অবচেতনে আত্মা
সলিল চক্রবর্ত্তী
ডিসেম্বরের তেইশ তারিখ। সমগ্র কোলকাতায় চলছে শৈত্যপ্রবাহ। সকাল থেকে ঝা-চকচকে রোদ ছিল, সন্ধ্যা নামতেই টেম্পারেচার নামতে শুরু করেছে।
রাত যখন দশটা, তাপস রেডিও বুলেটিনে শোনে, এই মুহুর্তে দমদমের টেম্পারেচার আট ডিগ্রীর কাছাকাছি। রাস্তাঘাট শুনশান, মানুষ তো দূরের কথা, একটা নেড়ি কুত্তাকেও ঘোরাঘুরি করতে দেখা যাচ্ছে না। তাপস বুঝল, মুদি দোকানের ঝাঁপ খুলে রেখে আর লা়ভ নেই। বরং, ঝাঁপ ফেলে বাড়ি ফিরে এক মগ গরম চা খেলে স্বস্তি হবে।
মানুষ সুখের কথা ভেবেছে কি মরেছে। এখানেও সেটাই হল। বাড়ি ফিরে তাপস শোনে জ্যাঠামশাই মারা গেছেন।
যদিও রক্তের সম্পর্কিত জ্যাঠামশাই নন, পাড়াতুতো, তবে সম্পর্ক ব্লাড কানেকশনের থেকে কোন অংশে কম নয়। ছোট থেকেই তাঁর ছত্রছায়ায় বেড়ে ওঠা। ফলে জ্যাঠামশাইয়ের পরিবারের পাশে সামাজিক এবং মানসিক ভাবে থাকাটা তাপস তার কর্তব্য বলেই মনে করে।
রাত বারোটা, একটা ম্যাটাডোর ভ্যান আনা হয়েছে। কনকনে ঠান্ডায় প্রতিবেশী সমব্যথীর সংখ্যা চোখে গোনা যায়। ফলে মৃত শরীর এবং অ-মৃত শরীর এক ভ্যানে ঠাসাঠাসি করে রতন বাবুর শ্মশান ঘাটে পৌছুতে হবে।
রাস্তায় ইলেকট্রিক পোষ্টের একটা করে বাল্বের টিমটিমে আলো ছাড়া আর কোন আলোর ব্যবস্থা নেই। পরিষ্কার করে মানুষগুলোকে চেনাও দুষ্কর হয়ে পড়ছে, গলার স্বর চিনে বুঝতে হচ্ছে।
তাপস একটা পশমের চাদর মুড়ি দিয়ে মৃত জ্যাঠামশাইয়ের ডেড বডির পায়ের কাছে গিয়ে বসল। একজন চেঁচিয়ে বলল -” ওরে গাড়িটা এবার ছাড়, কত রাত হল খেয়াল আছে?”
রাত পৌনে একটা নাগাদ গাড়ি ছাড়ল। গাড়ি চলছে, সবাই প্রায় দাঁড়িয়ে হরিবোল ধ্বনিতে কণ্ঠ মেলাচ্ছে। দু-এক জন খাটিয়া ঘিরে বসে আছে। তাপস তার মধ্যে একজন। তাপস দুর্বল রাশির মানুষ, সাহসী একদমই নয়, তবুও জ্যাঠামশাইয়ের বাম পা-টা ধরে বসে আছে, কারণ সে শুনেছে, বডি নাকি ছুয়ে থাকতে হয়। নব্বইয়ের কোঠায় গিয়ে বয়সজনিত কারণে মৃত্যু হওয়ায় শ্মশান যাত্রীদের মধ্যে শোকাতুর ভাবটা একেবারেই দেখা যাচ্ছে না। বরং সবাই হরিবোল ধ্বনি কমিয়ে বিভিন্ন রকমের গল্পগুজবে মশগুল। কে কবে মারা গিয়েছিল, তাঁকে শ্মশানে নিয়ে যেতে গিয়ে কি কি সমস্যা হয়েছিল, কার মৃত্যুর পর কি দোষ পেয়েছিল ইত্যাদি ইত্যাদি। তাপস জ্যাঠামশাইয়ের পা-টা ছুঁয়ে চুপ করে বসে আছে, কারণ যাদের মৃত্যু নিয়ে কথা হচ্ছে তাপস তাদের ঠিকঠাক চেনেই না। এরি মধ্যে বিলে বলে উঠল -” পঁচাশির জানুয়ারীতে সেজ ঠাকুরদা মারা গেলে, ওঃ কি শীত!! হঠাৎ গুটিকয়েক মানুষের মধ্যে কে যেন বলে উঠল-” মাসটা জানুয়ারী ছিল না, জুলাই ছিল।”
— ঠিক, ঠিক, নিম্নচাপ থাকায় টানা তিন চারদিন মুশলধারায় বৃষ্টি, সূর্যের দেখা ছিল না। তাই তো অতো ঠাণ্ডা পড়েছিল।
— কিন্তু জুলাই মাসটা কে বলল?
এ বলে ‘আমি না’, ও বলে ‘আমি না’। সবাই যদি বলে আমি না তাহলে বলল’টা কে?
—- তাপসের গলা তো, কিরে তাপস চুপ করে আছিস যে বড়ো?
তাপসের একটু ঝিমুনি এসেছিল, সে এই বিষয়ের বিন্দু বিসর্গও জানে না। থতমত খেয়ে বলে-” আমি আবার কি বললাম!!”
— কেন সেজ ঠাকুরদা জুলাইতে মারা গিয়েছিলেন তুই বললি না??
তাপস রীতি মতো আবাক হয়ে বলল- “আমি? আমি তো তাঁকে চিনিই না।”
—– তুই তো বললি, এটা কি কোন অপরাধ যে অস্বীকার করছিস।
তাপস আর কথা বাড়াল না ঠিকই, তবে সে নিজে জানে, সে ঘুমিয়েছিল। এই সবের মধ্যে তাপস খেয়াল করল তার ডান হাতটা একই ভাবে জ্যাঠামশাইয়ের বাম পা স্পর্শ করে আছে, আর সেই ঠাণ্ডা পা থেকে একটা তরঙ্গ যেন তার শরীরে সঞ্চারিত হচ্ছে। তাপসের ডান বাহুটা ঝিনঝিন করতে থাকায় সে হাতটা সরিয়ে নিতে গিয়ে অনুভব করল, হাতটা সরিয়ে আনল না, পা থেকে বরং ছিনিয়ে আনল। তাপসের কেমন খটকা লাগল, তবে ঘটনাটা প্রকাশ না করে কিছু অযৌক্তিক যুক্তি খাড়া করে মনকে শান্ত করল।
রতন বাবুর ঘাটে পৌঁছুতে রাত দেড়টা বেজে গেল। ম্যাটাডোর ভ্যান থেকে লাফিয়ে নেমে সকলের চক্ষু চড়কগাছ। ইলেকট্রিক চুল্লীর সামনে বারো থেকে চোদ্দোটা বডি শোয়ানো। পার বডি বার্ণ হতে এভারেজ পঁয়তাল্লিশ মিনিট করে ধরলে তাদের দাহ কার্য সমাধা হতে আগামী কাল সকাল দশ-এগারোটা বেজে যাবে। ফলে সর্বসম্মতিক্রমে সিদ্ধান্ত নেওয়া হল, ঝকমারির কাজ হলেও কাঠের চুল্লিতে দাহ করা হবে। তাহলে হয়ত ভোরের দিকে বাড়িতে ফেরা যাবে।
জ্যাঠামশাইয়ের বডিটাকে নিয়ে যাওয়া হল কাঠের চুল্লীর সামনে। এদিকটা একদম শুনশান, হবে নাই বা কেন? একে ফাঁকা জায়গা তার উপর গঙ্গার ধার। কনকনে ঠাণ্ডা বাতাস বয়ে আসছে মা গঙ্গার বুকের উপর দিয়ে। কাঠে পোড়ানোর ঝক্কি কেউ সখ করে এখন আর নেয় না, আবার বর্তমানে হাওয়া খাওয়ার প্রয়োজনও পড়ছে না, তাই জনশূন্য এই এলাকার রক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে মোটা এক বটবৃক্ষ, যার গোড়াটা শান বাঁধানো। যাইহোক অল্প কিছু শ্মশান যাত্রী তার অর্ধেক আবার নিজেদের ফুর্তির আয়োজনে এদিক ওদিক চলে গেছে। জনা দুয়েক গেল কাঠের ব্যবস্থা করতে। কেউবা অতি ব্যস্ত ঠাকুর মশাইকে এসকট করতে গেছে। বডি পাহারা দেওয়ার লোক আর পাওয়া যায় না। গাঁজা খোর, চাঁদ নস্কর আর সমির মন্ডল জ্যাঠামশাই এর দুই ছেলেকে বলল-” যাও,তোমরা অফিসিয়াল কাজ সেরে নাও, আমরা মরা ছুঁয়ে বসে আছি।” এই বলে বডির পাশে বসে পড়ল। তাপস আর কি করে সারাদিনের ক্লান্তিকর কায়িকশ্রমের ফলে চোখ জুড়ে আসছিল। কাউকে কিছু না বলে তাপস বডির পাশে সান বাঁধানো বট গাছের নিচে পশমের চাদর মুড়ি দিয়ে শবাসনে শুয়ে পড়ল। ভাবল যতক্ষণ না সকলে কাজ সেরে আসছে ততক্ষণ একটু ঘুমিয়ে নেবে। কিন্তু ঘুমাব বললেই তো আর ঘুম আসে না। ফলে চিত্তে চিন্তার হচপচ হতে থাকল। মনে পড়তে থাকল জ্যাঠামশাই এর সাথে প্রায় কুড়ি বাইশ বছরের টুকরো টুকরো স্মৃতি বিজড়িত ঘটনা গুলো। জ্যাঠামশাইয়ের মাইনের ডেটে তাপসদের বড়িতে পাঁচটা রাজভোগ আসবেই আসবে। আবার রথ, উল্টো রথে এক থালা করে চপ, পাঁপর ভাজা তো থাকবেই। অর্থাৎ স্পেশাল কিছু হলে তাপসদের বাড়িতে আসবেই আসবে। এখন তাপসের ভাবতে খারাপ লাগছে, তবুও সে সুযোগ পেলেই জ্যাঠামশাইদের গাছ থেকে আম,জাম,পেয়ারা চুরি করত। একবার তো পেয়ারা চুরি করতে গিয়ে গাছ থেকে পড়েই মরছিল। জ্যাঠামশাই এর জন্যে সেদিন রক্ষা পায়, তা না হলে জ্যাঠামশাই এর আগে তাকে স্বর্গে চলে যেতে হতো। ” এই তাপস পেয়ারা খাবি?” তাপস চমকে উঠল, এত রাতে শ্মশানে কে কথাটা বলল। এক লাফে উঠে বসল। দেখে কোথাও কেউ নেই। জ্যাঠামশাই এর বডির সামনে বসে চাঁদ আর সমির ঝিমুতে ঝিমুতে একটা বিড়ি ভাগাভাগি করে টানছে। তাপস ওদের জিজ্ঞেস করল, তারা কথাটা বলেছে কিনা। চাঁদের সন্ধ্যে বেলার বাংলার নেশাটা তখনো পুরো কাটেনি, তাপস কে ব্যাঙ্গ করে বলল-” না রে ভাই, বললে বিড়ি বলতাম, পেয়ারা কোথায় পাব।” যাইহোক ধরে নিলাম, ঘুম চোখে মনের ভুল। আবার যথারীতি আগের মতোই শুয়ে পড়লাম।
সবে মাত্র ঘুমটা এসেছে, আবার সেই একই প্রশ্ন, “এই তাপস পেয়ারা খাবি?” তাপস ভাল করে দেখার চেষ্টা করল, কিন্তু কাছাকাছি কাউকে দেখতে পেল না, আবার গলাটা তার চেনা চেনা লাগল। তাপস খুঁজে চলেছে। ” ডাঁশা পেয়ারা, একটা নে না।” কথা গুলো শুনতে পেয়ে শব্দের উৎস সন্ধান করতে গিয়ে তাপস দেখতে পেল, তার মাথার উপর বট গাছের ডালে জ্যাঠামশাই পা ঝুলিয়ে বসে বসে ফোকলা দাঁতে পেয়ারা খাচ্ছেন। যেটা এই বয়সে কোনো ভাবেই সম্ভব নয়। তাপস ভয়ে আড়ষ্ট হয়ে গেল। গায়ের লোম সব খাঁড়া হয়ে উঠল। ভাবল, জ্যাঠামশাই তো মারা গেছেন তবে এই বৃদ্ধ বয়সে গাছে বসে ———-। পা দোলাতে দোলাতে বিকট স্বরে হাসতে হাসতে জ্যাঠামশাই এর গায়ের রক্ত মাংস নিমেষের মধ্যে উধাও হয়ে শুধু কঙ্কালে পরিনত হল। জ্যাঠামশায়ের হাতের পেয়ারাটা নিমেষের মধ্যে একটা নরমুণ্ড হয়ে গেল। এবং সঙ্গে সঙ্গে কোথা থেকে আরো কয়েকটা কঙ্কাল উড়ে এসে গাছের ডালে বসে নরমুণ্ডটাকে কেড়ে নিতে গেল। কাড়াকাড়ি করতে করতে সব কটা কঙ্কাল গাছ থেকে নেমে পড়ল। তারপর ফুটবলের মতো নরমুণ্ডটি নিয়ে খেলতে লাগল। আর অট্টহাসিতে চারদিক বিভীষিকাময় করে তুলল। একটা কঙ্কাল নরমুণ্ডটাকে এমন একটা কিক মারল যে সেটা সেজা গিয়ে গঙ্গায় পড়ল, কিন্তু ডুবল না। আর একটা কঙ্কাল লম্বা লম্বা পা ফেলে গঙ্গাজলে উপর দিয়ে দিব্যি হেঁটে গিয়ে নরমুণ্ডটা নিয়ে আসল। আর একটা কঙ্কাল তাপসের দিকে ফিরে বলল-” আঁমি এঁই মাঁথাটা নেঁব।” কথাটা শুনে ভয়ে তাপসের শরীর আড়ষ্ট হয়ে গেল। তাপস চিৎকার করে বলে উঠল, “তোমরা কারা?” অট্ট হাসি হাসতে হাসতে “কারা??” বলে তাপস কে ধরতে উদ্যত হল। তাপস ছুটে পালানোর চেষ্টা করল, কিন্তু পারছে না। কঙ্কাল গুলো যত এগিয়ে আসতে থাকল, তাপস ততো তাড়াতাড়ি পালানোর চেষ্টা করতে থাকল, না পেরে শরীরটাকে একটা ঝটকা মেরে নাড়িয়ে দেয়। এবং
ঘুম ভেঙে যায়। তাপস তাড়াতাড়ি শোওয়া অবস্থা থেকে উঠে বসে। দেখে বিকৃত মুখমণ্ডল বিশিষ্ট জ্যাঠামশাইয়ের নশ্বর শরীরটা খাটিয়ার উপর শায়িত। পাশে চাঁদ, সমির কোথায়!! জনহীন স্থানে একমাত্র সে-ই জীবিত প্রাণী। এবার সত্যি সত্যিই তার শরীরের উষ্ণ রক্ত বরফ হয়ে যায়। গায়ের লোম খাঁড়া হয়ে ওঠে। কানের পাতায় গঙ্গাবক্ষ থেকে বয়ে আসা বাতাসের ধাক্কায় শোঁশোঁ শব্দটা ভৌতিক পরিবেশটাকে আরো প্রকট করে তুলেছে। বট গাছের উপর থেকে কয়েকটি নিশাচর খেচর তাদের অস্তিত্ব জানান দিয়ে ডানা ঝাপটে উড়ে গেল। মনে হচ্ছে এটা কোনো ইহলোকের স্থান নয়। তাকে হয়ত এখনি ওদের দলে চলে যেতে হবে। তাপসের মনে হচ্ছে, কে যেন পেছনে দাঁড়িয়ে তার উপর নজর রাখছে। সে পেছন ফিরে দেখার চেষ্টা করল না।
ভয় কনট্রোল করতে না পারলে হার্ট এট্যাক পর্যন্ত হয়ে যেতে পারে। কিন্তু পারছে কই!! তাপস শুধু রাম নাম করতে করতে সেখান থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করে। পিছনে না তাকিয়ে একটু এগোতেই দেখে তাপসদের লোকজন সবাই কাঠ,পারলৌকিক কাজের মালপত্র নিয়ে আসছে। তাপসের ধড়ে প্রাণ এলো। জ্যাঠামশাই এর বড় ছেলে শ্যামল, তাপসকে দেখে বলল-“যাক তুই তাহলে ছিলি, আমি ভাবছি বাবাকে কে ছুঁয়ে আছে?” তাপস একটু রাগান্বিত স্বরে বলল-” কেন তোমার চাঁদ,সমির?”
— ধুর ও দুটো চায়ের দোকানে বসে গাঁজা টানছে। জিজ্ঞেস করলাম, বলল লোক আছে।
তাপস একটু রেগে সদ্য ঘটে যাওয়া ঘটনাটা সংক্ষেপে বলল। পাশে দু’একজন ছিল, তারা বলে উঠল-” আরে ও সব মনের ভুল, নির্জন স্থানে বডির পাশে একলা——-।” শ্যামল বলল-” না না, ঘটনাটা মনের ভুল বলে চালিয়ে দেওয়া ঠিক হবে না।” পাশ থেকে গোকুল অতি উৎসাহে বলে উঠল-” তার মানে, তুই কি বলতে চাইছিস?” শ্যামল প্রত্যয় নিয়ে বলল-” বছর খানেক আগে আমার সাথে ঠিক এমনই একটা ঘটনা ঘটেছিল।”
— ভেরি ইন্টারেস্টিং মাইরি, কি ঘটেছিল রে?
বলাই প্রশ্ন করতেই, শ্যামল বলল-” বাবাকে চিতায় শুইয়ে মুখাগ্নি করে আমার হাতে অনেক সময় থাকবে, তখন বলব।”
তাপসের মাথা থেকে জ্যাঠামশাই এর রক্ত-মাংস হীন কঙ্কালের উপস্থিতিটা কিছুতেই সরছে না। উপরন্তু জানার ইচ্ছে তীব্রতর হচ্ছে, শ্যামল কি বলবে। একা তাপস নয়, আরো কয়েকজন অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে, শ্যামল আত্মা সম্পর্কে কি বলবে।
অবশেষে বৈতরণির কাজ সেরে শ্যামল রাত দুটো নাগাদ বট তলার সানের মেঝেতে বসে তার নিজস্ব অভিজ্ঞতা কথা বলতে শুরু করল।
— সবাই তো জানিস, আমি ইন্ডিয়ান এয়ারলাইনসের কার্গো ডিভিশনে জব করি। তিনটে শিফটে আমাদের কাজ হয়। প্রত্যেক স্টাফকে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে শিফট বদল করতে হয়।
গত বছর জানুয়ারির মাঝামাঝি সময়, আমার ডিউটি পড়েছে নাইট শিফটে, অর্থাৎ রাত এগারোটা থেকে সকাল সাতটা। সেদিনও ঠিক আজকের মতো ঠাণ্ডা পড়েছিল। আমি এগারোটার আগে ঢুকে রেজিস্ট্রার বুকে সই করে ভিতরে গিয়ে শুনলাম আমি আর একজন স্টাফ আছি। এখন আমাদের কোনো কাজ নেই। ভোর চারটে কুড়িতে একটা কার্গো ফ্লাইট ল্যাণ্ড করবে। তারপর হয়ত পাঁচটা থেকে আমাদের কাজ শুরু হবে। বাই দি বাই, বলে রাখি, ফকলিভে করে ফ্লাইট থকে গুডস এনে আমাদের কাছে পৌঁছে দেয়। আমরা প্রতিটি গুডসে ইনডিভিজুয়াল টিকিট মেরে রেজিস্ট্রারে একটা ন্যারেশান লিখে গোডাউনে রেখে দেই। আবার যখন পার্টি এসে তার মালের চালান সাবমিট করে, আমরা টিকিট মিলিয়ে গুডস পার্টির হাত তুলে দেই।
যাইহোক, আমার সহকর্মী পলাশ, একটা মোটা পেটি পেতে দুই চার পেগ টেনে কম্বল মুড়ি দিয়ে নাসিকা গর্জন করতে শুরু করেছে। আমি বেচারা কি করি, নিজের উপর নিজের করুণা হল। পেগ না হয় চলে না, ঘুম তো চলে। শরীর এই মুহুর্তে প্রকট ভাবে সেটাই বুঝিয়ে দিচ্ছে। খেলার মাঠের মতো এত বড় গোডাউনে আমরা মাত্র দুটো প্রাণী,একজন ঘুমন্ত,আর আর একজন ঘুমের দেশে পাড়ি দেওয়ার অপেক্ষায়। এরি মধ্যে আমার নজরে পড়ল, লাট দেওয়া মাল পত্রের মধ্যে একটা কাঠের চৌকোনা ফুট ছয়েকের বাক্স। নিশ্চিন্ত হয়ে ঠিক করলাম ঘন্টা চারেক বাক্সটার উপর কম্বল মুড়ি দিয়ে ঘুমিয়ে নেই।
যেই ভাবা সেই কাজ। চোখে ঘুম, সময় নষ্ট না করে হ্যালোজেন লাইটটা অফ করে টানটান হয়ে কাঠের বাক্সর উপর কম্বল মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়লাম। গোটা কতক একশ ওয়াট বাল্বের আলোতে সম্পূর্ণ হল ঘরটা মৃদু আলোকিত হয়ে থাকল। আমার থেকে অন্তত চল্লিশ মিটার দূরে পলাশ নাসিকাগর্জন করছে।
ঘুমে চোখ বুজে আসছিল, কিন্তু অবাক কাণ্ড, শোয়ার পর আর ঘুম তো আসছেই না, বরং শরীরে কেমন যেন একটা অস্বস্তি হচ্ছিল, মনে হচ্ছিল যেন না শুলেই ভাল হয়। এতো রাতে উঠেই বা কি করব, চোখ বন্ধ করে ঘাপটি মেরে শুয়ে থাকলাম। মিনিট দশেক পরে মনে হল কে যেন আমার চার পাশে হেঁটে বেড়াচ্ছে। সতর্ক হয়ে পদধ্বনিটার সত্যতা যাচাই করতে থাকলাম। হ্যাঁ ঠিকই শুনেছি, শুধু পদচারণা নয়, মনে হচ্ছে রীতিমতো আমার উপর তীক্ষ্ণ নজর রেখে চলেছে। কে লোকটি!! শরীরটা ভার হয়ে গেল, মনের ভুল কিনা সিওর হতে কম্বল থেকে মুখ বার করে চমকে উঠি, এই ঠাণ্ডায় দরদর করে ঘামতে থাকি। দেখি, ছয় সাত ফুটের একটা ছায়া মূর্তি আমার দিকে চোখ মোটামোটা করে চেয়ে আছে। আমি ‘কে?’ বলে চিৎকার করে উঠি। আমার গলা দিয়ে স্পষ্ট আওয়াজ বের হল না। কিন্তু মুহূর্তের মধ্যে ছায়া মূর্তিটা বড় হল ঘরের মধ্যে কোথায় যেন মিলিয়ে গেল। মন থেকে ভয়টা গেল না, মনে হচ্ছে ছায়া মূর্তি মিলিয়ে গেলেও আমার উপর অদৃশ্য নজর রেখে চলেছে। কিছুক্ষণ এই ভাবে বসে থেকে, কিছু না দেখতে পেয়ে মনে হল, পলাশ ফাজলামো করছে না তো!! এগিয়ে গেলাম ওর বিছানার কাছে। মাতালটা একই রকম নাক ডেকে ঘুমাচ্ছে। ভাবলাম ভয় দেখিয়ে ঘুমের অভিনয় করছে না তো!! ডাকলাম, মাতালটা উঠে ঝিমুতে থাকল। বললাম-” তুই কি আমার পায়ের কাছে গিয়ে দাঁড়িয়েছিলি?” বেহুঁশ পলাশ, একটু বিরক্ত হয়ে বলল-” তুই এক পেগও না খেয়েই আমার মতো হয়ে গেলি! যে টুকু সময় পাচ্ছিস ঘুমিয়ে নে। ঘুম না আসলে আমার বোতল থেকে কয়েক পেগ মেরে দে।” এই বলে আবার মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়ল।
বলাই এতোক্ষণ চুপচাপ শুনছিল। একটা নিঃশ্বাস ফেলে বলল- ” তারপর কি করলি?”
তারপর আর কি করব। পলাশ যা ব্যাঙ্গাত্মক উক্তি করল, তাতে ওকে আর কিছু বলতে সঙ্কোচ হল। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি, রাত দেড়টা বাজে। গুটি গুটি পায়ে আবার ফিরে গিয়ে কাঠের বাক্সের উপর টানটান হয়ে শুয়ে পড়ি।
সবেমাত্র চোখ বুজে এসেছে, ঘুমের ঘোরেই মনে হল কারা যেন মালপত্রের পেছন থেকে ইংরেজিতে কথা বলে চলেছে। আমি ঘুমের ঘোরে বিষয়টকে তেমন গুরুত্ব দিলাম না। একটু পরেই একটা হুড়মুড় শব্দে ঘুম ভেঙে গেল। উঠে এদিক ওদিক ভাল করে দেখতে থাকলাম, বোঝার চেষ্টা করছি শব্দটা কোথা থেকে এল। কারোর কথপোকথন শুনতে না পাওয়ায় ঢাঁই করা মালের পেছন দিকে গিয়ে চমকে উঠি, দেখি তিন চারটে পেটি মেঝেতে পড়ে আছে, আর তার মধ্যে একটা পেটি থেকে চুঁইয়ে চুঁইয়ে রক্ত গড়িয়ে আসছে। কি আছে এই পেটিতে? ভয়ে আমার গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল। কি করব বুঝতে পারছিনা। হঠাৎ দেখলাম পেটির আড়ালে সেই ছায়া মূর্তিটা দাঁড়িয়ে আছে, আমাকে দেখে সরে গেল। আমি যেন একটা ঘোরের মধ্যে চলেছি। ব্যাঙ্গাত্মক উক্তি শোনার ভয়ে পলাশের কাছেও যেতে পারছি না। ভাবলাম এই ভাবেই সব থাক, সকাল হলে দেখা যাবে। উপায়ান্তর না দেখে ফিরে এসে কাঠের বাক্সের উপর আবার টানটান হয়ে শুয়ে পড়লাম। ঘটে যাওয়া ঘটনা গুলো মনেমনে পর্যালোচনা করতে করতে মনে হল, রক্তের মতো লাল তরল পদার্থ পেটির মধ্য এলো কি করে? প্লেনে তো তরল পদার্থ তোলা নিষিদ্ধ। আবার ছায়া মূর্তিটা কি শুধুই আমার চোখের ভুল! না কি—?? সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে কখন যেন ঘুমিয়ে পড়ি। ঘুম ভেঙে গেল একটা কর্কশ শব্দে। কান খাঁড়া করে সতর্ক হলাম, মনে হল ছায়া মূর্তিটা ফিসফিস করে কার সাথে যেন ( ইংরেজিতে) কথা বলছে। আমি কম্বল মুড়ি দিয়ে ব্যাপারটা বোঝার চেষ্টা করছি। কথার আওয়াজ একটু উচ্চ স্বরে হওয়ায় মুড়ি খুলে তাকিয়ে দেখি, একটা সাহেব গোছের মানুষ গোডাউনে লম্বা লম্বা পা ফেলে এমন ভাবে পায়চারি করছে যেন ওঁর অপছন্দের কিছু একটা ঘটে চলেছে, যেটা ওই সাহেব গোছের লোকটা মেনে নিতে পারছে না। আমিও চিৎকার করে বললাম-” কে আপনি, কি চান এখানে।” আমার কথা শুনে লোকটা যেন ক্ষিপ্ত হয়ে উঠে আমার দিকে ক্রুর ভাবে তাকাল। চোখ দুটো ভাটির আগুনে মত জ্বলছে, সামনে দুটো বড়বড় দাঁত বার করে আমার দিকে ছুটে এসে শোয়া অবস্থায় আমার গলা চেপে ধরে মেরে ফেলতে গেল। ঠিক যেন ড্রাকুলার আক্রমন। আমি তার হাত থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করছি, কিন্তু কিছুতেই পারছি না। আমার শ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে। আর মনে হয় বাঁচব না। মুখদিয়ে গাঁজা উঠে গোঁগোঁ শব্দ বেরিয়ে আসছে। ” শ্যামল!! আরে এই শ্যামল!! কি হল, অমন করছিস কেন? আমি ধড়ফড়িয়ে উঠে বসি।
—- সাড়ে চারটে বাজে, প্লেন ল্যান্ড করার শব্দ শুনেছি। খানিকক্ষণ পরেই ফকলিভে করে মাল এসে যাবে। আমি লাইট গুলো জ্বালিয়ে খাতাপত্র রেডি করি।
আমার ঘোর কাটতে খানিকটা সময় লাগল। বাক্স থেকে নেমে বাথরুমে ঢুকলাম। গতরাতের ঘটনা গুলো যুক্তি সহকারে সাজিয়ে মনে হলো, রহস্যময় পেটিগুলোর জন্যে এমন উদ্ভট ভৌতিক পরিবেশের অবতারণা নয় তো!!! বাথরুম থেকে বেরিয়ে কিউরিওসিটি দমন করতে না পেরে চলে গেলাম পড়ে থাকা পেটিগুলোর কাছে। আবার অবাক হলাম, কোনো পেটি তো পড়ে নেই, এমন কি মেঝেতে পেটি থেকে চুঁইয়ে পড়া রক্তেরও কোনো চিহ্ন নেই। পলাশকে ডেকে জিজ্ঞেস করলাম, সে পেটিটা তুলে রেখেছে কিনা! পলাশ হেসে জবাব দিল-” সরকারি চাকরিতে কে কবে বাড়তি কাজ করেছে। যা,যা,চোখেমুখে ভাল করে জলের ঝাপটা দিয়ে আয়।”
এই সব আলোচনার মধ্যে ফকলিভে মাল চলে এলে আমরা দুইজন কাজে ব্যাস্ত হয়ে পড়ি। পলাশ কাজ করতে করতে বার দুয়েক আমাকে নিয়ে ব্যাঙ্গাত্মক মন্তব্য করল। আমি ঘটনাটা বোঝাতে চাইলে না বুঝে বলল-” নেশা করলাম আমি, আর মাতাল হলি তুই।”
কাজ করতে করতে সময় বোঝা যায় না। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি ছ’টা বেজে গেছে। গোডাউনের সামনের বড় শাটার তুলে দেখি, রাস্তার উপর একটা শববাহী গাড়ি দাঁড়িয়ে। লোকজন কেউ নেই। পলাশকে এসে কথাটা বলতেই, সে এবার সিরিয়াস হয়ে বলল-” তাহলেi তোর কথা মতো রক্ত চুঁইয়ে পড়া পেটিটার —–।”
ইতিমধ্যে কয়েকজন ব্যক্তি এসে আমাদের হাতে চালানের কাগজ পত্র ধরাল। আমাদের কাজ কাগজ পত্র মিলিয়ে তাদের হাতে মাল তুলে দেওয়া। পলাশ জিজ্ঞেস করল-” কি আছে?” উত্তর এলো ‘কফিন’। পলাশ এবার আমার দিকে এমন ভাবে তাকাল, যেন ওর চোখ বলছে, ব্যঙ্গবিদ্রূপ করার জন্যে সরি বন্ধু।
চালানে গুডস প্যাক নাম্বার ‘১১৩’ দেখে খুঁজতে খুঁজতে এসে দাঁড়ালাম সেই কাঠের বাক্সের কাছে, যার উপর গত রাতে আমি শুয়ে ছিলাম। সেটির উপর স্টিকার সাঁটা ‘১১৩’ নাম্বার।
পিছন থেকে পলাশ পিঠে হাত রেখে বলল-” মাই গর্ড, কাল সারারাত তুই এই কফিনের উপর——-।”
সবাই বাকরুদ্ধ হয়ে শ্যামলের বাক্স রহস্য শুনছিলা। এর মধ্যে জ্যাঠামশাই এর দাহ কার্য শেষ। একজন হেঁকে বলল-” শ্যামল, ভজা চলে আয়, চিতায় জল ঢালতে হবে।”
পুব আকাশ ধীরেধীরে রক্তিম আভায় পরিপূর্ণ হয়ে উঠছে। প্রহর শেষে খেচরকুল দিন শুরুর বন্দনা করে, যার যে দিকে ইচ্ছে ডানা মেলছে। গঙ্গায় আসছে জোয়ার, তার মধ্যে কয়েকজন জেলে নৌকায় করে গঙ্গা বক্ষে ভেসে ভেসে মাছ ধরে চলেছে। শ্যামল, ভজা দু কলসি জল এনে নিভু নিভু কাঠের উপর ছড়িয়ে দিল। আজ এই মুহূর্ত থেকে তাদের জীবনের বর্তমানটা অতীত হয়ে গেল।
★★★★★★
![]()







