নিজস্ব সংবাদদাতা: জল ও মাটি সংরক্ষণ করে কৃষি ও কৃষকের সমৃদ্ধি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিয়েছে। ‘প্রধানমন্ত্রী কৃষি সিঞ্চাই যোজনা’-এর আওতায় ‘জলবিভাজিকা উন্নয়ন উপাদান (WDC-PMKSY)’ প্রকল্পটি কেবল একটি সরকারি উদ্যোগ নয়, বরং এটি জনসাধারণের অংশগ্রহণে পরিচালিত এক গণআন্দোলন, যা দেশের খরা-প্রবণ ও বৃষ্টি-নির্ভর অঞ্চলগুলোর কৃষকদের জীবনে ব্যাপক পরিবর্তন এনেছে। কেন্দ্রীয় কৃষি ও কৃষক কল্যাণ মন্ত্রী শিবরাজ সিং চৌহানের মতে, এই প্রকল্প ভারতের ‘উন্নত ভারত ২০৪৭’-এর সংকল্পকে বাস্তবায়নের পথে এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।
ভূগর্ভস্থ জলের সংকট ও সমাধানের দূরদর্শী চিন্তা
আজ যখন দেশের অনেক অঞ্চলে ভূগর্ভস্থ জলের স্তর আশঙ্কাজনক হারে নিচে নেমে যাচ্ছে, তখন এর ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর দূরদর্শী নেতৃত্বে সরকার ‘জলবিভাজিকা উন্নয়ন’ প্রকল্পের মাধ্যমে এক বড় চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য হলো বৃষ্টির জলকে প্রবাহিত হতে না দিয়ে তা সংরক্ষণ করা। ‘ক্ষেতের জল মাঠেই থাকুক এবং গ্রামের জল গ্রামেই থাকুক’ – এই সহজ মন্ত্রকে সামনে রেখে এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এর আওতায় ছোট ছোট পুকুর, চেকড্যাম এবং অন্যান্য জল কাঠামো তৈরি করা হচ্ছে, যা বৃষ্টির জলকে ধরে রাখে এবং ধীরে ধীরে মাটির নিচে প্রবেশ করতে সাহায্য করে। এর ফলে ভূগর্ভস্থ জলের স্তর বৃদ্ধি পায় এবং মাটি দীর্ঘ সময় ধরে আর্দ্র থাকে।
জনগণের অংশগ্রহণ – প্রকল্পের মূল শক্তি
এই প্রকল্পের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এতে জনসাধারণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ। গ্রামের মানুষ একসঙ্গে বসে সিদ্ধান্ত নেয় যে কোথায় পুকুর খনন করা হবে, কোথায় জল কাঠামো তৈরি হবে এবং কোথায় বৃক্ষরোপণ করা হবে। ভূমিহীন পরিবার এবং মহিলা স্বনির্ভর গোষ্ঠীগুলিকে হাঁস-মুরগি পালন এবং মৌমাছি পালনের মতো বিকল্প জীবিকা উপার্জনের সঙ্গে যুক্ত করে তাঁদের আয় বৃদ্ধির ব্যবস্থা করা হয়েছে। এর ফলে প্রকল্পটির সফলতা বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে এবং এটি একটি প্রকৃত জনবিপ্লবে পরিণত হয়েছে।
সফলতার পরিসংখ্যান – এক নতুন দিগন্তের সূচনা
২০১৫ সাল থেকে সরকার এই প্রকল্পে প্রায় ২০,০০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে এবং ৬,৩৮২টিরও বেশি প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে, যা প্রায় ৩ কোটি হেক্টর অনুর্বর জমিকে আবার উর্বর করে তুলেছে। এই উদ্যোগের ফলে কৃষকদের আয় ৮% থেকে ৭০% পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। এই প্রকল্পের আওতায় ৯ লক্ষেরও বেশি জল কাঠামো তৈরি করা হয়েছে এবং ৫.৬ কোটিরও বেশি কর্মদিবস সৃষ্টি হয়েছে, যা গ্রামীণ কর্মসংস্থান বৃদ্ধিতে সহায়ক হয়েছে।
- জল ও ফসলের বৃদ্ধি: প্রকল্প এলাকায় জল উৎস প্রায় ১৬% বৃদ্ধি পেয়ে ১.৫ লক্ষ হেক্টর নতুন এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে। এর ফলে ফসলের জমি ১০ লক্ষ হেক্টর (৫% বৃদ্ধি) বৃদ্ধি পেয়েছে এবং ৮.৪ লক্ষ হেক্টরেরও বেশি অনুর্বর জমি চাষযোগ্য হয়ে উঠেছে।
- উদ্যানপালনে নতুন বিপ্লব: কৃষকরা এখন ঐতিহ্যবাহী ফসলের পাশাপাশি ফল এবং অন্যান্য গাছপালার চাষ শুরু করেছেন। উদ্যানপালন এবং বৃক্ষ চাষের পরিধি ১২% বৃদ্ধি পেয়ে ১.৯ লক্ষ হেক্টরে পৌঁছেছে।
বিভিন্ন রাজ্যের সাফল্যের গল্প – দৃষ্টান্তমূলক পরিবর্তন
এই প্রকল্প দেশের বিভিন্ন প্রান্তে দৃষ্টান্তমূলক পরিবর্তন এনেছে।
- মধ্যপ্রদেশের ঝাবুয়া: একসময়ের খরা-প্রবণ এই এলাকায় এখন ভূগর্ভস্থ জলের স্তর এক মিটার বৃদ্ধি পেয়েছে। চেকড্যাম নির্মাণের পর কৃষকরা ভুট্টার পাশাপাশি ছোলা চাষ করে তাঁদের আয় ৫০,০০০ থেকে ৬০,০০০ টাকা পর্যন্ত বাড়াতে পেরেছেন।
- রাজস্থানের বারমের: মরুভূমি অধ্যুষিত এই অঞ্চলে কৃষকরা ডালিম চাষ করে জীবিকা নির্বাহ করছেন। ‘জলবিভাজিকা’ প্রকল্পের সাহায্যে ১২০ জনেরও বেশি কৃষককে ডালিমের চারা সরবরাহ করা হয়েছে, যা সীমিত জলের পরিস্থিতিতেও ভালো ফলন দিচ্ছে।
- ত্রিপুরার প্রত্যন্ত অঞ্চল: ত্রিপুরার দাশ রিয়াং এবং বিমান রিয়াংয়ের মতো কৃষকরা তাঁদের অনুর্বর জমিতে আনারস চাষ করে ভালো আয় করছেন, যা তাঁদের জীবনযাত্রায় ইতিবাচক পরিবর্তন এনেছে।
প্রযুক্তি ও সচেতনতা – ‘জলবিভাজিকা যাত্রা’
এই প্রকল্পকে একটি গণআন্দোলনে পরিণত করার জন্য ‘জলবিভাজিকা যাত্রা’র আয়োজন করা হয়েছে, যার মাধ্যমে সারা দেশে জল সংরক্ষণ এবং ভূমি সমৃদ্ধকরণের জন্য জনসচেতনতা সৃষ্টি করা হয়েছে। প্রযুক্তির ব্যবহারও এই প্রকল্পের সফলতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। ‘ভুবন জিওপোর্টাল (সৃষ্টি)’ এবং ‘দৃষ্টি’ মোবাইল অ্যাপের মতো ডিজিটাল পরিষেবাগুলি প্রকল্পের অগ্রগতি সঠিকভাবে পর্যবেক্ষণ করছে, যা স্বচ্ছতা ও কার্যকারিতা নিশ্চিত করছে।
শিবরাজ সিং চৌহানের মতে, এই প্রকল্প কেবল পরিসংখ্যান নয়, বরং দেশের কৃষকদের কঠোর পরিশ্রম এবং উন্নত ভবিষ্যতের এক জীবন্ত গল্প। জল ও মাটি সংরক্ষণ করতে পারলে তবেই ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত হবে। ‘উন্নত ভারত ২০৪৭’-এর স্বপ্ন তখনই বাস্তবায়িত হবে যখন গ্রামের জমি সমৃদ্ধ হবে এবং কৃষকরা সমৃদ্ধ হবে।
![]()






