বিচ্ছেদের পরে
বাসুদেব দাশ
===========
আহেলী সিগারেটের শেষটা একটু দিস প্লিজ। তুই এত আপসেট হয়ে যাচ্ছিস কেনো বল তো শতুদ্রু ? আসলে নতুন কোম্পানিতে জয়েন না করে চাকরিটা ছাড়া আমার উচিত হয় নি বলেই এখন মনে হচ্ছে। আহেলী… তুই তো সুইচ ওভার করতে চেয়েছিলিস। তো এতো ভাবছিস কেনো ? হয়ে যাবে, ডো’ন্ট বি ওরিড। ইট টেকস সাম টাইমস , সুতরাং পেসেন্ট হারাস না। শতুদ্রু… ওকে,থাঙ্কস ফর সাপোর্ট । আহেলী… আচ্ছা শতুদ্রু হাউ লং আওয়ার রিলেশনশিপ,বলছি সম্পর্কটা কত দিনের ? একটা সম্পর্ক ম্যাচুউরড করতে কত দিন লাগে ? শতুদ্রু… কেন ? সম্পর্কের সময় কালের প্রশ্ন আসছে কেন ? এটা কি টাইম ব্যারড নাকি ?
আহেলী… দরকার আছে। শতুদ্রু… আমি মরছি আমার চাকরির কথা চিন্তা করে আর তোর যত সব উদ্ভট চিন্তা ভাবনা। আহেলী… তোর না হয় এই মুহূর্তে চাকরি নেই তো কি হয়েছে ? আমার তো আছে। শতুদ্রু… তুই বলতে চাইছিস তুই আমাকে টানবি। ইট ইস কোয়াইট ইম্পসিবল। আহেলী… কেন ইম্পসিবল ? আমি মেয়ে বলে আমার কোন আর্থিক দায়িত্ব থাকতে নেই। আমার চাকরি কি শুধু আমার ব্যক্তিগত নিরাপত্তার জন্য ? আর সমাজে আমার আইডেন্টিটির জন্য। না, এতোটা ইরেস্পন্সসিবল আমি হতে পারবো না। সংসারে অবশ্যই ফিনান্সিয়াল রেসপনসিবিলিটি থাকবে আমার মিস্টার শতুদ্রু। শতুদ্রু…সম্পর্ক বেশি দিনের হলে কি হবে ? তুই কি বিয়ের কথা ভাবছিস নাকি ? আহেলী… হ্যাঁ, অবভিয়াসলি। ভাবাটা তো লজিক্যাল । আই আম রেডি টু ম্যারি ইউ। শতুদ্রু… আমার যখন চাকরি নেই ঠিক তখনই তোর সংসারি হবার ঝোক চেপে বসলো। কি অদ্ভুত তোর থিংকিং। ইট ইস নট রাইট টাইম ফর দ্যাট আহেলী। আহেলী…প্লিজ ওয়েট ফর এট লিস্ট ওয়ান মান্থ । তুই M Tech করা ছেলে। আর আই টি সেক্টরে এ এরকম হয়। শতুদ্রু… তুই এই ভোর বেলায় এসে কি ঝগড়া শুরু করলি মাইরি ? আহেলী…. খুব ডিস্ট্রাব করলাম কি ? শতুদ্রু… আরে না না, আই আম নট টকিং লাইক দ্যাট। তোর আসার আবার সময় কিসের। আসলে আমি ন টা পর্যন্ত ঘুমাই তো তাই। আহেলী… একটা কুম্ভকর্ণ । সতুদ্রু… তুই বস আমি কফি করে আনছি। আহেলী… না না তুই বোস আমি করছি। মাসি মা, মেসো মিশাই কোথায় ? শতুদ্রু… একটু প্রাত ভ্রমণে বেরিয়েছে। কেনো,তোর ভয় লাগছে নাকি ? আহেলী…তোর যত সব বোকা বোকা কথা, হাদারাম। শতুদ্রু… ব্রেকফাস্ট কি খাবি ? আহেলী… আমি অর্ডার করে দিয়েছি। তোর ফেবারিট স্পেশাল গন্ধরাজ মোমো। শতুদ্রু.. ও, আচ্ছা থ্যাংক ইউ ম্যাম । ইউ আর সো সুইট আহেলী। কলিং বেল বাজলে শতুদ্রু নীচে নেমে দরজা খুলে দেখে খাবার ডেলিভারি দিতে এসে গেছে। শতুদ্রু… আহেলী এই নে তোর স্পেশাল মোমো। আহেলী… লেটস গো টু ব্যালকনি। শতুদ্রু… ওকে, এজ ইউ উইস। আহেলী… একটু শান্ত হয়ে থাক তোর জব অফার ঠিক আসবে। শতুদ্রু… কিন্তু আমি বাড়ীতে কি বলবো ? কাকে কি বোঝাবো ? মাধ্যবিত্ত পরিবারে এই হচ্ছে মস্ত বড় সমস্যা। আহেলী…. দ্যাখ এটা কর্পোরেট ওয়ার্ল্ড। এখানে তোর ইমোশনের কোন দাম কেউ দেবে না। কাজ করো টাকা ন্যাও চলে যাও ব্যাস। শতুদ্রু… এতো ভোরে কি বলার জন্য এলি সেটা তো বল্লি না। আহেলী… কিছুই না, তোকে একটু ক্যাল্টিভেট করা মানে বুস্টআপ করা। আর একটু মেন্টাললি সাপোর্ট দিতে। আর যদি মনিটরি হেল্প লাগে…। শতুদ্রু… তোর থেকে… নো নো ইট ইস নট পসিবল । আহেলী…. কেনো আমি মেয়ে.?.. তাহলে মেয়েদের এই ইকোনমিক্ ইনডিপেন্ডেন্সি কি জন্য ? ইগো ছাড় শতুদ্রু। কাম টু দ্যা পয়েন্ট। কোন চেঞ্চুরিতে উই আর লিভিং নাউ সেটা ভাব। উই আর গোয়িং টু বি লাইফ পার্টনার। থিঙ্ক ইট।
আহেলী আই হ্যাভ রিসিভড এ ইমেইল ফর অফার লেটার উইথ এ জয়েনিং মেইল। সো আই এম ফিলিং ভেরি হ্যাপি। আহেলী… লেটস উই গো টু ম্যারি নাউ। শতুদ্রু…ডো’ন্ট টক্ লাইক দিস প্লিজ। আহেলী… আরে আমি তো তোর সঙ্গে একটু লেগ পুল করছিলাম। শতুদ্রু… আমরা অবশ্যই বিয়ে করবো। আমাকে কয়েকটা মাস সময় দে একটু গুছিয়ে নিতে। দেন উই শ্যাল স্টার্ট আওয়ার ফ্যামিলি লাইফ। আহেলী… ওকে,আমার মাঝে মাঝে ভয় হয় তুই যদি কোন সুন্দরী মেয়ের পাল্লায় পরে আমাকে ল্যাংরি মেরে চলে যাস। শতুদ্রু… ডো’ন্ট টক্ রাবিশ। আমি কোথায় যাব তোকে ছেড়ে ? ডো’ন্ট থিঙ্ক সো। হঠাৎ শতুদ্রুর ফোনটা বেজে ওঠে। আহেলী একটা ফোন এসেছে আমি তোকে একটু পরে ফোন করছি প্লিজ । স্রোত… হ্যালো শতুদ্রু তাহলে তো ইওর প্রবলেম ইস সল্ভড। এবার জমিয়ে বিয়ে টা করে ফ্যাল। শতুদ্রু… ওহঃ শিট। সকালেও একটু শান্তি পেতে দিবি না মাইরি। স্রোত… আরে আমি কি তাই বলছি নাকি। লেট্ আস এরেঞ্জ এ পার্টি এন্ড এনজয় টুগেদার। শতুদ্রু..,..অবভিয়াসলি, একটা পার্টি থ্রো করা যেতেই পারে। লেটস গো, সবাইকে বলে দে। স্রোত… ওকে থাঙ্কস। আহেলী… তোরা নাকি মাল খেতে যাচ্ছিস ? শতুদ্রু… তোর কি সমস্যা বল তো ? আহেলী… তুই রেগে যাচ্ছিস কেনো ? আমি কি কোন সমস্যার কথা বলিছি ? আই এম জাস্ট টকিং দ্যাট আই শ্যাল জয়েন উউথ ইউ । শতুদ্রু… তুই তো যাবিই। আর তোকে ছাড়া আমি যাবো নাকি। নিহাও যাবে বলছে। আহেলী…. বাট নিহার লুল্লুরী তো যাবে না। তবে শ্রেয়ণ, রৌনক আর রিনিতা যাবে। শতুদ্রু… ওকে, লেট্ ইট বি ফিনিশড। যে যাবে যাবে, না যাবে তো না যাবে। আহেলী… তুই এতো আন ইজি ফিল করছিস কেনো রে ? শতুদ্রু… তোর মত একটা অপূর্ব সুন্দরী মেয়ের পাশে বসে যদি একটু নার্ভাস না হই তবে তো তোর সুন্দরের মর্যাদা দেওয়াই হবে না। বুঝলেন মেম সাহেব ? আহেলী… এতো ফেনাস না। শুধু হেয়ালি। শতুদ্রু…. একদমই না। পারফেক্টলি সেয়িং। আহেলী….ওকে, থাঙ্কস এ লট। শতুদ্রু…. চল আহেলী একটু ঘুরে আসি। আহেলী….. থাঙ্কস ফর সাজেশন। বাট হয়ার ডু ইউ ওয়ান্ট টু গো ? শতুদ্রু…. তোর কি ভয় করছে আমার সঙ্গে যেতে। আহেলী…আই এম নোট টকিং সো। শতুদ্রু… তাহলে যেখানেই নিয়ে যাবো সেখানেই যাবি। ওরা গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়ে । নল বনে যায় দুজনে। শতুদ্রু…আই হ্যাভ এ সারপ্রাইস ফর ইউ । আমি তোর চোখ বেঁধে দিচ্ছি। একটু পরে খুলে দেবো। তারপর তুই বলবি জায়গাটা কেমন । আহেলী… ওকে রাইট, ডু ইট। নল বনের চারি দিকে শুধু ভেরির জল আর জল মাঝখানে একটা বাঁশের মাচা বাঁধা আছে দ্বীপের মতো। মাছেরা মহা আনন্দে তাদের জলের সাম্রাজ্যে খেলা করছে। জোনাকির আলোতে ধরা পড়ছে তার দৃশ্য পট। একটা ছোট্ট নৌকোয় করে দ্বীপে গিয়ে বসে ওরা। শতুদ্রু আহেলীর চোখ খুলে দেয়। আহেলী…. আহঃ কি অসাধারণ!! সো বিউটিফুল! হাউ লাভিং প্লেস!! থ্যাংক ইউ। ইউ আর সো সুইট শতুদ্রু । শতুদ্রু… “এখানে উপস্থিত কালো আকাশের অসংখ্য তারা , জোনাকি পোকা আর আমরা। আকাশে মিটি মিটি জ্বলতে থাকা তারা আর জোনাকির মিটি মিটি আলো কেমন একটা কো-এক্সিসটেন্স হয়ে গেছে। হাউ বিউটিফুল আর দে !! আই এষ্টনাইশড!! জোনাকির আলো দেখে মনে হচ্ছে জলের উপরটাতেও একটা আকাশ আছে। অবশ্য মাছেরা আছে নিজেদের সাম্রাজ্যে। নিজের সাম্রাজ্যে প্রাণীরা যে কি সুখে বসবাস করে সেটা মাছেদের না দেখলে বুঝতে পারতাম না। মাছেদের এতো সুন্দর জলকেলি দেখে মন ভরে যায়। মনে হয় আমাদের জীবনটা এতো জটিল কেনো ? উই আর সো শ্রুট। ধূর্ত, কাপট তাই আমাদের এতো জটিলতা । ওরা অতি সরল। ” আহেলী…”এক বোতল বিয়ার আছে হাফ হাফ করে দু জনে ভাগ করে খাবো। নো হুইস্কি নো রাম। আর দুটো সিগারেট খাবো দুজনে ব্যাস। তারপর প্রকৃতির অপূর্ব শোভা উপভোগ করবো প্রাণ ভরে। জ্যোৎস্না না থাকলেও তারা আর জোনাকি পোকা কেমন একটা মায়াবী পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। প্রকৃতির এই অপরূপ মাধুর্য মানুষকে মাতাল করে তোলে। চির যৌবনা প্রকৃতির কত যে রূপ আছে সেটা মানুষ এখনো জেনে উঠতে পারেনি। একই জায়গায় একেক সময় একেকটা রূপ প্রকাশ করে প্রকৃতি। কি বিস্ময় !! আজ পর্যন্ত পৃথিবীর কত টুকু আবিষ্কার হয়েছে আর কতটা আবিষ্কার হতে বাকি আছে সেটাও মানুষ জানে না। থাঙ্কস গড। ” শতুদ্রু… এই যে মাই হিরোইন। এরকম সাইলেন্ট মুডে কেনো ? আপনি তো কথা বলতে ভালোবাসেন। তো কি হলো ? এনি থিঙ্ক রঙ ? নাকি প্রকৃতি বোবা করে দিয়েছে ? আহেলী… ইয়েস মাই বস। এনজয়, প্লিজ এনজয় দ্যা এভরি মোমেন্ট। চেটেপুটে উপভোগ কর। শতুদ্রু… আমার না কলেজ লাইফে ফিরে যেতে ইচ্ছা করছে। আহেলী….. ওকে, নো প্রবলেম। মেমোরি রিকল কর। শোনা আমাকে ফেলে আসা অতীত। হাউ হ্যাপি উই ওয়ার দেয়ার।
শতুদ্রু…ফার্স্ট ডে অফ মাই কলেজ, আমি প্রথম তোর সামনাসামনি হই। তুই আমাকে বল্লি… আই এম আহেলী, ইনফরমেশন টেকনোলজি, ফার্স্ট ডে ফ্রম বেথুন কলিজিয়েট স্কুল। নেম প্লিজ । আমি একটু হেজিটেট ফিল করছিলাম। তুই প্রম্পটলি বল্লি, তুই কি বোবা নাকি রে ? মুখ দিয়ে কথা বের হয় না। ভেরি সাঁই। তারপর আমি বললাম.. নো, নো,মাই নেম ইস শতুদ্রু, ইনফরমেশন টেকনোলজি ফ্রম এ ডি স্কুল, সল্টলেক । সেই প্রথম আলাপ। তারপর ক্লাসে এক সঙ্গে বসা। যেই আগে চলে আসতাম এক জন আরেক জনের জন্য কলেজ গেটে অপেক্ষা করা। ছুটির পর এক সঙ্গে ফেরা। মাঝে মাঝে এদিক ওদিক ঘোরাঘুরি করা। ফুচকা খাওয়া। মোমো খাওয়া। পাল্লা দিয়ে বাড়তে থাকলো মেলামেশা। ভালো লাগা, ঝগড়া করা। মারামারি করা। জীবনের উঠা পড়া, ঠিক বেঠিক বুঝতে পড়া। প্রপোজ করতে শেখা। আই লাভ ইউ বলতে শেখা। একে অপরের জন্য মন খারাপ করা। তোর সঙ্গে বন্ধুত্ব করার জন্য একবার এক সিনিয়রের হাতে মার খাওয়া। সিনিয়র আবির দা এক দিন তোকে দেখিয়ে বলে… নতুন সেমিস্টারের মেয়েটা খুব টুকটুকি। আমি বলি মানে ? মানে খুব কিউট। দেখে লোভ লাগে। ও এক দিন আমার উড বি হবে নিশ্চয়ই। ও ওর ফেসবুকে তোর একটা ছবি দেখিয়ে বলে আমার BBF। BBF মানে যে বেস্ট ফ্রেন্ড ফর এভার আমি সেটা বুঝতে পারি নি তখন। তাই আমার ভীষণ রাগ হয়ে যায়। আমি যা তা বলে দি আবির দাকে। আবির দা আরও দুজন সিনিয়রকে ডেকে আমাকে খুব মারে। কত ঘটনার সাক্ষী কলেজ লাইফ । জীবনের মোর ঘোরাবার পিরিয়ড। এক বার আমার বার্থ ডে গিফট দিচ্ছিলিস না তুই। আমি জোর করে তোর ব্যাগ থেকে কেড়ে নিয়েছিলাম। আমি জানতাম যে তুই কিছু একটা এনেছিস। তুই বলেছিলি.. “তোর জন্য দামি গিফট কিনতে ইচ্ছা করছিলো না। একশো টাকা দিয়ে একটা বই কিনে সুন্দর করে নাম লিখে দিয়েছি।” বইটার দাম কম হলেও আমার খুব পছন্দ হয়েছিল। মাঝ খানে আমি অন্য একটা গ্রুপে যুক্ত হয়ে গিয়েছিলাম। তাতে তোর মন খারাপ হয়ে গিয়েছিল। তুই অনেক দিন কথা বলিস নি আমার সঙ্গে। আমি এক দিন ফোন করলে তুই বলেছিলি, আমাকে মনে পড়েছে বুঝি ? আমি বলেছিলাম তোকে না আমি কাকি মার সঙ্গে কথা বলবো। তুই বলেছিলি তাহলে আমার ফোনে কেনো কাকি মার ফোনে কল কর। তুই ফোনটা ছেড়ে দিতে চাইছিলি ? আমি বললাম না না। তারপর তুই ফোনটা কেটেই দিলি। আমার মন খারাপ হয়ে গেলো । একটু পরে তুই ভিডিও কলিং করলি। আমি বললাম কি রে আমাকে দেখতে ইচ্ছা করছে ? তুই… না না তোর মত একটা জাত খচ্চর ছেলেকে কেনো দেখতে ইচ্ছা করবে। আমি… ভিডিও কলিং করলি যে। তুই…এমনি। ঐ গ্রুপে গার্ল ফ্রেন্ড পাস নি দু এক জন। চিক্কি চামেলী কেউ নেই। আমি… না রে। এখানে সব প্লাস্টিক । তুই… জানি তো। দুটো একটা ল্যাংরি খেয়ে দাঁত মুখ ভাঙ তারপর বুঝবি আমার মর্ম। শতুদ্রু… প্লিজ তুই আমাকে আনব্লক করে দে। আহেলী….আগে তুই আমার সাথে দেখা কর দেন উই শুড টক্।
এরপর শতুদ্রু এক দিন আহেলীদের বাড়ী যায়। গিয়ে আহেলীর সামনে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে। আহেলী… কি ট্যাংকি খেয়ে এসেছিস তো ? এই জন্য বোবা হয়ে গেছিস। আরে কিছু তো বল। শতুদ্রু… কি বলবো ? আহেলী…. আমাকে কি তোর কিছুই বলার নেই। শতুদ্রু…. বুঝতে পারছি না কি বলতে হবে ? আহেলী….এটাও কি তোকে আমায় শিখিয়ে দিতে হবে ? তুই বুঝিস না আমি তোর কাছ থেকে কি শুনতে চাইছি। শতুদ্রু… আমার মাথা কাজ করছে না। আমি আসছি।
তার আগেই আহেলী চলে যায়। কিছুটা গিয়ে আবার পিছন দিকে ফিরে এসে শতুদ্রুকে জাপ্টে ধরে কেঁদে ফেলে। শতুদ্রুও আহেলীকে জড়িয়ে ধরে। একটু বাদে দুজনই লজ্জা পেয়ে যায়। শতুদ্রু বাড়ী চলে যায়। বাড়ী গিয়ে আহেলীকে ফোন করে। আহেলী…চুপ করে আছিস কেনো ? কিছু বলতে চাইছিস তো বল। শতুদ্রু… কি বলবো। আহেলী…. যে কথাটা আমি শুনতে চাইছি তুই সেটাই বলবি। শতুদ্রু… আমি তোকে অনেক অনেক ভালোবাসি। ভীষণ ভালোবাসি। আমি জানি তুইও আমাকে অনেক ভালোবাসিস। আহেলী… হ্যাঁ ভীষণ ভীষণ ভালোবাসি আমি তোকে। তোকে ছাড়া আমি থাকতে পারবো না। শতুদ্রু… আমিও তোকে ছাড়া বাঁচতে পারবো না। তোর মধ্যে কেমন একটা বৌ বৌ ভাব আছে। আহেলী….তুই একটা বোকার হদ্দ। গোবর গনেশ। কিচ্ছু গুছিয়ে বলতে পারিস না।
শতুদ্রু… হ্যাঁ, পারি না তো ? আহেলী… তোদের ছেলেদের এই একটা বাজে দোষ মেয়েদের সামনে আসলে মুখ দিয়ে কথা বের হয় না। তোতলাতে থাকিস। বি স্মার্ট শতুদ্রু। ইউ আর এ M Tech ইঞ্জিনিয়ার। ভুলে যাস না।
এই ভাবে বেশ কয়েক মাস কেটে যায়। ইতি মধ্যে আহেলীর একটা সম্মন্ধ আসে। পাত্র পক্ষ আহেলীকে দেখে পছন্দ করে। তারা খুব তাড়াতাড়ি বিয়েটা সেরে ফেলতে চায়। ছেলে বিয়ে করে বৌ নিয়ে আমেরিকা চলে যাবে তার কর্ম ক্ষেত্রে। আহেলী দেখা করে শতুদ্রুকে বিষয়টা বলে। শতুদ্রু কথাটা শুনে চুপ হয়ে যায়। আহেলী… কিরে একটু আগেই তো চিল মুডে ছিলি। তো এখন চুপ মেরে গেলি কেনো ? তুই আমাকে ভালোবাসিস ? এই ছেলে, এই আমার চোখের দিকে তাকিয়ে বল যে ভালোবাসিস। একদম চুপ করে থাকবি না। আমি জানি তোর অনেক কিছু বলার আছে। শতুদ্রু… হ্যাঁ,হ্যাঁ কত বার বলতে হবে যে আমি তোকে ভালোবাসি ? আহেলী… তুই আমার বাবার কাছে চল। বাবাকে বলে দে এই কথাটা। শতুদ্রু…কাল তোর বাবার সাথে কথা বলি ? আহেলী… কেনো আজ কি হয়েছে ? আমার বাবা কি বাঘ না ভাল্লুক যে তোকে খেয়ে ফেলবে ? শতুদ্রু… আমার কেমন কেমন লাগছে। আহেলী… কিচ্ছু লাগছে না। তুই পারবি। আমি তো আছি তোর সঙ্গে। আমার বাবা খুব ভালো একজন মানুষ। আর তুই তো যোগ্য ছেলে। তুই যদি স্মার্টলি না বলতে পারিস তো কে বলতে পারবে ? শতুদ্রু….ঠিক আছে চল। আহেলী…. বিয়েটা হয়ে গেলে উই শ্যাল বি হ্যাপি। শতুদ্রু…. খারাপ সময়ে আমাকে টেক কেয়ার রাখার জন্য থাঙ্কস।
শতুদ্রু আহেলীর বাবার কাছে যায় এবং স্মার্টলি বলে যে সে আহেলীক ভালোবাসে এবং বিয়ে করতে চায়। আহেলীর বাবা শতুদ্রুর কথা শুনে একটুও অবাক হন নি। শতুদ্রুর সম্মন্ধে উঁনি পুরটা জানেন। তাই শতুদ্রুর মতো পাত্র পেয়ে তিনি খুশিই হয়েছেন। তিনি বলেন সে তো খুব ভালো কথা বাবা কিন্তু তোমার বাবা মা কি আহেলীকে মেনে নিতে পারবেন ? শতুদ্রু… কাকা বাবু ঐ সব নিয়ে আপনি একদম চিন্তা করবেন না। আমার বাবা মা আহেলীকে চেনেন এবং খুব পছন্দ করেন। বাকিটা আমি ম্যানেজ করে নেবো।
এরপর এক দিন আহেলীর বাবা মা বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে শতুদ্রুদের বাড়ী যান। শতুদ্রুর বাবা মায়ের মত জানতে। শতুদ্রু আগে থেকেই তার বাবা মাকে আহেলীর বাবা মায়ের আসার কথা বলে রেখেছিল। কি পারপাসে ওনারা আসবেন সেটা কিছুটা হিন্টস দিয়ে রেখেছিল। তাই কোন সমস্যা হয় নি কোন তরফ থেকেই। উভয় পক্ষের মত নিয়ে শতুদ্রু আর আহেলীর বিয়ে ঠিক হয়ে যায়। সবারই বক্তব্য তাদের একটা মাত্র সন্তান এবং সামর্থও যখন আছে তখন একটু আরম্ভর করেই বিয়ের অনুষ্ঠান করতে চান। সেই অনুযায়ী সামাজিক বিয়ের অনুষ্ঠানের এক সপ্তাহ আগে আইনি বিয়েটা ম্যারেজ অফিসারকে বাড়ীতে ডেকে এনে সেরে নেন দুই দম্পতি । তাতেও প্রায় শ খানেক লোক খেয়েছিল। তারপর পুরোহিত দর্পন অনুযায়ী নির্ধারিত দিনে পুরোহিত ডেকে মন্ত্র পরে শাক বাজিয়ে উলুর ধ্বনি দিয়ে মালা বদল করে সামাজিক বিয়ে হয়ে যায় আহেলী আর শতুদ্রুর। অতিথি আপ্যায়নের মধ্যে দিয়ে জাঁকজমক করে যথাযত মর্যাদা সহকারে বিয়ের অনুষ্ঠান পালন করা হয়। বিয়েতে কনের পরিবার তাদের সাধ্যমত উপহার সামগ্রী দিয়েছে। সেটা নিয়ে পাত্রর পরিবার কোন ত্রুটি ধরতে পারেনি। লাভ ম্যারেজে পাত্র পাত্রীর মানসিক প্রস্তুতির বিষয়টা তেমন একটা থাকে না যেহেতু তারা আগে থেকেই উভয়ে উভয়ের পরিচিত তাই। তাহলেও বিয়ের একটা চাপ থেকেই যায়। বিশেষ করে মেয়েটির একটু বেশি চাপ থাক। কারণ তাকে একটা পরিবেশ থেকে এসে আর একটা পরিবেশে এসে মানিয়ে চলতে হয়। দুটো পরিবেশের সংস্কৃতি গত তফাৎ থাকলে সেটাকে অ্যাডজাস্টমেন্ট করতে হয় তাকে। যতই ভালোবাসার বিয়ে হোক না কেনো কিছু চাপ থেকেই যায়। বিয়ের আগে আর বিয়ের পরে দুটো ব্যবস্থার মধ্যে বিস্তর ফারাক আছে।
বিয়ের পরের দিন বিকেল বেলা নববধূকে নিয়ে বরের বাড়ী ফেরার পালা। প্রচন্ড গরমে ঘেমে নেয়ে একসা নববধূ আহেলী। মুখের ফেসপাউডার স্যাৎস্যাতে হয়ে গেছে, কপালের চন্দনের ফোটা ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। কপালের সিঁদুর লেপ্টে গেছে। মাথার উপরের শাড়ির ঘোমটা অনাভ্যাসে বার বার সরে যাওয়ায় মুখের উপর চুল উড়ে এসে পড়ে সব সাজ নষ্ট করে দিয়েছে। কিন্তু তাতেও শরীরের সতেজতা একটুও ম্লান হয় নি আহেলীর। সদ্য ফোটা গোলাপের পাঁপড়ির মত সুমিষ্টি শোভা বিস্তার করে পরিমন্ডলকে আকৃষ্ট করে রেখেছে। বরের বাড়ীর উপস্থিত সকলের একটাই কথা বৌ এনেছে বটে শতুদ্রু। বাড়ী পৌঁছে তাড়াতাড়ি নববধূকে বরণ করে ঘরে নিয়ে গিয়ে বসিয়ে এ সি মেশিনটা চালিয়ে দেওয়াতে একটু স্বস্তি । শ্বশুড়ি মা ও আরও দু এক জন মহিলা মিলে বরণ করার কাজটা দ্রুততার সঙ্গে সম্পন্ন করতে পেরেছেন। চেনা ঘরটাকে আবার নতুন করে চিনতে হচ্ছে। বিরাট বড় ঘরটাকে মনে হচ্ছে একটা খোলা আকাশ। ঘরের ভিতর ঢুকে সোফায় বসে দক্ষিণ দিকের কাঁচের জানালাটা খুলে দিলে হুড়হুড় করে বাইরের ঠান্ডা বাতাস ঘরের ভিতর প্রবেশ করে ঘর্মাক্ত শরীরটাকে জুড়িয়ে দেয়। ঘরের আরেক দিকের দেওয়ালে কোন শল্পীর দক্ষ হাতে আঁকা রয়াল বেঙ্গল টাইগারের একটা জীবন্ত ক্যানভাস । অসাধারণ শিল্প নৈপুণ্য। একটা কৃষ্ণচূড়া গাছের মাথা পূর্ব দিকের দোতালার জানালা পর্যন্ত উঠে এসেছে। ঐ গাছটার ডাল পালার ফাঁকা দিয়ে ভোরের সূর্যো আমাদের শোবার ঘরে প্রবেশ করে ঘুম ভাঙাবার বার্তা পৌঁছে দেয় । ঘরের পশ্চিম দিকের দেওয়াল জুড়ে আছে একটা ওয়ার্ড ড্রপ। মাঝখানে সুন্দর ডিজাইন করা একটা ডিভাইন খাট রাখা আছে। ঘরের ছিলিং টা যেন একটা সৌরজগৎ । ঘরের ভিতর রজনী গন্ধা ও গোলাপের সুমিষ্ট সুবাস ভেসে বেড়াচ্ছে। একটা মাতাল করা আবেশ যেন ঘরটার মধ্যে বিরাজ করছে। আজ তাদের ফুল সজ্জা। এই রাতটা প্রতিটি মেয়ের জীবনের একটা সেরা রাত। এই রাতটার জন্য সে জীবনের এতো গুলো বছর অপেক্ষা করে ছিল । এক কথায় বিয়ে উপলক্ষে ঘরটাকে শতুদ্রু পরিপাটি করে সাজিয়েছে। ঘরের ভিতর খাটে বসে আছে আহেলী। ভয় আর আনন্দ মিশ্রিত নানা ভাবনা তার মনের অলিন্দে ঘুরে বেড়াচ্ছে। একটু বাদে ঘরে এসে ঢুকলো তার স্বপ্নের পুরুষ শতুদ্রু। তার পাশে বসে তার হাতটা হাল্কা করে ধরে একটু উঁচুতে তুলে একটা চুমু দিল পরম যত্নে। তাতে আহেলীর সারা শরীরে একটা শিহরণ খেলে যায় মুহূর্তের মধ্যে ।
বিয়ের পর শ্বশুর বাড়ীর সকলকে আপন করে নেওয়া এবং সকলের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখার বিষয়টা নিয়ে মেয়েদেরকেই একটু বেশি ভাবতে হয়। মানুষ সারা জীবন সুখে শান্তিতে কাটাবার জন্য বিয়ে করে কিন্তু সবার জীবনে সেটা সম্ভব হয় না। না না কারণে অসন্তোষ দানা বেঁধে তিক্ততা আনে সম্পর্কের মধ্যে। আর বিয়ের মধ্যে দিয়ে প্রেমের পরিসমাপ্তি ঘটে। ভালোবাসার মৃত্যু হয় । স্বামী স্ত্রীর একে অপরের প্রতি দায়িত্ব বারে। ইচ্ছা না হলেও একে অপরকে সহানুভূতি দেখাতে হয়। সম্পর্ক ধরে রাখার জন্য অনেক সময় ইচ্ছার বিরুদ্ধে অনেক কিছুই করতে হয়। ইচ্ছার বিরুদ্ধে চলতে গিয়ে নিজের ইচ্ছার মৃত্যু ঘটাতে হয়, স্বাধীনতাকে বিসর্জন দিতে হয়। ইচ্ছার বিরুদ্ধে চলতে চলতে মানুষ এক সময় হাঁপিয়ে ওঠে। স্বামী স্ত্রীর মধ্যে চুলচেরা হিসাব শুরু হয়। হিসাব একটু কম বেশি হলেই সম্পর্কের অবনতি ঘটতে থাকে, তিক্ততা শুরু হয়। একটা সম্পর্ক অনেক দিন ধরে চলার পর তার মধ্যে তিক্ততা বাসা বাঁধতে থাকে। সম্পর্ক টলে যায় ঝড়ের সমুদ্রে পানসি নৌকোর মতো। দম বন্ধ করা এক পরিস্তিতির সৃষ্টি হয়। বিয়ে এমন একটা ব্যবস্থা তার মধ্যে দিয়ে মেয়েটি বুঝতে পেরে যায় যে তার কোন নিজস্ব পরিচয় বা ঠিকানা নেই। জীবনের প্রথম ভাগ বাবার পরিচয়ে বাবার ঠিকানায় কাটে আর জীবনের পরবর্তী ভাগ স্বামীর পরিচয়ে স্বামীর ঠিকানায় কাটে । এমন কি নারীর নিজের কোন দেশও নেই। ঠিক যেমন একটা চারা গাছকে তার জন্ম স্থান থেকে তুলে এনে অন্য কোন জায়গায় বসানো হলে যেমন হয় ঠিক তেমনটিই ঘটে নারীর জীবনে। এর মধ্যে দিয়ে নারী বুঝতে পারে সমাজে পুরুষের সাথে তার অবস্থান গত পার্থক্য। তবে অনেক নারীরই এই বিষয়ে কোন জিজ্ঞাসা নেই। সমাজকেও দাঁড়িয়ে থাকতে হবে এই বিষয়ে নারীর সামগ্রিক বোধ জাগ্রত না হওয়া পর্যন্ত উন্নততর সমাজ ব্যবস্থায় পৌঁছাবার জন্য। কুসংস্কার যেমন মানুষের মনে বাসা বেঁধে আছে যুগ যুগ ধরে তেমনি বিবাহ ব্যবস্থাও টিকে আছে সমাজে তার প্রয়োজন আছে কি না আছে সে কথা বিবেচনা না করেই। প্রতিটি ব্যবস্থারই একটা নিদৃষ্ট আয়ুষ কাল থাকে। আয়ুষ কাল শেষ হয়ে গেলে সেই ব্যবস্থা বাতিল হয়ে যায়। বিবাহ ব্যবস্থারও হয়তো প্রয়োজন ফুরিয়ে এসেছে কিন্তু তবুও টিকে আছে তার ক্ষয়েষ্ণু চেহারা নিয়ে। তাই আজ “লিভ টুগেদার ” নামে একটা নতুন ব্যবস্থা চালু হয়েছে নারী পুরুষের এক সঙ্গে কিছু কাল থাকার অঙ্গীকার নিয়ে। রি-ম্যারেজ সিস্টেমও চালু আছে সমাজে। প্রথম প্রথম এই সব ব্যবস্থাকে সমাজ ভালো চোখে দেখতো না। এখন আর কু দৃষ্টিতে দেখে না। মেনে নেবার অভ্যাস তৈরি হয়ে গেছে। সংসার হলো বিরাট বড় একটা ক্রীড়াঙ্গন। এখানে নিজের মতো করে খেলতে হয়। বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ভাবে। যখন যেটা দরকার।
শ্বশুর বাড়ী এসে আহেলী খুব তাড়াতাড়ি মানিয়ে গুছিয়ে নিয়েছে। যেহেতু শ্বশুর বাড়ীর সবাই আগে থেকে ওর পরিচিত ছিল তাই এই কাজে ওকে খুব একটা বেগ পেতে হয় নি। খুব সহজেই ও এই বাড়ীর সবার প্রিয় পাত্রী হয়ে উঠতে পেরেছে। আহেলী ও শতুদ্রু সুখের নীর রচনা করতে পেরে খুব খুশি। ওদের এই সুখের জীবনের তিন বছরের মাথায় ওদের ঘর আলো করে আসে মেয়ে সুতন্দ্রা। সুতন্দ্রা ভীষণ কুউট একটা মেয়ে। সুতন্দ্রা যেন ওদের সুখের সংসারে উপছে পড়া বান। দাদু ভীষণ ভালোবাসে সুতন্দ্রাকে। ঠাম্মি যদিও আশা করে ছিল বংশের প্রদীপ আসবে তাদের ঘরে আলো দিতে কিন্তু কিছু করার নেই। জন্ম মৃত্যু বিয়ে এই গুলো মানুষের হাতে নেই। মনে না নিলেও মেনে নিতে হয়। ভালোবাসা কারো জীবনেই জীবন ভর থাকে না। একটা নিদৃষ্ট সময়ের পর ভালোবাসা চলে যায়। কারো জীবনের প্রথম ভাগে ভালোবাসা থাকে আবার কারো জীবনে মাঝ পথে ভালোবাসা আসে আবার কারো জীবনের শেষ ধাপে ভালোবাসা আসে। আহেলী আর শতুদ্রুর ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয় নি। প্রথম জীবনটা ভালোবাসায় ভর করে বেশ সুখে শান্তিতেই কেটে যায় ওদের। কোন অভাব অভিযোগ ছিল না। ছিল না কোন টানাপোড়েন । দুঃখের বেসাতি বলতে যা বোঝায় তার মুখ ওরা দেখেনি কোন দিন । জানেনা অশান্তি কি জিনিস। মন কষাকষি কি জিনিস সেটাও ওরা এতো দিনের জীবনে বুঝতে পারেনি। মন রাখার দায়ও নিতে হয় নি।
কিন্তু একটা কথা আছে না,”চির দিন কাহারো সমান নাহি যায়।” সেই রকম ভাবে আহেলীদের জীবনেও একটা সময়ের পর সুখের তরী একটু একটু করে ডুবতে শুরু করে । কখন যেন ভাটার টান এসে পড়েছিল ওদের সুখের জীবনে। সেটা ওরা টের পায় আহেলীর বাবার এক্সিডেন্ট এর মধ্যে দিয়ে। আহেলীর বাবা এক দিন বাথ রুমে পড়ে যান। ডান পায়ের হাঁটুতে চোট পান। দাঁড়াতে পারেন না পা সোজা করে। ডাক্তার বাবু এক্সরে প্লেট দেখে বললেন হাঁটুর মালাই চাকি ভেঙে গেছে। অপারেশন করাতে হবে। অপারেশন করানও হয় কিন্তু অপারেশন সাকসেসফুল হয় না। তার ফলে ওনার হাঁটা চলা বন্ধ হয়ে যায় চির দিনের জন্য । বিছানায় শুয়ে শুয়ে ওনার জীবন কাটে। ওনাদের তো সন্তান ঐ একটাই, আহেলী। তাই আহেলীকে বাবার দেখাশোনা, আর্থিক দায়িত্ব সবই পালন করতে হয় । তার ফলে আহেলীর শ্বশুর বাড়ীর লোকদের জন্য যেমন সময়ের বরাদ্দ কমাতে হয়েছে তেমনি অর্থের যোগানও এই পরিবারে কমে গেছে। এটা আহেলীর শ্বশুর বাড়ীর লোকেদের পক্ষে একটা অসুবিধা সৃষ্টি করে। দিনের পর দিন এই অসুবিধা চলতে থাকে। আর যখন নিদৃষ্ট হয়ে যায় যে আহেলীর বাবা আর ভালো হবেন না তখন শ্বশুর বাড়ীর লোকেরা আহেলীর এই দায়িত্ব পালনকে সহজ ভাবে মেনে নিতে পারেন নি। বিভিন্ন ভাবে তারা এর বিরূপ মনোভাব প্রকাশ করতে থাকেন। তারা এর জন্য আহেলীর দোষ ত্রুটি খুঁজে খুজে বার করতে থাকেন। যেটা এর আগে তাদের চোখে পড়তো না। কথায় আছে না, যারে দেখতে নারি তার চলন বাঁকা। আহেলীরও হলো সেই অবস্থা। কারণে অকারণে আহেলীর বিভিন্ন বিষয় নিয়ে সরব হন শ্বাশুড়ি মা । প্রথম দিকে আহেলীর শ্বাশুড়ি মা মুখ ঝামটা দিতে শুরু করেন বৌ মাকে। শ্বশুর মশাই চুপচাপ থাকতেন। এরপর শ্বাশুড়ি মায়ের সাথে শ্বশুর মশাইও সরব হন। আহেলী ওনাদেরকে পরিস্থিতির গুরুত্ব বোঝাবার চেষ্টা করলে ওনারা বিরক্ত হন। প্রথম দিকে শতুদ্রু আহেলীকে সাপোর্ট দিলেও পরে মা বাবার অসন্তোষ দূর করার জন্য শতুদ্রুও আহেলীর বিরুদ্ধে চলে যায়। আহেলী শ্বশুর বাড়ীতে পুরোপুরি একা হয়ে যায়। তার নিজেকে একটা পরগাছার মতো মনে হয়। তার অসুবিধা বোঝার মতো কেউ থাকলো না আর। এবারের ম্যারেজ ডে তে আহেলী তাড়াতাড়ি করে অফিস থেকে বাড়ী এসে ভালো মন্দ রান্না করে। এক সঙ্গে বসে সবাই একটু আনন্দ করে খাবে বলে। সেই দিন শতুদ্রু অনেক রাত করে বাড়ী ফেরে। আহেলী মন খারাপ করে জানতে চায় দেরি হলো যে ? শতুদ্রু কোন উত্তর দেয় না। চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে। আহেলী বলে… তাড়াতাড়ি ওয়াশরুম থেকে ফ্রেশ হয়ে আয় আমি খাবার রেডি করছি টেবিলে। শতুদ্রু… আমি খেয়ে এসেছি। আহেলী… খেয়ে এসেছি মানে ? আমি তো রান্না করেছি। শতুদ্রু… রান্না করেছিস তো খেয়ে নে। আহেলী…আমি কি আমার একার জন্য রান্না করেছি নাকি ? তুই জানিস না আজ কত তারিখ ? আজ আমাদের কি… ? ম্যারেজ ডে ও ভুলে গেলি ? শতুদ্রু… আমার ঐ সব আর মনে রাখতে ইচ্ছা করে না। আহেলী… ওকে ফাইন, নো প্রবলেম। সবাই চাইছে গেট রিড অফ ফ্রম মি। আহেলীর মনে পরে যায় এর আগের ম্যারেজ ডে গুলোর কথা। প্রতি ম্যারেজ ডে তে শতুদ্রু তাড়াতাড়ি করে বাড়ী এসে কলিং বেল বাজাতো। আমি দৌড়ে এসে দরজা খুলে দিতেই ও আমার চোখের দিকে এক দৃষ্টে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকতো তারপর একটা রজনী গন্ধা ফুলের তোরা আমার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলতো… হ্যাপি ম্যারেজ ডে মাই সুইট আহেলী বা বলতো আমার ভালোবাসার আহেলী। তারপর একটা সোনার গহনা ব্যাগ থেকে বের করে আমার হাতে তুলে দিত। আমি আগে বাড়ী এসে ভালো মন্দ রান্না করে রাখতাম টেবিলে বসে সেই খাবার খেতে খেতে কত হাসি ঠাট্টা করা হতো। আজ সে সব কোথায় ? হারিয়ে গেছে মরুভুমিতে । মরু ঝড়ে উড়িয়ে নিয়ে গেছে কোথায় তা কেউ জানি না। এমত অবস্থায় আহলীর পক্ষে সম্পর্ক ধরে রাখা অসম্ভব হয়ে যায়। আস্তে আস্তে তিক্ততা বাড়তে থাকে। মনোমালিন্য, বাত- বিতন্ডা শুরু হয়। তর্কাতর্কি খামচাখামচি বাড়তে থাকে। কেউ কারোকে আচড়াতে কামড়াতে ছাড়ে না। নখ দাঁত বেরিয়ে আসে দুজনের তরফ থেকেই। তিন জনের আক্রমণ সামলাতে হয় আহেলীকে। জুজে উঠতে না পেরে মানসিক ভাবে বিধ্বস্ত হয়ে পরে আহেলী। সম্পর্ক হাল্কা হতে থাকে। দুজনেরই মানসিক ক্ষত নিরাময় করার জন্য দ্বিতীয় সম্পর্কের সাপোর্ট নেবার কথা খুব করে মনে আসতে থাকে। দুজনেই তাদের অফিসে পছন্দের মানুষ খুঁজে পেয়ে যায়। তার সঙ্গে কথা বলে কিছুটা হলেও নিজেকে হাল্কা করতে পারে। নিজেকে হাল্কা করার জন্য মনের কথা বলতে বলতে মনের গভীরে দ্বিতীয় সম্পর্কের সমীকরণটা একটু একটু করে তৈরি হয়ে গাঢ় হতে থাকে। সম্পর্কের শিকড় অনেক গভীরে চলে যায়। ডাল পালা বেড়ে বেড়ে বিরাট বড় একটা বৃক্ষের আঁকার ধারণ করে। এক সময় ওদের মনে হয় এই তিক্ততা নিয়ে এক ছাদের তলায় এক বিছানায় থাকাটা একটা যন্ত্রনার কাজ। সম্পূর্ণ অচেনা দুজন নারী পুরুষ এক বিছানায় শুয়ে থাকলে যেমন অস্বস্তি বোধ হয় ওদের অবস্থাও ঠিক সেই রকম হয়। আজ আর ছোঁয়া লেগে কারো শরীরেই উত্তেজনা জাগে না। শরীরটা যেন পানসে, জোলো, পরিত্যক্ত অনুর্বর জমিতে পরিণত হয়ে গেছে। শত ঘর্ষণেও আগ্নেয় গিরির লাভা আর গলে না। তুহিন শীতল পাথর হয়ে গেছে শরীরের সেনসেটিভ অঙ্গ প্রত্যঙ্গ গুলো। কথা নেই বার্তা নেই, টান নেই, একে অপরের প্রতি সহানুভূতি নেই, খোঁজ খবর দেওয়া নেওয়া নেই। একে চলা বলা যায় না,চালিয়ে নেওয়া বলা যেতে পারে। এই অবস্থায় এক সঙ্গে থাকা খুব কষ্টকর একটা বিষয়। তাই এই সম্পর্ক ধরে রাখা মানে যন্ত্রনা বাড়ানো ছাড়া আর কিছুই না। অবশেষে ওরা ঠিক করে যে ওরা সেপারেশন নিয়ে নেবে। তার জন্য মানসিক প্রস্তুতি নিতে শুরু করে । একটা সময়ের পর ওরা বুজতে পারে যে ওদের এবার বিচ্ছেদ নিয়ে নেওয়া দরকার। সেই মতো ওরা উকিলের কাছে যায় মিউচুয়াল ডিভোর্স করার জন্য। উকিল বাবু বললেন… তোমাদের ভালোবাসার বিয়ে। ভালোবাসার বিয়েতে,ভালোবাসা বিয়ের কিছু দিন পর থেকে হাল্কা হয়ে যেতে থাকে। এক সময়ে তা শেষ হয়ে যায়। আচ্ছা কে আগে প্রপোজ কিরেছিলে ? শতুদ্রু…আমি ওকে ভালোবাসি এই কথাটা বলতে সাহস পাইনি। কারণ ও এতো সুন্দর একটা মেয়ে তাই ভয় হতো যদি ও রিফিউজ করে দেয় । তারপর এক দিন ওই আমাকে প্রপোজ করে। ও বুঝতে পেরেছিল যে আমি ওকে কিছু বলতে চাই কিন্তু বলতে পারছে না। তখন আমার সাহস বেড়ে যায়। উকিল বাবু ওদের বোঝালেন যে এত সুন্দর অতীত যাদের তাদের ডিভোর্স না হওয়া উচিৎ। অতীতই জীবনের ভীত। তার উপর দাঁড়িয়ে থাকে বর্তমান ও ভবিষ্যৎ। একটা গাছ যখন চারা থাকে তখন শিকড় তার ভীত । তার উপর দাঁড়িয়ে গাছটা বড় হয়। তারপর আস্তে আস্তে ডাল পালা মেলে যখন অনেক বড় হয়ে যায় তখন শিকড় হয়ে যায় তার অতীত। এবার গাছটা যদি ভাবে তার অতীত বা শিকড়কে বাদ দিয়ে সে আজ বাঁচতে পারবে। না পারবে না । সেরকম ভাবে তোমাদেরও অতীত ভালো তাই তোমাদের উচিৎ ডিভোর্স না নেওয়া। কিন্তু ওরা মানতে চাইলো না। অবশেষে উকিল বাবু ওদের হয়ে মিউচুয়াল ডিভোর্সের জন্য কোর্টে ফাইল করে দিলেন । নিদৃষ্ট ওদের দিনে বিচ্ছেদ হয়ে যায় । কিন্তু বাচ্চাটাকে নিতে রাজি হয় না কেউই। ওকে নিলে দ্বিতীয় সম্পর্কের মধ্যে সমস্যা সৃষ্টি হবার ভয় আছে। তাই ওরা কেউ মেয়েকে নিল না। দু বছরের বাচ্চাটাকে ওরা একটা অনাথ আশ্রমে দেয়। তার দু বছর পর সুতন্দ্রাকে একটা নিঃসন্তান ডাক্তার পরিবার দত্তক নিয়ে নেন। ডাক্তার বাবু এবং ওনার স্ত্রী সুতন্দ্রাকে খুব আপন করে নেন। নিজের গর্ভজাত মেয়ে বলেই মেনে নেন। সুতন্দ্রাও ডাক্তার বাবু ও ওনার স্ত্রীকে বাবা মা বলতে অজ্ঞান। তাদের আদর যত্নে সুতন্দ্রা একটু একটু করে বড় হতে থাকে। তাদের আদপ কায়দা ও শিষ্টাচার আয়ত্ব করে নেয় সুতন্দ্রা।
বিচ্ছেদের পর রি-ম্যারেজ সেরে ফেলার জন্য ওরা তৎপর হয়ে ওঠে। আগের সম্পর্কটাকে যত তাড়াতাড়ি মুছে ফেলা যায় ততই ভালো বলে মনে হয় ওদের। ঐ সম্পর্কটা যেন বজ্রর মতো বুকে বিধছে । কিন্তু ভুলতে চাইলেই যে ভোলা যায় এমন না। শিকড় থেকে গাছকে আলাদা করা যায় না।সাব কনসাস মাইন্ডে রয়ে যায় স্মৃতি হয়ে। একাকী নীরবে মনের গভীরে চুইয়ে চুইয়ে পড়তে থাকে স্মৃতির পাত্র ফুটো হয়ে। সম্পর্কের ভীত কতটা মজবুত ছিল সেটাই এখন বার বার করে মনে আসে । ঐ সম্পর্ক টাকে কি পুরোপুরি উপরে ফেলতে পারবে ওরা ? পাড়া যায় না ? এখনকার জেনারেশন সম্পর্ক নিয়ে বেশি ভাবতে চায় না। জীবনটাই তো আসল তাই সম্পর্ক নিয়ে বেশি চিন্তা ভাবনা করতে এখনকার জেনারেশন রাজি না। জীবনের জন্য সম্পর্ক। সম্পর্কের জন্য তো আর জীবন না। কিন্ত সম্পর্ককে মজবুত করতে না পারলে জীবনের মাধুর্য আসে না। জেনারেশন থেকে জেনিরেশনের মধ্যে চিন্তা ভাবনার পরিবর্তন হয়,একই থাকে না। সেটাই হয়তো এই জেনেরাশনের ক্ষেত্রে ঘটছে। তাই এই সময়ে বিচ্ছেদের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। সামান্য সামান্য কারণে এরা সেপারেশন নিয়ে নেয়। তা নিয়ে অবশ্য কারো হেলদোল নেই। যতক্ষণ আছে আছে না আছে তো না আছে। সম্পর্ক যে স্বার্থর উপর দাঁড়িয়ে থাকে সেটা এরা তলিয়ে ভাবতে চায় না। উভয়ের স্বার্থ রক্ষা না হলে সম্পর্ক টিকিয়ে রাখা যায় না। স্বার্থটা উপর থেকে দেখা যায় না কিন্তু ভিতরে ভিতরে লাভ ক্ষতির হিসাব চলতে থাকে অবিরাম। ওরা রি-ম্যারেজ করে স্বাভাবিক জীবন যাপন শুরু করে। নতুন পরিবারে ওদের জীবন খুব সুন্দর ভাবে শুরু হয়। সুতন্দ্রা ডাক্তার পরিবারে যথেষ্ট ভালো ভাবে পড়াশুনা করে মানুষ হচ্ছে। সে B Sc পাশ করে নার্সিং কোর্স নিয়ে পড়াশুনা করে। আহেলীর ছেলে উচ্চমাধ্যমিক পড়তে ব্যাঙ্গালোর যায়। শতুদ্রর কোন সন্তান হয় নি দ্বিতীয় পক্ষের ঘরে। দেখতে দেখতে ছেল মেয়েরা সব বড় হয়ে যায় । সাথে সাথে বাবা মায়েদেরও বয়স বাড়তে থাকে । সুতন্দ্রা নার্সিং কোর্স কমপ্লিট করে একটা সরকারি হসপিটালে নার্সিং স্টাফ হিসাবে জয়েন করে। আহেলীর ছেলে ব্যাঙ্গালোরেই রয়ে যায় ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার জন্য ।
সুতন্দ্রা চাকরির সাথে সাথে একটা NGO র সঙ্গে যুক্ত হয়। সেই NGO বৃদ্ধাশ্রম গুলিতে যে বৃদ্ধ বৃদ্ধারা বাস করেন প্রতি বছর
পূজোর সময় তাদের নতুন পোষাক দান করে ও ফল আহার করায়। এই রকম এক বার দূর্গা পূজোর সময় ঐ N G O র হয়ে সুতন্দ্রা ও আরও কয়েক জন মিলে একটা বৃদ্ধাশ্রমে পোষাক ও ফল দান করতে যায়। সেখানে এক জন বৃদ্ধ মানুষের সাথে সুতন্দ্রার আলাপ হয়। তবে ওনাকে বৃদ্ধ না বলাই ভালো। বয়সের তুলনায় একটু বেশি দুর্বল স্বাস্থ্য। দেখাশোনার লোক না থাকার জন্যই হয়তো এমন হয়েছে। ওনার বাড়ীতে দেখাশোনার লোক না থাকার জন্য ওনাকে কে এক জন বৃদ্ধাশ্রমে ভর্তি করে দিয়ে চলে গেছে। তারপর আর এসে বা ফোন করে ওনার কোন খোঁজ নেয় নি। তাই ওনার খুব অসহায় লাগে। ওনার মনে হয় এই চিড়িয়াখানায় থাকার চেয়ে খোলা আকাশের নীচে থাকা অনেক ভালো। কিন্তু ওনাকে এখান থেকে বের করে নিয়ে যাবে কে ? ওনার আপনজন এই মুহূর্তে কে আছে সেটা ওনি বলতে পারছেন না। ওনার দ্বিতীয় স্ত্রী দু বছর আগে বেশ কয়েক বছর ক্যান্সারে ভুগে মারা যান। তাতেই ওনার প্রচুর টাকা পয়সা খরচ হয়ে যায় এবং খাটাখাটনিতে শরীর ভেঙে গিয়ে বৃদ্ধর মত হয়ে যায় । এরপর সুতন্দ্রা কয়েক বার বৃদ্ধাশ্রমে গিয়ে ওনার সঙ্গে কথা বার্তা বলে। কথা বার্তার মাধ্যমে সুতন্দ্রা ওনার অতীত জীবন সম্মন্ধে অনেক কিছু জানতে পেরে যায়। সুতন্দ্রা জানতে পারে যে ওনি পেশায় এক জন ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন, ওনার দুটো বিয়ে। প্রথম পক্ষের ঘরে একটি মেয়ে ছিল। প্রথম স্ত্রীর সঙ্গে ওনার ডিভোর্স হয়ে যায়। ডিভোর্স হবার সময় ওনাদের দু বছরের একটি ছোট্ট মেয়ে ছিল। তাকে ওনারা অনাথ আশ্রমে রেখে দিয়েছিলেন। তারপর আর সেই মেয়ে ও তার মায়ের সঙ্গে দেখা হয় নি কোন দিন । তাদের কোন খোঁজ খবরও ওনার কাছে নেই। ওনি জানেন না তারা এখন কেমন আছে আর কোথায় আছে । ওনি ওনার প্রথম মেয়েটির সঙ্গে যা করেছেন তার জন্য ওনি লজ্জিত এবং দুঃখিত। ওনার প্রথম পক্ষের মেয়েটির নাম ছিল সুতন্দ্রা। সুতন্দ্রা বাড়ীতে গিয়ে এই মানুষটার বিষয় নিয়ে খুব চিন্তা করে। কোথায় যেন ওর সঙ্গে একটা শিকড় আছে বলে ওর অনুভব হয়। স্বামীর সঙ্গে পরামর্শ করে সুতন্দ্রা সিদ্ধান্তে আসে যে এই ভদ্রলোকই তার জন্ম দাতা বাবা, শতুদ্রু। সব কিছু ঠিকঠাক মিলে যাওয়াতে আর কোন দ্বিমত থাকলো না যে ওনিই ওর বাবা।
তারপর অনেক দিন কেটে যায়। এক দিন এক মহিলা পেসেন্ট সুতন্দ্রার হসপিটালে ভর্তি হন। এই ভদ্র মহিলা পায়ে ক্যান্সারের টিউমার নিয়ে ভর্তি হন। অপারেশন করলে সেরে যাবে বলে ডাক্তারদের ধারণা। পাশের বাড়ীর এক ছেলে ওনাকে ভর্তি করে দিয়ে চলে যায়। ভর্তি করার পর আর কোন খোঁজ খবর নেয় নি সেই ছেলে। তার ফলে ওনার ট্রিটমেন্ট বন্ধ হয়ে যাবার উপক্রম হয়। সুতন্দ্রা ওনার সঙ্গে আলাপ পরিচয় করে ওনার ব্যাক স্টোরি জানতে পারে। ওনার দ্বিতীয় পক্ষের ছেলে ওনার কোন খোঁজ খবর নেয় না। সে শুধু টাকা চায় আর দুটো বিয়ের জন্য মাকে দোষ দেয় । দ্বিতীয় স্বামী এক বছর আগে রোড এক্সিডেন্টে মারা যান। এই মহিলা পেশায় এক জন ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন। ওনার প্রথম পক্ষের ঘরে সুতন্দ্রা নামে একটি মেয়ে ছিল। ওনার প্রথম স্বামীর নাম ছিল শতুদ্রু। ওনি জানেন না যে ওনার প্রথম স্বামী বেঁচে আছেন কিনা আর থাকলে কোথায় আছেন আর কেমন আছেন। ওনার যখন ডিভোর্স হয়ে যায় তখন প্রথম পক্ষের সেই মেয়েটিকে একটা অনাথ আশ্রমে রেখে দিয়ে এসেছিলেন। তারপর থেকে মেয়েটির কোন খবর ওনি জানেন না। এখন সে কোথায় আছে কেমন আছে কিছুই ওনি জানেন না। এই ভদ্র মহিলার বিষয়টা সুতন্দ্রাকে খুব চিন্তায় ফেলে দেয়। সুতন্দ্রা জানতে পারে যে ওনার প্রথম স্বামীর নাম ছিল শতুদ্রু। তিনটে নাম পর পর মিলে যায়। এর থেকে সুতন্দ্রা বুঝতে পেরে যায় যে এই আহেলী নামের ভদ্র মহিলা আর ঐ বৃদ্ধাশ্রমের শতুদ্রু নিশ্চয়ই প্রথম স্বামী-স্ত্রী এবং এই দুজই তার বাবা ও মা। সুতন্দ্রা এক দিন দুজনকে এক জায়গায় করে। তারপর বলে…. আমিই আপনাদের সেই তুচ্ছ, অবহেলিত মেয়ে যাকে আপনারা অনাথ আশ্রমে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে নিজেদের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ গড়তে চলে গিয়েছিলেন। আমাকে দত্তক নেওয়া আমার ডাক্তার বাবা মা আমাকে না হারতে দিয়েছেন না হারিয়ে যেতে দিয়েছেন। মা বাবার কোন অভাব ওনারা আমাকে বুঝতে দেন নি কোন দিন। ওনারা আপনাদের মতো অবিবেচক বা স্বার্থপর না। আমি ওনাদের এক মাত্র সন্তান। ওনাদের বিরাট বড় বাড়ী ঘর আছে সেখানে আপনাদের সবার জায়গা হয়ে যাবে। আজ দেখুন আপনাদের কি পরিণতী। বিচ্ছেদের আগে ভাবা উচিৎ ছিল বিচ্ছেদের পরিনাম নিয়ে। তবে আজকের পর থেকে আপনাদের আর দুরাবস্থা থাকবে না। এখন থেকে আপনারা আপনাদের সেই অভাগী মেয়ের কাছে থাকবেন এক সঙ্গে স্বামী-স্ত্রী হয়ে।
দেখুন মিস্টার আপনি তো শতুদ্রু,হাজার বছর ধরে নুড়ি পাথর ঠেলে ঠেলে নিজের গতিকে সাচল রেখেছেন, আপনার দুই পারে অনেক সবুজ অরণ্য শস্য শ্যামল প্রকৃতি উপহার দিয়েছেন। তিব্বত থেকে জন্ম নিয়ে ভারত ও পাকিস্তানে জলের ধারা প্রবাহিত রেখেছেন সর্বদা। তাই আজকে থেমে গেলে তো হবে না। আজকেও আপনাকে সচল থাকতে হবে। আর একটু মানবীক হয়ে উঠে এক জন নারীর ভরসার স্থল হয়ে উঠতে পারলে হয়তো আজ এই জীবনটা দেখতে হতো না। হিসেবটা শুধু নিজের দিক থেকে না দেখে উভয়ের দিক থেকেই দেখা উচিৎ । তবেই তো সে পাঁকা হিসেবি। আর এই যে আহেলী দেবী আপনি তো একদম খাঁটি বা অমিশ্রিত,(আহেলী নামের অর্থ ) আপনি কি করে ভুলে গেলেন যে ক্ষমা করতে জানতে হয়। আর ক্ষমা করতে না পারলে এগোনো যায় না। এক জায়গায় থেমে থাকতে হয়। আর সেটা জীবনের ধর্ম না। জীবনের ধর্ম হলো সংশোধন হতে হতে পরিবর্তিত অবস্থার সাথে খাপ খাইয়ে এগিয়ে যাওয়া। আর সব কিছুর দায় ভার নিতে নেই কিছু কিছু ইগনোর করতে হয়। যত দিন যাচ্ছে আমাদের লাইফ তত ফার্স্ট হচ্ছে বা অ্যাডভান্স হচ্ছে আর ততই আমাদের লাইফের অপশনস বাড়ছে। কিন্তু এই অপশনস গুলো সব আমরা এভেইল করতে পারছি না। তাই আমাদের লাইফে কমপ্লিকেশন বেড়ে যাচ্ছে। এর ফলে আজকাল সম্পর্ক গুলো খুব তাড়াতাড়ি টক্সিক হয়ে যাচ্ছে আর এটা কেমন দ্রুত নরমালাইস হয়ে যাচ্ছে। আহেলী… কিন্তু মা তুমি এতটুকু বয়সে জীবনের এই গুঁড়ো সত্য গুলো কেমন করে জানলে ? সুতন্দ্রা..আমার জীবন বোধ আমাকে এই সব বুঝতে সাহায্য করেছে। একটা জীবনের সৃষ্টি হতে দুটি এলিমেন্ট লাগে। তার একটা আসে মেইল বডি থেকে আর একটা আসে ফিমেইল বডি থেকে। ঐ এলেমেন্ট দুটো ফিমেইল বডিতে স্টোর হয়ে একটা রাসায়নিক বিক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে একটি নতুন জীবনের সৃষ্টি হয়। ঐ এলিমেন্ট গুলোকে অনু, পরমাণু বলা যেতে পারে। অনু, পারমাণু গুলো যেখান থেকে আসে সেখানকার দোষ গুণ সব সঙ্গে নিয়ে আসে। তাই তো সন্তানের চেহারার সাথে বাবা বা মায়ের চেহারার মিল থাকে। সন্তানের আচার ব্যবহার,কথা বার্তার, চিন্তা ভাবনার সাথে বাবা মায়ের অনেক মিল থাকে। আমার জীবন সৃষ্টির অনু, পরমাণু এসেছে তোমাদের দুজনেরর শরীর থেকে। তাই এই গুণাবলী গুলো আমি তোমাদের মধ্যে থেকেই পেয়েছি। আর আমার ডাক্তার বাবা মা ওনাদের সহস্র গুণাবলী দিয়ে আমাকে মানুষ করেছেন। জীবন যেমন সৃষ্টি হয় প্রকৃতির মধ্যে থেকে প্রাকৃতিক উপাদান নিয়ে তেমনি আবার মৃত্যুর পর শরীরের সেই উপাদান গুলো পঞ্চ ভূতে বিলীন হবার মধ্যে দিয়ে প্রকৃতিতে ফিরে আসে। এটাকেই হয়তো আত্মার অমরত্ব লাভ বা বিনাশ না হাওয়া বলা যেতে পারে। শতুদ্রু… ডিজিটাল এজের (জেনারেশনের ) সবাই যে গতির পিছনে,বিলাসিতার পিছনে দৌঁড়াতে গিয়ে শিকড়কে ছিড়ে ফেলছে এমন না। কেউ কেউ যে সঠিক পথে অ্যাডভান্স তার প্রমান তুই মা। ভোগ বিলাসের নেশায় মেতে কিছু ছেলে মেয়ে অশান্ত মন নিয়ে শান্তির খোঁজে দৌঁড়াতে দৌঁড়াতে জীবনের চোরা স্রোতে হারিয়ে যাচ্ছে। শান্তি তাদের অধরাই থেকে যাচ্ছে। কারণ শান্তি তো ভোগ বিলাসের মধ্যে থাকে না। ভোগ বিলাসের মোহ সবাইকে গ্রাস করে মূল থেকে বিছিন্ন করতে পারেনি। এরপর AI বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সি আসছে। সেই সময়কার জেনারেশন কেমন হবে সেটা হয়তো আমাদের দেখে যাওয়া হবে না আহেলী। আহেলী… সবার উপর মানুষ সত্য আজও এটাই সত্য। পরিবর্তন যতই আসুক কোন পরিবর্তনই হয়তো এই সত্যকে উপড়ে ফেলতে পারবে না। পৃথিবীর সব কিছুকেই তার ভর কেন্দ্রের দিকে এগিয়ে আসতে হয়। ছুটে বেরিয়ে যেতে পারে না।কেন্দ্রগতিক বল (Centri fugal force )” এম ভী স্কয়ার বাই আর ” অনুযায়ী। ঐ গুলো সব বাহ্যিক পরিবর্তন। বাহ্যিক পরিবর্তন মানুষের গঠন গত মৌলিক বিষয় গুলোর পরিবর্তন করতে পারে না।
সমাপ্ত
![]()







