আজ, ১১ই আগস্ট, শহীদ ক্ষুদিরাম বসুর আত্মবলিদানের দিন। দেশের স্বাধীনতার জন্য ১৮ বছর বয়সে যিনি হাসিমুখে ফাঁসির দড়িকে বরণ করে নিয়েছিলেন, সেই মহান বিপ্লবীর কথা আজ স্মরণ করা যাক।
১৮৮৯ সালের ৩রা ডিসেম্বর মেদিনীপুর জেলার মোহবনী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন ক্ষুদিরাম। তার বাবা ছিলেন ত্রৈলোক্যনাথ বসু এবং মা লক্ষ্মীপ্রিয়া দেবী। তার জন্মের আগে মায়ের দুটি পুত্রসন্তানের মৃত্যু হয়, তাই কুসংস্কারবশত তিন মুঠো খুদের বিনিময়ে তাকে তার বড় বোনের কাছে বিক্রি করে দেওয়া হয়। এই খুদ থেকেই তার নাম হয় ক্ষুদিরাম।
ছোটবেলা থেকেই ক্ষুদিরাম ছিলেন ডানপিটে এবং রোমাঞ্চপ্রিয়। মাত্র ৬ বছর বয়সে তিনি বাবা-মাকে হারান এবং বড় বোন অপরূপা দেবীর কাছে মানুষ হন। ১৯০২-০৩ সালে অরবিন্দ ঘোষ এবং সিস্টার নিবেদিতার মেদিনীপুর সফরকালে তাদের জ্বালাময়ী বক্তব্য শুনে ক্ষুদিরাম ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে অনুপ্রাণিত হন। এরপরেই তিনি যোগ দেন হেমচন্দ্র কানুনগো এবং সত্যেন্দ্রনাথ বসুর গুপ্ত বিপ্লবী দলে। এই দলে তিনি বন্দুক চালানো, ঘোড়ায় চড়া, লাঠিখেলা এবং কুস্তির মতো বিভিন্ন রণকৌশল রপ্ত করেন।
১৯০৬ সালে বিপ্লবী ইশতেহার “সোনার বাংলা” বিলি করার অভিযোগে তিনি প্রথম গ্রেপ্তার হন। এরপর কংসাবতী নদীর বন্যায় দুঃস্থ মানুষের সেবায় তার অবদান মেদিনীপুরের মানুষের কাছে তাকে আরও প্রিয় করে তোলে।
১৯০৮ সালে কলকাতা থেকে অত্যাচারী ম্যাজিস্ট্রেট কিংসফোর্ডকে মুজফফরপুরে বদলি করা হলে যুগান্তর দলের পক্ষ থেকে তাকে হত্যার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এই কাজের দায়িত্ব দেওয়া হয় ক্ষুদিরাম বসু এবং প্রফুল্ল চাকীকে। ১৯০৮ সালের ৩০শে এপ্রিল তারা কিংসফোর্ডের গাড়িতে বোমা ছোড়েন, কিন্তু ভুলবশত সেই গাড়িতে কিংসফোর্ডের বদলে ছিলেন ব্যারিস্টার কেনেডির স্ত্রী এবং কন্যা। বোমা হামলায় তারা দুজনেই মারা যান।
ঘটনার পর প্রফুল্ল চাকী পুলিশের হাতে ধরা পড়ার ভয়ে আত্মহত্যা করেন। অন্যদিকে ক্ষুদিরামকে পরদিন ওয়াইনি রেলওয়ে স্টেশন থেকে আটক করা হয়। বিচার চলাকালীন ক্ষুদিরামের মুখে সবসময় হাসি লেগে থাকত। বিচারক যখন তাকে জিজ্ঞেস করেন যে তিনি তার ফাঁসির দণ্ডাদেশ সম্পর্কে অবগত কিনা, ক্ষুদিরাম হাসিমুখে তা নিশ্চিত করেন। এরপর, ১৯০৮ সালের ১১ই আগস্ট ভোর ছয়টায় মুজফফরপুর জেলে তার ফাঁসি কার্যকর করা হয়। তিনি দেশের কনিষ্ঠতম শহীদদের একজন।
ফাঁসির মঞ্চে ওঠার আগে ক্ষুদিরামের শেষ ইচ্ছা জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, তিনি খুব ভালো বোমা বানাতে পারেন এবং মৃত্যুর আগে সমস্ত ভারতবাসীকে তা শিখিয়ে দিয়ে যেতে চান। তার এই অদম্য সাহসিকতা এবং আত্মবিশ্বাসের কাছে ব্রিটিশ সরকারও বিস্মিত হয়েছিল।
ক্ষুদিরামের ফাঁসির পর চারণ কবি মুকুন্দ দাস রচিত একটি গান সারা বাংলায় ছড়িয়ে পড়েছিল – “একবার বিদায় দে মা ঘুরে আসি।” গানটি আজও বাঙালি হৃদয়ে শিহরণ জাগায়।
ক্ষুদিরামের আত্মত্যাগ আজও আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে দেশের স্বাধীনতা অর্জনের জন্য কত তরুণ প্রাণ হাসিমুখে নিজেদের জীবন উৎসর্গ করে গেছেন। তার সেই অদম্য সাহস এবং দেশের প্রতি ভালোবাসা আমাদের জন্য চিরকাল অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।
![]()






