আপন জন (পর্ব ছাব্বিশ)
কাকলি ঘোষ
একটু সময় নেয় অর্চনা। তারপর বলে। “ দ্যাখ আমার দুটো নারী কল্যান সমিতি আছে। সেখানে এই তোর মত মেয়েরা যাদের কেউ নেই বা ধর পরিবারের কেউ খবর রাখে না তারা হাতের কাজ শেখে। ব্যাগ তৈরি, পাপোশ তৈরি, আচার, বড়ি কাসুন্দি এসব বানানো। এসব জিনিস বাজারে বিক্রি হয়। সেই টাকা মেয়েদের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হয়।”
“ আমি পারব ?”
“ ওমা !” হেসে ওঠে অর্চনা। পারবি না কেন ? খুব পারবি। কাজ শিখে নিয়ে সব করতে পারবি। এখন তুই ভেবে দ্যাখ তুই কী করবি? আমার বাড়িতে রান্না করে, ঘর মুছে, বাসন মেজে কাটাবি নাকি কাজ শিখে নিয়ে নিজের পায়ে দাঁড়াবি। আজ তুই যদি কাজ শিখে নিস পরে তুই আরো কত জনকে শেখাতে পারবি। তাতে নিজের যেমন রোজগার হবে তেমনি আবার কাজ করার বা শেখানোর আনন্দ ও থাকবে। ”
হাঁ করে অর্চনার মুখের দিকে তাকিয়ে কথাগুলো শুনছিল রিন্টি । ক্লাস ফোর পর্যন্ত ইস্কুলে পড়েছে। তারপর মা মরে গেল। ওরও সব ঘুচে গেল। বৌদির কথা গুলো যেন সেই ইস্কুলের দিদিমণির কথার মত। ও শিখে কাউকে শেখাবে? ধুৎ। ও পারবে ? সে যাই হোক বৌদি কথাটা কিন্তু খুব দামী বলেছে। সত্যিই তো এই সব রান্না ঘরের কাজ না করে ওই রকম কাজ শিখলে ভবিষ্যতে ও অন্য কিছু করতে পারবে। এভাবে তো কেউ কখনও বলেও নি। কিন্তু সুখেন দা বা শিখা বৌদিকে তো বলে আসা হয় নি। ওরা যদি –
“ কোথায় থাকতে হবে ? এখানে থেকে শেখা যাবে না । তাই না ?”
“ না রে।”
“ তাহলে ?”
“ অন্য মেয়েরা যেখানে থাকে তোকেও সেখান যেতে হবে।”
“ সেটা কোথায় ? এখন থেকে অনেক দূর?”
“ হ্যাঁ। একটু দুর। তাতে কী? তোর তো কেউ নেই যে তোকে দেখতে যাবে। খবর নেবে।”
কথাগুলো কেমন যেন বুকের মধ্যে ঘা মারে রিন্টির। সত্যি কথা। কিন্তু খুব কষ্ট হয় শুনলে। আর সত্যিই ওর কেউ নেই নাকি? কেন ? পিসিমা আছে তো। সুখেনদা শিখা বৌদি ওরা কি আর কখনও খোঁজ নেবে না ওর? নাই নিক। ও নেবে খোঁজ। যাবে কখনও ওদের বাড়ি। গেলে কি ওরা অখুশি হবে? হ্যাঁ। দেশে এখন যেতে পারবে না। কিন্তু কখনোই কি পারবে না ?
“ তুই ভাব আগে।” সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়ায় অর্চনা। “ এক্ষুনি বলতে হবে না। তাড়া কিছু নেই। যাক না দু একটা দিন। কদিন থাক। খাওয়া দাওয়া কর ভালো করে। শরীরের যত্ন কর। চুলে কতদিন শ্যাম্পু করিস নি? গন্ধ বেরোচ্ছে তো। হাত পায়ের কী অবস্থা ! ভালো করে ঘষে ঘষে স্নান করবি। এই নে”
হাত বাড়িয়ে কয়েকটা শিশি আর কৌটো এগিয়ে দেয় অর্চনা। “ কী হল ধর –”
“ এগুলো কী বৌদি ?’হাত বাড়িয়ে নিতে নিতে প্রশ্ন করে রিন্টি।
“ ওই সবুজ শিশি টা শ্যাম্পু। কাল সকালে মাথায় ভালো করে মেখে স্নান করবি। ওই গোলাপীটা বডি লোশন। স্নান করে উঠে গোটা গায়ে ঘষে ঘষে মাখবি। ইস ! গায়ে খড়ি ফুটছে ! আর এই কৌটোটা হল মুখের ক্রিম। দু বেলা মাখবি। কিপটামি করে জমিয়ে রাখবি না। শেষ হয়ে গেলে আবার দেব।”
ঘাড় নাড়ে রিন্টি।
“ ঘরে সাবান দিয়েছে ?”
“ হ্যাঁ। দেওয়াই ছিল।”
“ হুম।” একটু কী যেন ভাবে অর্চনা। তারপর ঘরে চলে যায়। বেরিয়েও আসে তক্ষুনি। হাতে একটা সাবানের বাক্স।
“ এটা নে। এটা মাখবি।”
“ সাবান আছে তো বৌদি ঘরে। আবার দিচ্ছ কেন ?”
“ ওটা মাখিস না। এটা মাখবি।”
হাত পেতে নেয় রিন্টি সাবানের বাক্স টা। গন্ধে যেন ম ম করে ওঠে চারদিক।কী বাস ! এমন জিনিস এরা কাজের লোকেদের দেয়? এরা কি ভগবান ? অবাক হতে হতে ও কি মরে যাবে নাকি রে বাবা !
“ যা। এগুলো তোর ঘরে রেখে নিচে যা।টিভি দ্যাখ। এখন কদিন ভাব। কী করবি ? পরে জানাস।”
ঘরে চলে যায় অর্চনা। তাকিয়ে দেখে রিন্টি পাশের লোক টাও কখনো গেছে। কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থেকে জিনিস গুলো কোঁচড়ে নিয়ে নিচে নামতে থাকে ও।
ক্রমশ :
![]()







