তোমাতে আমার ঠিকানা (পঞ্চম পর্ব)
বারিত বরণ
সন্ধ্যার আকাশে লালচে আভা মেখে আস্তে আস্তে আঁধার নেমে আসছে। বস্তির সরু গলিগুলোতে এদিক ওদিক ছেলেমেয়েদের কোলাহল, কারও হাঁড়িতে ভাত বসেছে, কারও ঘরে আলো জ্বলেছে কুপির। অভি আর সুচরিতা পাশাপাশি হাঁটছে। আজকের মত বাচ্চাদের পড়ানো শেষ হয়েছে, বাচ্চাদের চোখেমুখে আনন্দের আলো এখনও লেগে আছে। সুচরিতার মুখে এক তৃপ্তির হাসি—আজ যেন সে নিজের স্বপ্নটাকে আরও একটু ছুঁতে পেরেছে।
কিন্তু অভির মনে হঠাৎ একটা চিন্তার কাঁটা খোঁচা দেয়—
“এখন তো শুভ দা অপেক্ষা করছে… আজই তো উনি বলেছিলেন একটা টিউশনের ব্যবস্থা করবেন।”
আকাশের পশ্চিম প্রান্তে সন্ধ্যা নেমে এসেছে। রাস্তার ল্যাম্পপোস্টগুলো একে একে জ্বলে উঠছে। বস্তির সঙ্কীর্ণ গলিপথ থেকে বেরিয়ে আসছে সুচি আর অভি। অভির মুখে গভীর চিন্তার ছাপ।
অভি সুচির দিকে ঘুরে দাড়ালো, একটু হালকা হাসি দিয়ে, অথচ দৃঢ় কন্ঠে বলল,
“আজ অনেকটা সময় দিলেন আমাকে… কিন্তু এখন যেতে হবে।শুভ দা অপেক্ষা করছে। একটা টিউশনের ব্যবস্থা করে দেবে বলেছে।”
সুচি চমকে উঠলো,
“এত রাত করে টিউশনে যাবেন?”
অভি একটু ইতস্তত করলো,
” আসলে ম্যাডাম আমি হয়তো এখানে এসেছি নিজের স্বপ্ন সফল করতে কিন্তু কিছু রোজগার না করলে যে দুবেলা দুমুঠো ভাতও জুটবে না।”
একটু চুপ করে মাথা নত করে অভি লজ্জিত হয়ে আবার বলল,
” এভাবে হয়তো নিজের দারিদ্রতার নগ্ন রূপ টা আপনার সামনে তুলে ধরা উচিত হয়নি, কিন্তু সত্যিটা তো সত্যিই, তাইনা!”
সুচি কি বলবে ভেবে পেলো না।
অভি বলতে থাকলো,
” আমাদের স্কুলের হেড স্যারের কথায় তার বন্ধু দয়া করে আমাকে তার মেসে ঠাই দিয়েছেন। খাওয়া পড়ার সংস্থান তো নিজেকেই করতে হবে।”
“ তাই আমার মতো মানুষের তো রাত-দিনের হিসেব নেই, সুচরিতা।কাজ করেই রুটি আর বই জোগাড় করতে হবে।”
অভির প্রতি সুচির শ্রদ্ধা এক লহমায় অনেকটাই বেড়ে গেলো।
একটু থেমে সে আবার বলে,
“তবে একটা কথা—আজ যা দেখলাম, সেটা আমার বুকের ভেতর আগুন ধরিয়ে দিল।”
সুচি চুপচাপ, গলাটা ভারী হয়ে এসেছে,
“আমি… আমি জানি না কীভাবে সামলাবো।শুধু মনে হচ্ছে এই শহরের হাসি, আলো—সবই যেন ওদের চোখের জলের ওপরে দাঁড়ানো।”
অভি গভীর দৃষ্টিতে সুচির দিকে তাকিয়ে,
“তাহলে আমাদের লড়াইটা শুরু হলো এখান থেকেই।”
হঠাৎ অভি সজাগ হয়।
“যাই… দেরি করলে শুভ দা রাগ করবে।”
সুচি মাথা নাড়ে, তবে চোখ নামিয়ে নেয়।
বিদায় নিতে নিতে অভির কণ্ঠে এক অদ্ভুত দৃঢ়তা ঝরে পড়ে।
“আবার দেখা হবে, সুচরিতা।
আজকের মতো বিদায়।”
অভি ধীরে ধীরে হেঁটে চলে যায় রাস্তায় আলোর নিচ দিয়ে।
পেছনে দাঁড়িয়ে সুচি তাকিয়ে থাকে।
“আলো কখনো নিভে না, শুধু জ্বলার সময় বদলায়।”
ঠাকুমার বলা এই কথাটা হঠাৎ মনে পড়ে যায় সুচির।
তার বুকেও যেন এক আলো জ্বলে ওঠে।
অভি ফুটপাত ধরে হাঁটছে। হাতে ধরা পুরনো ব্যাগটা কাঁধে ঝোলানো,মুখে দিনের ক্লান্তি, কিন্তু চোখে অদ্ভুত ঝিলিক।
রাস্তার ভিড় যেন তাকে ছুঁয়েও যায় না।রাস্তার বাতির হলুদ আলো, কলকাতার কোলাহল… অথচ তার ভেতরে একেবারেই নিঃশব্দে চলতে থাকে ভাবনা।
শুধু তার ভেতরের চিন্তাগুলোই তাকে বারবার ঘিরে ধরে।
অভি মনে মনে বলে,
“অদ্ভুত মেয়েটা!
বাবার এত ঐশ্বর্য, এত প্রাচুর্যের মাঝেও ওর চোখে এক ধরনের তৃষ্ণা।যা দেখলাম বস্তিতে, সেটা ও আমায় দেখাতে চেয়েছিল।
কেন?ও তো সহজেই চোখ ফিরিয়ে নিতে পারত।
কিন্তু নিল না…”
অভি থেমে এক মুহূর্ত রাস্তার ল্যাম্পপোস্টের দিকে তাকায়।
আলোর নিচে যেন মনে হয় সুচির মুখ ভেসে উঠেছে—
দৃঢ়, কৌতূহলী, আবার কোথাও ভীষণ কোমল।
অভি ভাবতে থাকে,
“ওর ভেতরে আমি দুটো মানুষ দেখি—
একদিকে বড়লোকের বাড়ির মেয়ে, অন্যদিকে নিঃস্ব মানুষদের প্রতি টান, মমতা।
এটা সহজ নয়।
কতজনই বা পারে এমনটা?”
রাস্তা পার হতে হতে হঠাৎ তার মুখে একচিলতে হাসি খেলে যায়।
অভি মৃদু গলায়,নিজেকেই বলে,
“যদি সত্যিই ওর ভেতরের আলো নিভে না যায়,তাহলে হয়তো… হয়তো লড়াইয়ে আমি একা থাকব না।”
অভি পা বাড়িয়ে তাড়াতাড়ি হাঁটতে থাকে মেসের দিকে।
কোলাহলের শহরটা যেন এক অচেনা ছন্দে গুনগুন করে ওঠে,
যেন আগামীর ইঙ্গিত দিয়ে যায়।
অভি তাড়াতাড়ি মেসে ঢুকলো। দরজা ঠেলে ভেতরে আসতেই দেখে—শুভব্রত জানালার পাশে বসে আছে, হাতে বই, চোখ বাইরের অন্ধকারে। অভিকে দেখেই বই বন্ধ করল।
অভি লজ্জিত হলো,
” একটু দেরি হয়ে গেলো গো শুভদা।”
“কোথায় ছিলি রে এতক্ষণ?” শুভ দার কণ্ঠে মৃদু অভিমান।
অভি একটু ইতস্তত করে বলল, “দাদা… আসলে এক সহপাঠিনীর সঙ্গে বস্তিতে গিয়েছিলাম। ও বাচ্চাদের পড়ায়, আজ আমিও গেলাম। সময়ের খেয়ালই ছিল না…”
শুভ দা ভুরু কুঁচকে তাকালো,
“সহপাঠিনী?”
অভি একটু লজ্জিত হয়ে মাথা নিচু করল।
“হ্যাঁ গো দাদা, ওর নাম সুচরিতা। হিস্ট্রি পড়ে।ওই যে তোমাকে সেদিন বললাম না। বিরাট বড় লোক ঘরের মেয়ে। ওর বাবা সেন জুয়েলার্সের মালিক।”
শুভব্রতের চোখে কৌতূহল।
“কিন্তু জানোত দাদা, মেয়েটি খুব ভালো মনের মানুষ। টাকার লোভ নেই, বাচ্চাদের জন্য দিন কাটায়। ওর সঙ্গে গিয়েই দেরি হয়ে গেল।”
শুভ দা গভীর দৃষ্টিতে অভির মুখের দিকে চেয়ে রইল। তারপর ধীরে বলল,
“তুই মানুষ চিনতে ভুল করিস না অভি। সবাই যে যেমন দেখায়, ভেতরে সবসময় তেমনটা হয় না। তবে শোন—তোর স্বপ্ন বড়। তুই যদি বড় হতে পারিস, তাহলে তোর পক্ষে হাজারটা বস্তির বাচ্চার পাশে দাঁড়ানো সম্ভব হবে। এখন তোর দরকার নিজের পায়ে দাঁড়ানো।”
অভি চুপচাপ মাথা নোয়াল। শুভ দার কথায় একটুকরো সত্যির ভার যেন বুকের ভেতর নেমে এলো। বাইরে বাতাসে অন্ধকার আর কুয়াশা জমলেও, অভির মনে সেই কথাগুলো আলো হয়ে রইল।
শুভ দা একটু থমকাল, তারপর ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে অভির কাঁধে হাত রাখল।
“শোন, অভি… তুই যা ভাবছিস, সেটা বড়ো স্বপ্ন। মানুষকে সাহায্য করার তোর টান আমি বুঝি। কিন্তু ভাব তো,আজ যদি তুই নিজের ভবিষ্যৎ নষ্ট করিস, তাহলে ওদের কতটুকুই বা উপকার করতে পারবি?
শুধু কি দু’জনকে বই-খাতা কিনে দিলেই হবে? নাকি ওদের জীবনের নিয়মটাও বদলাতে হবে।”
অভি বিস্মিত চোখে শুভ দার দিকে তাকাল।
শুভ দা গভীর কণ্ঠে বলল,
— “তুই যদি একদিন সত্যিই ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট হতে পারিস, তাহলে আইনের জোরে, রাষ্ট্রের ক্ষমতায় তুই শত শত অসহায় মানুষের ভাগ্য বদলে দিতে পারবি। তাই তোর প্রথম দায়িত্ব,নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করা। বুঝলি? এটাই সমাজের জন্য সবচেয়ে বড় দান।”
অভির বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।চোখ নামিয়ে নিল, কিন্তু মনে হলো, শুভ দার প্রতিটা শব্দ যেন মাটিতে বীজের মতো গেঁথে গেল।
তবে আর একটা কথাও মনে রাখিস, পড়াশোনা যেমন জরুরি, তেমনই টিউশনও এখন তোর প্রয়োজন। তোকে একসাথে দুটো পথ সামলাতে হবে।”
অভি মাথা নিচু করে হালকা লজ্জিত হাসি দিলো।
তার ভেতরে এক অদ্ভুত দ্বন্দ্ব—একদিকে বস্তির শিশুদের চোখে আলো জ্বালানোর টান, অন্যদিকে নিজের স্বপ্নপথে এগিয়ে চলার প্রয়োজন।
শুভ দা হেসে মাথায় হাত বুলিয়ে দিল।
” এবার তাড়াতাড়ি চল দেখি বাবা। তোর টিউশন টার ব্যবস্থা টা করে আসি।”
মেস থেকে বেরিয়ে রাস্তায় হাঁটছে শুভব্রত আর অভি। চারপাশে রাতের হালকা আলো, চায়ের দোকানগুলো তখনও খোলা। শুভ দা হাঁটতে হাঁটতেই অভিকে বোঝাচ্ছিল,
শুভ দা (গম্ভীর ভঙ্গিতে):
“শোন অভি, আজ যে টিউশনটা ঠিক করলাম সেটা একটু আলাদা। ছাত্রটা বিরাট বড়লোকের ছেলে—বাবা ব্যবসায়ী, নাম শুনলেই লোকজন কেঁপে ওঠে। কিন্তু বাপের টাকার গরমে ছেলেটা একেবারেই বিগড়ে গেছে। পড়াশোনার নামগন্ধ নেই, দিনে গেম খেলবে, রাতে আড্ডা।”
অভি কৌতূহলী চোখে তাকাল,
“তাহলে আমি ওকে শেখাবো কীভাবে?”
শুভ দা হেসে ফেলল:l,
“ওরে, এখন বড় কিছু শেখানোর সময় নেই। একটুখানি বুদ্ধি খাটিয়ে ওকে অন্তত উচ্চমাধ্যমিকটা পাশ করিয়ে দিতে হবে। যতই হোক, পরীক্ষায় না পাশ করলে বাবা মান সম্মান রাখতে পারবে না।”
অভির মনে দ্বন্দ্ব তৈরি হলো।
অভি চুপচাপ,
“মানে… যেনো তেনো প্রকারে পাস করানোই আসল কাজ?”
শুভ দা মাথা নেড়ে বলল,
“হ্যাঁ রে, তোর কাছে এটাই এখন সুযোগ। ওর বাবার হাতে টাকা আছে, মাইনে ভালই দেবে। এই টিউশনটা যদি জমে ওঠে, তোকে আর পিছনে তাকাতে হবে না। তুই এখানে খরচ চালাতে পারবি, বই কিনতে পারবি। নিজের স্বপ্ন পূরণ করতে গেলে এসব টিউশনের টাকাই তো ভরসা।”
অভি হাঁটতে হাঁটতে নিরব হয়ে গেল। মনের ভেতর কোথাও একটা খচখচানি কাজ করছিল,
বড়লোকের ছেলেকে জোর করে পাশ করানো, এটাই কি শিক্ষার উদ্দেশ্য? কিন্তু আবার মনে পড়ল মা-বাবার মুখ, গ্রামের হেডমাস্টার মশায়ের স্বপ্ন, নিজের ডিএম হবার লক্ষ্য।
একটু থেমে অভি ধীর গলায় বলল
“ঠিক আছে দাদা, আমি চেষ্টা করব। তবে… আমি যদি পারি, ওকে অন্তত পড়াশোনার গুরুত্বটা বোঝাতে চেষ্টা করব।”
শুভ দা মুচকি হেসে অভির কাঁধে হাত রাখল।
“এই তো আমার অভি। কাজ কর, টাকা কামা—কিন্তু নিজের মাটিটা ভুলিস না।”
রাস্তা প্রায় ফাঁকা। লাইটপোস্টের আলোয় দু’জনের ছায়া লম্বা হয়ে গেছে। শুভ দা সামনের টিউশনের কথা বলছে, আর অভি চুপচাপ শুনছে। কিন্তু ভেতরে ভেতরে এক অদ্ভুত অস্বস্তি খুঁচিয়ে চলেছে তাকে। যতই টাকা রোজগারের তাগিদ থাকুক, অভির অন্তরের দ্বন্দ্ব টা কিছুতেই যাচ্ছে না।অভির মনের ভেতরটা দুমড়ে মুচড়ে যাচ্ছে।
“শিক্ষা তো মানুষকে গড়ার হাতিয়ার। অথচ আমি এখানে এসে প্রথম দিনেই শিখছি কাউকে শুধু পাশ করিয়ে দিতে হবে! এটাই কি আসল উদ্দেশ্য? টাকাটা দরকার, সন্দেহ নেই—মেসের খরচ, বই কিনতে হবে, বাড়িতে একটু সাহায্য পাঠাতে পারলে বাবা-মার মুখে তো হাসি ফুটবে। কিন্তু… এরকম করে কি আমি সত্যি সত্যি নিজের স্বপ্নের পথে হাঁটছি?”
পরক্ষনেই অভির চোখের সামনে আবার ভেসে উঠল গ্রামের ছবি, বাবা সারাদিন ভ্যান চালিয়ে হাঁপাচ্ছে, মা অন্যের জমিতে কাজ করে হাত ফাটিয়ে ফেলেছে, হেড মাস্টার মশায় বারবার বলছেন,
“অভি, তোকে আমরা চাই বড় হতে। তুই ডিএম হয়ে এই অন্যায় সমাজটাকে বদলে দিস।”
হঠাৎ করেই অভির বুকের ভেতর একটা চাপা কষ্ট গুমরে উঠল।
“আমি যদি এখন শুধু বড়লোকের ছেলেকে বাঁচিয়ে দেওয়ার জন্য নকল পড়াই, সেটা কি আসলে সমাজ বদলানো? নাকি আমিও ধীরে ধীরে এই ভাঙা সিস্টেমের অংশ হয়ে যাচ্ছি?”
শুভ দা যেনো বুঝতে পারলো অভির মনের এই দ্বন্দ্বটা, পাশে হাঁটতে হাঁটতে বলল,
“চিন্তা করিস না রে অভি। এখন তোর কাজ নিজেকে বাঁচানো, নিজেকে গড়া। তুই প্রতিষ্ঠিত হলে, তখন তোকে কেউ আটকাতে পারবে না। তখন যা ইচ্ছে করবি।”
অভি গভীর নিশ্বাস ফেলল। মনে মনে ভাবল,
“হয়তো শুভ দা ঠিকই বলছে। এখন আপস না করলে এগোনো যাবে না। কিন্তু প্রতিটা আপসই আমার ভেতরের মানুষটাকে একটু একটু করে মেরে ফেলছে না তো?”
সে আর কিছু বলল না। চুপচাপ হাঁটতে হাঁটতে শুধু মনের ভেতর শপথ করল,
“আমি হেরে যাব না। আমি এই টাকাও নেব, কিন্তু এর সঙ্গে সঙ্গে চেষ্টা করব ওই ছেলেটাকে সত্যিই কিছু শেখাতে। অন্তত একটুখানি হলেও যদি বুঝিয়ে দিতে পারি শিক্ষার মানে কী, তাহলে হয়তো এই আপসটা ব্যর্থ হবে না।”
শুভ দা তাকিয়ে দেখল অভি কেমন যেন অন্য জগতে ডুবে গেছে। হালকা হেসে শুধু বলল,
“চল, দেখি সামনে কি হয়। তোর পথ এখনও অনেক লম্বা।”
অভি আর শুভব্রত যখন বাড়িটার সামনে এসে দাঁড়াল, তখনই অভির বুক কেঁপে উঠল। উঁচু ফটক, গেটের দু’পাশে মার্বেল বসানো সিংহমূর্তি, আর ভেতরে ঢুকতেই ঝলমলে আলোয় ঝাড়বাতি যেন চোখ ধাঁধিয়ে দিল।
অভির মনে হল,
“এটাই কি সেই কলকাতা? এদের জন্যই কি এত বৈষম্য? একদিকে আমাদের গ্রামে মানুষ দু’বেলা খেতে পায় না, আর এখানে বিলাসিতার পাহাড়।”
শুভব্রত অভির কাঁধে হাত রাখল, যেন বলল,
“চুপ করে থাকিস, বেশি কিছু ভাবিস না।”
ড্রয়িং রুমে ঢুকতেই যে মানুষটা তাঁদের অভ্যর্থনা করল, তাঁর চেহারা বেশ ভদ্রোচিত,ঝকঝকে পাঞ্জাবি, গলায় সোনার চেইন, ঠোঁটে কৃত্রিম হাসি। প্রথমে দেখে মনে হয়, খুবই মিশুক, অতিথিপরায়ণ।
ভদ্রলোক শুভব্রত কে দেখে বললেন,
“আসুন আসুন!
এবার অভির দিকে তাকালেন,
এই তুমি-ই বুঝি সেই অভি? ওহো, শুনলাম খুব মেধাবী ছাত্র! আমাদের ছেলেটাকে একটু সামলাও তো বাবা, কিছুতেই পড়াশোনা মুখে রোচে না। অনেক খরচ করছি স্কুলে, তবু কাজ হচ্ছে না।”
বলে হেসে উঠলেন, কিন্তু সেই হাসির ভেতর কোথাও একটা অস্বস্তিকর ঔদ্ধত্য লুকিয়ে আছে। যেন বোঝাতে চাইছেন,
“আমরা টাকার জোরে সব কিনতে পারি, তোমাকেও।”
অভি মাথা নিচু করে ভদ্রভাবে প্রণাম করল। ভদ্রলোক হঠাৎ তাচ্ছিল্যের সুরে বলে উঠলেন,
“শোনো বাবা, আমাদের ছেলেটা একটু আলাদা স্বভাবের। পড়াশোনার চেয়ে বাইরের দুনিয়ায় বেশি আগ্রহ। তবে, পরীক্ষায় পাস করতেই হবে। সমাজে মান-সম্মানের ব্যাপার আছে না! তুমি যা করো করো, ওকে শুধু পাশ করিয়ে দাও।”
কথাগুলো শোনার সঙ্গে সঙ্গেই অভির বুকের ভেতর হাহাকার উঠল। যেন আড়ালে আড়ালে শুনতে পাচ্ছে,
“শিক্ষা মানে আমাদের কাছে কেবল নাম, আর তোমার মতোদের কাছে বাঁচার একমাত্র অস্ত্র।”
শুভব্রত ভদ্রভাবে মাথা নাড়ল। কিন্তু অভি চোখে চোখ রাখতে পারল না। এক মুহূর্তে তার মনে হল, যেন এ মানুষটার সাজানো ভদ্রতার মুখোশ ভেঙে পড়ছে,
সোনার চেইনের আড়ালে লোভ, কৃত্রিম হাসির আড়ালে তাচ্ছিল্য, ভদ্রতার আড়ালে নিষ্ঠুরতা।
অভি মনে মনে শপথ করল,
“যা-ই হোক, আমি কেবল পাস করাব না। আমি চেষ্টা করব ও ছেলেটাকে সত্যিই শেখাতে। অন্তত মানুষ হিসেবে কিছুটা গড়ে তুলতে।”
ভদ্রলোক আবারও কৃত্রিম ভদ্রতায় বললেন,
“চলুন, আমি আপনাদের ওর ঘরে নিয়ে যাই। বুঝবেন কতটা কষ্ট করতে হবে!”
অভি ও শুভব্রত নিয়ে ধীর পায়ে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে একটা বিশাল ঘরের সামনে ভদ্রলোক থামলেন। দরজাটা খোলা, ভেতরে ঢুকতেই অভি আর শুভব্রত থমকে দাঁড়াল।সামনে খুলে গেল আরেকটা অচেনা দুনিয়ার দরজা।
ঘরটা যেন খেলার মাঠ—এখানে পড়াশোনার কোনো চিহ্ন নেই।
একদিকে বড় টিভি, ভিডিও গেম ছড়িয়ে আছে, টেবিলে অর্ধেক খাওয়া পিৎজা, কোকের বোতল। বইয়ের আলমারি থাকলেও, সেগুলোতে ধুলো জমে গেছে, যেন বহুদিন কেউ ছুঁয়েই দেখেনি।
মেঝেতে গা এলিয়ে বসে আছে এক তরুণ—গায়ে দামি জার্সি, হাতে মোবাইল, কানে হেডফোন।
তাঁকে দেখে মনে হয় না তিনি উচ্চমাধ্যমিকের পরীক্ষার্থী, বরং কোনো বখে যাওয়া বন্ধুদের দলের লিডার।
ভদ্রলোক গলা ঝাড়লেন,
“এই যে, শুনছিস? এরা এসেছে তোকে পড়াতে। এখন থেকে আর ফাঁকি নয়, বুঝলি?”
ছেলেটা ধীরে হেডফোন খুলে, উদাস ভঙ্গিতে অভিদের দিকে তাকাল। চোখে একরাশ বিরক্তি, যেন ওরা ওর শান্তি নষ্ট করেছে।
ছেলে হেসে, তাচ্ছিল্যে বলল,
“কে ওরা? নতুন মাস্টারমশাই নাকি? কাকাবাবু, এবার আবার নতুন সার্কাস শুরু করলে?”
ভদ্রলোক একটু লজ্জিত হলেও জোর করে হেসে বললেন,
“চুপ কর! যা-ই হোক, পড়াশোনা শুরু করতেই হবে। এই দাদারা তোমাকে সামলাবে।”
অভি প্রথমবার ছেলেটির চোখে তাকাল,
সেই চোখে পড়াশোনার প্রতি ঘৃণা, জীবনের প্রতি উদাসীনতা, আর বাবার টাকার গরমে গড়ে ওঠা একধরনের অবাধ্যতা স্পষ্ট।
অভির বুক কেঁপে উঠল।
“একে মানুষ করা কি আদৌ সম্ভব?”
শুভব্রত পাশে দাঁড়িয়ে অভির কানে ফিসফিস করে বলল,
“দেখলি? এদের সামলানো সহজ নয়। তবে তুই পারবি। তোর ধৈর্যই তোর শক্তি।”
অভি গভীর শ্বাস নিল। মনে মনে দৃঢ় হল,
“যদি একে সামলাতে পারি, তবে বুঝব আমার শিক্ষক হবার যোগ্যতা সত্যিই আছে।”
অভির যেনো একটা জেদ চেপে গেলো। টেবিলে রাখা কয়েকটা বই তুলে নিয়ে ছেলেটির পাশেই মাটিতে বসে পড়ল। ছেলেটি তখনও মাটিতে বসে সোফায় হেলান দিয়ে মোবাইলে গেম খেলছে।
অভি শান্ত গলায় বলল,
“তাহলে আজ আমরা একটু বাংলা দিয়ে শুরু করি? কবিতা পড়তে ভালো লাগে তোমার?”
ছেলেটি হেসে উঠল, কানে কটূ শোনাল সেই হাসি।
“কবিতা? ওগুলো বুড়োদের শখ! আমার এসব ভালো লাগে না। গেম খেলাই অনেক ভালো।”
অভি থমকাল, কিন্তু চুপ করে গেল না। সে নরম স্বরে বলল,
“তাহলে যা তোমার ভালো লাগে, তার সঙ্গেই পড়াশোনার যোগ খুঁজে নেব। কিন্তু পরীক্ষায় পাস করতে হলে তো পড়তেই হবে, তাই না?”
ছেলেটি হঠাৎ হেলান ছেড়ে উঠে বসে অভির দিকে তাকাল, চোখে রাগ।
“শোনো মাস্টারমশাই, আমার কিচ্ছু লাগে না! বাবার টাকা আছে, পাস-টাস সব হয়ে যাবে। তুমি শুধু নামটা লিখে দিও, হয়ে গেল।”
অভির বুক কেঁপে উঠল। এক মুহূর্তের জন্য যেন নিজের বাবার মুখ ভেসে উঠল তার চোখে,
ক্লান্ত, ঘামে ভেজা, রোদে পুড়ে যাওয়া।
“আমার বাবা সারা দিন ভ্যান চালিয়ে কয়েক টাকা জোগাড় করে, আর এখানে বাবার টাকার গরমে ছেলে পড়াশোনাকে খেলনা বানিয়ে ফেলেছে!”
অভির চোখে ক্ষণিকের জন্য কঠোরতা এল।সে শান্ত গলায় কিন্তু দৃঢ়ভাবে বলল,
“শোনো, আমি নাম লিখে দেওয়ার মাস্টার নই। পড়াশোনা করাতে এসেছি। তুমি যদি শিখতে না চাও, আমি এখানে সময় নষ্ট করব না।”
ঘরটা থমথমে হয়ে গেল। ভদ্রলোক পাশেই দাঁড়িয়ে ছিলেন, তড়িঘড়ি বলে উঠলেন,
“না না, রাগ কোরো না। ওকে একটু সময় দাও। একদিনে অভ্যেস হবে না।”
শুভব্রত বাইরে দাঁড়িয়ে সবটা শুনছিল। অভির দৃঢ়তায় তার মুখে একটা অদ্ভুত গর্ব ফুটে উঠল।
অভি চুপচাপ ব্যাগ থেকে খাতা বের করে রাখল, তারপর বলল
“চল, আজ একটুখানি পড়া শুরু করি। তুমি যতটুকু পারো, আমি তার সঙ্গেই এগোব।”
ছেলেটি বিরক্ত মুখে বইয়ের দিকে তাকাল, কিন্তু প্রথমবার যেন অভির গলায় এমন কিছু পেল যা তাকে থামিয়ে দিল।
অভি খাতা খুলে টেবিলে রাখল। ছেলেটি তখনও অনীহা নিয়ে মোবাইল ঘাঁটছে।
অভি একটু থেমে, নরম স্বরে বলল,
“শোনো, আমি গ্রামে ছোট একটা মাটির ঘরে থাকি। আমার বাবা সারা দিন ভ্যান চালিয়ে ক্লান্ত শরীরে বাড়ি ফেরে, মা অন্যের জমিতে মজুরি খেটে আমাদের দু’বেলা খাওয়ান। আমার মতো ছেলেকে পড়তে দেওয়া তাদের জন্য সহজ ছিল না। কিন্তু তারা চেয়েছে আমি যেন বড় হই, যেন অন্যদের জন্য কিছু করতে পারি। তাই আজ আমি এখানে, তোমার পাশে বসে আছি।”
ছেলেটি চমকে তাকাল। গেম খেলার হাত থেমে গেল।
অভি গলা শান্ত কিন্তু গভীর আবেগ,
“তুমি বললে তোমার বাবার টাকা আছে। হয়তো ঠিকই বলেছ। কিন্তু বিশ্বাস করো, বাবা শুধু টাকা খরচ করেন না—বাবারা তাঁদের ঘাম, পরিশ্রম আর স্বপ্ন দিয়ে সন্তানের জন্য বাঁচেন। তোমার বাবাও চায় তুমি কিছু হও। শুধু পাস করা নয়, সত্যিকারের মানুষ হও।”
ঘরটা যেন ভারী হয়ে গেল। ভদ্রলোক দূরে দাঁড়িয়ে ছিলেন, নিজের মুখে একরকম অস্বস্তি এসে গেল,অভির কথাগুলো যেন তাকেও আঘাত করল।
ছেলেটি ধীরে ধীরে মোবাইলটা টেবিলে রেখে দিল। গলাটা একটু রুক্ষ, তবু কেমন যেন নরম হয়ে এল।
ধীরে ধীরে বলল,
“তুমি… তুমি এভাবে বললে কেন? তুমি তো আমার মাস্টার, পড়াশোনা করাও, কিন্তু… মনে হচ্ছে তুমি অন্যরকম।”
অভি হালকা হেসে বলল,
“আমি মাস্টার হতে আসিনি, তোমার পথপ্রদর্শক হতে চাই। তুমি যদি মন থেকে চেষ্টা করো, আমি পাশে থাকব।”
শুভব্রত বাইরে দাঁড়িয়ে সব শুনছিল। তার চোখ ভিজে এল। মনে মনে ভাবল,
“এই ছেলেটা একদিন শুধু টিউশন মাস্টার হবে না, একদিন আসলেই সমাজ বদলাবে।”
ঘরের ভেতরে এক অদ্ভুত নীরবতা তৈরি হলো।
ছেলেটি প্রথমবার খাতা খুলে কলম হাতে নিল।
কলেজের ক্লাস শেষ হয়েছে। চারিদিকে কোলাহল—কেউ তাড়াহুড়ো করে বাস ধরছে, কেউ আবার টিফিন ক্যান্টিনের দিকে ছুটছে। কিন্তু অভির মনে আজ অদ্ভুত এক অস্থিরতা কাজ করছে। নিজের অজান্তেই চোখ খুঁজে বেড়াচ্ছে কাউকে—সুচরিতাকে।
গতকালকের সেই মুহূর্তগুলো মনে পড়ছে — বস্তিতে যাওয়া, সুচরিতার শান্ত অথচ দৃঢ় কণ্ঠে বস্তির দুরবস্থার কথা বলা, এত বড় ঘরের মেয়ে হওয়া সত্ত্বেও ছোটো ছোটো বাচ্চা গুলোকে শিক্ষার আলোয় উদ্ভাসিত করার যে প্রয়াস সে সুচির মধ্যে দেখেছে যার মধ্যে অহংকারের লেশমাত্র নেই, আছে শুধু ওই অসহায় মানুষ গুলোকে বাঁচতে শেখানোর এক অদম্য প্রয়াস। কোথাও যেনো সুচরিতার প্রতি এক অজানা টান সে অনুভব করছে।অভির বুকের ভেতর হালকা এক ধকধকানি।
“আজ যদি আবার একবার দেখা হয়! কয়েকটা কথা বলতে পারতাম… হয়তো আরোও জানতে পারতাম, তার বস্তির বাচ্চাদের নিয়ে কাজের স্বপ্নটা।”
অভি অন্যমনস্ক হয়ে সিঁড়ি বেয়ে নামছে, হঠাৎ করেই ভিড়ের মাঝখানে দেখতে পেল তাকে। সুচরিতা সাদা-নীল সালোয়ার পরে দাঁড়িয়ে আছে, হাতে দুটো বই ধরা। গম্ভীর অথচ সরল এক চাহনি, যেন নিজের মধ্যে ডুবে আছে।
অভির মন হঠাৎ করে উজ্জ্বল হয়ে উঠল। কিন্তু তার স্বভাবসিদ্ধ লাজুকতা আবার পিছু টানল। সে দ্বিধায় দাঁড়িয়ে রইল—যাবে কি যাবে না!
ঠিক তখনই সুচরিতা চোখ তুলে তাকাল। চোখাচোখি হতেই হালকা এক হাসি খেলল তার ঠোঁটে।
“কেমন আছেন অভি? আজ ক্লাস কেমন হলো?”
অভির বুক ভরে গেল। সরল হেসে উত্তর দিল,
“ভালো… তবে মনে হয় আসল ক্লাসটা তখনই শুরু হয়, যখন আপনার মতো কাউকে দেখে মনে হয় পড়াশোনা শুধু নিজের জন্য নয়, সমাজের জন্যও।”
সুচরিতা অবাক হয়ে অভির দিকে তাকাল। তার চোখে এক অদ্ভুত প্রশংসা আর কৌতূহল ঝিলিক দিল।
অভি বুঝল—আজ তার এই ছোট্ট প্রত্যাশা পূর্ণ হয়েছে। আবারও দেখা হলো, আর এ দেখা হয়তো এক নতুন সম্পর্কের শুরু।
তারা হেঁটে চলেছে পাশাপাশি।
অভি যেনো উৎসুক হয়ে সুযোগ খুঁজছিল গতকাল বড়লোকের বিগড়ে যাওয়া ছেলে রনিকে পড়াতে যাওয়ার অভিজ্ঞতা সুচি কি বলার জন্য, কিন্তু একটা লজ্জাবোধ তাকে গ্রাস করছিল।
সুযোগ টা সুচিই দিয়ে দিলো তাকে,
” কাল রাতে কোথায় যেনো পড়াতে গিয়েছিলেন না…. তা কেমন লাগলো??
অভির মুখে এক হাসির ঝলক খেলে গেলো,
“সুচরিতা, কাল একটা নতুন অভিজ্ঞতা হলো… আপনাকে বলার জন্যই মনে মনে ভাবছিলাম।”
সুচরিতা অবাক হয়ে তাকাল।
“কী অভিজ্ঞতা?”
অভি কিছুক্ষণ চুপ করে রইল, তারপর ধীরে ধীরে বলতে শুরু করল।
“শুভ দা আমাকে এক বড়লোকের ছেলের কাছে টিউশন করাতে নিয়ে গিয়েছিল। ছেলেটা… রনি নাম, খুবই বিগড়ে গেছে। মোবাইল, গেমস, আদর-আবদারে নষ্ট। পড়াশোনার নামে শুধু বাবার পয়সা উড়ছে। প্রথম দিনই বুঝলাম, পড়ানোর চাইতে তাকে মানুষ করা কঠিন।”
অভির চোখে সেই মুহূর্তের অস্থিরতা ফুটে উঠল।
“ওর সঙ্গে বসে যখন আমার নিজের জীবনের কথা বললাম—মাটির কুড়েঘর, বাবার ভ্যান, মায়ের মজুরি—তখন প্রথমবার তার চোখে এক ফোঁটা নীরবতা দেখলাম। মনে হলো, হয়তো সে বুঝছে কিছু।”
সুচরিতা মন দিয়ে শুনছিল। ধীরে ধীরে তার চোখ ভিজে উঠল।নরম গলায় বলল,
“ আপনি শুধু পড়াচ্ছেন না অভি… আপনাকে বদলে দিতে হবে। যেটা আমি বস্তির বাচ্চাদের পড়াতে গিয়ে বুঝি, আপনি সেটা রনির মতো ছেলেকেও বোঝাতে পারছেন, এটাই আসল শিক্ষা।”
অভির বুক হালকা হয়ে গেল। সে ভেতরে ভেতরে ভেবেছিল—সুচরিতা হয়তো বুঝবে না। কিন্তু ঠিক সেই বোঝাপড়াটাই সে পেল, যেটা সবচেয়ে দরকার ছিল।
অভি ভেবেছিল সুচরিতা হয়তো শুধু সামান্য প্রশংসা করবে, অথবা নির্লিপ্ত থাকবে। কিন্তু তার চোখে সে যা দেখল—সেটা ছিল এক অন্যরকম দৃষ্টি।
সুচরিতা হালকা হাসল, কিন্তু সেই হাসির ভেতর যেন এক গভীর আন্তরিকতা লুকিয়ে আছে।
“ আপনি জানেন অভি, অনেকেই টাকা দিয়ে, সাজগোজ দিয়ে, ভাষার বাহারে নিজেকে বড় দেখায়। কিন্তু আসলে বড় হওয়া মানে হলো—নিজের কষ্টকে শক্তি বানানো, আর অন্যকে মানুষ করার ক্ষমতা থাকা। আপনি সেটা পারছেন ।”
অভি মাথা নিচু করল, কী বলবে বুঝতে পারছিল না। বুকের ভেতরে যেন অচেনা এক উষ্ণতা জমে উঠল।
সে ভাবল,
“এই মেয়েটা অন্যদের মতো নয়। এর চোখে অহংকার নেই, আছে বোঝাপড়া। সমাজের প্রতি, মানুষের প্রতি সত্যিকারের টান। এ এমন এক মেয়ে, যার কাছে নিজের কথা বললে ছোট হতে হয় না… বরং বড় হয়ে ওঠা যায়।”
সামনে দাঁড়ানো সুচরিতার সাধারণ সালোয়ার, খোলা চুল, আর সহজ হাসি যেন অভির চোখে এক নতুন রঙে ভরে উঠল। শহরের ব্যস্ত কোলাহলের মাঝেও এই মেয়েটি যেন নিরাভরণ একটা আলোর মতো—যেখানে মানুষ নিজেকে হারিয়ে নয়, খুঁজে পায়।
অভির ভেতরে প্রথমবার এক অদ্ভুত টান জেগে উঠল—শ্রদ্ধা, কৃতজ্ঞতা আর এক অচেনা আবেগের মিশ্রণ। সে বুঝল, সুচরিতা শুধু সহপাঠী নয়, হয়তো একদিন তার পথের সাথীও হতে পারে।
সেদিন রাতে মেসে ফিরে অভি জানলার পাশে দাঁড়িয়েছিল। বাইরে ভিজে ভিজে হাওয়া বইছে, মাঝে মাঝে কুকুরের ডাক ভেসে আসছে। ঘরের ভেতর শুভ দা বই নিয়ে বসেছিল, কিন্তু চোখে-কানে টের পাচ্ছিল অভি আজ অন্যরকম চুপচাপ।
শুভ দা হেসে বলল,
“কি রে, আজ কলেজে কিছু বিশেষ হলো নাকি? এমন গম্ভীর কেন?”
অভি হেসে এড়িয়ে গেল।
“না দাদা, তেমন কিছু নয়। ক্লান্ত লাগছে।”
শুভ দা আর চাপ দিল না। সে বই নিয়ে ডুবে গেল, কিন্তু অভির মনে চলছিল এক অদ্ভুত টানাপোড়েন।
জানলার বাইরে তাকিয়ে অভি ভাবছিল,
“আজ সুচরিতা আমার কথা এমনভাবে বুঝল, যেভাবে এতদিন কেউ বোঝেনি। তার চোখের সেই প্রশংসা, সেই আন্তরিকতা—আমাকে যেন আরও শক্ত করে দিল। অথচ এই কথা আমি কাউকে বলতে পারছি না… এমনকি শুভ দাকেও নয়।”
মায়ের মুখ মনে পড়ল। কুঁড়েঘরে বসে মা কেমন করে প্রতিদিনের খাবারের চিন্তায় চোখের কোণে ভাঁজ ফেলে বসে থাকতেন।
অভির বুক কেঁপে উঠল,
“মা যদি জানত, আজ শহরে এমন এক মেয়ের সাথে আমার দেখা হয়েছে, যে শুধু আমার দারিদ্র্য নয়, আমার স্বপ্নকেও শ্রদ্ধা করে… মা কত খুশি হতেন।”
চোখে হালকা জল এসে গেল অভির। কিন্তু শুভদাকে সেটা টের পেতে দিল না।
অন্ধকার আকাশে ঝুলে থাকা ম্লান চাঁদ, ভিজে হাওয়ায় মাটির গন্ধ—সব মিলিয়ে যেন এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা। সেই নিস্তব্ধতার ভেতর অভির বুক কাঁপছে, নিজের সঙ্গে নিজেরই লড়াইয়ে।
“আজকের দিনটা যেন আমার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিল।
সুচরিতার সেই চোখ… কী অদ্ভুত স্বচ্ছ! সেখানে আমি নিজের প্রতিচ্ছবিই দেখতে পেলাম।
ওর কণ্ঠে যখন শুনলাম—আমি শুধু নিজেকে গড়তে আসিনি আমি মানুষ গড়তেও পারি —তখন মনে হলো, কেউ যেন আমার বুকের ভেতর আলো জ্বালিয়ে দিল।
কিন্তু এ কী! কেন বারবার সেই চোখ, সেই কথাগুলো আমাকে টানছে?
এটাই কি ভালোবাসা? নাকি এ কেবল এক ধরনের শ্রদ্ধা?
আমি তো ভাবতাম, ভালোবাসা মানেই দুর্বলতা। অথচ আজ মনে হচ্ছে—এটা হয়তো শক্তি।
কিন্তু আমি কি দুর্বল হয়ে যাচ্ছি? আমি কি আমার স্বপ্নকে ভুলতে বসেছি?
না… না, আমি ভুলতে পারি না।
আমি তো সারা জীবন ভেবেছি—প্রথমে নিজেকে গড়ে তুলতে হবে, তারপর সমাজকে কিছু দিতে হবে। অথচ আজ একটা মেয়ের দুটো আন্তরিক কথা আমার বুকের ভেতর এমন আলোড়ন তুলছে কেন? আমি কি দুর্বল হয়ে যাচ্ছি? নাকি এটাই মানুষ হবার প্রথম ধাপ?”
অভি চোখ বন্ধ করল। ভেসে উঠল মায়ের ক্লান্ত মুখ।
“আমার মা, আমার বাবা—তাদের চোখের জল, তাদের হাহাকার আমার বুকের মধ্যে রক্ত হয়ে বইছে।
যদি আমি ভেসে যাই এই আবেগে, তাহলে কে ভরসা হবে তাদের?
“না, আমি ভাঙতে পারি না… ভালোবাসা যদি থেকেও থাকে, তাকে শক্তি হতে হবে, দুর্বলতা নয়।”
“তবু… তবু কেন মনে হচ্ছে সুচরিতা যেন আমার স্বপ্নের সাথী হতে পারে? সমাজকে বদলানোর লড়াইতে যদি কখনো কেউ কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে হাঁটে, তবে সে কি এই মেয়েটাই?”
অভি এক গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলল। চোখের কোণে অজানা এক আলোড়ন জমে উঠল।
ঠিক তখনই পেছন থেকে শুভ দার কণ্ঠস্বর,
“কী রে, আজ এত ভাবনাচিন্তা কিসের? কলেজের দর্শন পড়তে গিয়ে দেখছি তোকে ইতিমধ্যেই দার্শনিক বানিয়ে ফেলেছে!”
অভি চমকে ঘুরল, কিন্তু হাসি চাপল মুখে। সে তার চিন্তায় এতটাই মগ্ন ছিল যে বুঝতেই পারেনি শুভদা বই পড়া ছেড়ে তার পেছনে এসে দাঁড়িয়ে তাকে লক্ষ্য করছে।
অভি একটু লজ্জা পেলো,
“না দাদা, কিছু না… খালি মনে হচ্ছে, শহরের এই নতুন জীবনটা আমাকে কেমন করে যেন বদলে দিচ্ছে।”
শুভ দা একবার তাকাল তার দিকে। চোখে একটুখানি মমতা, কিন্তু সে আর কিছু জিজ্ঞেস করল না। শুধু ধীরে ধীরে বলল, “দেখিস অভি, নিজের মনের জোরটাই আসল। সেটা ধরে রাখতে পারলেই তুই অনেক দূর যাবি।”
অভি চুপ করে মাথা নাড়ল। তার ভেতরে চলতে থাকা দ্বন্দ্বের ঢেউ যেন এক মুহূর্তের জন্য একটু থেমে গেল।
শুভব্রত কিছুক্ষণ চুপচাপ,এবার একটু হেসে বলল,
“শোন, আমি কিন্তু তোর চেহারার ভাঁজগুলো পড়তে শিখে গেছি রে… কিছু একটা বদলেছে আজ। তুই বলবি না এখন, ঠিক আছে। তবে মনে রাখ, কখনো যদি বুকের ভেতর বোঝা বেশি ভারি লাগে, আমি আছি।”
অভি চমকে পেছন ফিরে তাকায়। কিছু বলতে গিয়েও থেমে যায়। শুধু হালকা মাথা নাড়ে, যেন একটা নীরব স্বীকারোক্তি।
শুভ দা বিছানায় ফিরে গিয়ে আবার বইয়ে চোখ নামিয়ে নেয়। আর অভি কিছুক্ষণ জানালার বাইরে তাকিয়ে থাকে—বুকের ভেতরের অদ্ভুত আলোড়ন আর এই নতুন অনুভূতিটা নীরবে বুকে লুকিয়ে রেখে বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়ল।চোখ বন্ধ, তবু বুকের ভেতরের ঝড় যেন ঘর ভরিয়ে রেখেছে।
এদিকে শুভ দা বইটা হাতে রেখেই চুপ করে অভির দিকে তাকিয়ে রইল।তার চোখে মায়া—যেন ছোট ভাইয়ের ভেতরে নতুন এক আলোর ঝলক দেখতে পাচ্ছে।
শুভব্রত মনে মনে ভাবল,
“এই ছেলে অন্যরকম… এতদিন শুধু তার দারিদ্র্য, সংগ্রাম আর স্বপ্নের কথা জানতাম। কিন্তু আজ দেখছি, তার ভেতরে আরও কিছু জন্ম নিচ্ছে—যা তাকে মানুষ হিসেবে আরও বড় করে তুলবে। হয়তো এটাই প্রথমবার, যখন ওর চোখে নিজের জন্য নয়, অন্য কারও জন্য আলোর ঝলক দেখছি। কে জানে, এটাই কি জীবনের সেই অধ্যায়, যা ওকে ভেতরে ভেতরে ভেঙে আবার নতুন করে গড়ে তুলবে?”
সে মনে মনে ভাবল,
“ছেলেটা বড় নিরীহ দেখায়, কিন্তু বুকের ভেতর কত আগুন লুকিয়ে আছে তা ও নিজেই হয়তো জানে না।
আজ যে চোখে আমি ঝলক দেখলাম—সেই চোখ একদিন হয়তো সমাজের অন্ধকার ভেদ করবে।”
তার চোখের সামনে ভেসে উঠল,
অভাবী গ্রামে মা-বাবার ক্ষুধার্ত মুখ, অভির ক্লান্ত বাবার ভ্যান ঠেলার দৃশ্য, মায়ের মজুরি খেটে ফেরা কাঁপা হাত…
শুভ দার বুক মোচড় দিয়ে উঠল,
“কেন এতো অবিচার ওদের জীবনে! কেন জন্মের পর থেকেই ওদের কাঁধে শুধু বঞ্চনার বোঝা চাপানো থাকে?”
কিন্তু পরক্ষণেই সে অভির মুখটা মনে করল—সেই দৃঢ়তা, সেই শান্ত অথচ শক্ত ভরসার হাসি।
শুভ দা নিঃশব্দে প্রার্থনা করল,
“হে ঈশ্বর, যদি কোথাও ন্যায় থাকে, তবে এই ছেলেটাকে শক্তি দাও।যেন ও একদিন মানুষের জন্য দাঁড়াতে পারে… যেভাবে হয়তো ভাগ্য একদিন ঠেলে দেবে ওকে।
হয়তো সত্যিই এই অভি,গ্রামের এই ছেলে—একদিন ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট হয়ে, সমাজের ঘুন ধরানো অবিচার ভেঙে ফেলবে।”
তার চোখে জল এসে গেল, কিন্তু দ্রুত মুছে নিল।কারণ অভিকে সে ভাঙতে দেখতে চায় না—
শুধু চায়, ছেলেটা নিজের শক্তিকে চিনুক।
শুভ দা দীর্ঘশ্বাস ফেলল, তারপর আবার বইয়ের পাতায় চোখ নামিয়ে নিল।তবু ভেতরে ভেতরে একটা নিশ্চিন্তি কাজ করছিল,
“অভি একা নয়, ওর পথচলায় আমি আছি।”
রাত গভীর হচ্ছে। মেসের ঘরে বাতি নেভানো, শুধু জানালা দিয়ে আসা চাঁদের আলোয় ঘরটা আধো-অন্ধকার। শুভদা ঘুমিয়ে পড়েছে।
অভি বিছানায় শুয়ে আছে, অথচ চোখের পাতা বন্ধ করেও ঘুম আসছে না।
হঠাৎ তার চোখের সামনে ভেসে উঠল মায়ের মুখ,
মাটির উঠোনে বসে ভাঙা হাঁড়ি থেকে খুন্তি দিয়ে আঁচড়ে আঁচড়ে ভাত বার করছেন মা। পাশে বাবা ক্লান্ত মুখে বসে আছেন, সারাদিন ভ্যান টেনে শরীর ভেঙে গেছে। তবু ছেলের পড়াশোনার জন্য মুখে কিছু বলেন না, শুধু ম্লান হাসি।
অভির বুক ভারী হয়ে এল,
“মা, বাবা… আমি জানি, তোমরা আমার জন্য কত কষ্ট করছো।আমি যদি হেরে যাই, তবে এই দারিদ্র্য, এই অবিচার কোনোদিন শেষ হবে না।”
ঘুমের ঘোরে গুঙিয়ে কেঁদে উঠল অভি।
বাইরে থেকে শুধু কুকুরের হাহাকার ভেসে আসছে। হঠাৎ মাঝরাতে নিস্তব্ধতা ভেঙে ঘুমের ভেতর শুভ দার কানে এলো এক অদ্ভুত শব্দ—মৃদু গোঙানি, যেন কারও বুকভাঙা কান্না।
সে চমকে উঠে বিছানায় সোজা হয়ে বসল।
অভির খাটের দিকে তাকিয়ে দেখল।অভি কাতর হয়ে শুয়ে আছে, ঠোঁট নড়ছে, চোখ থেকে টপটপ করে জল গড়িয়ে বিছানার চাদরে ভিজে যাচ্ছে।
শুভ দা ছুটে গিয়ে অভিকে ঝাঁকিয়ে ধরল আতঙ্কে,
“এই অভি! অভি, কি হয়েছে রে তোর? কোথাও ব্যথা করছে? দুঃস্বপ্ন দেখছিস নাকি?”
অভি চমকে জেগে উঠল। বুক ধড়ফড় করছে, চোখ ভেজা।
মুহূর্তে বুঝল—সে কেঁদে ফেলেছে। লজ্জায় মুখ ঢাকল।
অভি কাঁপা গলায় বলল,
“না দাদা… কিছু না। শুধু…মায়ের মুখটা বারবার চোখের সামনে ভেসে উঠছিল। ওঁরা কত কষ্টে আছেন… আমি যদি কিছু করতে না পারি, তবে সব শেষ।”
শুভ দা গভীর শ্বাস নিল, মমতাভরা দৃষ্টিতে অভির মাথায় হাত রাখল।
“পাগল ছেলে… কান্না দুর্বলতার লক্ষণ নয়। এটা প্রমাণ করে, তোর ভিতরটা এখনো মানুষ হয়ে আছে। কিন্তু মনে রাখিস—কাঁদতে কাঁদতে কেউ স্বপ্ন পূরণ করতে পারে না। তুই যদি সত্যিই ওদের দুঃখ ঘোচাতে চাইস, তবে নিজের চোখ শুকিয়ে ইস্পাত বানাতে হবে।”
অভি চুপ করে শুভ দার চোখের দিকে তাকাল। সেই চোখে ভরসা, শক্তি।শুভ দা যেন এক অদৃশ্য প্রতিজ্ঞা তার হাতে তুলে দিল।
অভির বুকের ভেতর কেমন যেন হালকা লাগল।
সে ধীরে ধীরে মাথা নোয়াল,
“হ্যাঁ দাদা, আমি ভাঙব না। আমি পারব।”
শুভ দা হেসে তার কাঁধে চাপড় দিল।
” সাবাস।”
ঘরের ভেতর নিস্তব্ধতা আবার ফিরে এল, তবে এবার সেই নিস্তব্ধতার মধ্যে জন্ম নিল এক নতুন দৃঢ়তা।
তার ভেতরে যেন এক আগুন জ্বলে উঠল।অভি নিঃশব্দে মুঠি শক্ত করে শপথ নিল,
“না, আমি ভাঙব না।আমি প্রমাণ করব, গরিবের সন্তানও স্বপ্ন পূরণ করতে পারে।
আমি হব ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট—আর সেই দিন আমি অন্যায়ের বিচার করব,যারা আজ আমার গ্রামের মানুষকে খিদে আর অবহেলার মধ্যে ফেলেছে, তাদের দাঁতভাঙা জবাব আমি দেব।”
চোখের কোণে জল জমলেও সে দ্রুত মুছে নিল।
তার বুকের ভেতর এক অদম্য দৃঢ়তা জন্ম নিল,
যেন ঘুম নয়, এই শপথ নিয়েই সে নতুন দিনের ভোরের অপেক্ষায় রইল।
ভোরের আলো আস্তে আস্তে ঘর ভরিয়ে তুলছে।
জানলার বাইরে পাখির ডাক, দূরে কোথাও শাঁখ বাজছে—কলকাতার ভোর যেন এক অদ্ভুত শান্তির আভা ছড়িয়ে দিয়েছে।
অভি তখনও বিছানায় চুপচাপ শুয়ে ছিল, রাতের কান্নার ভার যেন এখনো বুকের ভেতর চেপে আছে। শুভ দা উঠে বসে জানলার পাশে দাঁড়াল। আকাশের দিকে তাকিয়ে সে হাসল, যেন নিজের ভেতরের সব অন্ধকারকে বিদায় জানাচ্ছে।
মুহূর্ত পরে সে অভির দিকে তাকাল।
মৃদু গলায় বলল,
“দেখলি অভি, প্রতিটা রাত যতই ঘন অন্ধকার হোক না কেন, ভোরের আলো আসবেই। এটা প্রকৃতির নিয়ম।”
অভি চোখ মুছে উঠল, চুপচাপ শুনছিল।
“কাল রাতে তুই কাঁদলি, ঠিক আছে—কাঁদা মানে দুর্বলতা নয়। কিন্তু আজ থেকে মনে রাখিস—তোর স্বপ্ন, তোর মা-বাবা, তোর গ্রাম, তাদের আশা… সবকিছু তুই কাঁধে নিয়ে চলছিস। ভোরের এই আলো যেমন নতুন করে জন্ম দেয় দিনকে, তুইও সেরকম নিজের ভেতর নতুন আলো জ্বালবি। তখনই একদিন তুই পারবি সত্যিকারের মানুষের পাশে দাঁড়াতে।”
অভির বুকের ভেতর যেন এক নতুন শক্তি জেগে উঠল। জানলার বাইরে তাকিয়ে সে হঠাৎই অনুভব করল—আকাশটা যত দূরে, তার স্বপ্নও তত বড়, তবু অধরা নয়।
অভি দৃঢ় গলায় বলল,
“দাদা, আজ থেকে আমি আর কাঁদব না। আমি লড়ব। শুধু নিজের জন্য নয়—যাদের কেউ নেই, তাদের জন্য।”
শুভ দা হেসে অভির কাঁধে হাত রাখল।
“এই তো চাই। মনে রাখিস, অভি—ভোর মানেই নতুন শুরু।”
ঘরের ভেতর সূর্যের আলো ঢুকে পড়ল।অভির চোখে সেই আলো ঝলমল করে উঠল—এবার সে সত্যিই এক নতুন ভোরকে বুকে নিয়ে সামনে এগিয়ে চলার জন্য প্রস্তুত।
সে তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে নিলো।সকালের আলো মেসের জানলার ফাঁক দিয়ে ঘরে ঢুকছে। টেবিলে ভাতের পাত্র, কলাই ডাল, আর হালকা সব্জির গন্ধ।
অভি ব্যাগ কাঁধে নিয়ে নামতে গিয়েই থমকে গেল—জলখাবারের টেবিলে বসে আছেন মেসের মালিক, হেড স্যারের বন্ধু, সুধীর বাবু। সামনে কাপে ধোঁয়া ওঠা চা, আর হাতে খবরের কাগজ।মুখটা গম্ভীর, ভ্রু কুঁচকে খবরের কাগজ পড়ছিলেন।
অভি ধীরে ধীরে সিঁড়ি বেয়ে নেমে এলো। কাঁধে ব্যাগ, চোখে ভোরের উজ্জ্বলতা। তাকে দেখে ভদ্রলোক কাগজ ভাঁজ করে টেবিলে রাখলেন।
সুধীর বাবু রাশভারী ভঙ্গিতে বললেন,
“কোথায় যাচ্ছিস এত সকালে?”
অভি নতমুখে বলল,
“ আজ্ঞে… আজ কলেজের প্রথম ক্লাসটা করতে হবে । তাই একটু আগে বেরোতে চাইছিলাম।”
ভদ্রলোক কিছুক্ষণ অভির দিকে তাকিয়ে রইলেন। চোখের চাহনিতে গম্ভীরতা থাকলেও কণ্ঠস্বর নরম হলো।
” তা পড়াশুনা কেমন চলছে?
অভি শুধু মাথা নাড়ল।
” শুভ বলছিল, তুই নাকি একটা টিউশনও করতে শুরু করেছিস?”
“তা বেশ। পরমুখাপেক্ষী না হয়ে একটু সাবলম্বী হওয়া ভালো।তোর স্যার যা বলেছিল তোর সম্বন্ধে ,তুই তো দেখছি আর এককাঠি উপর। এই আত্মসম্মান বোধটাই তোকে অনেকদূর নিয়ে যাবে।”
একটু থামলেন।
“তবে একটা কথা মনে রাখিস বাবা, কলকাতা সহজ শহর নয়। এখানে পয়সার জোরে অনেক কিছু মাপা হয়। কিন্তু তুই যেন ভুলে যাস না, মানুষের আসল দাম মাপা হয় তার মনের শক্তিতে।”
অভি চুপ করে মাথা নাড়ল। বুকের ভেতর যেন অদৃশ্য এক সাহস জেগে উঠল।
মালিক চোখ সরু করে, কিন্তু স্নেহ মেশানো ভঙ্গিতে,
“তুই হেডমাস্টার সাহেবের ভরসায় এখানে এসেছিস। পরিশ্রম কর, সোজা পথে চল। একদিন তুই যদি বড়ো হতে পারিস, তখন এই মেসের ভাত-ডালও সার্থক হবে।”
অভির গলা শুকিয়ে এল। সে ধীরে ধীরে বলল,
“চেষ্টা করব স্যার … মায়ের মুখ মনে রেখেই চেষ্টা করব।”
ভদ্রলোক আর কিছু বললেন না। শুধু মাথা নাড়লেন, যেন নিঃশব্দে আশীর্বাদ করলেন।
অভি খেয়ে টেবিল থেকে উঠে পড়ল। বাইরে বেরিয়ে এলো সে।
সকালের আলোয় কলেজ স্ট্রিটের কোলাহল জমে উঠেছে।রাস্তায় তখন ভিড় জমতে শুরু করেছে। অটো, বাস, রিকশার হর্ন—সব মিলিয়ে শহরটা যেন জেগে উঠেছে নিজের চিরচেনা কোলাহলে। মেস থেকে বেরিয়ে অভির মুখে আজ এক অদ্ভুত দৃঢ়তা—গত রাতের অশ্রু যেন ভোরের আলোয় গলে গেছে।
অভি হাঁটছিল কলেজের পথে। হঠাৎই তার চোখে পড়ল—ফুটপাথের ধারে এক বয়স্ক ভিখারি বসে আছে, কাঁপতে থাকা হাতে একটা ভাঙা প্লাস্টিকের গ্লাস বাড়িয়ে দিচ্ছে। লোকজন পাশ কাটিয়ে চলে যাচ্ছে, কেউ ফিরেও তাকাচ্ছে না। পাশে দাঁড়িয়ে একটা ছোট্ট মেয়ে, তার চোখে ক্ষুধার্ত আতঙ্ক।
অভির বুকটা কেঁপে উঠল। মনে হলো, মা যদি এই শহরে থাকতেন, তবে হয়তো ঠিক এমনভাবেই মানুষের কাছে হাত পাততে বাধ্য হতেন। সে থমকে দাঁড়াল।
ঠিক তখনই দেখল—এক কলেজ পড়ুয়া ছেলে পাশ কাটাতে গিয়ে বিরক্ত স্বরে বলল,
“এইসব মানুষদের জন্যই তো শহরের চেহারা নষ্ট হয়!”
অভির ভেতরটা হঠাৎ করে গর্জে উঠল। সে চুপচাপ কিন্তু দৃঢ় চোখে লোকটার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর নিজের পকেট থেকে বের করল কিছু খুচরো পয়সা, ভিখারির হাতে গুঁজে দিল।
মেয়েটির চোখে তখন এক অদ্ভুত কৃতজ্ঞতার ঝিলিক। অভির বুক ভরে উঠল।
সে হাঁটা শুরু করল আবার। এবার তার ভেতর অন্যরকম শক্তি। মনে মনে বলল,
“আমি যদি সত্যিই ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট হতে পারি, তবে এই অবহেলা, এই অসম্মান একদিন ভেঙে দেবো। শহরকে শিখিয়ে দেব, মানুষের দুঃখ-দুর্দশা কখনো বোঝা নয়, বরং সমাজের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।”
রাস্তার ভিড়ের ভেতর দিয়ে এগিয়ে চলল অভি। তার চোখে আজ আছে উত্তেজনা, আছে অটল সংকল্প—নিজেকে গড়ে তুলে সমাজকে বদলানোর দৃঢ় অঙ্গীকার।
কলেজের গেটের ভেতরে ঢুকতেই সে দেখতে পেল, করিডোরের শেষ মাথায় দাঁড়িয়ে আছে সুচরিতা। সাদা সালোয়ার কামিজে, চুল খোলা, হাতে কয়েকটা বই—কিন্তু তার চোখ যেন কারও খোঁজ করছে।
অভি ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল।
সুচরিতা অভিকে দেখে মুচকি হেসে বলল
“আজ আপনাকে একটু অন্যরকম লাগছে। মুখে যেন আলো ফুটে উঠেছে।”
অভি একটু হেসে উত্তর দিল,
“আজ ভোরে বুঝলাম, যত অন্ধকারই আসুক, আলোকে থামানো যায় না। আমি ঠিক করেছি, আর পিছিয়ে যাব না।”
সুচরিতা কিছুক্ষণ চুপ করে অভির দিকে তাকিয়ে রইল। তার চোখে বিস্ময়ের সঙ্গে যেন শ্রদ্ধার ঝিলিক।
“ আপনি একটু আলাদা অভি… বাকিদের মতো নন। আপনার মধ্যে একটা শক্তি আছে—যেটা শুধু পড়াশোনার নয়, ভেতর থেকে আসে। আমি সেটা অনুভব করতে পারি।”
অভি মাথা নাড়ল, সুচরিতার মুখে কোনো অহঙ্কার নেই।
অভি নরম গলায় বলল,
“আমি শক্তিশালী হবো শুধু তখনই, যখন আমার শক্তি দিয়ে অন্যদের পাশে দাঁড়াতে পারব।”
এই কথাগুলো শুনে সুচরিতার বুকের ভেতর যেন ঢেউ খেলে গেল। এ ছেলেটি কেবল স্বপ্ন দেখে না, স্বপ্নকে বাস্তব করতে লড়াই করার সাহস রাখে—এটাই তাকে বাকিদের থেকে আলাদা করে তোলে।
করিডোরে ভিড় বাড়ছিল, কিন্তু অভি আর সুচরিতার চারপাশে যেন সময় থমকে গেল।
একই সঙ্গে তারা দু’জনেই অনুভব করল—এই দেখা, এই আলাপ, যেনো এক অদৃশ্য বাঁধনের শুরু।
ঠিক তখনই করিডোরে ঘণ্টা বাজল, ভিড় আরও ঘনিয়ে উঠল। ছাত্রছাত্রীরা বই হাতে হুড়মুড় করে ছুটতে লাগল। কিন্তু অভি আর সুচরিতার চারপাশে যেন অন্য এক নীরবতা।
অভির বুকের ভেতর একটা আলোড়ন চলছিল। সুচরিতার সেই শ্রদ্ধাভরা চোখের দৃষ্টি যেন তার সব দুঃখ, সব লড়াইকে মুহূর্তে মুছে দিচ্ছে। তার মনে হলো—এই মেয়েটি সত্যিই বোঝে, এমনভাবে বোঝে যেভাবে এতদিন কেউ বোঝেনি।
সুচরিতা বই বুকে চেপে হালকা গলায় বলল,
“আপনি জানেন, আমি প্রায়ই ভাবি… সমাজের আসল পরিবর্তন আনতে হলে শুধু বড় বড় কথা বললেই হয় না, কাউকে সামনে থেকে পথ দেখাতে হয়। আজ মনে হচ্ছে, আপনি সেই মানুষ হতে পারবেন।”
অভির বুক ধক করে উঠল। এতখানি বিশ্বাস সে কখনো শোনেনি, এমনকি নিজের গ্রামেও না।
সে একটু কেঁপে উঠে জবাব দিল
“আমি চেষ্টা করব সুচরিতা। কিন্তু যদি একদিন পথটা খুব কঠিন হয়ে ওঠে, তখন পাশে একজন মানুষ দরকার হবে—যে শুধু বলবে, ‘হার মানিস না।’ সেই মানুষ কি আপনি হবেন?”
সুচরিতা অবাক হলো প্রশ্ন শুনে। এক মুহূর্ত চুপ করে রইল। তার বুকেও যেন ঢেউ খেলে গেল। তারপর ধীরে মাথা নাড়ল, ঠোঁটের কোণে নরম হাসি ফুটল।
“হ্যাঁ… আমি থাকব।”
দু’জনেই আর কিছু বলল না। তাদের চোখের ভেতরে যে প্রতিশ্রুতি ঝলসে উঠল, তার চেয়ে বড় কোনও ভাষা নেই।
করিডোরের কোলাহলের মধ্যে দাঁড়িয়ে থেকেও, তাদের দু’জনের চারপাশে যেন এক মুহূর্তের জন্য সময় স্তব্ধ হয়ে গেল।দুজনের সামাজিক দূরত্বের ভেতরেও অদৃশ্য এক বিশ্বাস, এক গভীর স্নেহের অঙ্কুর জন্ম নিল—যা হয়তো একদিন এক মহীরূহে পরিণত হবে।
—oooXXooo—
![]()







