পথ ভোলা এক পথিক
নিলয় বরণ সোম
ছোটবেলায় স্কুলে ভৌত বিজ্ঞানের পাঠ্য বইতে শেখা গিয়েছিল -রাশি দুই প্রকার – ভেক্টর রাশি ও স্কেলার রাশি। স্কেলার রাশির শুধু মান বর্তমান, ভেক্টর রাশির মান ও দিক দুইই থাকে।
চলমানে, আমি একেবারে স্কেলার রাশি , অর্থাৎ দিককানা। কোনও দিনই , জায়গার অবস্থান আমার মনে থাকে না।
একটা উদাহরণ দেই। আমার স্বল্পকালীন প্রবাসে , সপ্তাহান্তে এ পাড়া ও পাড়া আর শপিং মল , এই থাকত মোটামুটি গন্তব্য। আমাদের যাত্রাস্থল মোটামুটি বলা যায় , কোয়ার্টার কম্পাউন্ড থেকে ভিলেজ বলে আরেকটি কোয়ার্টার কম্পাউন্ড , যেখানে অনেক ভারতীয়র বাস, আর হরেক রকম শপিং মল , গেম সিটি , পিক এন্ড পে , ট্রান্স আফ্রিকা এইসব বাহারি নামের । উদাহরনের স্বার্থে আমি পিক এন্ড পে কে পিক করে নিলাম।
কোনও শুভ সপ্তাহান্তে যদি ঠিক হত, ভিলেজ যাওয়া হবে , কোনও চাপ থাকত না। আমার ড্রাইভিং এর কেরামতি, সেটুকু যাওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল, আর বার বার যাওয়ার ফলে , কোয়ার্টার থেকে ভিলেজ আমার চোখস্থ। তেমনি, কোয়ার্টার থেকে পিক এন্ড পে , তুড়ি মেরে পৌঁছে যেতাম।
মুশকিল হত , ভিলেজ হয়ে পিক এন্ড পে যাওয়ার পরিকল্পনা হলে।
পাশে রাস্তা বলে দেওয়ার সঙ্গী না থাকলে , আমাকে কোয়ার্টার থেকে ভিলেজ গিয়ে, ভিলেজ থেকে কোয়ার্টার ফিরে, আবার গাড়ি হাঁকিয়ে যেতে হত পিক এন্ড পে তে -কী ঝামেলা বলুন তো !
আমার সঙ্গে এ ব্যাপারে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারত বোধহয় এলিজা। এলিজা ভুটিয়া, পাহাড়ের মেয়ে। চাকরি জীবনের শুরুতে কলকাতায় আমাদের আয়কর দপ্তরের কলকাতায় তদন্ত বিভাগে কর্মরত। ডিউটি আওয়ার বলে নির্দিষ্ট কিছু থাকত না , করে তল্লাসী থাকলে , কাজ শেষ হতে হতে রাত হয়ে যেত। তল্লাসী দলের সকলকেই রুট ধরে বাড়ি পৌঁছে দেওয়ার বন্দোবস্ত থাকত , আর গাড়ি গুলি বেশিরভাগ থাকত বাইরে থেকে ভাড়া করে আনা গাড়ি। সুতরাং, সিনিয়র অফিসাররা সবসময় নিশ্চিত করতেন , রাতে বেরাতে একজন অন্ততঃ পুরুষ সহকর্মীকে এলিজার এস্কর্ট হিসাবে সঙ্গে দেওয়ার।
তাতে কোন ঝামেলা ছিল না ,ঝামেলা অন্যত্র। এলিজা ওর পাহাড়ের পাকদন্ডী গুলো মনে রাখতে পারত কিনা জানি না, কিন্তু গভীর রাত্রে কিছুতেই নিজের ডেরা চিনতে পারত না। ড্রাইভার এদিকে ঘুরেই চলেছে , হয়ত একটু বিরক্তও হত। সহকর্মীর প্রশ্নের জবাবে এলিজা শুধু বলত , ‘পতা নেহি , সুবে তো এহি থা !’
নিজের কিস্সায় ফিরি। সকালে একটু এ টি এমে যাওয়ার প্রয়োজন পড়েছিল। চেন্নাইতে এই কোয়ার্টার কম্পাউন্ডে আমি আগেও থেকেছি-আমার ঝাপসা মনে আছে , পেছনের গেট দিয়ে কিছু দূর গেলে , এক পিস্ এ টি এম ছিল।
সুতরাং, পেছনের গেটে গিয়ে দ্বাররক্ষীকে জিজ্ঞাসা করলাম , এ টি এম ইরকে?
একজন’নার্থ ইন্ডিয়ানের ‘ মুখে তামিল ভাষায় প্রশ্ন শুনে দ্বাররক্ষী দ্বিগুন উৎসাহে দ্রুত লয়ে কী বলে গেল বুঝলাম না , শুধু একবার লেফট , একবার রাইট , কানে গেল।
সেই মত হিসাবে এগোতে থাকলাম – একটা দুটো চেনা নাম চোখে পড়ল , পন্নী কলোনি , আইজ্যাক স্কুল , এই সব। কিন্তু , স্পষ্ট মনে আছে , কোয়ার্টারের পেছনের দিকে গেলে একটা বাজার মত ছিল , বিজয়লক্ষী স্টোর্স বলে একটা মুদির দোকান ছিল, একটা সেলুন ছিল, যার মালিক ফিলিপ কোটলারের মার্কেটিং ম্যানেজমেন্টের বই না পড়েও, মার্কেট সেগমেন্টেশন মাথায় রেখে, দোকানের এক দিক এ সি , একদিক নন এ সি, একদিকে গদি মোড়া চেয়ার, একদিকে কেঠো চেয়ার , এসব বন্দোবস্ত রেখেছিল , সে সব কোথায় গেল !
টাকা তোলার তাড়া ছিল , সুতরাং সে চিন্তা মুলতুবি রেখে , একটু পরেই এ টি এম পেয়ে গেলাম।
যন্ত্র থেকে টাকা পকেটস্থ করে আবার হাঁটা লাগলাম।
কিছুদূর গিয়েই বুঝতে পারলাম , ভুলরাস্তায় এসে গিয়েছি। এদিকে , কুসুমে কুসুমে না হলেও , যে পিচ ঢালা রাস্তায় একটু আগেই চরণচিহ্ন রেখে গেছি , মগজের খুপরি থেকে সেটিও হাওয়া।
আজকের দিনটিতে , অন্যদিনের মত ‘মর্নিং ওয়াকের ‘ দ্রুত পদচালনা না করলেও , আমি তখন ঘামতে শুরু করে গেছি। আজ অফিসে অন্যদিনের থেকে আগে পৌঁছনোর কথা , এদিকে কানাওয়ালা ভর করা লোকের মত হাঁটতে থাকলে বাসস্থানে পৌঁছব কখন ?
ঠিক তখুনি একটা ছোট সাইনবোর্ড নজরে পড়ল , ‘লিটল হাট ‘I
তৃষ্ণর্ত পথিক যেমন জলসত্র দেখে উল্লসিত হয় , পাঁড় মাতাল খুশি হয় পানশালা দেখে , বেপুথো যুবক পুলকিত হয় প্রশ্রয়দাত্রী পাড়াতুতো বৌদি সন্দর্শনে , লিটল হাট দেখে আমি ঠিক তেমনি আনন্দের শিখরে উঠলাম।
লিটল হাট , পূর্ব পরিচিত , এক রেস্টুরেন্টের নাম। আমার চেন্নাই 1.0 তে বাসের সময় , স্মৃতিজড়িত একটি খাদ্যশালা। রেস্টুরেন্ট তখনও খোলে নি , কিন্তু তার পাশের চায়ের দোকানের দোকানি নিবিষ্ট মনে চা করছে।
বউনি কথাটার তামিল প্রতিশব্দ জানি না , কিন্তু লোকটিকে শুধু পথনির্দেশ জিজ্ঞাসা করতে কেমন বাধো বাধো লাগল। তাই , ওর থেকে এক চাপ চা খেয়ে , তামিল ভাষার ঝুঁকি না নিয়ে , ককনিজ ইংরেজিতে জিজ্ঞাসা করলাম , অমুক কম্পাউন্ড কোথায় ?
আবার সেই লেফট এন্ড রাইট !
এবার কিন্তু পূর্ববাসের চেনা পথেই ফিরে এলাম – মুদির দোকানে জ্বলজ্বল করছে দেখলাম – জয়লক্ষ্মী স্টোর্স। বুঝতে পারলাম , আমার স্মৃতিতে যা ছিল বিজয়লক্ষ্মী, আদতে তার নাম ছিল জয়লক্ষ্মী। তবে বি, বিযুক্ত হলেও , দোকানির লক্ষ্মীলাভের হের ফের হয় না, দোকানের জেল্লাবৃদ্ধিতে সেটাই মালুম হলো।
তারপর , শ্রান্ত দেহে ,ঠিক অর্থে প্রাতঃ ভ্রমণ না করেই , শরীরে আরো কিছু মধুর অনুপ্রবেশ ঘটিয়ে , বাসস্থানে পৌঁছে গেলাম।
শেষ করার আগে , লেখার গোড়ার দিকের একটা তথ্য গত ভুল সংশোধন করে নেই।
এলিজা ছাড়াও , আমার আরেকজন পরিচিত আছেন, ঘোষাল দা , যিনি পথভ্রষ্ট হওয়ায় আমার থেকেও দড়।
স্বভাবকবি ঘোষালদাও একটা সময় কোয়ার্টারের বাসিন্দা ছিলেন ।
একদিন , ফ্ল্যাটের দরজা খোলা পেয়ে , সটান ঢুকে , বাজারের ব্যাগটা মেঝেতে রেখেই হুকুম করলেন একটু চা দাও না এবার !
মিসেস ঘোষাল সবসময় টিপ্ টপ থাকেন , কিন্তু সেদিন ওর ডাক শুনে , নাইটির সাইডে হলুদ রঙের ছোপ মারা কে আবির্ভুত হলেন !
শক্তি চাটুজ্যে কণ্ঠস্থ যার , সেই ঘোষালদা জানেন মধ্যরাতে ফুটপাথ বদল হয় , কিন্তু সাত সকালে বৌ বদলে যায় কী করে ?
পরক্ষনেই বুঝতে পারলেন , সবগুলো কোয়ার্টারের গড়ন এক, উনি ভুল দরজায় ঢুকে পড়েছেন !
খোঁপাটা উঁচু করে বাঁধা হলেও হলুদছাপ এতটাই বিস্মিতা হয়ে ছিলেন যে তিনি কপালকুণ্ডলা স্টাইলে জিজ্ঞাসাও করলেন না , পথিক , তুমি কি পথ হারাইয়াছ?
ঘোষালদাই ভুল বুঝতে পেরে , নতুন জামাইয়ের মত লজ্জা লজ্জা গলায় অনেক সরি টরি বলে , বলতে গেলে, পালালেন।
পালিয়ে , পৌঁছেও গেলেন, নিজের সুখী গৃহকোণে ।
আসলে, , দিক অভ্রান্ত আর দিককানা , যাই হোক না কেন , হারিয়ে যেতে না চাইলে, কেউ হারিয়ে যায় না। উদ্দীষ্ট ঠিকানায় সকলেই পৌঁছে যায় –সে ঠিকানা , আসলে ঠিক কিনা , সেটি আরেকটি মৌলিক , অন্য প্রসঙ্গের প্রশ্ন।
মানবজীবনে, এক অন্তিম ঠিকানা ছাড়া নিশ্চিত কিছুই হয়ত বলা যায় না।
কিন্তু , সেই ঠিকানায় পৌঁছতে পৌঁছতে , সকল চেতনাই যে অবলুপ্ত হয়ে যায়। জীবনের এই পরম সত্য, সুন্দর কিনা , সেটা বোঝার অবকাশ কোথায় ?
—oooXXooo—
![]()







