আপন জন (পর্ব পঞ্চবিংশ)
কাকলি ঘোষ
“ ওই বুড়ো বাবু কোথায় গো ? আর গিন্নি মা ?”
“ ওনারা এক তলায় থাকেন সিঁড়ি ওঠা নামা করতে অসুবিধে তো। তাই। ”
কড়াইতে হিসেব মত মাপ জল দিতে দিতে উত্তর দেয় কল্পনা।
“ এরা খুব বড় লোক ! তাই না কল্পনা দি ?”
হাসি মুখে ওর দিকে ফিরে তাকায় কল্পনা। সত্যিই পাগলী মেয়েটা। মুখে বলে, “ বড় লোক তো বটেই। ওই বুড়ো বাবু হাইকোর্টের জজ ছিল। জজ বোঝো ? যারা খুন করলে ফাঁসি দেয় গো। তেমন।”
বাপ রে ! কেঁপে ওঠে রিন্টি।
“ অনেক টাকা। আর দাদাও খুব বড় চাকরি করে। বৌদিরও তো কত কী আছে।”
“ কী?”
“ ওই কী সব বলে না নারী কল্যাণ সমিতি। তার পর ধর যে সব মেয়েদের কেউ নেই তাদের থাকার ব্যবস্থা করা , কাজের ব্যবস্থা করে দেওয়া। আরও কত কী !”
চোখ বড় বড় হয়ে যায় রিন্টির। সত্যি বৌদি মানুষ নয়। ভগবান। নইলে এসব দু:খী মেয়েদের কথা কেউ ভাবে ? কী দরকার ওনার ? তবু তো করছে। আনন্দে, ভালোবাসায় বুক ফুলে ফুলে ওঠে ওর।
“ চল। বাইরে যাই। টিভি দেখবে? সিরিয়াল?”
অবাক চোখে তাকায় রিন্টি। এ বাড়িতে কাজের লোকেরাও টিভি দেখে ? দেখতে দেয় এরা ? আশ্চর্য ! ও কী অবাক হতে হতে মরে যাবে নাকি এবার?
“ আমি কোনদিন টিভি দেখি নি। দাদাদের ঘরে ছিল। আমাকে ঢুকতে দিত না। ওই চা দিতে গিয়ে হয়ত তাকিয়েছি কোনদিন। ওকে দেখা বলে না। কোথায় দেখবে টিভি ?”
“ কেন নিচের হল ঘরে। ওটা তো আমাদের জন্যই রাখা। এই সন্ধ্যে বেলা কাজকর্ম সের আমরা সবাই মিলে বসে টিভি দেখি। তারপর নটা বাজলে যে যার মত কাজে চলে যাই। চল দেখবে।”
ওকে নিয়ে নিচে সিঁড়ির দিকে যেতে যায় কল্পনা। কিন্তু তার আগেই ডাক ভেসে আসে ওপর থেকে।
“ কোথায় যাচ্ছিস ওকে নিয়ে ?” অর্চনা ডাক দিয়েছে।
“ নিচে যাচ্ছি বৌদি। টিভি দেখব। সব কাজ হয়ে গেছে।” সপ্রতিভ উত্তর কল্পনার।
“ তুই যা। ও একটু পরে যাবে। কথা আছে।”
একটু থমকে যায় কল্পনা। তারপর বলে, “ আচ্ছা। তুমি তাহলে একটু পরে এসো।” সিঁড়ি দিয়ে নেমে যায় ও।
“ এদিকে আয়।” হাঁক দেয় অর্চনা।
পায়ে পায়ে আবার সেই ঘরে এসে দাঁড়ায় রিন্টি। আর চমকে যায়। ঘরে এখন আর বৌদি একা নয়। আরো একজন আছে। ইনি বুঝি দাদা ? কী সুন্দর দেখতে ! ফর্সা লম্বা। চোখে সোনালী চশমা। হাতে গ্লাস। তার মধ্যে কী একটা শরবত। কী মিষ্টি মিষ্টি গন্ধ গোটা ঘর জুড়ে। কেমন যেন ঝিম ঝিম করে শরীরটা।
“ আয়। বোস।”
মাথা নিচু করে মেঝেতে পাতা নরম চাদরের মত যেটা ওটাতেই বসে রিন্টি। না তাকিয়েও বুঝতে পারে ও। যে চশমার আড়াল থেকে দুটো হাসি মাখা চোখ ছুঁয়ে যাচ্ছে ওকে। বৌদি ডাকল কেন ? দাদাকে দেখাবে বলে? ইস ! কী লজ্জা ! ওকে আবার দেখাবার কী আছে ? ভারি তো কাজের লোক কাজ করতে এসেছে তাকে বাড়ির মালিককে ডেকে দেখানোর এত কী দরকার ? বৌদি যেন কী !
“ ওর নাম রিন্টি। ভারি ভালো মেয়ে। কাজ খুঁজতে গ্রাম থেকে শহরে এসেছে। বাপ মা নেই। জ্যাঠতুতো দাদা বৌদিরা অত্যাচার করত। তাই পালিয়ে এসেছে।”
অর্চনা বৌদি পরিচয় দিচ্ছে।
“ আমাদের এখানে রাখবে ?”
“ আর উপায় কী? দেখি যদি হাতের কাজ টাজ শিখিয়ে পরে কোথাও যদি ভর্তি করে দিতে পারি –”
“ হ্যাঁ। সেটাই ভাল। কারণ আমাদের এখানে আর তো কাজের লোকের দরকার নেই।তাই না ?” গ্লাসে চুমুক দিতে দিতে গমগমে গলায় উত্তর ভেসে আসে।
ভয়ে কেঁপে ওঠে রিন্টি। মানে ? ওকে এখানে রাখবে না বৌদি ? কাজের লোকের দরকার নেই ওদের? তাহলে নিয়ে এল কেন?
চমকে চোখ তোলে ও। হাসি মুখে ওর দিকে তাকিয়ে আছে বৌদি।
“ কী রে ভয় পেয়ে গেলি ? আরে বাবা ভয় পাবার কিছু নেই। দাদা তোকে এক্ষুনি তাড়িয়ে দিতে বলছে না। শোন। একটা কথা বলি। এখানে বাড়ির রাঁধুনির বা কাজের লোকের মত থেকে কী লাভ? তার চেয়ে নিজে যদি কিছু কাজ শিখে নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারিস সেটা ভালো না ?”
“ কী কাজ ?” অস্ফুটে প্রশ্ন করে ও।
ক্রমশ :
![]()







