অভাগিনীর চিঠি
নবু
নির্মলা তখন সদ্য কৈশোরের গা ছুঁয়ে উঠেছে, যেন মেঘলা ভোরে প্রথম কুয়াশার পরশ। স্কুলে ক্লাস সেভেনে পড়ে, কিন্তু মনটা যেন কোথায় উড়ে বেড়ায়—তেতুল গাছের মাথায়, মাঠের পাখির ডানায়, কিংবা ওই ছেলেটার পিছু পিছু… হ্যাঁ, হরেনের কথা বলছি।
হরেন ছিল গাঁয়ের এক ‘চটি-ফেরিওয়ালা’। দিনভর গ্রামময় ঘুরে বেড়াত হাতে তার বাবার তৈরি চটির বোঝা, আর মুখে গান—“তোমায় হৃদ মাঝারে রাখব”—সে ঠিক জানত না কাকে বলছে, কিন্তু নির্মলা জানত। হরেনের গান শুনে মাঠে গরুরাও একবার দাঁড়িয়ে চেয়ে থাকত, আর নির্মলার বুকের ভেতরটা করত কেমন কেমন।
এই হরেনের চটি বিক্রি করার ধরনটাই ছিল আলাদা—গ্রামে গিয়ে লোকজনকে বলত, “চটি কিনলে প্রেম ফ্রি!” একবার তো নির্মলার মায়ের সামনেই বলে ফেলেছিল, “এই চটি যদি পায়ে পরেন, চোখে চমক লাগবেই।” মা একটু ঘাড় কাত করে বলেছিলেন, “চোখে না, মাথায় বাজে!” হরেন হেসে বলেছিল, “মাথায়ও পরানো যায়, যদি কেউ প্রেমে পড়ে গিয়ে ঘোরে হাঁটে।”
নির্মলা তখন সবে বুঝতে শিখেছে, প্রেম মানে শুধু কবিতা নয়, তার গন্ধও আছে। হরেন যখন তার পাশে দিয়ে হেঁটে যেত, তার গায়ের ঘামের সঙ্গে মাটি, পাটকাঠি আর একধরনের গরম বিকেলের গন্ধ মিশে যেত—সে গন্ধ ছিল প্রেমেরও, দারিদ্র্যেরও।
এক বিকেলে মাঠের ধারে বসে গরু চরাচ্ছিল নির্মলা, হঠাৎ হরেন এসে বলল, “তোর জন্য একটা নতুন চটি এনেছি—সাইজ দেখিয়ে দে।” নির্মলা লজ্জায় মুখ নামিয়ে বলেছিল, “আমার পা তো বড় নয়…” হরেন মুচকি হেসে বলেছিল, “পায়ের মাপ না, মনটার মাপ বোঝার চেষ্টা করছি।”
সেদিন বিকেলে যে রোদটা ধানক্ষেতের উপর দিয়ে গড়িয়ে পড়ছিল, সেটা আর আগের মতো ছিল না। সে রোদ ছিল নির্মলার কপালে, হরেনের হাসিতে, আর দুটো কিশোর বুকের ভেতরকার নরম আলোয়।
এ প্রেমে কোনো মিষ্টি দোকান ছিল না, ছিল শুধু জলপাই গাছের তলায় বসে লুকিয়ে লুকিয়ে হাসাহাসি, আর সেই চটি—যেটা পায়ে না, মনে গেঁথে গিয়েছিল।
তখন তো মোবাইল ছিল না, চিঠিও লেখা হত না। শুধু একবার মেলা থেকে হরেন একটা কাঠের বাঁশি এনে দিয়েছিল নির্মলাকে। বলেছিল, “তুই বাজা, গরুগুলা যদি না এসে দাঁড়ায়, আমি চটি বিক্রি করা ছেড়েদেব।”
সে বাঁশি নির্মলা আজও রেখেছে, একটা ছোট কাপড়ের থলেয়। মাঝে মাঝে ওটা বের করে গন্ধ শোঁকে—কাঠের না, না, ওটা আসলে হরেনেরই গন্ধ।
এই ছিল নির্মলা আর হরেনের গল্প। না, এ প্রেমে চুম্বন নেই, মিথ্যে প্রতিশ্রুতি নেই। আছে শুধু সেই সরল সময়টার নিঃশব্দ কোমলতা—যেখানে একজোড়া চটি দিয়েই ভালোবাসা শুরু হত, আর একটা বাঁশি দিয়েই তার ছোঁয়া আজও বাজে।
আর নির্মলা? সে আজ আর গরু চরায় না, কিন্তু মনটা রয়ে গেছে ঠিক সেই বয়সেই—যেখানে প্রতিটা বিকেল মানেই হরেনের চটি, হরেনের গান, আর মন কেমন করা এক প্রেমের গন্ধ।
প্রথম কথা হয়েছিল সরস্বতী পুজোর দিন। গাঁয়ের মাঠে মেলা বসেছিল, তার মাঝখানে বাঁশের মঞ্চে হয়েছিল নাটক—“অভাগিনী বধূ”। গরিব কৃষকের কষ্টের কাহিনি। হরেন হয়েছিল সেই কৃষক, আর নির্মলা তার মলি। চরিত্র দুটো ঠিক যেন তাদের ভবিষ্যতের ছায়া, অথচ সেদিন সেটা কেউ বুঝতে পারেনি। নাটক শেষে যখন পর্দা নামল, তখনও তাদের চোখে যে আলোটা ছিল, তা কিন্তু মঞ্চের ঝিলিক নয়—তা ছিল ভয় আর ভালোবাসার এক অভ্যন্তরীণ চমক।
তারপর থেকে তাদের দেখা হওয়া শুরু। নিয়ম করে। ঠিক যেন স্কুলের পড়ার মতো সময় বাঁধা—দুপুরের পর, মাঠের কাজ সেরে, কেউ গাছের ছায়ায়, কেউ নদীর পাড়ে।
মুড়ি খাওয়ার একটা অদ্ভুত নিয়ম ছিল—কাঁসার থালার ভেতরে মুড়ি আর দুটো কাঁচা লঙ্কা। নির্মলা লঙ্কা খেতে পারত না, কিন্তু হরেন বলত, “ভালোবাসলে ঝাল খেতে হয়, না হলে ঠিক মানায় না।” নির্মলা মুখ বেঙ্কিয়ে বলত, “তুই থাক ঝাল নিয়ে, আমি বরং প্রেম করব সন্দেশ দিয়ে।”
ধানক্ষেতের ধারে বসে হরেন কবিতা বলত। সেগুলোর অর্ধেক ছিল তার নিজের বানানো—কখনও অগোছালো, কখনও এমনই শব্দে গাঁথা যে শুনলে মনে হত সোনার গয়নার মতো ঝনঝন করে। একবার সে বলেছিল—“তুই আমার কবিতার পাতার মতো—ভাঁজ খুললে তোর গন্ধ বেরোয়।” নির্মলা প্রথমে লজ্জা পেয়ে গাল ফুলিয়ে বসেছিল, তারপর একটু পরেই বলে উঠেছিল, “আর তুই, হরেন, ভুলে হরফে লেখা একটা ছড়া!”
সবচেয়ে প্রিয় জায়গা ছিল নদীর পাড়। সন্ধ্যা নামলে নদীর ধারে বসে থাকত—একেবারে নীরবে। কথার প্রয়োজন হতো না। পাখি ডেকে যেত, জল গড়িয়ে যেত, আর তারা একে অপরের দিকে না তাকিয়ে, তবু অনুভব করত—একজন ঠিক পাশেই আছে।
এ ছিল তাদের প্রেম। না, শহরের চকচকে রেস্টুরেন্ট ছিল না, ছিল না ইনস্টাগ্রামে ফিল্টার দিয়ে তোলা ছবি। ছিল শুধু কাঁসার থালার মুড়ি, ধানক্ষেতের বাতাস, আর নদীর পাড়ে সন্ধ্যার ছায়া।
তাদের ভালোবাসা ছিল একরকমের কাঁচা শালপাতার মতো—টুকটাক দাগ থাকলেও প্রকৃতির মতো খাঁটি, সহজ, আর অপূর্ব তার গন্ধ।
তখনকার সমাজে প্রেম মানেই ছিল চোখ রাঙানো পাপ, আর যদি সেই প্রেম নিম্নবর্ণের কারো সাথে হয়, তবে তো মহাপাপের উপর মহা-কলঙ্ক। নির্মলার বাবা ছিলেন ধনী চাষি, বংশে ব্রাহ্মণ, আর মনে মনে নিজেকে প্রায় ঈশ্বরের আত্মীয় ভাবতেন। মেয়ের চোখের ভাষা আর সন্ধ্যায় বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকা দেখে তিনি বুঝে গিয়েছিলেন—এই বৃষ্টি-ভেজা প্রেমটা ঠিক মাঠের ফসল নয়, এর শেকড় অনেক গভীরে, আর গন্তব্য একেবারে মুচিপাড়ার ঘর।
অমন সময়ে তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন—নির্মলার বিয়ে দেবেন। কোলকাতার এক ডাক্তার পাত্র ঠিক হল। পাত্রপক্ষ বলল, “মেয়ে যদি কালো হয়, সমস্যা নেই, তবে উচ্চতা যেন পাঁচ ফুটের ওপরে হয়।” নির্মলার মা পাত্রের ছবি দেখিয়ে বললেন, “চশমা পরলেও কিরকম ভদ্র লাগে না বলো?”
নির্মলা তখন যেন শীতের সকালে লেপের নিচে চাপা পড়ে যাওয়া একটা কুয়াশার মেয়ে। কথা বলে না, খায় না ঠিকমতো। শেষ পর্যন্ত সাহস করে এক সন্ধ্যায় হরেনকে চিঠি লেখে—পঁচিশটা লাইনের মধ্যে সাতবার “ক্ষমা করিস” আর তিনবার “ভুলে যা” ছিল।
চিঠি সে গুঁজে দিয়েছিল হরেনের বাঁশির থলেটায়, যার গায়ের সুতো সে আগে নিজেই সেলাই করে দিয়েছিল। কিন্তু হায়! চিঠি পৌঁছোয়নি।
সেই দিন হরেন গিয়েছিল বাজারে চটি বিক্রি করতে, আর ফেরার পথে বাঁশির থলেটা ফেলে আসে নদীর ঘাটে। কপালমন্দে, সেটা তুলে নেয় এক ছোকরা ছেলে, যে চিঠির লেখা না বুঝে সেটাকে দিয়ে সিগারেট ধরায়!
হরেন অপেক্ষা করে গিয়েছিল সেই চিঠির। প্রতিদিন ভোরে নদীর পাড়ে এসে বসত, ভেবেই নিত—নির্মলা আজ আসবে, হয়তো বলবে, “আমি পালিয়ে এসেছি তোদের জন্য।”
কিন্তু নির্মলা তখন বিয়ের গয়নার মাঝে হারিয়ে যাচ্ছিল, আর ঘরভর্তি লোকজনের ভেতর সে হঠাৎ একফাঁকে চোখ বন্ধ করে ভাবত—“হরেন এখন কোথায়?”
এই না পাওয়ার হাওয়ায় একটা শব্দ বারবার বাজত—চিঠিটা যদি পৌঁছত!
আসলে নির্মলার দিদা সেই চিঠি পুড়িয়ে দিয়েছিলেন। “তোর বাবার মানসম্মান আছে,” বলেছিলেন তিনি। নির্মলা কাঁদছিল, কিন্তু সেই কান্না গ্রামের শিউলি গাছ ছাড়া কেউ শুনল না।
বিয়ের দিন হরেন চলে গিয়েছিল নদীর পাড়ে। গলায় গান, চোখে জল। সে নদীতে ঝাঁপ দিল কিনা—তা কেউ জানে না। শুধু পদ্মা আজও গোপনে বলে—“হরেন আজও ফিরল না।”
তারপর বহুদিন কেটে গেছে, বর্তমানে নির্মলা একা। জয়ন্ত গত হয়েছেন বছর দশেক আগে। সন্তানরা বিদেশে। নির্মলার কাছে সবচেয়ে বড় স্মৃতি সেই গোপন প্রেম।
সন্ধ্যাবেলা পদ্মার পাড়ে বসে সে হঠাৎ একটা চিঠি খুঁজে পায়, পুরনো ডালার ভেতরে। সেই প্রথম চিঠি, যা সে হরেনকে পাঠিয়েছিল—কিন্তু পৌঁছায়নি। হাত কাঁপছে, চোখে জল।
নির্মলার একমাত্র মেয়ে ‘হরিণী’। এই নাম রেখেছিল সে নিজের ইচ্ছায়। যদিও জয়ন্ত প্রতিবাদ করেছিল। “একটা নাম, যার ভেতর লুকিয়ে আছে আমার হারানো প্রেম,”—বলে হেসেছিল সে।
আজ হরিণীও প্রেমে পড়েছে। সে চায় বিয়ে করতে এক মুসলিম ছেলেকে—নাসিম। সমাজ, আত্মীয় সবাই বলেছে না।
নির্মলা এবার চুপ করে বসে থাকে না। সে সামনে দাঁড়িয়ে বলেছে, “প্রেম যদি পাপ হয়, তবে আমি আজও পাপিনী। তুই কর, হরিণী, ভালোবাসাকে ভয় পাস না।”
এবার সমাজ স্তব্ধ। গ্রামের পুরোহিত চোখে চোখ রাখতে পারেননি। নির্মলার মুখে সাহসের রেখা ছিল, যার উপর সময়ও দাঁড়াতে পারেনি।
হরিণীর বিয়ে হয়। কোলকাতা ফিরে যাবার আগে নির্মলা তার পুরনো খাতায় একটি চিঠি লেখে—
“হরেন, তুই থাকিস পদ্মার পাড়ে, আমি থাকি স্মৃতির ভিতরে। তোর কথা ভুলিনি। তোকে জানাই—প্রেম হেরে যায় না, সমাজ যতই বাধা দিক।”
চিঠিটা সে ভাসিয়ে দেয় বোতলে ভরে নদীতে। পদ্মা এবার আর নীরব থাকেনি। হাওয়া উঠেছিল। পাখি ডেকেছিল, যেন একটা ‘হ্যাঁ’ বলে গেছে ওপার থেকে।
নির্মলার মৃত্যুর দিন সকালে পদ্মার পাড়ে এক ছেলে আসে—চেহারায় হরেনের ছায়া। মুখে গান গায়—
“প্রেম প্রেম বলে কে, সমাজের ভয় পায় যে?”
হরিণী ছুটে এসে বলে, “তুমি কে?”
ছেলে বলে, “আমি হরেনের নাতি। দিদিমার কথা শুনতে এসেছিলাম।”
হরিণী-নাসিম এবার গান্ধী গ্রামে স্কুল খুলেছে—নিম্নবর্ণের বাচ্চাদের জন্য। স্কুলের নাম—“হরেন-নির্মলা শিক্ষা নিকেতন”।
প্রেম ছিল, আছে, থাকবে—কাগজে নয়, হৃদয়ে। আর পদ্মা নদী, সে এবার চুপ থাকে না, গেয়ে ওঠে—
“প্রেম, প্রেম, প্রেম—এটাই মানবতার ভাষা।”
—শেষ–
![]()







