সামনেই এক ভয়ঙ্কর দুর্দিন ?
সৌমেন ভট্টাচার্য্য
পৃথিবীর তিন ভাগ জল আর এক ভাগ স্থল। এই বিশাল জলরাশির প্রায় ৯০ শতাংশই লবণাক্ত সমুদ্রের জল, আর মাত্র ১০ শতাংশ হলো মিষ্টি জল। দুঃখজনকভাবে, সমুদ্রের গভীরে লুকিয়ে থাকা ‘অমৃত ভাণ্ড’ আজ নিঃশেষের পথে। একদিকে সামুদ্রিক ঢেউয়ের ভয়াবহ জলোচ্ছ্বাস ও অনিয়মিত সুনামি, যা পরিবেশ দূষণেরই ফল, অন্যদিকে উপকূল অঞ্চলের সুবিশাল মিষ্টি জলের চাষের জমি আজ লবণাক্ততার শিকার। গ্রাম বাংলার পুকুরগুলিতে একসময় যে সুস্বাদু মাছের দেখা মিলত, আজ তার অধিকাংশই বিলুপ্ত।
আফ্রিকার আমাজন জঙ্গলের পর পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম অরণ্য হলো আমাদের ম্যানগ্রোভ অরণ্য সুন্দরবন। এটি ৮৪ প্রজাতির উদ্ভিদ ও প্রাণী নিয়ে গঠিত এবং পৃথিবীর অক্সিজেনের একটি বিশাল অংশ এই অরণ্য থেকেই আসে। অথচ, কিছু লোভী ও অবিবেচক মানুষের কারণে এই ম্যানগ্রোভ অরণ্য ধ্বংসের মুখে। ফলস্বরূপ, সুন্দরবনের বিস্তৃতি দিন দিন কমছে। ইতিহাসে জানা যায়, কলকাতার একটি অংশ একসময় সুন্দরবনের অন্তর্ভুক্ত ছিল। নগরায়ন ও শহরীকরণের কারণে সুন্দরবনের এই বিস্তৃতি আজ ‘হেরিটেজ’ তকমা পাওয়ার মতো অবস্থায় এসে দাঁড়িয়েছে। মানুষের মনে এখন একটাই দুশ্চিন্তা—আগামী পৃথিবী তাদের বাসযোগ্য থাকবে তো?
ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে বর্ষাকালে বজ্রপাতে মৃত্যুর ঘটনা প্রায় নিয়মিত হয়ে দাঁড়িয়েছে। সম্প্রতি বিহারে ২৪ ঘণ্টায় ১৯ জনের মৃত্যু হয়েছে বজ্রপাতে, যার মধ্যে নালন্দা, বৈশালী, পাটনার মতো বহু এলাকা অন্তর্ভুক্ত। পর্যটন মরসুম হওয়া সত্ত্বেও হিমাচল প্রদেশ ও উত্তরাখণ্ডের বিস্তীর্ণ এলাকা বৃষ্টি ও ভূমিধসে বিপর্যস্ত। গত ২০ জুন থেকে ১৬ জুলাই পর্যন্ত হিমাচলে বর্ষাজনিত দুর্ঘটনায় অন্তত ১০৯ জনের মৃত্যু হয়েছে; এর মধ্যে ৬৪ জনের মৃত্যু সরাসরি বৃষ্টিপাতের কারণে এবং বাকি ৪৫ জন প্রাণ হারিয়েছেন বর্ষার কারণে পথ দুর্ঘটনায়। হিমাচলের অন্তত ২০০টি রাস্তা ভূমিধসের কারণে বন্ধ রয়েছে। ভূমিধস এবং আকস্মিক বন্যা—সবই মনুষ্যসৃষ্ট পরিবেশ দূষণের ফল।
আজকাল সারা পৃথিবীতে গভীর জঙ্গলের মধ্যে রিসর্ট তৈরির প্রবণতা বেড়েছে। এরপর গৃহস্থালির কাজে অগ্নিকাণ্ড থেকে শুরু হয় দাবানল। হেক্টরকে হেক্টর জমি পুড়ে ছাই হয়ে যায়, কত গাছ, কত প্রাণী, কত মানুষের জীবন ধ্বংস হয়, কিন্তু মানুষের এই স্বাধীনতার অপব্যবহার কমানো যাচ্ছে না। ভারতে হাতেগোনা কয়েকটি রাজ্যেই এখন শীতের দেখা মেলে। আবহাওয়া উত্তপ্ত হওয়ায় এবং বিশ্ব উষ্ণায়নের ফলে প্রতিদিনের তাপমাত্রার এই অসহ্য বৃদ্ধি আবালবৃদ্ধবণিতার দুঃখের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। চারপাশে এত দূষণময় পরিবেশ যে মানুষ প্রাণ ভরে নিঃশ্বাসটুকুও নিতে পারে না। শহরাঞ্চলে অপরিকল্পিত ও অনিয়মিত বহুতল নির্মাণও মানুষের জীবন দুর্বিষহ করে তোলার অন্যতম কারণ। সম্প্রতি আমেরিকার টেক্সাসে আকস্মিক বন্যায় একটি স্কুলের ৯০ জনেরও বেশি ছাত্রছাত্রী প্রাণ হারিয়েছে। তারা গ্রীষ্মকালীন ক্যাম্পে আনন্দে মেতেছিল, কিন্তু প্রকৃতির রূঢ় অভিশাপে তাদের জীবন অকালে ঝরে গেল। এর দায়ভার কার, তা কেউ বলতে পারছে না।
একটি প্রতিবেদনে প্রকাশিত হয়েছে যে, কাস্পিয়ান সাগরের পাশের দেশ আজারবাইজানের রাজধানী বাকুতে ২০২৪ সালে ‘ইউনাইটেড নেশনস ক্লাইমেট চেঞ্জ কনফারেন্স’ অনুষ্ঠিত হয়েছে। ১৯৯২ সালে জলবায়ু পরিবর্তন সংক্রান্ত কাঠামো কনভেনশনটি জাতিসংঘের মৌলিক চুক্তি ছিল। এরপর ১৯৯৭ সালের কিয়োটো প্রোটোকল এবং ২০১৫ সালের প্যারিস চুক্তির মাধ্যমে ১৫৭টি দেশ জলবায়ু পরিবর্তনের ওপর কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার চুক্তি স্বাক্ষর করে।
বায়ো-ফিজিক্যাল পরিবেশ বলতে সজীব উপাদানের চারপাশের সজীব ও নির্জীব উপাদান বা পপুলেশনের উপস্থিতি বোঝায়, যাদের টিকে থাকা, উন্নতি সাধন, বিবর্তন সবই পরস্পরের মিথস্ক্রিয়ার উপর নির্ভরশীল। প্যালিওলিথিক যুগে মানুষ পাথরের হাতিয়ার ব্যবহার করে শিকার করত। মেসোলিথিক যুগে চাষাবাদ শুরু হয়। নিওলিথিক যুগে মানুষ স্থায়ী বসতি স্থাপন করে এবং কৃষি ও পশুপালনের মাধ্যমে নিজেদের মানিয়ে নিতে শুরু করে। হোমো ইরেক্টাস থেকে হোমো সেপিয়েন্সে বিবর্তনের ইতিহাসে প্রায় ২০ হাজার বছর ধরে শিকার ধরার সময় জলবায়ুর সঙ্গে এক জটিল মিথস্ক্রিয়া ঘটেছিল। জলবায়ুর উপর ন্যূনতম প্রভাব পড়লেও, বিগত ১০ থেকে ১২ হাজার বছরে কৃষি এবং মানুষের জীবনযাত্রার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে আধিপত্যবাদের ফলে পরিবেশ ও জলবায়ুর উপর প্রতিকূল প্রভাব পড়েছে, যার কারণে বহু প্রজাতির বিলুপ্তি ঘটেছে। মানুষ তামা, ব্রোঞ্জ ও লোহার আবিষ্কার করেছে। আমরা ক্যালকোলিথিক যুগে প্রবেশ করেছি। আমরা নদী উপত্যকায় সভ্যতা স্থাপন শুরু করেছি। আগুনের আবিষ্কার এবং একই সাথে প্রকৃতির শোষণ চলতে থাকল। অবশেষে শিল্প বিপ্লব আসায় আমরা পরিবেশ ধ্বংসের মূল চাবিকাঠি খুঁজে পেলাম। একসময় আমরা প্রাকৃতিক সম্পদকে উপাসনা করে তাদের প্রয়োজনীয়তা বুঝতে পেরেছিলাম। কিন্তু উন্নতির সিঁড়িতে পা রাখতে গিয়ে আমরা সেই সম্পদগুলোকেই ধ্বংসের কাজে লাগালাম।
১৫ বছর বয়সী সুইডিশ স্কুল শিক্ষার্থী গ্রেটা থুনবার্গ সারা পৃথিবীর মানুষকে জলবায়ু দূষণের কারণ ও ফলাফল সম্পর্কে চিন্তা করতে বাধ্য করেছে। সেপ্টেম্বরের তৃতীয় শুক্রবার ‘ফ্রাইডেজ ফর ফিউচার’ স্লোগানে পৃথিবীর শিক্ষার্থীরা ‘ক্লাইমেট স্ট্রাইক’ পালন করে। গত শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানী স্টিফেন হকিং বলেছেন, পৃথিবীর আয়ু আর মাত্র ১০০ বছর। তবুও আমরা নিশ্চিন্তে শিক্ষার্থীদের বইয়ের পাতায় ইকোসিস্টেম, বায়ু, জল, মাটি, শব্দ, তেজস্ক্রিয়তা দূষণ পড়িয়েই ভাবছি যে আমাদের কাজ শেষ।
দূষণ রোধে রাজনৈতিক সদিচ্ছা দেখানো তো দূরের কথা, কাঠ ও কয়লার ধোঁয়া বন্ধ করতে যে ‘উজ্জ্বলা যোজনা’ সকলের ঘরে পৌঁছানো উচিত, তাও রাজনৈতিক বুলিতেই আটকে আছে। সৌরশক্তিকেও কাজে লাগানো হয়নি। যখন ৩২টি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত গাড়ি ছুটিয়ে নেতা গাড়ির ধোঁয়ায় কার্বন মনোক্সাইড বিষ ছড়িয়ে রাস্তায় যান, তখন সরকারি প্রকল্প থেকে নাম ও নম্বর বাদ পড়ার ভয়ে আমরা ব্যক্তিগত স্বার্থে চুপ থাকি।
ক্যালিফোর্নিয়ার দাবানল, ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ, এমনকি ইসরায়েল-ফিলিস্তিন দ্বন্দ্ব ও নতুন করে শুরু হওয়া সিরিয়ার যুদ্ধ পৃথিবীর পরিবেশকে কলুষিত করছে। গ্লোবাল টেম্পারেচার বৃদ্ধি পৃথিবীর হিমবাহগুলোকে জলে পরিণত করে সমুদ্রের উচ্চতা বাড়িয়ে তুলছে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, পৃথিবীর উপকূলবর্তী শহরগুলো জলের তলায় চলে যেতে আর বেশিদিন লাগবে না। লা নিনা বা এল নিনো পৃথিবীর বৃষ্টিপাতের পরিমাণ এবং স্থান পরিবর্তন করছে। এই কথাগুলো যাদের বলা উচিত ছিল, তারা আমাদের মধ্যে বিদ্বেষ তৈরি করছেন এবং তাদের শাসনব্যবস্থাটা জারি রাখছেন। আমাজনে বলসেনার সরকার যখন কৃত্রিম দাবানল সৃষ্টি করেন অথবা যখন COP চুক্তি না মেনে উন্নত দেশগুলো তাদের কার্বন নিঃসরণের তথ্য মিথ্যা বলে প্রদেয় জরিমানা বন্ধ করে, তখন থেকেই বোঝা যায় পৃথিবীর জলবায়ুর পরিবর্তন শাসকের চোখে মিথ্যা হলেও সাধারণের জীবন ও জীবিকা ভঙ্গুর হয়ে পড়বে এবং পড়ছে।
এখন মানুষ কি দূষণ প্রতিরোধ করতে পারবে?
ভারতসহ শিল্পোন্নত দেশগুলো যারা জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভর করে তাদের দৈনন্দিন কাজ পরিচালনা করে, সেক্ষেত্রে যদি জনপ্রতি কার্বন নির্গমনের মাত্রা কমাতে পারে, তাহলে কিছুটা প্রতিরোধ করা যায়। বিপুল জনসংখ্যা সত্ত্বেও ভারতের জনপ্রতি গড় কার্বন নির্গমনের হার এখনো কম—১.৯ মেট্রিক টন, যা উন্নত দেশগুলোর তুলনায় অনেকটাই কম। ‘ওয়ার্ক লোকাল, থিঙ্ক গ্লোবাল’ কথায় ভরসা রেখে আমরা প্রত্যেকে যদি পাশের মানুষটিকে বোঝাই যে পরিবেশ দূষিত হলে আমরা কেউই সুস্থ থাকতে পারব না, তাহলেই গাছ লাগানোর প্রয়োজনীয়তা থেকে তার অনুভূতিটা আমাদের সকলের কাছে পৌঁছবে। গাছ লাগানোর থেকে যে গাছগুলো আছে সেটা যাতে কেউ না কাটে, সেই দিকে নজর দেওয়া আশু প্রয়োজন। ‘একটি গাছ একটি প্রাণ, গাছ বাঁচাও প্রাণ বাঁচাও’—এই প্রতিজ্ঞা মানুষের মনের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে হবে।
—oooXXooo—
![]()






