এক স্বাধীনতা সংগ্রামীর অজানা কাহিনী
নিলয় বরণ সোম
সামনে ১৫ আগস্ট। এবার পড়েছে শুক্রবার , তারপর শনি রবি ছুটি। ১৪ তারিখ রাত্রে ভাই বোন মিলে ঠাকুরদা অর্থাৎ শিশিরবাবুর কাছে আবদার করল , স্বাধীনতা আন্দোলনের অজানা কাহিনী শুনবে বলে। শিশিরবাবুর বয়স ৭৫, সুতরাং স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা ওঁর থাকার কথা নয়। কিন্তু উনি ভাবলেন , নিজের ছোটবেলা কেটেছে ডিব্রুগড় আসামে। লিপি আর মিতুল ইতিমধ্যেই ক্ষুদিরাম , প্রফুল চাকি , বিনয় বাদল দীনেশ , মাতঙ্গিনী হাজরা সকলের কথাই পড়েছে। কিন্তু ওঁর নিজের রাজ্যের সংগ্রামীদের কথা তো কিছুই জানে না। তাই বললেন ,
” আচ্ছা , শোনো তবে এক অল্পবয়সী বীরাঙ্গনার কথা , কনকলতা বড়ুয়ার কথা !
মিতুল অধৈর্য্য , বলল , ” কে কনকলতা বড়ুয়া ?”
শিশিরবাবু বলেন , ” বলছি , চুপ করে শোনো তোমরা। “
আলমারি খুলে শিশিরবাবু তার পুরোনো ডায়েরিটা বের করলেন , মাঝে মাঝে সেখানে চোখ রেখে , শুরু করলেন কনকলতার আখ্যান:
-“কনকলতা বড়ুয়ার জন্ম অবিভক্ত আসামের দারাং জেলার বোরাংবাড়ি গ্রামে , ১৯২৪ সালের ২২ ডিসেম্বর। বাবা মায়ের নাম ,কৃষ্ণকান্ত বড়ুয়া ও কামেশ্বরী বড়ুয়া।কনকলতার ঠাকুরদা ঘনকান্ত বড়ুয়া শিকারী হিসাবে খুব বিখ্যাত ছিল , সুতরাং পরিবারটি স্থানীয় অঞ্চলে এনামকরা পরিবার ছিল। কনকলতাকে শৈশব থেকেই শোকতাপ সহ্য করতে হয়েছিল ; পাঁচ বয়স বয়সে মা মারা যান , বাবা দ্বিতীয়বার বিয়ে করলেও , নিজে প্রাণত্যাগ করেন কনকের তের বছর বয়সে। স্কুলে যাতায়ত শুরু করলেও তার পড়াশুনা ক্লাস থ্রিয়ের গন্ডি পেরোয় নি , কারণ ছোট ভাইবোনদের দেখাশোনার দায়িত্ব তখন ওঁর কাঁধে। “
একগ্লাস জল খেয়ে নিয়ে শিশিরবাবু বলতে থাকেন, “পরিবারের দায়িত্বই বোধহয় কনককে বৃহত্তর ভূমিকার জন্য প্রস্তুত করে নিয়েছিল। ১৯৪২ এর ভারত ছাড় আন্দোলনের অভিঘাত ভারতের অন্যন্য প্রদেশের মতো আসামেও স্পর্শ করেছিল , পৌঁছে গিয়েছিল কনকের অখ্যাত গ্রাম গ্রামাঞ্চলেও । কনকলতা মৃত্যু বাহিনী বলে গোহপুর সব ডিভিশনের একটি যুব সংগঠনে যোগ দেন। বাহিনীর সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ১৯৪২ সালের ২০ সেপ্টেম্বর , স্থানীয় থানায় পতাকা উত্তোলনের দায়িত্ব তাঁকে দেওয়া হয়। স্থানীয় থানার দারোগা বাহিনীকে সতর্ক করে দিয়েছিল , এই পরিকল্পনা রূপায়ণ করতে গেলে তার ফল হবে মারাত্মক।
লিপি এবার বলল , ” সেই দারোগা নিশ্চয়ই ইংরেজ ছিল !”
শিশিরবাবু বলেন , ” না , উনি ভারতীয়ই ছিলেন। তখন অনেক সরকারি কর্মচারী যেমন গান্ধীজীর ডাকে অফিস আদালত চাকরি বাকরি সব ছেড়ে দিয়েছিল দেশের জন্য , অনেক ভারতীয় আবার ভয়ে অথবা ভক্তিতে , ব্রিটিশ শাসকদের হয়েই কাজ করতI এই দারোগাও এমনি ছিলেন।“
মিতুল জিজ্ঞাসা করল , তারপর কী হল ?
শিশিরবাবু বলে চলেন , সেই বাহিনীর রক্ত তখন টগবগ করে ফুটছে। ওরা কী পুলিশের কথা শোনার পাত্র?বাহিনী এগিয়ে চলে , তেরঙ্গা পতাকা হাতে নেতৃত্বে ১৭ বছরের তরুণী কনকলতা। থানার সামনে এক অগ্নিবর্ষী ভাষণ দিতে শুরু করেন , পুলিশ এগিয়ে আসে দমন করতে; দারোগা চালিয়ে দিল গুলি চালাবার হুকুম। পুলিশের গুলি সরাসরি এসে লাগে কনকলতার বুকে , উনি হয়ে যান আসামের প্রথম মহিলা শহীদ। পতাকা তাঁর হাত থেকে পড়ে গেলে অন্য এক যুবক , মুকুন্দ কাকোতি সেই পতাকা উচ্চে তুলে ধরেন , কিন্তু ওঁকেও শহীদের মৃত্যু বরণ করতে হয়।
“এতো অসাধারণ বীরত্বের কাহিনি ! তাহলে আমাদের বইতে ওঁর কথা নেই কেন ?” ভাইবোন দুজনেরই প্রশ্ন।
শিশিরবাবু বলেন , ” আমাদের দেশ বিরাট। আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামে লক্ষ লক্ষ যোগ দিয়েছে , নানাভাবে , নানারকম আত্মত্যাগ তাদের। সকলের কথা টেক্সটবুকে লেখা সম্ভব নয় , তাই স্থানীয় ইতিহাস বলে একটা বা ধারণা আছে। ধরে নাও , বিনয় বাদল দীনেশের নাম হয়ত ভারতের অনেক রাজ্যে জানে না ,সে রাজ্যের লোকেরা আবার জানে তাদের সন্তানদের কথা। তাই , কনকলতা আমার স্থানীয় ইতিহাসের অঙ্গ। আর যারা ইতিহাস নিয়েই পড়াশুনা করে , বড় হয়ে তারা সকলের কথাই জেনে যায় , পড়াশুনা করতে করতে আর গবেষণার মাধ্যমে। “
শিশিরবাবু আরেকটু কিছু বলতে যাবেন , মিতুল ওর ফোন থেকে বলতে থাকে ,
“ সেই বীরাঙ্গনার নামে আসামের রাজধানী গৌহাটিতে একটি রাস্তা আছে , কনকলতা পথ। তাছাড়া , ১৯৯৭ সালে ইন্ডিয়ান কোস্ট গার্ডের একটি দ্রুত প্রহরী যানের নামকরণ হয় ICGS Kanak Lata Barua বলে। তাছাড়া , গৌহাটিতে তাঁর একটি পূর্ণাবয়ব মূর্তি স্থাপন করা হয়েছে। অসমীয়া ভাষায় Epaah Phulil Epaah Xori একটি সিনেমা হয় , চন্দ্র মুদলির পরিচালনায়। পরে পূরব কী আওয়াজ বলে সিনেমাটি হিন্দিতে রূপান্তরিত হয় , সর্বভারতীয় দর্শকদের জন্য।“
শিশিরবাবু বলে চলেন , সেই বাহিনীর রক্ত তখন টগবগ করে ফুটছে। ওরা কী পুলিশের কথা শোনার পাত্র ? দারোগা চালিয়ে দিল গুলি চালাবার হুকুম।
শিশিরবাবু খুশি হয়ে বলেন , এবার দেখছো , তুমি নিজেই কেমন গবেষণা করে বের করলে। তাহলে , আমরা ১৫ আগস্টে সবাই মিলে ওই হিন্দী ছবিটা দেখার চেষ্টা করবো কেমন ?
লিপি আর মিতুল রাজি হয়ে বলে , হ্যাঁ , স্কুল থেকে ফিরে দেখা যাবে।
—oooXXooo—
![]()







