তোমাতে আমার ঠিকানা (তৃতীয় পর্ব)
বারিত বরণ
ভোরের বৃষ্টিভেজা ঠাণ্ডা হাওয়ায় ভিজে, অভি আজ বাঁকুড়া থেকে বাস ধরে কলকাতার দিকে পা বাড়িয়েছিল—এক নতুন জীবনের খোঁজে। বাসের জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখছিল অপরিচিত পথ, অপরিচিত মুখ, আর কখনও কখনও নিজের ভেতরের ভাবনাগুলো। বহুদিনের স্বপ্ন আজ বাস্তব হলো—রামানন্দ কলেজে দর্শন অনার্স পড়বে সে। একদিন ঠিক সে আইএএস উত্তীর্ণ হয়ে ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট হবে, আইন শৃঙ্খলার দায়িত্ব সামলাবে। এই ঘুন ধরা সমাজের খোল নলছে বদলে ফেলবে সে। এক সুস্থ্য সাবলীল সমাজের স্বপ্ন দেখে সে, যেখানে প্রত্যেক টা শিশুর পরণের বস্ত্র, মাথার ছাদ থাকবে। অনাহারে আর মরবে না কেউ। শৈশব কাটবে কলম ধরে, মজুর খেটে নয়।
বাসের ঝাকুনিতে অভি একটু ঘুমিয়ে পড়েছিল। হঠাৎ করেই একটা ঝাকুনিতে ঘুম টা কেটে গেলো তার। চোখ মেলে তাকালো সে।বাসটা ধীরে ধীরে নিবেদিতা সেতু পেরিয়ে গঙ্গা নদী পার হচ্ছে ,অভি জানালার কাঁচে ঠেস দিয়ে তাকিয়ে ছিল বাইরের দিকে।নদীর ঢেউ—নিরবধি চলে চলেছে। আকাশ ছিল ধূসর, ভারী মেঘে ঢেকে আছে চারদিক। সেই মেঘ ছুঁয়ে টুপটাপ বৃষ্টি পড়ছিল গঙ্গার শান্ত জলের বুকে—এক ধরনের ধ্বনি হচ্ছিল, যেন প্রকৃতির এক অন্তরালের সঙ্গীত।
সেতু পেরিয়ে বাস যখন দক্ষিণেশ্বরের দিকে ঢুকলো, অভি হঠাৎ চমকে উঠল। সামনে যেন একটা চিত্রকল্প—বৃষ্টিতে ভেজা আকাশের নিচে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে দক্ষিণেশ্বর মন্দির। ছয়টি মিনার নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা সেই চৌদ্দশতকের স্থাপত্য যেন এক আধ্যাত্মিক শক্তির কেন্দ্র।
তার মনে হলো, এই শহর শুধু ইঁট-পাথরের নয়, এখানে আছে কিছু ‘অদৃশ্য শক্তি’—যা অনুভব করা যায়, চোখে দেখা যায় না। মন্দিরের রঙ যেন আরও গাঢ় হয়ে উঠেছে বৃষ্টির ভেজায়, আর গঙ্গার পাড়ে দাঁড়িয়ে থাকা মন্দিরটি যেন ঠিক অভিকে স্বাগত জানাচ্ছে।
তার কপালের উপরে একফোঁটা বৃষ্টির জল পড়ল—অভি জানালার কাঁচ খুলে সেই জলের স্বাদ নিতে চাইল। ঠিক তখন সে অনুভব করল—এই শহর, এই নদী, এই মন্দির—সবকিছু তার জীবনের অংশ হয়ে যাচ্ছে।
অজানা ভয় আর নতুন আশা নিয়ে সে মনে মনে বলল,
“কলকাতা, আমি এলাম। তুমি আমায় গ্রহণ করো।”
এত আলো! এত গাড়ি! এত মানুষ! যেন মানুষ না, নদীর ঢেউ—নিরবধি চলে চলেছে। সে আগে কখনো এমনটা দেখেনি। বাঁকুড়ার কাঁদামাটির পথ ছেড়ে এখানে এসেছে; সেখানে সন্ধ্যা নামলে গোটা গ্রাম নিস্তব্ধ হয়ে যেত, এখানে সন্ধ্যা যেন আরও জেগে ওঠে।
পিচঢালা রাস্তা, মাথার ওপর উঁচু উঁচু দালান—অভি ভেবেই পায় না, এত উঁচু বাড়িগুলো ভেঙে পড়ে না কেমন করে! ফুটপাতের কোনায় কাগজের বিছানা পেতে কেউ ঘুমাচ্ছে, আর একটু দূরেই কাচের জানালায় সাজানো জামাকাপড়—যার দাম হয়তো এক কৃষকের মাসের রোজগারের থেকেও বেশি।
বাসটা যখন ধর্মতলায় পৌঁছালো , তখন প্রায় বিকাল। মেঘলা আকাশে আলো অনেক টাই পরে এসেছে। চারিদিকে কৃত্রিম আলোর ছটা। শহর তখনও ব্যস্ত, অথচ আকাশটা ভারী, মেঘে ঢাকা—ঠিক যেন অভির নিজের মনটা।দীর্ঘ যাত্রার ধকল, নতুন শহরের গন্ধ, আর কলেজের না দেখা নতুন পরিবেশের প্রতি এক অজানা ভয় , সব মিলে এক ধরনের নিঃশব্দ উত্তেজনা বুকে জমে উঠছে।
নতুন শহর, নতুন জীবন—তবু মাটির গন্ধটা যেন আজও বাঁকুড়ার মতোই পরিচিত।
অভি আকাশের দিকে তাকাল—মেঘের নিচে লুকিয়ে থাকা রোদ যেন তার ভবিষ্যতের মতো, অদেখা, অথচ আশাব্যঞ্জক।
যাত্রীদের মধ্যে হঠাৎ করেই আগে আগে নামার তারা দেখা দিলো। অভির আজ কোনো তাড়া নেই । বাস টা যখন প্রায় খালি , অভি ধীরে সুস্থে উঠলো, ছোটো বাগ টা কাধে নিয়ে নেমে পড়লো বাস থেকে। সারাদিন কিছুই খাওয়া হয়নি প্রায়। মাঝে বাস দাঁড়িয়ে ছিল দুবার। সকালে একবার জলখাবার খাওয়ার জন্য আর দুপুরে মধ্যাহ্নভোজের জন্য। অভি সকালে শুধু এক কাপ চা দিয়ে দুটো বিস্কুট খেয়েছে মাত্র। কলেজে ভর্তি হওয়ার পর যা টাকা বাঁচবে ,সেই দিয়েই তাকে সারাটা মাস চালাতে হবে। যদিও হেড স্যার তার বন্ধু কে বলে রেখেছেন, যাতে একটা দুটো টিউশন সে খুঁজে দেয়। কিন্তু যতক্ষন না কিছু রোজগার হচ্ছে ,এইটুকু পুজিই তার ভরসা। হেডস্যার বার বার বলে দিয়েছেন,
“খুব সাবধানে খরচ করবি বাবা।”
“কলকাতার জীবনযাত্রার ব্যয় তুলনামূলকভাবে বেশি, বিশেষ করে নতুন যারা আসে, তাদের জন্য সামঞ্জস্য করা শুরুতে একটু কঠিন হতে পারে —প্রতিটি পা ফেলার সঙ্গেই যেন কিছু না কিছু খরচ জড়িয়ে থাকে।”
কলকাতা শহরের কিছুই সে চেনেনা। কিভাবে যাবে মেস বাড়িতে সেটা ভেবেই হঠাৎ করেই তার মধ্যে একটা অজানা ভয় কাজ করতে শুরু করলো। জামার পকেট থেকে হেড স্যারের দেওয়া চিরকুট টা বের করলো সে। এখানে ঠিকানা টা লেখা ছিল।
— “ মেসবাড়ি: ১৪৩বি, কলেজ স্ট্রিট, কলকাতা – ৭০০০০৬”
বাসের কন্ডাক্টর পাশেই দাঁড়িয়ে দাড়িয়ে বিড়িতে সুখটান দিচ্ছিল। অভি গিয়ে তাকেই দেখলো চিরকুট টা।
” কাকু এইখানে কিভাবে যাবে বলতে পারেন।”
লোকটি একঝলক ঠিকানা টা দেখে নিয়ে অভিকে বলল,
” কলেজ স্ট্রিট যাবা তো আগে বলবা না। শিয়ালদা তে লাবিয়ে দিতাম।”
“কলকাতায় নতুন এয়েচো ভায়া।”
অভি শুধু মাথা নাড়ালো।
“তুমি ভায়া একটা কাম করো, এই সামনের সেন্ট্রাল এভেনু দিয়ে হাঁটতে থাকো। “
সামনের দিকে রাস্তাটা সে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল।”
মেডিক্যাল কলেজের পাশ দিয়ে চলে যেওক্ষণ ,কলেজ স্ট্রিট পৌঁছে যাবা।”
মাথা নিচু করে হাঁটতে থাকলো অভি। তার গায়ে শুধু একটা প্যান্ট আর পুরোনো শার্ট, কাঁধে মায়ের সেলাই করা পুরানো একটা ঝোলা। কেউ তাকিয়ে দেখে না, কেউ ঠেলে দেয়, কেউবা গায়ে গা লাগিয়ে চলে যায়—এ শহরে কেউ কারো আপন নয়, এটাই বোধহয় বড়লোকদের জগৎ।
তবু অভির চোখে একটা আলো আছে—সেই আলো স্বপ্নের, শিক্ষার, হয়তো ভবিষ্যতের। কলেজে ভর্তি হয়েছে সে। বুকের ভেতর এক মিশ্র অনুভূতি—ভয়, কৌতূহল আর এক চিলতে সাহস।
কলকাতা তার কাছে আজ শুধু একটা শহর নয়, এক বিশাল পরীক্ষা। আর সেই পরীক্ষায় সে পাস করতে চায়—নিজের জন্য, মায়ের জন্য, আর গ্রামে রেখে আসা তার ছেঁড়া চৌকির পাশে দাঁড়িয়ে থাকা কুঁড়ে ঘরটার জন্য। সর্বহারা সমাজের অভুক্ত মানুষ গুলোর জন্য তাকে জিততেই হবে।
সন্ধ্যে নামছে ধীরে ধীরে, আকাশের রং মিশছে সোনালি থেকে ধূসর।
বাস থেকে নামার পর লোকজনের ভিড় ঠেলে, গলির গলি পেরিয়ে অভি অবশেষে পৌঁছাল কলেজ স্ট্রিটের এক পুরোনো মেসবাড়িতে।
হাঁটার ক্লান্তিতে পা যেন ভারী হয়ে এসেছে। কলেজ স্ট্রিটের এক সরু গলিতে, হলদেটে আলোয় ভিজে থাকা একটা পুরোনো বাড়ি,চারপাশের গন্ধ আর গুমোট বাতাসে একটা ধকলের গন্ধ টের পাওয়া যায়।
লোহার গেট খুলে ভেতরে ঢোকে সে। উঠোনে দুটো সাইকেল হেলে পড়ে আছে, একটা বিড়াল চুপচাপ কোণে বসে চোখ মেলে তাকায় তার দিকে। মেঝেতে গামছা পেতে কেউ বসে পড়েছে পত্রিকা হাতে, পাশেই ধোঁয়া উঠছে রান্নাঘর থেকে—মশলার গন্ধে ক্ষুধাটা যেন আরও জেগে ওঠে।তিনতলার ঘরটা দেখিয়ে দেয় এক অল্পবয়সী দারোয়ান, মুখে ক্লান্ত অথচ অভ্যস্ত উদাসীনতা।
তিনতলার সিঁড়ি ভেঙে ওপরে ওঠার সময় মনে হচ্ছিল, পা যেন আর চলে না। শরীরটা অবশ হয়ে আসছে—সকাল থেকে দীর্ঘ যাত্রা, মাথার ওপর ভারী ব্যাগ, আর তার চেয়েও বেশি—নতুন শহরের চাপা উদ্বেগ।
পেটের ভেতরটা যেন জ্বলে যাচ্ছে—সকালের পর থেকে কিছুই খায়নি। ক্ষুধা, ক্লান্তি আর একাকিত্ব মিলে তাকে আচ্ছন্ন করে ফেলল। এই শহরে তার কেউ নেই, কেউ জিজ্ঞেস করবে না—”তুই খেয়েছিস তো?”
তিনতলার এক কোণে যে ঘরটার সামনে সে এসে দাড়ালো, তার কাঠের দরজা, খসে পড়া রঙ।অভি একটু থমকে গেল।
ঘরের দরজাটা ধীরে ধাক্কা দিতেই কিঞ্চিৎ কর্কশ শব্দ তুলে খুলে গেল। ভেতরে অল্প আলো, জানালার পাশে একটা টিমটিমে বাল্ব ঝুলছে, দুদিকে দুটি খাট ,একটা টিনের আলমারি ,আর দেয়ালে কয়েকটা পেরেক ঝুলছে—তার মধ্যে একটাতে জামা ঝুলছে।আর আছে একটা ভাঙ্গা চেয়ার। এক কোণে জানালা দিয়ে ঢুকছে কলকাতার গরম বাতাস। একটা প্যাঁচার পোস্টার ঝুলছে দেয়ালে — যেন জেগে আছে দিন-রাত।
আর ঘরের এক দিকের খাটে আর এক জন বসে আছে।
একজন রোগা মধ্যবয়সী মানুষ। গায়ে হালকা রঙের ধুতি আর হাফ শার্ট। মুখে চাপা গম্ভীরতা, কিন্তু চোখে একরকম ক্লান্ত বোধ। ছিপছিপে গড়ন, মুখে হালকা দাড়ি, চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা—ব্যক্তিত্বে নির্লিপ্ত অথচ চোখে একধরনের গাঢ় বোধ। নাম শুভব্রত পাল। বয়সে অভির চেয়ে অন্তত ১৫-২০ বছর বড়। অভির চোখে প্রথম দেখা থেকে মনে হয়েছিল, মানুষটা যেন এই ছোট ঘরের সঙ্গে গড়ে উঠেছে—এই দেওয়ালের ফাটল, এই জানালার জং, এমনকি বাতাসের গন্ধও যেন ওর নিজের মতো।
হাতে একটা পুরনো বই, হয়তো কোনো কোচিংয়ের নোট। অভিকে দেখে চমকে না উঠে বরং মাথাটা কেবল সামান্য নাড়ালেন — একরকম অভ্যস্ত উদাসীন অভিবাদন। খাটের উপর ওই ভদ্রলোকের জিনিসপত্র গোছানো—চিরুনি, প্লাস্টিকের জগ, গামছা। অন্য খাটটা খালি।
অভি ধীরে ধীরে ব্যাগটা নামিয়ে খালি খাটে বসলো। ঘরের গায়ে গায়ে গরম জমে আছে, আর গায়ে ঘাম লেগে চিটচিট করছে।
ঘরের নিঃস্তব্ধতায় নিজের নিঃশ্বাসের শব্দই যেন কানে লাগে। এখানেই এখন তার থাকা, পড়া, বাঁচা—সব।
রুমমেট হঠাৎ মুখ খুললেন,
— “নতুন এসেছো বুঝি?”
— “হ্যাঁ… আজই এলাম,” বলল অভি একটু ভয়ভয় গলায়।
“কি নাম ভাই তোমার?”
একটু ঘাবড়ে গিয়ে সে উত্তর দিলো, “অভি”।
— “আমি শুভব্রত। ভয় পেও না ভাই , এই শহর কঠিন ঠিকই… কিন্তু সহ্য করলে আপন করে নেবে।”
কথার ধরণে কেমন যেন অভিজ্ঞতার ছাপ। অভির মনে হলো, মানুষটা যেন এখানেই বহু বছর ধরে কাটিয়ে ফেলেছেন—ঘরটা, খাটটা, জানালাটা, বাল্বটার আলো—সব যেন তার চেনা।
ঘরের নিঃস্তব্ধতায় নিজের নিঃশ্বাসের শব্দই যেন কানে লাগে। এখানেই এখন তার থাকা, পড়া, বাঁচা—সব। এই ঘর, এই মানুষ, এই গন্ধ… সবই এখন থেকে অভির নিত্যদিনের সঙ্গী।
বাইরে সন্ধ্যে ঘনিয়ে এসেছে। দূরে কোথাও হর্ন বাজছে, কারা যেন হাসছে, আবার কোথাও রেডিওতে পুরোনো বাংলা গান।
অভি চোখ বন্ধ করে, মনের মধ্যে বলে—
“এই শহরে আমার শুরু হলো আজ।”
অভি ঠিক কখন ঘুমিয়ে পড়েছিল, তা ও নিজেও জানে না। শরীরটা ছিল ধকলের চূড়ায়, মাথা ব্যথা করছিল, পেট খালি। খাটে পড়ে ছিল যেন কোনোভাবে নিজেকে বিছানার সঙ্গে জোড় করে রেখেছে।
হঠাৎ একটা শব্দে তার ঘুম ভেঙে গেল।
খটাস্!
দরজাটা ঠেলেই খুলে গেল।
করিডোরের হালকা আলোয় দরজার ফ্রেমে এক ছায়ামূর্তি দেখা যাচ্ছে। সঙ্গে হালকা চামড়ার চটি চাপা পায়ের শব্দ। ঘুমচোখে কিছুই স্পষ্ট বোঝা যায় না, শুধু মনে হলো, দরজার কাছে কেউ দাঁড়িয়ে।
তারপর সেই কণ্ঠ—শক্ত অথচ পরিমিত ভদ্রতা মেশানো গলা:
— “এই ঘরেই উঠেছে নতুন ছেলেটা?”
সঙ্গে সঙ্গে শুভব্রত উঠে দাঁড়াল খাট থেকে, গলাটা একটু নিচু করল:
“হ্যাঁ দাদা, এই অভি।”
অভির দিকে তাকিয়ে ভদ্রলোক ভারী গলায় বললেন,
” তুমিই তাহলে সেই ছেলে… বাঁকুড়া থেকে এসেছ।দর্শন অনার্স নিয়েছে রামানন্দ কলেজে পড়তে।”
“তোমার হেডস্যার আমাকে সব বলেছেন।”
ততক্ষণে অভি আধো ঘুম থেকে উঠে বসেছে। চোখ কচলাতে কচলাতে তাকায়।
দরজার কাছে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটি পঞ্চাশ পেরোনো, কিন্তু চেহারায় কঠোর শৃঙ্খলার ছাপ। গা-চাপা রঙের পাঞ্জাবি, হাতে ধরা একটা ফোল্ডার, মুখে ধূসর গোঁফ। চোখে চশমা, মুখে মিশ্র অভিব্যক্তি—জানা-অজানা সবকিছুকে মেপে নেওয়ার ক্ষমতা যেন জ্বলজ্বল করছে চোখে।
শুভব্রত নিচু গলায় বলে ওঠে,
“মেসের মালিক, সুধীরদা।
অভি মনে মনে বলে,
“উনিই তাহলে তার হেডস্যারের বন্ধু। মেসের মালিক সুধীর চন্দ্র হালদার।”
অভি উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে। একটু অপ্রস্তুত, ঘুম জড়ানো গলা।
— “নমস্কার, স্যার…”
সুধীরদা তাকে একবার চুপচাপ উপরে নিচে দেখে নেন, যেন চোখ দিয়েই তার জীবনের পুরো ব্যাকরণ পড়ে ফেলতে পারেন। তারপর বলেন:
— “ভালোমত থাকবি এখানে। গণ্ডগোল পছন্দ করিনা। পড়াশোনার বাইরে সময় নষ্ট হলে মেসে জায়গা থাকবে না, বুঝলি?”
কথাগুলো কড়া, কিন্তু তাতে বিরক্তি নেই—আছে অভিজ্ঞ অভিভাবকত্বের একরকম সতর্কবার্তা।
এবার ভদ্রলোক দরজা বন্ধ করে ভেতরে এসে ঘরের এক কোণে রাখা ভাঙ্গা টিনের চেয়ারে বসেন। চোখেমুখে এখন আর অতটা কঠোরতা নেই, বরং অভির দিকে একটু মনোযোগ নিয়ে তাকান। শুভব্রত একপাশে দাঁড়িয়ে, কিন্তু কথা বলছেন না—তিনি জানেন, এখন শুধু শুনে যাওয়ার সময়।
“শোন বাবা, এই মেসে থাকার কিছু নিয়ম আছে। নতুন এসেছিস, জানিয়ে দিলাম, যাতে ভুল না করিস।”
অভি চুপচাপ মাথা নাড়ল।
“প্রথম কথা, এখানকার মেসটা ছাত্রদের জন্য। কিন্তু ছাত্র মানেই বখাটে না—এই ভুল করবি না।
ভোর ছ’টা থেকে দরজা খোলে, রাত দশটার পর লক হয়। ওই সময়ের পরে কেউ বাইরে থাকতে পারবি না, আর ভেতরেও কাউকে আনতে পারবি না।”
“সকাল আটটায় চা আর বিস্কুট, সাড়ে ন’টায় জলখাবার—লুচি, সাবু, বা সাদা পাউরুটি। দুপুরে ভাত, ডাল, সবজি, আর ডিম—সোমবার আর শুক্রবার মাছ।
রাতের খাবার আটটা থেকে সাড়ে আটটার মধ্যে, একবারই রান্না হয়—লেট করলে খাবে না, খালি থালা। বুঝলি?”
অভি অবাক চোখে চেয়ে থাকে। শহুরে ছকে বাঁধা নিয়মগুলো তার গ্রামের এলোমেলো স্বাধীন জীবনের সঙ্গে কেমন যেন সংঘাত তৈরি করে।
উনি আরো বলতে থাকলেন,
“ঘর গুছিয়ে রাখতে হবে। রান্নাঘরে নিজে গিয়ে থালা নিতে হবে, খাওয়ার পরে ধুয়ে রাখবি।
রবিবারে কাপড় কাচার সময়, ছাদে শুকাতে দিতে হবে নিজের বুঝে। মাস গেলে ৫০০ টাকা ঘরভাড়া আর ৫০০ টাকা খাবার খরচ বুঝলি ।”
আর একটা কথা—এইখানে কেউ মায়ের ছেলে হয়ে থাকতে পারবে না।কলেজ করবি, পড়বি, বড় হবি—তাই এসেছিস। কিন্তু সেটার দায়ও তোকে নিতে হবে।
অপমানিত হবি না, কিন্তু অভিমান করেও চলবে না। শহরটা যেমন কঠিন, তেমনই এই মেসটাও।”
একটু থেমে শুভব্রতের দিকে তাকিয়ে বলেন,
“শুভব্রত তো তোদের দিকটা বুঝে, আমার দিকটাও বোঝে। তাই ওকেই বলি সব দেখভাল করতে। আর ছেলেটার জন্য দুটো টিউশন দেখে দিবি, যাতে ও নিজের খাওয়া,পড়ার খরচ টা চালাতে পারে।”
শুভব্রত শুধু বাধ্য ছেলের মত মাথা নাড়ল।
তারপর আবার অভির দিকে ফিরে উনি সংক্ষেপে বলেন,
“সব ঠিকঠাক রাখলে, তুই ঠিক চলতে পারবি এখানে। আর যদি খেয়ালছাড়া হোস—কলকাতা তোকে গিলে খাবে, এটা সবসময় মাথায় রাখিস।”
বলেই তিনি উঠে দাঁড়ান, ধীরে ধীরে দরজার দিকে এগিয়ে যান। বেরোনোর আগে কি মনে করে আবার ঘুরে দাড়ালেন,
” দেখ বাবা তোর স্যার আমার ছোটবেলার বন্ধু। শুধু তার কথাতেই আমি তোর দায়িত্ব নিয়েছি। তার মান রক্ষার দায়টাও কিন্তু তোর।”
উনি আর দাড়ালেন না।
দরজা বন্ধ হয়ে গেলো আরেকটা খট করে আওয়াজে। অভি চুপচাপ বসে থাকে।
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে শুভব্রত বলেন,
“ মানুষটা ওরকমই, কিন্তু ভিতরটা নরম। শুধু একটু শৃঙ্খলা ভালোবাসে। এখানে টিকতে হলে, এই নিয়মগুলোই তোর ঢাল হয়ে দাঁড়াবে। মেনে নে, দেখবি ঠিক হয়ে যাবে।”
অভি মাথা নেড়ে আবার খাটে বসে। শহরের প্রথম দিন, প্রথম রাত—আর এই প্রথম ঝটকা।
অভি ধীরে ধীরে বুঝে যায়—এই মেসবাড়িটা শুধু ছাদ আর খাট না, এ এক ছোট সংসার। আর এই সংসারের চালচলনের নিজস্ব সংবিধান আছে।
অভি এতটাই ক্লান্ত ছিল যে শুভ দার কথা শুনতে শুনতে আবার শুয়ে পড়ছিল।
শুভব্রত রে রে করে উঠলো,
“করছো কি, করছো কি ভায়া। এখন আবার শুচ্ছ যে। শুনলে না দাদা কি বলে গেলো, সাড়ে আটটার মধ্যে না খেলে যে আর রাতের খাবার টাই জুটবে না।শিগগির চলো।”
অভি বুঝতেই পারেনি যে এত রাত হয়ে গেছে, ছোট্ট টেবিল ঘড়িতে প্রায় সাড়ে আটটা।
রাতের খাবার রুটি আর সবজি। সারাদিন না খেয়ে অভির গা টা কেমন যেনো গুলিয়ে উঠছে।দুটো রুটি খেয়েই সে উঠে পড়ল। হাত মুখ টা ভালো ভাবে ধুয়ে নিলো, ঘরে গিয়ে একটু বসলো।কিছুক্ষণ পরেই শুভ দাও চলে এলো।
শুভব্রত নিজেই মুখ খুললেন, “বুঝলে ভায়া, আমি আগে ভবানীপুরে থাকতাম। মা-বাবা ছিলেন, চাকরিও করতাম একটা প্রাইভেট স্কুলে। বাংলা পড়াতাম।”
“এখন?” অভি বলল।
“স্কুল বন্ধ হয়ে গেল, বাবা-মা কেউ নেই। তখন থেকে এই মেসেই আছি। কোচিং করাই, অনলাইনেও পড়াই এখন।”
অভি কিছুক্ষণ চুপ করে ছিল। এর পর সে নিজেও বলেছিল নিজের কথা—বাঁকুড়ার কুঁড়ে ঘর,তাদের বেঁচে থাকার সংগ্রাম, দর্শনে অনার্স নেওয়া ও ডিস্ট্রিক্ট মাগিস্ট্রেট হওয়ার স্বপ্ন।
শুভব্রত তাকিয়ে ছিলেন কিছুক্ষণ। তারপর আস্তে করে বলেছিলেন,
“এই শহর আমাদের মতো মানুষদের তেমন করে জায়গা দেয় না, কিন্তু যদি ধৈর্য রাখো, সে অল্প একটু ঠাঁই ঠিক দেয়। তুই ভালো করে পড়, আমি আছি পাশে।”
ঘড়িতে তখন ভোর পাঁচটা কুড়ি। কলকাতার আকাশে হালকা আলো ফুটছে। ঘুম ভেঙে গেছে অনেক আগে, কিন্তু অভি চোখ বুজে শুয়ে ছিল কিছুক্ষণ। আজ তার জীবনের এক নতুন দিন—কলেজে প্রথম ক্লাস।
ধীরে ধীরে উঠে বসে। ঘরের ভেতর নিঃশব্দ, কেবল করিডোরে দূরে কোথাও কারও গরম জলের হাঁড়ি বসানোর আওয়াজ। খাট থেকে নামতেই শরীরটা টান টান, মাথার ভেতরে উত্তেজনা আর প্রশ্ন—কেমন হবে ক্লাস? কেউ কথা বলবে? বকবে না তো?
খাটের এককোন থেকে কাপড়ের ব্যাগ টা টেনে নেয় সে। ভালো জমা বলতে মোটে দুটি, আর একটি ফুল প্যান্ট । গতকালের পরা জামাকাপড় গুলো আলাদা করে রেখেছিল অভি। সেগুলোর সাথে মলিন রংচটা গামছা টা নিয়ে অভি বাথরুমে ঢুকলো। আজ অনেক্ষন ধরে স্নান করলো সে। গতকালের যাত্রার ধকল আর প্রথম কলেজে যাওয়ার চাপা উত্তেজনায় শরীর টা যেনো অবস হয়ে ছিল এতক্ষণ। এবার একটু যেনো সুস্থ্য লাগছে।আয়না নেই ঘরে, টিনের আলমারির ধাতব পৃষ্ঠে নিজের মুখটাকে একটু দেখে নেয়—চুলে হাত বুলায়। ব্যাগ থেকে নীল জামাটা বের করে সে।মায়ের হাতে ধুয়ে রাখা, এখনও সেই গ্রামের সস্তা ডিটারজেন্টের হালকা গন্ধ লেগে আছে।শুভব্রত তখনো ঘুমিয়ে, অভি চুপচাপ দরজা খুলে করিডোরে বেরোয়। রান্নাঘরে তখন এক বুড়ো ভৃত্য চায়ের জল বসাচ্ছে। তাকে পাস কাটিয়ে মেসের সরু সিঁড়ি দিয়ে পা টিপে টিপে নিচে নামে অভি। তখনও চারপাশ ঘুমন্ত।
দরজাটা খুলে সামনের রাস্তায় পা রাখতেই তার গায়ে এসে লাগে এক নিস্তব্ধ, ঠান্ডা বাতাস।
ভোরের আলো তখন ঠিক সূর্য ওঠার আগের ধূসর আভা।
পাশের চায়ের দোকানটায় সবে আঁচ দিয়েছে। কুণ্ডলী কৃত ধোঁয়ার গন্ধ অভির নাকে আসে। সেই ধোঁয়ার মধ্যে আলো ছড়িয়ে পড়েছে, যেন অদ্ভুত এক সোনালি কুয়াশা। বুক ভরে শ্বাস নেয় অভি। খুব রোগা ধুতি পরে এক বয়স্ক মানুষ চায়ের বাসন গুলো ধুয়ে গুছিয়ে নিচ্ছে। অভির বয়সী একটি ছেলে একগাদা খবরের কাগজ নিয়ে দাঁড়ালো এসে চায়ের দোকানে।
” আজ খুড়ো এত দেরি যে, আমি গেলুম তাহলে, পরে এসে চা খাবো।”
ছেলেটি সাইকেল চালিয়ে এগিয়ে গেলো।
এই কলকাতা এখন আর উত্তাল নয়, নেই শোরগোল বা ট্র্যাফিকের আওয়াজ।এ শহর এখন বইয়ের পাতার মতো নিঃশব্দ, ধৈর্যশীল।
পাশে হেঁটে যাওয়া এক ঠেলাগাড়িওয়ালা ধীরে ধীরে ফুল তুলছে গাঁদা আর রজনীগন্ধার ঝুড়ি থেকে। কোনো শব্দ নেই, শুধু একটা অদৃশ্য কর্মযোগ চলছে।
অভির চোখে জল চলে আসে প্রায়। না দুঃখে নয়—এই নিঃশব্দ শ্রম, এই প্রভাতের প্রস্তুতি, এই আলো-ছায়া মেশানো কলকাতা যেন ঠিক তার নিজের মতো।
তার মনের মধ্যে বাজে মায়ের গলা,
“সকালের রোদ গায়ে মাখিস, মনটা ঠান্ডা থাকবে।”
আজ সত্যিই, এই ভোরবেলার কলকাতা তার ভিতরের কাঁপনকে স্নেহে জড়িয়ে নেয়।
ট্রাম লাইন ধরে ধীরে চলা গাড়ির ঘর্ঘর আওয়াজ ভেসে আসে—সব মিলে যেন এক নীরব সংগীত।
এই শহর, যা তাকে চিনত না, আজ যেন প্রথমবার তার দিকে তাকায়।অভি নিজের বুকের ওপর হাত রাখে, ভাবে,
“হ্যাঁ, আমি ঠিক জায়গাতেই এসেছি।”
ইলেকট্রিক পোস্টের সাদা আলো ধুয়ে যাচ্ছে সূর্যের ম্লান আলোর সাথে। মেসবাড়ীর দরজাটা খুলে অভি ভিতরে চলে যায় আবার।
কলেজ স্ট্রিট ধরে হাঁটছে অভি। কাঁধে ব্যাগ, পরনে হালকা নীল শার্ট, চোখে একধরনের নির্ভুল অজানা। রাস্তায় চারপাশে বইয়ের দোকান, চা-ঠোঙার শব্দ, “দাদা একটু সরে যান তো”—সব যেন এক নতুন ভাষা, যেটা শিখতে হবে ধীরে ধীরে।
কলেজের মূল ফটকে পৌঁছে থমকে দাঁড়ায় সে। সামনে বিশাল ভবন, মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে—রামানন্দ কলেজ। দোতলা ভবনের সিঁড়ি, পাশে নোটিশ বোর্ড, আর গেটের পাশে দাঁড়ানো দারোয়ান—সব কিছুতেই যেন একটা পুরনো ইতিহাসের গন্ধ।
ফটক পার হতেই বুকের ধুকপুক শুরু হয়ে যায়। কেউ চেনে না, কেউ ডাকে না। সবাই ব্যস্ত, সবাই চেনা কাউকে খুঁজে নিয়ে গল্পে মত্ত।
অভি কলেজের মূল ভবনের করিডোরে পা রাখতেই যেন একটা অদৃশ্য দেয়াল ঠেলে নতুন জগতে ঢুকে পড়ল সে। চারপাশে শুধু মুখ—সাজানো, পালিশ করা, চুলে জেল দেওয়া, ঠোঁটে গাঢ় লিপস্টিক।ব্যাগগুলো যেন ব্র্যান্ডের বিজ্ঞাপন, আর মোবাইলগুলো ক্যামেরার চেয়ে বড় কিছু। কিন্তু অভির পরনে পাতলা সাদা-নীল হাফ হাতা শার্ট, তার নিচে এটি সাধারণ একটা ফুলপ্যান্ট আর পায়ে স্যান্ডেল, কাপড়ের ব্যাগ টা কাঁধে ঝুলছে।
একটা করিডোর পেরিয়ে ক্লাসরুমের সামনে পৌঁছয়। দরজার বাইরে লেখা—”দর্শন (Philosophy) অনার্স, প্রথম বর্ষ, সেকশন A”।
ভেতরে ঢোকে ধীরে ধীরে। বেঞ্চে ছেলেমেয়েরা বসে পড়ছে। কেউ কেউ নতুন জামা পরে এসেছে, কেউ মোবাইল স্ক্রলে ব্যস্ত, কেউ চুপচাপ, অভির মতো।সে পেছনের সারিতে গিয়ে বসে, ব্যাগটা পাশে রাখে। মুখ নিচু করে জানলার দিকে তাকিয়ে থাকে—সরাসরি কারও চোখে চোখ পড়লে যেন ভয় পাবে। শুনতে পেলো তার ডানদিকে বসা এক ছেলের ফিসফিস,
“ওরে দেখ, মনে হচ্ছে যেন কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে এসেছে।”
অন্য একজন বলল,
“না রে, স্টাইলটা দেখ—একদম টিপিকাল গ্রামের হাদা কাত্তিক!”
“হ্যান্ড ব্যাগটাও তো হরিপদর দোকান থেকে আনা মনে হয়।”
প্রথম জন বলে উঠলো,
“চুপ রে! শুনে ফেললে আবার কেঁদে ফেলবে…”
হালকা হাসির শব্দ, চাপা কটাক্ষ। কেউ সরাসরি কিছু বলছে না, কিন্তু সবাই তাকিয়ে আছে—সেই অদ্ভুত, উপহাস মেশানো দৃষ্টিতে। যেন অভি এই ভবনে ভুল করে ঢুকে পড়েছে।
একটা মেয়ে, পরনে চোখ ধাঁধানো ওয়েস্টার্ন পোশাক, চুল রঙিন হাইলাইটে ঝলমল করছে, পাশ দিয়ে হেঁটে যেতে যেতে একটু নাক কুঁচকে বলে—
“এই ধরনের ছেলেদের দেখলেই একটা বাজে গন্ধ লাগে।”
অভি কিছু বলে না। সে বোঝে, এই ভাষা তার চেনা ভাষা নয়। এই চোখের ভাষাও নয়।
তার বুকের ভেতরটায় একটা চাপা হাওয়া খেলে যায়। এমন তো কেউ কখনও বলে না তাকে—গ্রামে তো সবাই নাম ধরে ডাকে, ভালোবাসে, ভুল ধরলেও মুখে হাসি থাকে।কিন্তু আজ এখানে, প্রথম দিনেই সে বুঝে গেল, মানুষের জামাকাপড়, ফোন, কথার টোন, সব কিছু এখানে ‘মানবিকতার থেকেও বেশি দামি’।
হঠাৎ দরজা দিয়ে ঢুকলেন একজন প্রৌঢ় মানুষ, মুখে সংযত হাসি, হাতে কিছু খাতা।
“আমি আপনারা যাকে আজকাল বলবেন, ‘ফার্স্ট ইয়ারের দর্শনের ক্লাসের প্রথম শিক্ষক।’ আমার নাম অরিন্দম মুখোপাধ্যায়।”
তার গলায় মৃদু রসিকতা, কিন্তু চোখে শৃঙ্খলা।
“দর্শন মানে কি জানো? ভাবা। নিজের সম্পর্কে, জগৎ সম্পর্কে, ঈশ্বর সম্পর্কে, জীবন সম্পর্কে। এখানে তোমরা শিখবে–কীভাবে প্রশ্ন করতে হয়, উত্তর খুঁজে নিতে হয়।”
অভির মনে হয়, যেন তারই মনের কথা বলছেন শিক্ষক। বইয়ের বাইরে এমন কথা কেউ কখনো বলেনি।
ক্লাস চলতে থাকে কিন্তু কিছু ছেলে-মেয়ে মোবাইল নিয়ে ব্যস্ত, কেউ চুপচাপ ক্লাসের ছবি তুলছে স্টোরিতে দেওয়ার জন্য, কেউ পাশের বন্ধুর সঙ্গে হাসছে।
অভি চোখ বড় করে বোঝার চেষ্টা করছে—দর্শনের প্রথম পাঠ, কিন্তু তার মন পড়ে আছে সেই কথাগুলোর ভেতর। সে মনে মনে ভাবে,
“ এদের মানবিকতা নেই, কিন্তু দামি ঘড়ি আছে। চোখে মায়া নেই, কিন্তু ঠোঁটে লিপস্টিক আছে। কথা গায়ে লাগে না, কিন্তু শরীরের জামায় দাগ লাগলেই বড় কষ্ট।”
পাশে বসা এক ছেলে,নাম সুমন, হঠাৎ মুচকি হেসে বলে,
“প্রথম দিন?”
অভি মাথা নেড়ে বলে,
“হ্যাঁ, বাঁকুড়া থেকে এসেছি।”
সুমনের হাসি আরও বড় হয়।
“বেশ, মন খারাপ করো না ভাই, এরকম অনেক অমানুষ পাবে যারা শুধুই অন্যকে ছোটো করতেই ব্যস্ত। আমাদের মত ছোট ঘরের ছেলেমেয়েদের এরা মানুষ বলে মনে করেনা।”
অভি একটু শুকনো হেসে স্যারের কথায় মনোনিবেশ করে।
অভি জানে,ওর হাতে দামি ঘড়ি নেই, কিন্তু সময়ের মূল্য সে বোঝে।ওর মোবাইল বা ইন্টারনেট নেই, কিন্তু মাথার ভেতর জেগে আছে জ্ঞানপিপাসা,ও সাজেনি, কিন্তু মনের ভেতর আজ একরকম আত্মবিশ্বাসের শোভা লেগে আছে।
ক্লাস শেষ হওয়ার ঘণ্টা বাজার সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষকের পেছনে পেছনে ছাত্রছাত্রীরা হইচই করে বেরিয়ে পড়ে। কেউ গলার আওয়াজ বড় করে বলে,
“আজ তো ভয়ানক বোরিং ক্লাস ছিল রে!” কেউ মোবাইল টেনে ‘ফার্স্ট ক্লাস সেলফি’ তুলে ফেলল।
অভি ধীরে ধীরে বেরিয়ে এল দরজার ফাঁক দিয়ে। তার মুখে একটা নির্লিপ্ত ভদ্রতা, চোখে কৌতূহল, কিন্তু পেছনে লেগে থাকা সেই বাঁকুড়ার মাটি আর ঘামের সুবাস যেন কেউ কেউ সহ্য করতে পারছে না।
হঠাৎ পাশ থেকে একটা দল দাঁত কটমটিয়ে বলে ওঠে,
“ওই ভাই, খেতমজুরের ক্লাসে ঢুকে পড়েছ নাকি ভুল করে?”
“ব্যাগটা একবার দেখ, যেন বাবা ‘শুকনো মুড়ি পাঠানোর বস্তা’।”
“এই ধরনের ছেলেরা আসলে কলেজের পরিবেশ নষ্ট করে।”
হাসি, কটাক্ষ, চোখাচোখি—সব কিছু ছড়িয়ে পড়ছে বাতাসে, যেন বিষ।
রাহুল বলে একটি ছেলে অভির সামনে এসে দাঁড়ায়।বলে,
“এই ভাই, তুমি তো মনে হচ্ছে গাধার গায়ে ইউনিভার্সিটি ট্যাগ লাগিয়ে ঢুকে পড়েছ।”
অভি থেমে যায়।
রাহুল আরো বলে,
” এসেছো কোথা থেকে, বাঁকুড়া নাকি পুরুলিয়া?”
কথাগুলো শুনে আশেপাশে হালকা ফিসফাস, কয়েকজন মুচকি হাসে।
অভি কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে। সে উত্তেজিত হয় না, না চোখ নামিয়ে নেয়।
সে নিজের শরীরটাকে একটু সোজা করে নেয়। চোখ দুটো স্থির করে তাকায় সেই দলের দিকে। তার মুখে কোনো অভিমান নেই, করুণা নেই—আছে এক অদ্ভুত শান্ত আত্মবিশ্বাস।
তার মুখে ধীরে ধীরে ফুটে ওঠে এক অনাড়ম্বর সৌজন্য।অভি বলে,
“আপনাদের কথা শুনে আমার খুব ভালো লাগছে। কারণ কেউ তো এত মনোযোগ দিয়ে আমাকে লক্ষ্য করছে, সেটাই তো বড় কথা। তবে একটা কথা বলি, আমি হয়তো আপনাদের মতো আধুনিক পোশাক পরি না, ইংরেজিতে সাবলীলও নই, তবুও আমি শিক্ষিত হওয়ার চেষ্টা করছি।আর শিক্ষার মানে শুধু বই পড়া না—অন্যের প্রতি সম্মান, সহানুভূতি, ভদ্রতা—এইগুলোও শেখার বিষয়।”
একটা নিস্তব্ধতা নেমে আসে চারিদিকে।
অভি থামে না।সে আরোও বলে,
“আমি জানি, শহরে আসা একজন গ্রামের ছেলেকে অনেকটা রাস্তা পেরোতে হয়। আমি সেই পথ পেরিয়ে এসেছি।আর আমি প্রতিযোগিতার মাপকাঠিতে পাস করেই এখানে দাঁড়িয়ে আছি। কেউ দয়া করেনি আমাকে এখানে আসার সুযোগ দিয়ে। “
একটু থেকে সে আবার বলতে শুরু করে,
” তাছাড়া আমি যে পরিবার থেকে উঠে এসেছি, সেখানে দুবেলা দুমুঠো ভাত জোগাড় করতে আমার বাবাকে অক্লান্ত পরিশ্রম করতে হয়, আপনাদের মত জীবন যাপন আমার পক্ষে সম্ভব নয়।তাই আমি আপনাদের মতো হতে পারিনি বলেই নিজেকে ছোট ভাবি না। তবে আমি আমার যোগ্যতা দিয়ে চেষ্টা করছি,একজন প্রকৃত মানুষ হয়ে ওঠার,ওটাই যথেষ্ট নয় কি ..”
আমার এই ব্যাগ, এই জামা, এই পায়ে স্যান্ডেল—এসব কিছুতেই আমি লজ্জা পাই না। বরং আমি গর্ব করি।
কারণ এগুলো আমার বাবামায়ের পরিশ্রমের চিহ্ন।”
এবার সে রাহুল কে লক্ষ্য করে হালকা হেসে বলে,
“আপনি যদি আমাকে ছোট ভাবেন, সেটা আপনার চিন্তার দৈন্যতা। আমি তো কাউকে ছোট ভাবি না।”
এবার আশেপাশে থাকা সবাই স্তব্ধ।
অভি একটু মুচকি হেসে বলে,
“মানুষের নিজের জায়গা সে নিজেই জানে। কেউ আঙুল তুলে দেখিয়ে দেয় না।
আমি কে, কোথা থেকে এসেছি, কেন এসেছি—এসব মনে রাখলেই পথ ভুল হবে না আমার।”
দূরে একটা গাছের নিচে দাঁড়ানো পাখির মতো চুপ করে থাকা দু’একজন ছাত্র এবার হাততালি দেয় হালকা। কেউ আর উচ্চ গলায় কিছু বলে না। তারা বুঝে গেছে—এই ছেলেটি নীরব নয়, শিকড়বদ্ধ। মুখে মাটি লেগে থাকলেও, কণ্ঠে আগুন আছে।
সুমন দৌড়ে এসে অভিকে জড়িয়ে ধরে,
“ভদ্রভাবে কথাটা বলেও কী সুন্দর তীক্ষ্ণ উত্তর দিলে ভাই!”
অভি আর দাঁড়ায় না। মাথা নিচু না করেই সোজা হেঁটে চলে যায় করিডোর পেরিয়ে। পেছনে পড়ে থাকে কিছু চুপ করে যাওয়া মুখ, কিছু লজ্জায় নুয়ে পড়া হাসি, আর কিছু চিন্তিত দৃষ্টি—যারা হঠাৎ করে বুঝতে পারে, ভদ্রতা কখনো দুর্বলতা নয়, বরং চরম শক্তির প্রকাশ।
একটা মুহূর্তের নীরবতা শহরের এই ব্যস্ত কলেজের করিডোরে ছড়িয়ে পড়ে—যেখানে কথার আওয়াজেই শোরগোল ওঠে, সেখানে এক ভদ্র, মাটির গন্ধমাখা কণ্ঠস্বর তাদের চুপ করিয়ে দিল।
এই ছেলেমেয়ে গুলো, যারা একটু আগেও গলা ফাটাচ্ছিল হাসির চোটে, এখন নিচু গলায় বলে,
“ও বুঝিয়ে দিল… ক্লাসে বসার যোগ্যতা জামা কাপড় নয়, মনের রুচি আর যোগ্যতা দিয়ে হয়।”
রাহুল ভেতরে ভেতরে অস্বস্তি নিয়ে তাকিয়ে থাকে অভির দিকে।সেই চোখে কৌতূহল নয়, তুচ্ছতা নয়—বরং একপ্রকার ভয় ও শ্রদ্ধার মিশ্র অনুভব।
এই মুহূর্তে অভির ওই কয়েকটি সোজাসাপটা কথা শুধু রাহুলদের মুখ বন্ধ করেনি,বরং প্রমাণ করে দিয়েছে—আত্মমর্যাদা কোনো সাজের, উচ্চারণের, ফোনের ব্র্যান্ডের পরিচয় নয়… আত্মমর্যাদা হৃদয়ের গভীর এক আলো, যা আলো ফোটাতে জানে, চিৎকার করতে নয়।
সেই মুহূর্তে, করিডোরের ওপাশে দাঁড়িয়ে থাকা একজন অধ্যাপক, অরিন্দম মুখার্জি—এই ঘটনার সাক্ষী হয়ে যান।
এই ছেলেটি কারো সঙ্গে তর্ক করেনি, কণ্ঠ তোলেনি, অপমানের জবাবে অপমান দেয়নি—তবু আজকের দিন থেকে সে আর এক অবজ্ঞাত গ্রাম্য ছেলে নয়, এক আত্মমর্যাদায় ভরপুর মানুষ।
তাঁর চোখে এক দীর্ঘশ্বাস আর হাসি মেশানো দৃষ্টি। তিনি মনে মনে বলেন—
“এই ছেলেটা… একদিন অনেক দূর যাবে।”
অভি করিডোরের শেষ মাথায় জানালার ধারে গিয়ে দাঁড়ায়। বাইরের গাছের পাতাগুলো দুলছে হাওয়ায়, আলো-ছায়ায় খেলছে যেন কেউ ব্রাশের টানে জলরঙে এঁকে দিয়েছে।বাইরে বৃষ্টি পড়ছে। বৃষ্টিভেজা ঠাণ্ডা বাতাস অভির মুখে চোখে লাগে।
একটা অজানা শান্তি অনুভব করে সে।
তার চোখে এখনো কিছুক্ষণ আগের ঘটনাগুলোর ছায়া। অপমানের কাঁটা নয়—বরং আত্মবিশ্বাসের এক গোপন আলো জ্বলছে ভিতরে ভিতরে।
এই শহরে আজ প্রথমবার সে নিজের মতো করে একটা ‘উত্তর’ দিয়েছে।
হঠাৎ পাশে এসে দাঁড়ায় এক মেয়ে।
চোখে ঠান্ডা দীপ্তি, মুখে কোমল অভিব্যক্তি।
মেয়েটি বলে,
“ভালো বললেন কিন্তু আপনি… সবসময় চুপ থাকা ঠিক না। আমি দেখছিলাম—ওরা খুব বাজে ব্যবহার করছিল আপনার সাথে।”
অভি একটু তাকিয়ে দেখে—মেয়েটি তার মতোই সাধারণ পোশাকে, কিন্তু চোখে বুদ্ধির স্পষ্ট রেখা।
সে শান্ত গলায় বলে,
“চুপ থাকলে তো ভাববে, সত্যিই আমি নিচু… আসলে আমি জানি, আমি কে। সেটাই শেষ কথা।”
মেয়েটি একটু চমকে তাকায়। এমন উত্তর সে প্রত্যাশা করেনি।
তার চোখে অভির মুখটা যেন অন্যরকম হয়ে ওঠে—শহরের কোলাহলের মধ্যেও এক অপার্থিব নির্ভরতার ছায়া।
সে হেসে বলে,
“আমি সুচরিতা সেন। হিস্ট্রি ফার্স্ট ইয়ার। আপনি তো নতুন মনে হচ্ছে।”
“হ্যাঁ, আমি অভি। দর্শন বিভাগে। আজই জয়েন করেছি।”
এক মুহূর্তের নীরবতা।
তারপর মেয়েটি চোখ না সরিয়েই বলে,
” আমার ক্লাস আছে, আমি আসি তাহলে।”
মুখে এক আশ্চর্য প্রশংসার ছাপ—যা কোনো বাহ্যিক ভদ্রতা নয়, বরং অন্তরের সম্মান।
সে হয়তো এক মুহূর্তেই বুঝে ফেলে, এই ছেলেটি সাধারণ পোশাকে এলেও—তার মনটা একেবারেই ‘অসাধারণ’।
শহরের কংক্রিটের দেয়ালে যাদের হৃদয় শুকিয়ে গেছে, তাদের মধ্যেও কেউ কেউ এমন থেকে যায়—যাদের ভদ্রতা নিছক নরমতা নয়, বরং দৃঢ়তার অলিখিত ভাষা।
সুচরিতা চলে যায় ধীরে ধীরে করিডোরের বাঁক ঘেঁষে।
অভি চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে, তাকিয়ে থাকে তার পেছনে পড়ে থাকা ছায়ার দিকে। সেই হাঁটায় কোনো তাড়াহুড়ো নেই, কোনো কৃত্রিম ছন্দ নেই—আছে এক আত্মবিশ্বাসী, স্থির পদক্ষেপ।
সুচরিতা সেন।
নামটা যেন তার মুখের সাথে মিলে যায়—শান্ত, স্থির, অথচ কঠিনের ভিতর লুকানো কোমলতা।
অভি জানে না এখনও, কে সে।
কিন্তু তার চোখে যে ভদ্রতা ছিল, যে স্বরে ছিল সমানুভব, আর কথায় ছিল দৃঢ়তা—তাতে একটা অদ্ভুত টান থেকে যায়।
অভির চোখে সেই মেয়েটা এক ঝলক হাওয়ার মতো—যা আসে, না বলেই ছুঁয়ে দিয়ে যায়।
সে জানে না সুচরিতা একজন ধনী গহনার দোকানদারের একমাত্র মেয়ে,সে জানে না তার বাবা শহরের প্রভাবশালী ব্যবসায়ী, যার নামে একাধিক শোরুম।সে জানে না মেয়েটির ঘরে দামি পোশাকের র্যাক, শেলফ ভর্তি বিদেশি বই, কিংবা নিজের নামে গাড়ি।
অভি শুধু এটুকুই দেখেছে—
একটা মেয়ে, যার চোখে ছিল সহমর্মিতা, যার কথায় ছিল সাহস,আর যার সাদামাটা জামার ভাঁজে লুকানো ছিল এক মহৎ জীবনের স্বপ্ন।
তার হাঁটুর ওপরে ছোট একটা সুতির ব্যাগ ঝোলানো, যাতে কয়েকটা খাতা, একটা জলভর্তি বোতল, আর সম্ভবত কিছু চক আর রঙপেন্সিল।
অভি তাকিয়ে থাকে চুপচাপ।
তার মনের ভেতরে জন্ম নেয় এক নীরব বিস্ময়। তারপর সে ধীরে পা বাড়ায় নিজের ক্লাসের দিকে।কিন্তু মনের ভিতরে শব্দহীনভাবে বাজতে থাকে সেই নামটাই—
সুচরিতা।
অভি জানালার পাশে দাঁড়িয়ে আছে।
কলকাতার রাত গভীর, ব্যস্ত শহরের কোলাহল তখন ক্লান্ত হয়ে নিস্তব্ধতায় ঢলে পড়েছে। দূরের রাস্তার বাতিগুলো স্তব্ধ কোনো যন্ত্রনার মতো জ্বলছে, আর হালকা হাওয়ায় জানালার পর্দা কাঁপছে ধীরে ধীরে। মেসবাড়ির আলো নিভে গেছে।কিন্তু অভির চোখে ঘুম নেই।
জানালার বাইরের সেই শহরের আলো তাকে টানে না।
সে যেন চোখ রাখে জানালার বাইরে নয়, তার বহু দূরের গ্রামের ছোট্ট একটি মাটির ঘরে।, যেখানে তার বাবা সারাদিন ভ্যান চালিয়ে চাল কিনে এনেছেন আর মা হয়তো ফ্যান ভাত খাওয়ার জোগাড় করছেন।
আধপেটা খাওয়া দুটো মানুষ তবু হাসি মুখে ছেলের ভবিষ্যতের চিন্তায় ডুবে আছেন।
অভির বুকের ভেতরটা হঠাৎ কেঁপে ওঠে।
তার চোখে জল আসে না—তবু বুকের ভেতরে একটা ভার জমে থাকে।
“আমি এখানে কলকাতায় দর্শন পড়তে এসেছি, নিজের স্বপ্ন খুঁজতে এসেছি,” — মনে মনে বলে সে।
“কিন্তু ওদিকে আমার মা-বাবা এখনো ভাতের হিসেব করে, পকেট গুনে তেল কেনে।
জানালার বাইরে চেয়ে থেকে অভি মনে মনে বলে,
“আমি হাল ছাড়ব না।তোমাদের এই কষ্ট আমি বৃথা যেতে দেব না।
আমি এমন কিছু করে ফিরব একদিন—যাতে তোমাদের গায়ের রুক্ষ চামড়ার নিচের শ্রমটুকুগর্ব হয়ে উঠবে, গ্লানির ভার নয়।”
অভির চোখে তখন একটিই প্রতিজ্ঞা জ্বলজ্বল করছে,
“আমি শুধু ডিগ্রি নিতে আসিনি…
আমি এসেছি তোমাদের হাসি ফিরিয়ে নিতে।”
চাঁদের আলো জানালার ফাঁক দিয়ে এসে পড়ছে তার মুখে।
আর ঠিক তখনই মনে পড়ে যায় সেই চোখদুটো—সুচরিতা।
নামটা বড় বেশি মিশে থাকে তার ব্যক্তিত্বে। যেন কোনও গানের অনুচ্চ সুর,যেটা কানে বাজে না, কিন্তু মনের ভিতর থেমে থাকে বহুক্ষণ।
আজকে কলেজে চোখের সামনে ঘুরে বেড়ানো মেয়েরা—চোখে রঙের চড়া রেখা, ঠোঁটে দামি লিপস্টিক, কানে হেডফোন, হাতে আইফোন।একটার চুলে পাঁচ রকম হাইলাইট তো অন্যজনের হাতে ক্যামেরামুখো ফোন।
তারা কথা বলে দ্রুত, হাসে জোরে, নিজেরা নিজেদের ছবি তোলে বারবার। যেন তারা প্রত্যেকেই নিজস্ব বিজ্ঞাপন।
কিন্তু তাদের এই সাজে কোনো সত্যতা নেই, অনুভূতি নেই, ছোঁয়ার মতো কিছু নেই।এদের চোখে না আছে কৌতূহল, না আছে কারো কষ্ট বোঝার ব্যস্ততা।সবাই যেন এক প্রতিযোগিতায় আছে—কে বেশি দামি, কে বেশি শহুরে, কে বেশি জনপ্রিয়।
আর সেখানে সুচরিতা যেনো এক ব্যতিক্রমী চরিত্র।
আজকের কলেজের মেয়েরা হয়তো সুন্দর, আকর্ষণীয়, স্মার্ট,কিন্তু সুচরিতা স্বচ্ছ। “
সে জানে কীভাবে কথা বলতে হয়, জানে কীভাবে সহানুভূতির হাত বাড়াতে হয়।
পেছন থেকে শুভব্রত ডেকে ওঠে,
“কি ভায়া ঘুমাবে না।”
অভি ভেবেছিল শুভব্রত ঘুমিয়ে পড়েছে।
“ঘুমাও নি শুভ দা।”
অভির পাশে এসে দাঁড়ায় সে। শান্ত গলায় বলে,
” বাড়ির কথা মনে পড়ছে বুঝি?”
অভি শুধু মাথা নাড়ে।
শুভব্রত সিগারেটটা ধরিয়ে চোখ বন্ধ করে একটা সুখটান দিলো, ধীরে ধীরে ধোয়া ছেড়ে দিয়ে বলে,
“আজ তোমার কলেজের প্রথম দিনটা কেমন গেলো, অভি?”
অভি চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিল। কিছুক্ষণ চুপ থেকে একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে বলল,
“একটা অন্যরকম দিন ছিল দাদা।যেখানে আমি একা, অথচ একেবারে একা ছিলাম না।”
একটু থেমে বলল,
“প্রথমে কলেজের গেট পেরোনোর সময় বুক ধুকপুক করছিল।নতুন শহর, নতুন মুখ, সব কেমন অচেনা…আর তার উপর আমার এই সাধারণ জামা, চটি স্যান্ডেল, মাথার ঘামে ভেজা চুল।পাশ দিয়ে যখন ছেলে-মেয়েরা পেরিয়ে যাচ্ছিল—হাঁটা, কথা, পোশাক, চালচলন সব যেন বিজ্ঞাপনের মতো চকচকে।তাদের চোখে আমি যেন এক ভুল জায়গায় ঢুকে পড়া চরিত্র।”
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল অভি।
আবার শুরু করলো সে। “ক্লাসরুমে ঢুকেই দেখলাম, কিছু ছেলেমেয়ে আমাকে দেখে চাপা হাসি হাসছে। যেনো গ্রাম থেকে কোনো একটা অসভ্য, জোকার কোটা পেয়ে কলেজে পড়তে ঢুকেছে। আসলে আমার কোনো যোগ্যতাই নেই এই কলেজ পড়ার।”
“আমার রাগ হয়নি, কিন্তু একটা অভিমান জমে গেল গলার কাছটায়।তাদের চোখে আমি পিছিয়ে থাকা কেউ।
কেবল এই জন্য যে আমার পকেট হালকা, উচ্চারণ শহুরে নয়, আর জামাটা দামি শপিং মল থেকে কেনা নয়।”
“কিন্তু শুভ দা, আমি তো জানি আমি কে।আমি জানি আমার মা না খেয়ে, ছেড়া শাড়ি পরেও আমাকে মানুষ করার স্বপ্ন দেখে।আমি জানি, আমার বাবা সারা জীবন ভ্যান টেনে গেছে—আমার মুখে দুগাল ভাত তুলে দেওয়ার জন্য, আমার খাতা কিনে দেওয়ার জন্য।তাদের মুখের দিকে তাকিয়ে আমি মাথা নিচু করব?”
“না, করিনি।”
“আমি ক্লাস শেষে ওদের সামনেই বললাম–শব্দ দিয়ে আঘাত করা সহজ,কিন্তু শব্দ দিয়েই যদি কারও আত্মসম্মান রক্ষা করতে পারো, তবে বুঝবে, তুমি সত্যি মানুষ হয়েছ।”
তারা চুপ করে গিয়েছিল।
সেই চুপটা, একটা সারা জীবনের জবাবের মতো মনে হচ্ছিল।”
একদমে কথা গুলো বলে অভি একটু শ্বাস নিলো,একটু উত্তেজিত হয়ে পড়েছিল সে।
একটু সময় নিয়ে খুব শান্ত গলায় বলল,
তারপর… সুচরিতা এল।
চোখে অসম্ভব শান্তি, কথায় ভদ্রতা, মুখে মৃদু আত্মবিশ্বাস।
সেও ওদের আচরণে বিব্রত হয়েছিল। পাশে দাঁড়িয়ে বলেছিল,
“ভালো বললেন কিন্তু আপনি…”
জানো শুভ দা, সেই এক লাইনেই আমি বুঝে গিয়েছিলাম,এই শহরে সবাই একরকম নয়, কিছু ব্যতিক্রমও আছে।”
আজ আমি প্রতিজ্ঞা করলাম,
প্রতিদিন পড়ব, শিখব, গড়ে তুলব নিজেকে,আর একদিন প্রমাণ করব—
মানুষ বড় হয় তার পোশাকে নয়, তার মননে।”
শুভব্রত কিছুক্ষণ চুপ থাকে।
তারপর ধীরে ধীরে বলে,
“ তুমি ঠিক পথেই হাঁটছো ভায়া… তোমার মতো লোকদের জন্যই এই শহরটা এখনো বেঁচে আছে।”
জানালার বাইরে তখন হালকা ঠান্ডা হাওয়া।শহর ঘুমিয়ে পড়েছে, কিন্তু অভির চোখে ভোরের আলো ঝলমল করছে।
কলেজ স্ট্রিটের মেসবাড়ির ঘুমন্ত পুরীতে জানালার পাশে বসে আছে শুধু দুটো নিদ্রাহীন মানুষ, অভি আর শুভব্রত। বাইরে দূরে কোথাও কুকুর ডাকে, রিকশার ঘন্টা বেজে ওঠে ছেঁড়া ছেঁড়া ছন্দে।
হঠাৎ অভি জিজ্ঞেস করে, “দাদা,তুমি এত বছর ধরে কলকাতায়… কেমন লাগে এই শহরটা?”
শুভব্রত জানালার দিকে চেয়ে থাকেন কিছুক্ষণ। তারপর শান্ত গলায় বলেন:
“কলকাতা… এক অদ্ভুত শহর।
তুমি যদি খুব ব্যস্ত থাক, সে তোমাকে হাঁপিয়ে দেবে। আবার যদি একা থাকো, শহরটা এমনভাবে তোমাকে জড়িয়ে ধরবে, বুঝতেই পারবে না কখন সে তোমার নিজের হয়ে গেছে।”
অভি কিছু না বলে শোনে। শুভব্রত আবার বলেন,
“এই শহর কাউকে চোখে পড়ে না, তবু কাউকে ফেলে রাখে না।
তুই যদি কিছু করতে চাস—এই শহর তোকে জায়গা দেবে, ধীরে ধীরে, সময় নিয়ে। কিন্তু যদি ভেঙে পড়িস, তোর কান্নার জন্য এখানে কারও সময় নেই।
হঠাৎ করেই শুভ দা তুমি থেকে তুই তে চলে এলো। মুহূর্তে অভির মনে হলো শুভ দা তার কত কাছের মানুষ, কতদিনের পরিচয় ।
দাদা বলতে থাকেন,
“কলকাতা সহানুভূতিশীল নয়—কিন্তু সে পরিশ্রম বুঝতে পারে।সে স্বপ্নের শহর নয়, কিন্তু যারা জেগে স্বপ্ন দেখে, তাদের ঠাঁই দেয়।”
তার গলায় কোনো অভিযোগ নেই, শুধু বাস্তবতার ধুলো ঝরছে কথায়।
“এই শহরে যাদের কিছু নেই, তারাই আসলেই সবচেয়ে বেশি দিন বাঁচে। এখানে বেঁচে থাকতে জানতে হয়—কম খেয়ে, ধুলোর মধ্যে হেঁটে, ইটের পাশে ঘুমিয়ে… কিন্তু বুকের মধ্যে কিছু আগুন নিয়ে।
কলকাতা তোদের সেই আগুনটা টিকিয়ে রাখে। আর যদি একবার নিভে যায়—তবে আর কেউ জিজ্ঞেস করে না তুই কোথা থেকে এসেছিলি।”
অভি চুপ করে থাকে। শহরটাকে আরেকভাবে দেখতে শুরু করে সে—এটা আর শুধু ভবিষ্যতের ঠিকানা নয়, এটা এক চাপা যুদ্ধের ময়দান, যেখানে টিকে থাকাটাই জয়।
শুভ দা এবার। তারা দেয়,
“আর নয় ভাই, আবার পরে কথা হবে এসব নিয়ে।অনেক রাত হয়েছে, এবার ঘুমিয়ে পর। আর কাল কিন্তু কলেজ থেকে ফিরে বিকালে আমার সাথে একটু বেরোতে হবে। “
“তোর জন্য একটা টিউশনের ব্যবস্থা করেছি।সেখানে একবার যাবো। “
আজ শুভব্রত শুধু রুমমেট নয়, অভির চোখে হয়ে উঠলো এক অভিভাবকের মতো,বড় দাদা —নীরব, সংযত, কিন্তু ছায়ার মতো উপস্থিত।
—oooXXooo—
![]()







