আপন জন (পর্ব ত্রয়োবিংশ)
কাকলি ঘোষ
কল্পনা হাতে চা আর একটা বাটিতে কী যেন নিয়ে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এল। এত সুন্দর ধপধপে সাদা কাপে চা ! সঙ্গে আবার মেলানো ডিস ! ওর জন্য ! অবাক হয়ে যায় রিন্টি। বাড়িতে দাদা বৌদিরাও খেত চা। সে তো কোনটা হাতল ভাঙ্গা, চটা ওঠা, কাপ আর ডিস ? সে তো একেক টা একেক রকম ! এরকম কাপ ডিস ! ও তো শুধু ছবিতে দেখেছে।
“ নাও গো। খেয়ে নাও। তারপর ওই খানে কাপ ডিস ধুয়ে রান্না ঘরে রেখে যাবে।”
বাটির দিকে তাকায় রিন্টি। কী সুন্দর গন্ধ ! কী এটা ? যেমন দেখতে তেমন গন্ধ ! খেতে না জানি।কত ভালো হবে !
“ ওটা চিঁড়ের পোলাও গো।খাও নি কখনও?”
একবার মুখ তুলে তাকিয়ে হাসে অর্চনা। সব কিছু দেখে হকচকিয়ে গেছে মেয়েটা। ভালই। এই ভাবটা বজায় রেখে দিতে হবে। শুধু দরকার একটু মিষ্টি কথা আর ভালো ব্যবহার। কপট ভ্রু ভঙ্গী করে কল্পনাকে নকল তিরস্কার করে অর্চনা।“ আহ ! চুপ কর। নাও খেতে পারে। তাতে কী হয়েছে ?”
তারপর ফিরে তাকায় রিন্টির দিকে।
“ খেয়ে দ্যাখ। ভালো লাগবে।”
আঙুল ডুবিয়ে খানিকটা তুলে নিয়ে মুখে ফেলে রিন্টি। ঘি গরম মশলা আরো কী কী সব দেওয়া আছে কে জানে? মুখটা এক অপূর্ব স্বাদে ভরে যায় ওর। এমন খাবার জীবনে কখনও খায় নি ও। এরা সব সময় এত ভালো ভালো খাবার খায় ! আবার কাজের লোকেদের ও দেয় ! এরকমও হয় ! কে জানত ওর কপাল এত ভালো ! এমন একটা বাড়িতে এসে পড়বে। ইস ! সুখেনদা শিখা বৌদি যদি জানতে পারত ! আজ দুপুরেই ভাত খেতে বসে ওর পাতে মাছ, মাংস তুলে দিতে দিতে বলছিল শিখা বৌদি,
“ আমার কতটুকু ক্ষমতা। তোমার সেরকম যত্ন করতে পারলাম না। দাদার সঙ্গে এসেছ। কিই বা আছে বল ? তবু কাকিমা এই মাছ মাংস টুকু দিয়েছিল বলে পাতে দিতে পারলাম”
খুব লজ্জা করছিল ওর। ওই তো উড়ে এসে জুড়ে বসেছিল ওদের সংসারে। বরং ওরাই তো করল ওর জন্য। শিখা বৌদি না থাকলে এমন একটা জায়গায় এসে পৌঁছতে পারত ও ? সত্যি ওরা দেখলে খুব খুশি হতো। আচ্ছা এখানে কাজ করলে ছুটি পাওয়া যাবে ? নিশ্চয়ই দেবে একটা দুটো দিন। তখন সুখেন্দা আর শিখা বৌদির সঙ্গে গিয়ে আবার দেখা করে আসবে ও। এই যা : পিসিমাকে একটা খবর দেবার কথা বলে আশা হল না তো ! নিশ্চয়ই দেবে ওরা। বুড়ো মানুষ। চিন্তা করবে নাহলে। ও তো আর যেতে পারবে বা দেশে। সুখেনদা কে দিয়ে একবার পিসিমার জন্য শাড়ি আর মটকার চাদর পাঠাবে। আগে প্রথম মাসের মাইনে টা পাক। বৌদিকেও একটা শাড়ি দেবে। ভালো ডুরে শাড়ি।
খাওয়া শেষ করে বাটি কাপ ডিস ধুয়ে রান্নাঘরে ঢুকল রিন্টি। বাপরে !এটা রান্নাঘর ! যেমন বড় তেমনি কী সুন্দর ! চারদিকে কাচের আলমারি করা। চকচকে ঝকঝকে। একদিকে বাসন, একদিকে মশলার কৌটো। আর কত কী ? ও তো অর্ধেকের নামই জানে না। চট করে মনে পড়ে গেল ওর। ওদের গ্রামের বাড়ির রান্নাঘরের কথা। কালো হয়ে থাকা দেওয়াল। চটা ওঠা মেঝে। জল চৌকিতে রাখা বাসনের পাঁজা। নিজের চোখ দুটোকে কচলে নেয় ও। খেয়ে দেয়ে কাজ নেই ওরও। কার সঙ্গে কার তুলনা করতে বসেছে।
“ ওই খানে রাখো।” আঙ্গুল দিয়ে একটা বিশেষ জায়গা দেখিয়ে দেয় কল্পনা। “ ওখানেই থাকবে তোমার কাপ ডিস। রোজ খেয়ে আবার ধুয়ে ওখানেই রাখবে। নড়চড় যেন না হয়। বৌদি অগোছালো জিনিস একদম দেখতে পারে না।”
দ্রুত ঘাড় নাড়ে রিন্টি। কক্ষনো করবে না।ও নিজেও গুছিয়ে রাখতে ভালোবাসে। আর এমন বাড়ি! এমন সংসার ! ও কি নোংরা করতে পারে ?
“ কী রান্না করছ গো ?” ভয়ে ভয়ে কল্পনাকে জিজ্ঞেস করে ও। ওর মুখের দিকে তাকিয়ে একটু হাসে কল্পনা।
“ এ দিদিমণির খাবার গো। ইংরিজি খাবার। আমি ছাই অত কি নাম মনে রাখতে পারি? বৌদি শিখিয়ে দেয়। করে দি।”
“ দিদিমণি কে ?”
“ বৌদির মেয়ে গো। খুব মেজাজী। পান থেকে চুন খসলে একেবারে খাবারের থালা ছুঁড়ে ফেলে দেবে। দেখবে খন। সব একটু পরেই খেতে আসবে।”
“ আর কে আছে ?
ক্রমশ :
![]()








অনবদ্য