মুতোর জবাব
বাসুদেব চন্দ
অঙ্কিতের তখন ক্লাস এইট। কঙ্কনার নাইন। দুজনেরই স্কুল এক, ‘বিদ্যাসাগর বিদ্যামন্দির’। ইংরেজি-বাংলার পাশাপাশি ভালোবাসাবাসিও চলছে জোর কদমে!
বাড়ির লোকজন তখনও কিছু বুঝে উঠতে পারেনি।
একদিন কঙ্কনার মা বললেন-
-হ্যাঁ রে কিংকিন, অঙ্কিত ভালোবাসে বলে রোজ রোজ আমি আলুর পরোটাই বানাব, তাহলে তুই কী খাবি?”
“ও নিয়ে তুমি ভেবো না, আন্টি আমার জন্য লুচি আর আলুরদম করে পাঠায়।”
“আন্টি মানে?”
“আরে বাবা, অঙ্কিতের মা!”
“তাহলে আর কী, লুচি-আলুরদম খেয়ে শরীরের বারোটা বাজাও!
তোদের দিদি-ভাইয়ে যখন এতই ভাব-ভালোবাসা তাহলে ওকে ফোঁটা দিস না কেন?”
“যা-বাবাহ্, এর মধ্যে আবার ফোঁটা দেওয়ার কথা আসছে কোত্থেকে!”
নিচু স্বরে বিড়বিড় করে আরও বলে- ‘খালি আজেবাজে কথা বলে!’
আমার কিন্তু দেরি হয়ে যাচ্ছে মা, টিফিনটা দেবে?”
“এই নাও ধরো!
আজকাল আমার সব কথাই তোমার ‘আজেবাজে’ মনে হয়!
আজই বলছি তোমার বাবাকে।”
“বলো না, কে ‘না’ করেছে।
আমি আসছি!”
“সাবধানে যেয়ো।”
★★★
শুধু টিফিনের ঘণ্টাটা পড়ার অপেক্ষা! তিনতলা থেকে তরতর করে নেমে এসে অঙ্কিতের ক্লাসে ঢুকে ছোঁ-মেরে নিয়ে যায় কঙ্কনা!
সারা ক্লাসজুড়ে তখন গুঞ্জন আর গঞ্জনা! প্রথমটি উৎসাহ ব্যঞ্জক দ্বিতীয়টি অতিরঞ্জক!
‘অঙ্কিতের ক্লাসমেট ‘তুলিকা’ কঙ্কনাকে মোটেই সহ্য করতে পারে না!
পারবে কী করে, মনে মনে ও-ই তো অঙ্কিতকে ভালোবেসে আসছে ক্লাস সেভেন থেকে!
★
আসলে অঙ্কিত শুধু চেহারায় নয়, পড়াশোনা এবং স্বভাবেও খুব ভালো। ফাঁকিবাজিটা একটু কমাতে পরলে ও-ও কঙ্কনার মতো ফার্স্ট অথবা সেকেন্ড হতে পারত।
এ-ছাড়াও ভালো অভিনয় করে!
দুবছর আগে স্কুলের বাৎসরিক অনুষ্ঠানে ‘ছুটি’- নাটকে ফটিকের চরিত্রে অভিনয় করেছিল।
উঃ, সে-অভিনয় দেখার মতো! সারা নাটকে হইচই করে শেষে শেষ দৃশ্যে এসে সবাইকে কাঁদিয়ে ছাড়ল ওই পুঁচকে ছোড়াটা!
কঙ্কনা এমন কাঁদা কাঁদল, পরদিন আর স্কুলে আসতে পারল না, তার আগেই জ্বর এসে গেল!
★★★
এখন দুটিতে মিলে টিফিন খাচ্ছে আর বকবক করছে-
“তুই রোজ রোজ এ-ভাবে আলুর পরোটা খাস না রে অঙ্কিত, মোটা হয়ে যাবি!”
“যারা নিয়মিত খেলাধুলো করে তারা কখনও মোটা হয় না।”
হ্যাঁ, এ-টা অঙ্কিতের আরেকটা গুণ, খুব ভালো ক্রিকেট খেলে! ব্যাট ধরলেই ছক্কা হাঁকায়!
পাড়া-বেপাড়ার কত ক্রিকেট-টিমকে যে ও উইনার্স-ট্রফি এনে দিয়েছে তার কোনও হিসেব নেই!
এ-সব কারণেই স্কুল-গণ্ডীর বাইরেও অঙ্কিতকে নিয়ে কাড়াকাড়ি হয়!
কঙ্কনা বলল-
“হ্যাঁ রে অঙ্কিত, ক্লাসে কেউ তোকে ডিস্টার্ব করে না তো?”
অঙ্কিত ইচ্ছে করেই প্রসঙ্গটা এড়িয়ে গিয়ে অন্য কথা বলল-
“যা-ই বলিস, কাকিমার হাতের আলুর পরোটার স্বাদই আলাদা, মা ঠিক এমনটা পারে না।”
“যা জিজ্ঞেস করছি আগে তার উত্তর দে। তোকে-আমাকে নিয়ে কেউ কিছু বলে না তো?”
“কে কী বলবে। তুলিকা আর মেঘা সব সময় আমাকে আগলে আগলে রাখে। তাই কেউ কিছু বলতে সাহস পায় না।
একটু থেমে গিয়ে বলে-
তবে তুলিকা প্রায়ই একটা কথা বলে।”
“কী কথা?”
“কঙ্কনা তো তোত্থেকে বড়, ওকে নামধরে ডাকিস কেন? ‘দিদি’ বলতে পারিস না?”
কথাটা শুনেই বাঁ-হাত দিয়ে অঙ্কিতের ডান হাতটা চেপে ধরল-
“এ-কথাটা এতদিন আমায় বলিসনি কেন?
ওর মজা আমি আজই বোঝাব!”
কঙ্কনা যেভাবে রিয়্যাক্ট করল, তাতে মনে হলো এক্ষুণি তুলিকাকে ধরল বলে!
কিন্তু না, হঠাৎ করেই কেমন যেন শান্ত হয়ে গেল!
আসলে ঘরে-বাইরে একই কথা শুনতে শুনতে কান ঝালাপালা হয়ে গেছে!
কীভাবে সবাইকে মোক্ষম একটা উত্তর দেওয়া যায় সে-টাই মাথার মধ্যে ঘুরছে!
★★★
পরশু থেকে এ্যনুয়াল এক্সাম শুরু হচ্ছে। সবাই এখন লাস্টমিনিট-প্রিপারেশনে ব্যস্ত।
★
পরীক্ষার হলে বসে বরাবরের মতোই মাথা নিচু করে একমনে লিখে গেছে কঙ্কনা।
★
পরীক্ষা শেষ।
এখন খাতা দেখা চলছে।
ইংরেজি মাস্টারমশাই খাতা খুলেই মাথায় হাত দিলেন!
“মেয়েটা করেছেটা কী!”
শুধু উনিই নন, সব মাস্টারমশাইদেরই এক অবস্থা!
বাংলা-ইংরেজী-ইতিহাস-ভূগোল সব খাতাতেই উত্তর একটা-
“কুমোর-পাড়ার গরুর গাড়ি-
বোঝাই করা কলসি হাঁড়ি।
গাড়ি চালায় বংশীবদন
সঙ্গে যে যায় ভাগ্নে মদন……”!
এর মানেটা কী! মাস্টারমশাইরা কী করবেন ভেবে পাচ্ছেন না!
খাতা বগলদাবা করে ছুটলেন হেডস্যারের ঘরে-
★
“কী বলছেন আপনারা?
দেখি দেখি!”
সবকটা খাতায় চোখ বুলিয়ে হেডস্যারেরও চোখ ছানাবড়া!
চশমাটা খুলে টেবিলের ওপর রেখে বললেন-
“পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে- এসব ইচ্ছেকরে করেছে!”
“স্যার, আজই ওর বাবাকে ডেকে পাঠান।”
“না না, বাবা-মা’কে ডেকে কিছু লাভ হবে না। সামনের বছর যে মেয়েটা মাধ্যমিক দেবে তাকে মা-বাবা কী বোঝাবে!”
চশমাটা টেবিল থেকে তুলে চোখে রাখলেন-
“আপনারা এখন আসুন, আমাকে একটু ভাবতে দিন।”
★
পরদিন হেডস্যার কঙ্কনাকে ডেকে পাঠালেন। একা।
“হ্যাঁ রে মা, তুই কি আমাদের মানসম্মান ডোবাবি? তোর ওপর কত ভরসা আমাদের তা তো তুই জানিস!”
“কিচ্ছু চিন্তা করবেন না স্যার, আমি কখনোই স্কুলের নাম ডোবাব না!”
“তাহলে এ-সব লিখতে গেলি কেন?
বুঝেছি, ও নিয়ে আর ভেবে লাভ নেই।”
তুই কিন্তু আমাকে কথা দিলি!”
★★★
আজ থেকে শুরু হলো নতুন সেশন।
সব ক্লাসে একটাই আলোচনা- “কঙ্কনা আর অঙ্কিত!”
সারা স্কুলজুড়ে হঠাৎ হাততালি শুরু হয়ে হলো !
তুলিকা তিনতলার বারান্দা থেকে উঁকি মেরে দেখে- কঙ্কনা ঢুকছে!
ওকে আসতে দেখেই তুলিকা-মেঘা-অঞ্জলি ছিটকে গেছে যোজন যোজন দূরে!
কঙ্কনা গটগট করে হেঁটে এসে অঙ্কিতের পাশে বসল!
তুলিকার সঙ্গে চোখাচুখি হতেই একগালে একখণ্ড হাসি হাসল, মুখে কিছু না-বলে ভ্রু-দুটো ‘টুংটুং’-করে একবার নাচিয়ে বলল-
‘কী বুঝলি’?
★★★
কঙ্কনা যেমন ইচ্ছেকরে ফেল করেছে তেমনই স্টার মার্কস নিয়ে মাধ্যমিক পাস করেছে!
শুধু তাই নয়, কঙ্কনার সঙ্গ পেয়ে অঙ্কিতও দুটো সাবজেক্টে লেটার মার্কস পেয়েছে!
★
এ-ভাবেই হাত ধরাধরি করে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরিয়ে আজ দুজনেই নামিদামি দুটো কর্পোরেট হাউজের চাকরিজীবী!
মজার কথা হলো, গুরুত্বের নিরিখে এখানেও কঙ্কনা অঙ্কিতের থেকে অনেক উঁচু পদে বসে আছে!
★
সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতে উঠতে উঠোনের দিকে তাকাতেই ভুলে গেছি-
সে-দিন ছাদনাতলায় অঙ্কিতের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে কঙ্কনাকে দেখতে বেশ লাগছিল! পুরো লজ্জাবতী নারী, সে-লজ্জায় শুধু আনন্দ নয়, বুকভরা ‘ঢিভ ঢিভ’ করা সূক্ষ্ম একটা অনুভূতিও ছিল!
★
প্রেয়সীর শরীর ও মন আজ সম্পূর্ণরূপে উৎসর্গীকৃত!
সমুদ্রের বাঁধভাঙা ঢেউ তিরে এসে চলকে পড়ে ক্ষণে ক্ষণে!
জলোচ্ছ্বাসের অতলান্তে হারিয়ে যায় কপোত-কপোতী, খুঁজে পায় পুণ্যলগ্ন উত্তাল-যৌবনে!
★★★
দেখতে দেখতে বৈবাহিক সম্পর্ক আজ তিন বছরে পা দিল!
বহু কাঙ্খিত ‘অন্নপূর্ণার’ সংসার সামলাবার দায়িত্ব পড়ল কঙ্কনার ওপর! পদ্মবাড়ির অন্নপূর্ণাদেবী এতদিনে নিশ্চিন্ত হলেন!
সংসারের বর্ণনাটা একটু বিস্তরে না-বললে শ্বশুরবাড়ির চরিত্র এবং চৌহদ্দি সঠিকভাবে চিত্রায়িত হবে না।
ন’কঠা জমির ওপর তিনতলা একটা বাড়ি। একতলায় থাকেন শ্বশুর-শাশুড়ি। দোতলায় কাকা’শ্বশুর-কাকি’শাশুড়ি।
ভালো ঠাম্মা ‘আলো রানি’র কোল আলো করে তিনতলায় থাকে ওদের পুত্রসন্তান ‘দেবোত্তম’!
পাশেই একটা একতলা ঘর, সেখানে সপরিবারে থাকে সনাতন নস্কর। পুরুষানুক্রমে।
এত মানুষজনের বাস যেখানে, সেখানে কুকুর-বিড়াল আর হাঁস-মুরগির মতো গোটা দশ-বারো পুষ্যি থাকবে না তা কি হয়!
জমির পূর্ব দিকে রয়েছে একটা বড়সড় পুকুর, পুকুরে পদ্ম ফোটে, তাই ‘পদ্মপুকুর’। সে-নামেই নাম হয়েছে ‘পদ্মবাড়ি’।
এই পদ্মবাড়ির পদ্মপুকুরের উত্তর দিকে আছে একটি শিবমন্দির!
‘এই বাড়িতে ঢুকে পড়তে পারলে যত্নআত্তির কোনও ত্রুটি হবে না’- এ-টা ভেবেই বাবা মহেশ্বর একদিন ভোররাতে অঙ্কিতের ঠাকুরদাকে টুককরে একটা স্বপ্নাদেশ দিয়ে দিলেন!
ব্যাস, সেই থেকে বাবা মহেশ্বরের ঘর হলো পদ্ম-পাড়ে! তিনিও আছেন সপরিবারে!
মহেশ্বর-পরিবারকে সেবাযত্ন করেন ‘বারুজ্যে বংশের’ কুলপুরোহিত বীরেশ্বরের নাতি যজ্ঞেশ্বর!
সারকথা হলো-
যে ‘হাট’ কবিতাকে একদিন হেলাফেলা করেছিল সে-টা যে হেঁটে এসে শ্বশুরবাড়ির পদ্মপাড়ে বসে আছে, সে-টা কঙ্কনা কল্পনাও করতে পারেনি!
অঙ্কিত কিন্তু এ-সবের মধ্যে নেই! সে আগের মতোই ফুরফুরে মেজাজে নাটক আর খেলাধুলোয় মজে আছে!
তারমধ্যে থেকে সময় বারকরে কোনোমতে অফিসটুকু করে!
অফিস-সর্বস্ব-জীবনযাপনের ঘোর বিরোধী সে! তাই আজ পর্যন্ত কোনও প্রমোশন-টোমোশন তার কপালে জোটেনি! উল্টে উল্টোটাই ঘাড়ের ওপরে ঝুলছে! যে-কোনোদিন ঝুলে পড়তে পারে!
★★★
দেবোত্তমের বয়স এখন দুই ছুঁই ছুঁই।
সে-দিন নাতির ঘরে ‘পুতির’ ভূমিষ্ঠ হওয়ার খবর পেয়েই আলো রানি মাধ্যাকর্ষণ শক্তিকে বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠী দেখিয়ে একতলা থেকে তরতর করে তিনতলায় উঠে এলেন!
সেই থেকে তিনি এখানেই রয়ে গেলেন।
দিনরাত আর রাতদিন দেবোত্তমকে নিয়ে বড় আনন্দে থাকেন- এটাই তো স্বাভাবিক! তাই সে-কথা বাদ দিন!
ভালো ঠাম্মা আরে-ঠারে এটাও বুঝিয়ে দিলেন- এই বয়সেও এমন গোটা চারেক ছানাপোনা তিনি একাই মানুষ করে দিতে পারেন!
কিন্তু কে কার কথা শোনে, এতদিন হয়ে গেলেও নাথ-বউয়ের মধ্যে আর কোনও শুভ লক্ষণ দেখা গেল না!
ভালো ঠাম্মা তাই হা-হুতাশ করে বলেন-
“বউ তো নয়, যেন ‘পঞ্চাত পোদান’! দিনভর শুধু কাজ আর কাজ! সোয়ামীর সেবাযত্নে বিন্দুমাত্র মন নেই তার!
এত্থেকে আমাদের কুসুমপুরের মালতির নাতনি ‘পুচির’ সঙ্গে বে দিলিই ভালো হতো! ঘর আজ ভরে যেত!”
★
ঠাম্মা ঠিকই বলেন- সপ্তাহে একটা দিনও কঙ্কনাকে সে-ভাবে কাছে পায় না অঙ্কিত!
কী করে পাবে, শনি-রবি এবং ছুটিরদিনেও বাড়িতে হইচই লেগে থাকে-
প্রেসার মাপার যন্ত্রটা নিয়ে উপেন’ডাক্তার আসেন সবার আগে, একে একে বয়স্কদের প্রেসার দেখেন।
তারপর সবজি-রুটি খেয়ে, চিনি-দুধ বিনে লিকার চা-এ গলা ভিজিয়ে নিজের সন্তুলান বজায় রাখেন।
উপেন ডাক্তার গেট থেকে বেরোতে না-বেরোতেই চলে আসেন রহমত’চাচা, এ-তল্লাটে তিনিই হলেন অচল গাড়ির বেঁচে থাকা একমাত্র সচল ডাক্তার।
চারটে গাড়ির মধ্যে পুরোনো দুটোর চিকিৎসা তিনিই করে আসছে গত দশ বছর ধরে! বয়সের কারণে গাড়ি দুটো এখন আর রাস্তায় বেরোয় না, তাই প্রতি মাসে নিয়মকরে রহমত’চাচার চেকআপে থাকে!
ধোপা-নাপিত-কল মিস্ত্রি-রং-মিস্ত্রি তো লেগেই আছে, সবারই আবদার হলো- ‘বোদিমুনির হাতে এক কাপ চা খাওয়া’!
“রুটি-সবজিটা তো আর চাইতে হয় না, ওটা ফাউউ”- এটা সকলেই বুঝে গেছে!
“হাতুড়ি পেটালেও তুড়ি মেরে মন জয় করার কৌশলটা এরা খুব সহজেই শিখে গেছে!”- অন্নপূর্ণাদেবী প্রায়ই ঠাট্টা করে বলেন!
যাবতীয় কাজ লক্ষ্মী বাসন্তি আর সনাতন করলেও নাম হয় কঙ্কনার, শুধু তদারকিটুকু করে বলে!
ভালোবাসার এমনই গুণ!
আজকাল মা-বাবাকেও দেখতে যেতে পারে না, সবই করে অঙ্কিত। অফিস যাতায়াতের পথে।
★
অফিস আর ঘর সামলাতে সামলাতে কঙ্কনা আজ বড় ক্লান্ত!
সারাদিনের ক্লান্তি নিয়ে যখন ঘুমিয়ে পড়ে তখন অঙ্কিত শঙ্কিত থাকে, কাছে যেতে ইতস্তত করে! অপরাধবোধ থেকে শেষপর্যন্ত আর এগোতে পারে না, পিছিয়ে আসে!
দিনের পর দিন ইচ্ছেগুলো এ-ভাবেই অপূর্ণ থাকে!
ক্ষোভ দানা বাঁধে!
★
সেদিন অঙ্কিত গাড়ি চালিয়ে লেকটাউনের ‘ক্লক টাওয়ারের’ পাশ দিয়ে অফিস যাচ্ছিল-
হঠাৎ নজরে পড়ল তুলিকাকে! দাঁড়িয়ে আছে। একা।
গাড়িটা ব্রেক কষে দাঁড়াতেই তুলিকারও নজর গেল গাড়িটার দিকে-
একজন হ্যান্ডসাম ভদ্রলোক হাত নেড়ে ডেকে যাচ্ছেন! গাড়িতে আর কেউ নেই! একা!
একটু অস্বস্তি বোধ করলেও দু-পা এগিয়ে গিয়ে তুলিকা জিজ্ঞেস করল-
“আমায় ডাকছেন?”
অঙ্কিত উত্তর না-দিয়ে হাসতে থাকে।
এবার তুলিকা চিনতে পারল-
“অঙ্কিত তুইই!!!”
“উঠে আয় তাড়াতাড়ি, এক্ষুণি কেস খেয়ে যাব কিন্তু!”
তুলিকা চটকরে গাড়িতে উঠে আসে; সামনের সিটে, অঙ্কিতের পাশে!
“সরি অঙ্কিত, সত্যিই তোকে চিনতে পারিনি।”
“তা তো বুঝতেই পারলাম!
তুই তো বাইরে কোথাও ছিলি, কবে ফিরলি?”
“মাস দুয়েক হলো। আর যাচ্ছি না রে, এখানেই কিছুএকটা শুরু করব ভাবছি।
আমার কথা ছাড়। তোদের কী খবর? কেমন চলছে ঘরসংসার?”
“ভালোই”
“তোর ‘ভালোই’-তে ততটা ‘ভালো’ নেই, যতটা তুই বোঝাতে চাইছিস।
আরে বাবা, বিদেশে থাকলেও চোখ-কান দুটো এখানেই রেখে গেছিলাম, শুধু তোর খবর নেব বলে!”
অঙ্কিত হাসতে হাসতে বলে-
“ডাক্তারি পড়তে গিয়ে কেউ গোয়েন্দা হয়ে ফিরে আসে সে-টা তোকে না-দেখলে জানতেই পারতাম না!”
দুজনেই ‘হো-হো’-করে হেসে ওঠে!
অঙ্কিত বলল-
“জানি, মেঘার সঙ্গে তোর নিয়মিত কথা হয়। আমারও হয় মাঝেমধ্যে।”
“অঙ্কিত, আমি কিন্তু সামনেই নেমে যাব, তার আগে কাজের কথাটা সেরে নিই-
শনি-রবি এবং ছুটির দিন আমি বাড়িতেই থাকি। একা। চলে আয় না!”
“তোর প্রস্তাবটা অনেকটা সেই নাটকের বিজ্ঞাপনের মতো।”
“কী রকম?”
“কাশী বিশ্বনাথ মঞ্চে সগৌরবে চলছে ‘বার বধূ’! শনি-রবি ও ছুটিরদিন, ৩ – ৬. ….”
“মারব একটা গাট্টা”
“মজা করলাম! তা গেলে কী খাওয়াবি শুনি?”
“তুই যাআআ খেতে চাইবি!”
“ব্ল্যাংক চেক দিচ্ছিস কিন্তু!”
“ব্ল্যাংক চেক তো তোকে অনেক আগেই দিয়ে রেখেছিলাম, তুইই কাজে লাগাসনি!”
কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থাকে…!
দুজনেই!
সারা শরীর জুড়ে কেমন একটা শিহরণ অনুভব করে অঙ্কিত!
সঙ্গে সঙ্গে নিজেকে সামলে নিয়ে মনস্থির করে স্টিয়ারিংয়ে!
জড়ানো স্বরে তুলিকা বলল-
“আমাকে এখানেই নামিয়ে দে!”
অঙ্কিত গাড়িটা দাঁড় করালে তুলিকা নেমে গিয়ে হাত নাড়ে-
অঙ্কিতও!
কিছু বলতে গিয়েও বলতে পারল না, কথা জড়িয়ে গেল!
তুলিকা বলল-
“আমি কিন্তু তোর জন্য অপেক্ষা করে থাকব!”
★
সে-দিন রাতে তুলিকা ‘ঘুমোতে পারেনি’-
‘অঙ্কিত এলে কীভাবে ওকে সন্তুষ্ট করবে’- সে-টা ভেবে যেমন আনন্দ পাচ্ছে তেমনই হাবুডুবু খাচ্ছে!
কখনও আবার আয়নায় দাঁড়িয়ে নিগূঢ় দৃষ্টিতে নিক্তিতে নিজেকে মাপছে সম্ভবা-সঙ্গমে!
★
মোবাইলটা বেজে উঠলেই তুলিকার মনে দুকলি গান বেজে ওঠে!
কিন্তু পরক্ষণই নিরাশ হয়, কলটা অঙ্কিতের নয় বলে!
নিজেকেই সান্ত্বনা দেয়-
“পুরুষমানুষ বলে কথা, ওরা কি কখনও খিদে সইতে পারে! একদিন না একদিন আসতেই হবে ওকে!”
★★★
যে-দিন তুলিকার সঙ্গে দেখা হয়েছিল সে-দিন রাতেই অঙ্কিত কঙ্কনার ঘুম ভাঙিয়েছিল!
তুলিকার সঙ্গে কথা বলে বুঝেছে- ‘ইতস্তত’ একটা ‘আপাত-অবস্থা’, এগোতে না-পারলে হবে না!
“তোর সঙ্গে আমার একটা জরুরি কথা আছে!”
ওরা একান্তেই শুধু ‘তুই-তোকারি’
করে।
ঘুমচোখে কঙ্কনা বলল-
“কাল সকালে বলিস খন, এখন ঘুমোতে দে প্লিজ।”
“তেমন জরুরি কিছু নয়, ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে শুনলেও হবে।”
“বল তালে।”
“আমার আর চাকরি করতে ভাল্লাগছে না!”
“বেশ তো, ছেড়ে দে।”
“আজ দিয়েছি!”
এবার কঙ্কনা উঠে বসে!
“ইয়ার্কি হচ্ছে, চাকরি লোকে পায় না, সেখানে তুই ছেড়ে দিলি!
একবার জিজ্ঞাসা পর্যন্ত করলি না!”
“তোর ‘সময় কোথা, সময় নষ্ট করবার’!
অনেকদিন ধরেই ভাবছি-
আমার পয়সা তো কোনও কাজে লাগছে না, পাসবুকের পাতা ভরানো ছাড়া! অমন চাকরির দরকারটা কী!”
“তুই কী করতে চাইছিস খুলে বলবি আমায়?”
“আমি ঘরে থেকে তোর সবকাজ করে দেব!
তুই শুধু চাকরিটা করবি। তারপর বাড়ি ফিরে রেস্ট নিবি!”
অঙ্কিত আরও কিছু বলতে গিয়েও থেমে যায়, ঠোঁট দুটো কাঁপতে থাকে!
কঙ্কনা এবার অঙ্কিতের হাতটা চেপে ধরে বলে-
“হ্যাঁ রে অঙ্কিত, আমি তোকে আগের মতো সময় দিতে পারি না, ভালোবাসতে পারি না! তাই রাগ করেছিস বুঝি!”
“আমার কথা ছাড়!
ঘর আর অফিস সামলাতে সামলাতে তুই কেমন যেন হয়ে গেছিস! তুই আর আগের মতো নেই!
একটা মাত্র ছেলে আমাদের, কতটুকু সময় দিস ওকে?
দিনের পর দিন একটা জড় পদার্থের মতো তোর পাশে……!
বলতে বলতে বুক নিংড়ে কান্না পেল অঙ্কিতের!
তাড়াতাড়ি ওয়াসরুমে চলে গেল!
ভালো ঠাম্মার কথাগুলো আজ কঙ্কনা উপলব্ধি করতে পারল!
আফসোস আর অনুশোচনায় কী করবে বুঝে উঠতে পারছে না!
অঙ্কিত হাত-পা মুছে পাশে এসে শুয়ে পড়ে। ওপাশ ফিরে!
‘কী করে অঙ্কিতের অভিমান ভাঙাবে’- ভাবতে থাকে কঙ্কনা!
শেষে ভালোবেসে সেই আগের মতো করে বলে- কী রে অংকন, ঘুমিয়ে পড়লি নাকি? আসবি না?”
তারপর নিজেই অঙ্কিতকে জাপটে ধরে!
অঙ্কিত অভিমানী শিশুর মতো একটা লম্বা শ্বাস ছাড়ে!
উষ্ণ ঠোঁটে ঠোঁট রেখে কঙ্কনা বলে-
“সরি, আর হবে না!”
★★★
হঠাৎ একদিন তুলিকার মোবাইলে অঙ্কিতের মুখ ভেসে ওঠে-
সাগ্রহে কলটা রিসিভ করে তুলিকা বলে-
“এতদিন পর তোর সময় হলো?”
“সরি সরি, রাগ করিস না তুলি, তোকে কী করে ভুলি বল!”
“বল তাহলে কবে আসছিস?”
“শোন না, সবাইকে ফোনেই বলছি- আগামী শনিবার আমার ছেলের জন্মদিন! প্লিজ আসবি কিন্তু! অনেকের সঙ্গে দেখা হবে, মেঘা তো থাকবেই!”
“তাই বুঝি?
ঠিক আছে চেষ্টা করব।”
“চেষ্টা করব কী রে! অনুষ্ঠানটা তো হচ্ছে শনিবার রাতে, পরদিন রোববার। তার পরেরদিনও ছুটি, ‘স্বাধীনতা দিবস’!
“তাহলে তো কোনও অসুবিধা নেই।
যাব।”
★
তুলিকা ক্ষেপে গিয়ে ফোনটা রেখে দিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বলে-
“ইডিয়েট !”
—oooXXooo—
![]()







