যত ভয় দেখান, এই ছেলেগুলোই আগামী দিনে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াবে।”
অভিও পাশে দাঁড়িয়ে বলল,
“শুনে রাখুন, ভয় দেখিয়ে কাউকে চুপ করানো যায় না।
আজ যদি এই বাবু কথা বলে, কাল আরও অনেকেই বলবে।”
লোকজনের ভিড়ের মধ্যে হঠাৎ কয়েকটা আওয়াজ উঠল,
“ঠিক বলেছে! আমরা আর ভয় পাব না।”
“আমাদের ঘর আমরা ছাড়ব না!”
গোপাল রাগে দাঁত চেপে চেঁচিয়ে উঠল,
“তোরা খুব বড় বড় কথা বলছিস!দেখাই তোকে কী হয় যখন গোপালের সামনে কেউ দাঁড়ায়।”
সে লাঠি উঁচিয়ে সরাসরি বাবুর দিকে ছুটে গেল।ভিড়ের মানুষজন আতঙ্কে পিছিয়ে গেল।মুহূর্তের মধ্যে লাঠি বাবুর মাথায় পড়তে যাচ্ছিল,ঠিক তখনই সুচি ঝাঁপিয়ে বাবুর সামনে দাঁড়াল।
এক ভয়ংকর শব্দ—
ধপ!
লাঠির বাড়ি সোজা সুচির কপালের পাশে লাগল।
সে দুলে উঠল, চোখে অন্ধকার নেমে এলো,আর মুহূর্তের মধ্যে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল।
“দিদি… দিদি…!”
বাবু চিৎকার করে কেঁদে উঠল।
অভি প্রথমে স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল।অভির চোখ মুহূর্তেই রক্তবর্ণ হয়ে উঠল।বুকের ভেতর আগুনের মতো ছড়িয়ে গেল ক্ষোভ।চোখ লাল হয়ে উঠল, কপালে রক্ত চেপে গেল।সে এগিয়ে গিয়ে সুচিকে কোলে তুলে নিল,চোখ দিয়ে আগুন ঝরছে।
অভি গর্জে উঠল,
“তুই একটা কাপুরুষ! নিরস্ত্র মেয়ের ওপর হাত তোলে যারা,তারা কোনোদিন মানুষ হতে পারে না।”
গোপাল তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে বলল,
“যারা আমাদের পথে দাঁড়াবে, এভাবেই বেঘোরে মরতে হবে।”
এবার যেনো অভির সব ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেলো।সে আর কিছু না ভেবে ঝাঁপিয়ে পড়ল গোপালের ওপর।
গর্জে উঠলো সে,
” তোকে আমি ছাড়বো না। “
গোপাল কিছু বুঝে ওঠার আগেই অভি তার কলার চেপে মাটিতে ফেলে দিল।দু’ঘুষি পড়তেই গোপালের মুখ দিয়ে রক্ত বেরোল।মাস্তানদের দল হতভম্ব হয়ে গেল,
যে ছেলেটাকে তারা নিরীহ, গোবেচারা ভেবে হাসছিল,
সে যেন এবার আগুন হয়ে উঠেছে।
অভির চিৎকার কাঁপিয়ে দিল বস্তির বাতাস,
“এই রক্ত দেখছিস? এটা একটা মেয়ের রক্ত—যে লড়ছে তোমাদের মতো অসভ্যদের বিরুদ্ধে।আজ থেকে এই বস্তি আর চুপ করে থাকবে না।যদি এক কদম এগোতে চাস,
আমাদের সবার শরীরের ওপর দিয়েই যেতে হবে!”
একটা লাঠি সপাটে এসে পড়ল অভির মাথায় ,দর দর করে রক্ত ঝরছে গাল বেয়ে,অভি একটু বেসামাল হলো। সেই সুযোগে গোপাল নিজেকে ছাড়িয়ে নিল।
এদিকে চারপাশে ভিড় থেকে এবার আওয়াজ উঠতে শুরু করল,
“না, এটা আমরা হতে দেব না!”
“এবার সবাই একসাথে দাঁড়াও!”
দু–একজন যুবক পাথর কুড়িয়ে নিল হাতে,মহিলারা বাচ্চাদের আড়াল করে সামনে দাঁড়িয়ে পড়ল।লোকজনের চোখে ভয় নয়, জ্বলে উঠল প্রতিরোধের আগুন।
গোপাল হঠাৎ বুঝল,আজ এই মেয়েটির রক্ত বস্তির মানুষকে চুপ করাতে নয়,বরং জাগিয়ে তুলতে সাহায্য করেছে।গোপালের চোখে আগুন, কিন্তু কণ্ঠে স্পষ্ট ভয়ের আভাস,
“ঠিক আছে… আজ বেঁচে গেলি।
কিন্তু মনে রাখিস—এই লড়াই তোরা টিকতে পারবি না।”
সে তার লোকজনকে নিয়ে গলি ছেড়ে বেরিয়ে গেল।
অভি হাঁপাতে হাঁপাতে সুচির দিকে দৌড়ে গেলো।মাটিতে অচেতন অবস্থায় পড়ে আছে সুচি। অভি তার মাথা কোলে তুলে নিল,চোখে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে, নিজের রক্তে জামা ভিজে গেছে সে খেয়াল নেই তার।
“সুচি… চোখ খোলো।
তুমি হার মানতে পারো না… তুমি আমাদের ভরসা।”
বাবু ও বস্তির আরও কয়েকজন দৌড়ে এলো।এবার তারা ভয় পেয়ে নয়,প্রথমবার একসাথে দাঁড়িয়ে বলল,
“চলুন, হাসপাতালে নিয়ে যাই দিদিকে!”
অভি মাথা নেড়ে বলল,
“হ্যাঁ, কিন্তু মনে রেখো, আজকের এই রক্ত আমাদের সবাইকে জাগিয়ে দিয়েছে।এটা শুধু আঘাত নয়, এটাই আমাদের লড়াইয়ের শপথ।”
বাবু কান্নায় ভেঙে পড়েছে,
“দাদা,তোমার মাথাতেও তো চোট লেগেছে।”
অভি পরণের জামাটা খুলে ভালো করে মাথায় বেঁধে নিলো। কপাল থেকে রক্ত গড়িয়ে গলায় নামছে।তার দুই হাত তখনও শক্ত করে আঁকড়ে আছে অচেতন সুচির শরীর।
অভি শ্বাস নিতে নিতে বলল,
“না… আমি থামব না।ওকে হাসপাতালে নিয়ে যেতেই হবে…”
বাবু তাড়াতাড়ি দৌড়ে এলো,
তার সাথে আরও কয়েকজন ছেলে।
“ দাদা তুমি একা পারবেন না। আমরাও আছি।”
মিলেমিশে তারা অভিকে সহায়তা করতে লাগল।কেউ সুচিকে ধরে, কেউ অভির পাশে কাঁধ দিল।রক্তাক্ত শরীর নিয়ে অভি দাঁতে দাঁত চেপে এগোতে লাগল রাস্তার দিকে।
চারপাশের মানুষ ফিসফিস করছিল,
“এ ছেলে নিজের রক্ত ঝরিয়ে দিদিকে বাঁচাচ্ছে…”
“এরা সত্যিই আলাদা…”
রাস্তার মোড়ে একটা অটো রিকশা থামানো হলো। অভি কাঁপা গলায় বলল,
“চল, দ্রুত… হাসপাতালে।”
অটো ছুটে গেল কলকাতার ব্যস্ত রাস্তায়।চারপাশে সন্ধ্যার আলো আর শহরের কোলাহল,কিন্তু তার ভেতরে শুধু রক্ত, ভয় আর অদম্য লড়াইয়ের শপথ।
সুচি অচেতন।
অভির চোখে অন্ধকার নেমে আসছে,কিন্তু তার হাতের মুঠোয় শক্ত করে ধরা আছে সুচির হাত।
অভি মৃদুস্বরে, যেন নিজেকেই বলছে,
“তুমি বাঁচবে, সুচি…
আমরা একসাথে এই লড়াই জিতব।”
কলেজ স্ট্রিটের সরকারি হাসপাতালে তখন হৈচৈ। অভি ও বাবুর সাথে আরও কয়েকজন ছেলেই অচেতন সুচিকে নিয়ে ঢুকেছিল।ডিউটি ডাক্তার দ্রুত প্রাথমিক চিকিৎসা শুরু করলেন।
হঠাৎ করেই হাসপাতালের করিডোর কাঁপিয়ে উঠল পরিচিত কণ্ঠস্বর,
“সুচি! আমার মেয়ে কোথায়?”
সেন সাহেব ছুটে এলেন, তার সাথে মালবিকা দেবী আর ঠাকুমা।পিছনে আরও কয়েকজন আত্মীয় আর বাবার ব্যবসার লোকজন।
মালবিকা ছুটে গিয়ে মেয়ের রক্তমাখা কপাল দেখে ফুঁপিয়ে উঠলেন,
“হে ভগবান! আমার মেয়ে…”
সেন সাহেবের মুখ শক্ত, কিন্তু চোখ কেঁপে উঠছে। তিনি ডাক্তারকে চিৎকার করে বললেন,
“কী অবস্থা? এক্ষুনি ওকে বাঁচান!”
ডাক্তার একটু দ্বিধা করে বললেন,
“মাথায় গভীর আঘাত।আমরা যতটা পারছি করছি, কিন্তু আমাদের এখানে নিউরো সার্জন নেই এই মুহূর্তে। রোগীকে দ্রুত পিজি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া দরকার।”
সেন সাহেব এক মুহূর্ত দেরি করলেন না।মোবাইলে ফোনে নির্দেশ দিলেন,
“অ্যাম্বুলেন্স তৈরি করো,তাকে এখনই শহরের সবথেকে বড় বেসরকারি সিটি হাসপাতাল নিয়ে যাওয়া হবে।”
অ্যাম্বুলেন্সে ওঠানোর সময় অভি এগিয়ে এলো।তার নিজের গায়ের রক্ত তখনও শুকোয়নি,
কপালে গভীর কাটা দাগ।তবু সে সুচির হাত ধরে ছিল শক্ত করে।
অভি নিচু গলায় বলল,
“ওকে ছেড়ে দেব না… ওর পাশে থাকতে দিন।”
মালবিকা থমকে গেলেন।এক মুহূর্তের জন্য তাঁর চোখে ভেসে উঠল কৃতজ্ঞতা।
কিন্তু সেন সাহেব গম্ভীর গলায় বললেন,
“ তোমাকে আর দরকার নেই।
এখন থেকে আমার মেয়ে আমার দায়িত্ব।”
চলো, অ্যাম্বুলেন্স চালাও!”
অভি স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল,
তার চোখে জল জমে উঠল,
তবু ঠোঁট শক্ত করে বন্ধ রাখল।
শুধু ফিসফিস করে বলল,
“তুমি বাঁচো, সুচি… এটাই আমার প্রার্থনা।”
অ্যাম্বুলেন্স ছুটে গেল রাতের অন্ধকারে।অভি আর বাবু হাসপাতালের ফটকে দাঁড়িয়ে থাকল।চারপাশে বস্তির কয়েকজন মানুষ হাত জোড় করে প্রার্থনা করছে,
“ওই মেয়ে তো আমাদের মেয়ের মতোই…ও যদি বাঁচে, তবে আমরাও বাঁচব।”
অ্যাম্বুলেন্সটা বেরিয়ে যাওয়ার পর অভি হঠাৎ দুলে উঠল।তার চোখে অন্ধকার নেমে এল,শরীর ভারী হয়ে আসছিল। এতক্ষণ সুচির হাত ধরে ছিল সে, যেনো এক অজানা শক্তি ভর করেছিল তাকে।
বাবু চিৎকার করছে,
“অভি দা ! অভি অভি দা!”
বাবুর গলার আওয়াজ টা আস্তে আস্তে ক্ষীণ হয়ে এলো,অভি আর দাঁড়াতে পারল না, ফুটপাতেই ঢলে পড়ল।কপালের ক্ষত থেকে আবার রক্ত বেরোতে লাগল।
বাবু দ্রুত ছুটে গিয়ে কয়েক জনকে ডাকল।তারা সবাই মিলে অভিকে সরকারি হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিয়ে এলো।
ভর্তি প্রক্রিয়া করতে গিয়ে নার্স ভ্রূ কুঁচকে জিজ্ঞেস করল,
“ওর বাড়ির লোক কই?”
বাবু লজ্জিত গলায় বলল,
“দাদা তো গ্রাম থেকে এসেছে, মেসে থাকে,তাই আমরা-ই এখন ওর লোক।”
ডাক্তার এসে ক্ষত পরীক্ষা করলেন।গম্ভীর মুখে বললেন,
“গভীর কাটা, অনেক রক্ত বেরিয়েছে।তাকে এখনই সেলাই করতে হবে।শরীর দুর্বল হয়ে পড়েছে।”
অভিকে একটা নোংরা পর্দা ঘেরা বেডে শুইয়ে দেওয়া হলো।পাশের দেয়াল ফাটল, বাতাস শীতল, চারপাশে সীমিত আলোর ঝলক।কোনো ঝলমলে যন্ত্র নেই,কেবল মানুষের সহানুভূতি আর হাতের তাপ।
বাবু তার হাত ধরে বসে আছে।
অভির চোখ আধবোজা, তবু ঠোঁটে ফিসফিস,
“সুচি… তুমি বাঁচবে… আমি আছি…”
বাবুর চোখ ভিজে গেল।
সে মাথা নিচু করে বলল,
“দাদা, তুমি-ও আছো।আমরা তোমাকে কিছু হতে দেব না।
ডাক্তার এসে বললেন,
“ওনাকে ভর্তি করা হচ্ছে।তবে অনেক রক্ত বেরিয়ে গেছে , এখুনি রক্ত দিতে হবে, ডোনার লাগবে।”
বস্তির সব ছেলেরা সমস্বরে চেঁচিয়ে উঠলো,
“আমি রক্ত দেবো।”
ওদিকে সিটি হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সামনে এম্বুলেন্স টা সাইরেন বাজিয়ে এসে দাঁড়ায়। এ যেনো এক অন্য পরিবেশ ঝলমলে আলো, আধুনিক যন্ত্রপাতি ,ডাক্তাররা তৎপর, নার্সরা চুপচাপ চলাফেরা করছে।
সুচি কে অ্যাম্বুলেন্স থেকে নামতেই অ্যাডমিশন শুরু।
মালবিকা দেবী মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে বলছেন,
“হে ভগবান, তুমি আছো তো?”
সেন সাহেবের চোখে উদ্বেগ,
কিন্তু মুখে দৃঢ়তা।
“সব ঠিক হবে”
বলে তিনি ডাক্তারদের দিকে ইঙ্গিত করলেন।
ডাক্তাররা অপারেশন রুমের দিকে দ্রুত এগিয়ে গেলো।
সবকিছু শৃঙ্খলাবদ্ধ,প্রতিটি মুহূর্ত নজরদারিতে।সুচির জীবন বাঁচাতে সব প্রযুক্তি ব্যবহার হচ্ছে। অপারেশন থিয়েটারের লাল আলো জ্বলে উঠল।
মালবিকা ঠাকুরের নাম জপতে লাগলেন।চোখে জল জমে উঠছে, ঠোঁটে কেবল একই কথা,
“আমার মেয়ে তো কখনো কারও খারাপ চায়নি…ও শুধু মানুষকে সাহায্য করতে চাইত…
তাহলে কেন ওর সঙ্গে এমন হলো?”
ঠাকুমা স্নেহভরা গলায় বললেন,
“শান্ত হও মালবিকা।ভালো মানুষের জীবনে দুঃখ এলেও,
ওরা লড়াই করে জেতে। আমার নাতনি লড়াই হেরে যাবে না।”
সেন সাহেব নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে আছেন।চোখে অদ্ভুত চাপা যন্ত্রণা,কিন্তু তিনি কাঁদছেন না।
মাথা নিচু করে শুধু নিজের মনে বললেন,
“সুচি, তুই সুস্থ্য হয়ে ওঠে মা…
আমি প্রতিজ্ঞা করছি…যা কিছু অন্যায় দেখেছি, প্রশ্রয় দিয়েছি, সেই পথে আর হাঁটব না।”
করিডোরে নিস্তব্ধতা।
ঘড়ির কাঁটা যেন থেমে গেছে।
প্রতিটি মিনিট যেন একেকটা দীর্ঘ যন্ত্রণার মতো।
হঠাৎই অপারেশন থিয়েটারের লাল আলো নিভে গেল। দরজাটা খুলে গেলো।
সবার নিশ্বাস আটকে গেছে যেনো।
বেরিয়ে এলেন সাদা অ্যাপ্রন পরা ডাক্তার, চোখে ক্লান্তি কিন্তু ঠোঁটে এক আশ্বাসজনক হাসি।
সবাই একসাথে ছুটল তার দিকে।
“অপারেশন সফল হয়েছে।
বেশি রক্তক্ষরণ হয়েছিল, তবে আমরা সামলে নিতে পেরেছি।
এখনই বড় কোনো বিপদ নেই…
তবে মেয়েটিকে দীর্ঘ বিশ্রামে থাকতে হবে।পরের ২৪ ঘণ্টা পর্যবেক্ষণে রাখছি।”
মালবিকা দেবী হঠাৎ হাতজোড় করে ডাক্তারকে প্রণাম করলেন।
চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে, কণ্ঠ কাঁপছে,
“আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ ডাক্তারবাবু… আপনি আমার মেয়েকে ফিরিয়ে দিলেন।”
ঠাকুমা গভীর নিঃশ্বাস ফেলে বললেন,
“আমি জানতাম, আমার নাতনি লড়াই ছেড়ে দেবে না।”
সেন সাহেব এবার প্রথমবারের মতো বুক ভরে শ্বাস নিলেন।
চোখে জল টলমল করছে, কিন্তু তিনি শক্ত থাকার চেষ্টা করলেন।
চুপচাপ নিজের মনে ফিসফিস করলেন,
“সুচি, তুই জিতেছিস মা।
তুই আমাকে নতুন করে বাঁচতে শিখিয়ে দিলি।”
করিডোরে যেন হালকা হাওয়া বয়ে গেল।ক্লান্ত অপেক্ষার পর একটুখানি স্বস্তি—তবুও মনে হচ্ছে, আসল লড়াই এখনো বাকি।
দুদিন পর দুপুরবেলা সিটি হাসপাতালের কেবিনের দরজা খুলল। হুইলচেয়ারে বসা সুচিকে ধীরে ধীরে বাইরে আনা হলো।
চোখে মুখে ক্লান্তি, কপালে এখনো ব্যান্ডেজ, তবুও তার ভেতরে একরাশ শান্তি, কারণ সে জানে, সে ফিরছে নিজের ঘরে, কিন্তু মনের মধ্যে লুকিয়ে আছে একরাশ উদ্বেগ, অভির জন্য।
অ্যাম্বুলেন্স ধীরে ধীরে সেন বাড়ির সামনে এসে থামল।
অট্টালিকার বড় ফটক খুলে গেল, চাকর-বাকর সবাই দাঁড়িয়ে।মালবিকা দেবী চোখে জল নিয়ে মেয়েকে নামতে সাহায্য করলেন।
ঠাকুমা দরজায় দাঁড়িয়ে তার অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছেন অনেক্ষন, তার হাত ধরে বললেন,
“সাবধানে এসো মা, এখন শুধু বিশ্রাম।”
সুচিকে নিয়ে যাওয়া হলো তার নিজের ঘরে।ডাক্তার আগেই কড়া নির্দেশ দিয়েছেন, হাসপাতালে ছাড়ার আগেই,
“অন্তত তিন সপ্তাহ তাকে কড়া বিশ্রামে রাখতে হবে।বেশি নড়াচড়া নয়, মানসিক চাপ নয়।
যতটা সম্ভব শান্ত পরিবেশ দিতে হবে।”
ঘরে এসেই সুচি বিছানায় শুয়ে পড়ল।চারপাশে প্রিয় বই, টেবিলে রাখা ছোট্ট ফুলদানি, জানালা দিয়ে আসা সূর্যের আলো—সবকিছু যেন তাকে বলছে, “তুমি এখন নিরাপদ।”
কিন্তু তার চোখ বন্ধ হলেই মনে পড়ছে সেই বস্তির ভিড়, মেয়েদের কান্না, ছেলেদের প্রতিবাদ, আর অভির রক্তাক্ত মুখ।ডাক্তার বলেছে বিশ্রাম, কিন্তু মনে হচ্ছে তার ভেতরটা জ্বলছে।
মালবিকা বিছানার পাশে বসে কপালে হাত বুলিয়ে দিলেন,
“এখন কোনো চিন্তা নয় মা, তুমি শুধু বিশ্রাম নাও।”
সুচি ঠোঁটে ম্লান হাসি এনে বলল,
“মা, শরীর হয়তো বিশ্রাম চাইছে…
কিন্তু মন তো আর বিশ্রাম মানে না।”
সন্ধ্যা নেমে এসেছে।
মালবিকা এক গ্লাস দুধ নিয়ে এলেন।
“মা, একটুও শক্তি নেই তোমার শরীরে।এটা খেয়ে নাও।”
সুচি ধীরে ধীরে বসল।
দুধের গ্লাসটা হাতে নিলেও মুখে আনতে পারল না।চোখে হঠাৎ জল এসে গেল।
সুচি কণ্ঠ কাঁপা বলল,
“মা… তুমি জানো, ওই দিন আমাকে বাঁচাতে গিয়ে অভি…
ও-ও তো রক্তাক্ত হয়ে গেল।”
মালবিকা চমকে তাকালেন।
সুচির চোখ ভিজে যাচ্ছে,
“ও মাটিতে পড়ে গিয়েছিল মা…
তবুও আমার হাত ছাড়েনি।”
একটু শ্বাস নিয়ে সে আবার বলল,
“আমি জানিনা মা ও কি অবস্থায় আছে। ওর পাশে কেউ নেই মা।সুস্থ্য আছে নাকি…..”
কথাটা শেষ করতে পারল না সূচি। তার আগেই কান্নার আবেগে তার গলা ধরে এলো। মায়ের কোলে মুখ গুজল।
মালবিকার বুক কেঁপে উঠল।
তিনি মেয়ের মাথায় হাত রেখে বললেন,
“ও ছেলে বড় মন নিয়ে জন্মেছে মা।তুমি যে তাকে এত শ্রদ্ধা করছ, তাতেই বোঝা যাচ্ছে।
কিন্তু তুমি এখন দুর্বল, তোমার শরীর আগে শক্ত হোক…
তারপর আমরা ওর খবর নেব।”
সুচি মাথা নাড়ল, চোখের কোণে জমে থাকা জল গড়িয়ে পড়ল।
“মা, আমি শান্তি পাব না যতক্ষণ না জানি ও ভালো আছে কিনা।
ও শুধু আমাকে নয়, আমার ভেতরের স্বপ্নকেও বাঁচিয়ে দিয়েছে।”
মালবিকা এবার মেয়েকে জড়িয়ে ধরলেন।তার চোখেও জল এসে গেল।
ফিসফিস করে বললেন,
“তুই সত্যিই অন্যরকম মেয়ে সুচি…আর সেই ছেলেটিও হয়তো তোর মতোই অন্যরকম।”
রাত গভীর,তখন প্রায় সাড়ে দশটা।সেনবাড়ির সব ঘরে আলো জ্বলছে, তবু অট্টালিকায় অদ্ভুত নীরবতা।বিমল সেন স্টাডি রুমে বসে ব্যস্ত কাগজপত্রে, আর ঠাকুমা নিঃশব্দে বই পড়ছেন তার ঘরে।
কিন্তু সুচির ঘরে অস্থিরতা।সে শুয়ে থেকেও বারবার উঠে বসে, হাঁটাহাঁটি করছে।চোখ দুটো লাল, মন ভরা এক অদম্য তাগিদ—ও,
“অভির খবর না জেনে আমি শান্তি পাব না।”
মালবিকা মেয়ের এই অবস্থা দেখে আর সহ্য করতে পারলেন না।ধীরে ধীরে কাছে গিয়ে বললেন,
“সুচি, মা তুমি যদি এভাবে কাঁদতে থাকো, তোমার শরীর ভেঙে পড়বে।বলতো, কী করলে তোমার মন শান্ত হবে?”
সুচি কাঁপা গলায় বলল,
“মা, তুমি অভির খবর নাও… প্লিজ।আমি জানি ও হাসপাতালে একা লড়ছে।
বস্তির ছেলেরা কীই বা করবে?
আমি যদি শান্তি পাই, তবে ওর খবর জেনে।তুমি না করলে, আমি নিজেই যাবো।”
এই কথার পর মালবিকা বুঝলেন, আর দেরি করলে মেয়েকে সামলানো যাবে না।
তিনি মেয়ের হাত ধরে আস্তে বললেন,
“ঠিক আছে মা, তোকে কিছু করবে না।আমি খোঁজ নেবো।
কিন্তু তোর বাবা যেনো ঘুণাক্ষরেও টের না পান।”
সুচি চোখ মুছল, ধীরে মাথা নাড়ল।
মালবিকা দেবী নিজের শোবার ঘর থেকে নিঃশব্দে বেরোলেন।
পায়ের শব্দও যেন শোনা না যায়।চাকরকে ডাক দিলেন চাপা গলায়,
“এই মুহূর্তে পেছনের বস্তিতে যাও, সেখান থেকে বাবু বলে একটি চোদ্দ পনেরো বছরের ছেলে আছে, তাকে নিয়ে এসো।
তবে দেখো,যেন বড়বাবুর চোখে না পড়ে।”
অল্পক্ষণ পরেই পেছনের দরজার ফাঁক দিয়ে প্রবেশ করল বাবু।পায়ে ধুলো, গায়ে ঘাম, চোখে ক্লান্তি, মনে ভয়। আকস্মিক ডাক পড়ায় একটু হতবাক। তবু সম্মান জানিয়ে দাঁড়াল সামনে।
মালবিকা চিন্তিত সুরে বলল,
“বাবু, অভি কেমন আছে?”
বাবু মাথা নিচু করে বলল,
“মা, অভিদা এখনো সরকারি হাসপাতালে ভর্তি।রক্ত অনেক বেরিয়েছিল, তবে ডাক্তার বলেছে ধীরে ধীরে স্থির হচ্ছে।
কিন্তু… জ্ঞান ফেরার পর বারবার একটা নাম বলছে—
‘সুচি… সুচি বাঁচুক…’”
মালবিকার চোখে জল এসে গেল।তিনি গভীর শ্বাস নিয়ে মনে মনে বললেন,
“এমন মানুষকে ভগবান যেন সুস্থ রাখেন।”
মালবিকা নিঃশব্দে বাবুকে নিয়ে এলেন সুচির ঘরে।বিছানায় শুয়ে থাকা সুচি উঠে বসল, চোখে জ্বলজ্বলে অস্থিরতা।
“বাবু, অভি সুস্থ্য আছে তো?”
একটু থেমে আগ্রহ নিয়ে জানতে চাইলো,
“আমি অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার পর কি ঘটেছিল বলো বাবু।”
বাবু গলা শুকিয়ে গেলেও ধীরে ধীরে বলতে শুরু করল,
“দিদি… সেদিনের সেই মুহূর্তটা আমার চোখ থেকে কখনো যাবে না। তুমি যখন মাটিতে অজ্ঞান হয়ে পড়লে, আমরা সবাই হকচকিয়ে গিয়েছিলাম।কিন্তু অভিদা এক মুহূর্ত দেরি করেননি।তোমাকে দুই হাতে তুলে ধরলো।”
গোপাল মস্তান তখনও সবাইকে মেরে ফেলার হুমকি দিয়ে চলেছে। অভিদার যেনো মাথায় রক্ত চেপে গেলো। লাফিয়ে উঠে গোপাল মস্তান কে মাটিতে ফেলে মারতে থাকলো অভিদা।”
এক নিশ্বাসে কথা গুলো বলে বাবু একটু থামলো।
“অভি দাদার হাত থেকে মুক্তি পেতে গোপালের হিমশিম অবস্থা তখন।কিন্তু সেই মুহূর্তে পেছন থেকে এক মস্তান লাঠি দিয়ে মারল দাদার মাথায়।”
ঠাস!
“অভি দার কপাল ফেটে গেল, রক্ত গড়িয়ে পড়ল মুখ বেয়ে।”
সূচি ফুপিয়ে উঠলো।
“ওইদেখে দিদি আমরাও রুখে দাড়ালাম। গোপাল পালালো তার দলবল নিয়ে।”
“অভি দাদা হাল ছাড়ল না।মাথায় আঘাত লেগে শরীর কাঁপছিল, চোখ ঝাপসা,রক্তে ভেসে যাচ্ছিল,তবুও তোমাকে বুকে টেনে তুলে নিল।”
বাবু একটু জল খেলো।
“আমরা সবাই চারপাশে দিশেহারা, আর মস্তানদের দল তখনও দুর থেকে গালিগালাজ করছে।অভিদা কিন্তু নিজের ব্যথা ভুলে শুধু একটা কথাই বলছিল,
‘সুচি তোমাকে বাঁচতে হবে, যেভাবেই হোক বাঁচাতেই হবে।”
“তারপর তোমাকে কোলে নিয়ে দৌড়ে বেরোল রাস্তার দিকে।আমরা পেছনে ছুটে চললাম।রক্তে ভিজে গিয়েছিল ওর জামাকাপড়,কিন্তু তবুও তোমাকে আঁকড়ে ধরে ছুটতে থাকল।”
সুচির চোখ বিস্ফারিত।
হাসপাতালে গিয়েও এক মুহূর্তের জন্যও দাদা তোমার হাত ছাড়েনি। তোমাকে যখন বড় হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, তখনও দাদাই তোমাকে এম্বুলেন্স তুলে দিলো। “
“কিন্তু…”
বাবু একটু থামলো।
“তোমাকে নিয়ে এম্বুলেন্স বেরিয়ে যাওয়ার পরেই দাদা নিজেই মাটিতে লুটিয়ে পড়ল।”
ঘরে নিস্তব্ধতা নেমে এলো।
সুচির চোখ দিয়ে টলটল করে জল গড়িয়ে পড়ছে।মালবিকা দেবী মেয়ের হাত চেপে ধরলেন।
সূচি অভিভূত স্বরে বলল,
“মা… আমি আজ বেঁচে আছি, কারণ অভি আমার জন্য নিজের জীবন বাজি রেখেছে।”
বাবু কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর নিচু গলায় বলল বলল,
“দিদি… একটা কথা বলি, অভিদার শারীরিক অবস্থা এখনো ভালো নয়।মাথার আঘাতটা গভীর, অনেক রক্ত বেরিয়ে গিয়েছিল।ডাক্তাররা তাকে বাঁচাতে রক্ত দিলেন…
আমাদেরই দুজন বস্তির ছেলেরা রক্ত দিয়ে এসেছে।”
সুচির বুক কেঁপে উঠল, চোখ ছলছল করে উঠল।
সুচি কাঁপা স্বরে বলল,
“তাহলে… ও এখনো হাসপাতালে?”
“হ্যাঁ দিদি। সরকারি হাসপাতালে ভর্তি আছে।দাদা মেসে যার সাথে থাকে,সেই শুভ দা দিনরাত অভি দার সাথে আছে আর আমরা কয়েকজনই আছি। ডাক্তার বলেছেন, বিপদ আপাতত কেটে গেছে,কিন্তু ওকে অনেক বিশ্রাম নিতে হবে।শরীর খুব দুর্বল হয়ে গেছে।”
সুচি মায়ের হাত দুটো শক্ত করে চেপে ধরল,মনে হচ্ছিল বুক ফেটে যাবে।
সুচি ফিসফিস করে বলল,
“আমার জন্য… শুধু আমার জন্য এত বড় বিপদে পড়ল ও… মা, ওকে না দেখা পর্যন্ত শান্তি পাব না আমি।”
মালবিকা দেবী মেয়ের কাঁধে হাত রাখলেন।চোখে অশ্রু, তবু গলায় দৃঢ়তা,
“শান্ত হ মা।আমি আছি, আমি সব ব্যবস্থা করব। তুই এখন বিশ্রাম নে,অভির খোঁজ আমি নেবো…
যত গোপনেই হোক, আমি ওর খবর আনব।”
বাবুকে বিদায় দেওয়ার আগে মালবিকা তাকে বললেন,
“তুমি প্রতিদিন ওর খবর আমার কাছে পৌঁছে দেবে।ওর যদি কিছু প্রয়োজন হয়, আমার কাছে নিঃসংকোচে জানাবে।আমিও যাবো ওকে দেখতে,কিন্তু এটা আমাদের মধ্যেই গোপন থাকবে, বুঝেছো বাবু?”
বাবু মাথা নেড়ে বিদায় নিল।
রাত নেমেছে।
ঘরের বিছানায় আধশোয়া সুচি জানালার বাইরে তাকিয়ে আছে।
দূরে আলো-আঁধারির শহর, কিন্তু তার চোখে ভাসছে শুধু এক মুখ—অভির মুখ।
মাথার ভেতর এখনও বাজছে বাবুর বলা কথাগুলো—
“রক্ত ঝরছিল তবুও দিদিকে বুকে আগলেছে…নিজে রক্তাক্ত হয়ে তোমাকে হাসপাতালে পৌঁছে দিয়েছে… তারপর নিজেই মাটিতে লুটিয়ে পড়েছে।”
সুচির বুকটা হঠাৎ কেঁপে উঠল।
চোখ ভিজে এল, ঠোঁট কাঁপতে লাগল।
সুচি নিজের মনে বলল,
“আমার জন্য ও প্রাণ বাজি রাখল…আমি যদি আজ বেঁচে থাকি, তবে অভির জন্যই।এই মানুষটার পাশে না দাঁড়ালে আমার বেঁচে থাকাই বৃথা হবে। আজ থেকে ওর দুঃখ আমার দুঃখ, ওর স্বপ্ন আমার স্বপ্ন।”
এক অদ্ভুত দৃঢ়তা ভর করল তার ভেতরে।মনে হলো, যেন কোনো অদৃশ্য শক্তি তাকে নতুন করে জাগিয়ে তুলছে।
সে হাত দুটো জোড় করে বুকের কাছে টেনে নিল।চোখ বন্ধ করে অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে শপথ করল,
“হে ভগবান, তুমি আমার জীবনটা যদি সত্যিই ফিরিয়ে দিয়ে থাকো,তবে আমি আজ থেকে সেই জীবনটা শুধু অভির জন্যই বাঁচাব।আমার শ্বাস, আমার প্রাণ, আমার স্বপ্ন—সবকিছু ওর পাশে বিলিয়ে দেব।এই মানুষটার পাশে সারাজীবন থাকাই হবে আমার ধর্ম।”
মালবিকা দেবী পাশে বসে চুপচাপ মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে চলেছেন। মেয়ের মুখের দিকে চাইলেন, তার মুখে যেনো আলো—অদ্ভুত গর্ব, অদ্ভুত শান্তি। তিনি এই মুহূর্তে মেয়ের মন পড়ে নিলেন।
মালবিকা মৃদুস্বরে বলেন,
“তুই আজ সত্যিই বড় হলি মা।
যার পাশে থেকে জীবন কাটানোর সিদ্ধান্ত নিলি, সে সত্যিই যোগ্য।”
সুচির চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ল,কিন্তু সেই অশ্রুর ভেতরেই যেন ফুটে উঠল এক দীপ্তি,যা জানিয়ে দিল—
এ আর কোনো কিশোরীর আবেগ নয়, এ এক নারীর অটল সিদ্ধান্ত।
—oooXXooo—
![]()







