একসময়ের ‘ট্রেডিং পাওয়ারহাউস’ CSE-র স্বেচ্ছামূলক প্রস্থানের সিদ্ধান্ত! বাংলার আর্থিক ইতিহাসে এক যুগের অবসান।
সংবাদ প্রতিবেদন, কলকাতা, ২৫ শে এপ্রিল ২০২৫: একশো সতেরো বছরের ঐতিহ্যবাহী কলকাতা স্টক এক্সচেঞ্জ (CSE) অবশেষে স্বেচ্ছামূলকভাবে স্টক এক্সচেঞ্জ লাইসেন্স থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে আইনি লড়াই ও নিয়ন্ত্রক সংস্থা সেবি (SEBI)-র কড়াকড়ির পর এই সিদ্ধান্ত বাংলার আর্থিক ইতিহাসে এক যুগের অবসান ঘটাল। একসময় যা ছিল মুম্বাই স্টক এক্সচেঞ্জ (BSE)-এর অন্যতম প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী, তার এই পরিণতি রাজ্যের অর্থনীতির জন্য এক বড় প্রশ্নচিহ্ন।
পতনের নেপথ্যে মূল কারণ
কলকাতা স্টক এক্সচেঞ্জ বন্ধ হয়ে যাওয়ার পিছনে একাধিক জটিল কারণ রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো বিনিয়োগকারীদের আস্থার অভাব, প্রযুক্তির সাথে মানিয়ে নিতে না পারা এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার চাপ।
১. কেতন পারেখের কেলেঙ্কারি (Ketan Parekh Scam)
-
ঘটনা: ২০০০ সালের গোড়ার দিকে ₹১২০ কোটি টাকার কেতন পারেখ সংক্রান্ত কেলেঙ্কারির ঘটনাটি CSE-কে সবচেয়ে বড় ধাক্কা দেয়।
-
ফলাফল: এই কেলেঙ্কারির ফলে বহু স্টক ব্রোকার তাদের আর্থিক লেনদেন নিষ্পত্তি করতে ব্যর্থ হন, যার জেরে বিনিয়োগকারীরা CSE-র উপর থেকে দ্রুত বিশ্বাস হারাতে শুরু করেন। একসময়ের ‘বিশ্বস্ত’ এই প্রতিষ্ঠান ‘প্রতারণার’ প্রতীক হয়ে ওঠে।
২. নিয়ন্ত্রক সংস্থার হস্তক্ষেপ ও লেনদেন স্থগিত (SEBI Suspension)
-
সময়কাল: ২০০০-এর দশকে লেনদেনের পরিমাণ ক্রমশ কমতে থাকার পর, সেবি (Securities and Exchange Board of India) বারবার নিয়ম না মানার অভিযোগে ২০১৩ সালের এপ্রিলে CSE প্ল্যাটফর্মে ট্রেডিং স্থগিত করে দেয়।
-
পরিসংখ্যান: সেবির এক্সিট পলিসি স্কিমের আওতায়, CSE সহ মোট ১৩টি আঞ্চলিক স্টক এক্সচেঞ্জ গত কয়েক বছরে বন্ধ হয়ে গেছে। আঞ্চলিক এক্সচেঞ্জগুলি হয় কড়া নেট-ওর্থ ও টার্নওভারের শর্ত পূরণ করতে পারেনি, নয়তো নিজেরাই ব্যবসা গুটিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
৩. আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে প্রতিযোগিতা
-
পরিবর্তন: একসময় Lyons Range-এর ফ্লোরে দাঁড়িয়ে হাত তুলে শেয়ার কেনা-বেচার (Open Outcry System) রমরমা ছিল। ১৯৯৭ সালে CSE ইলেকট্রনিক ট্রেডিং প্ল্যাটফর্ম C-STAR (CSE Screen Based Trading And Reporting) চালু করলেও, তা ন্যাশনাল স্টক এক্সচেঞ্জ (NSE) বা বোম্বে স্টক এক্সচেঞ্জ (BSE)-এর আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় এঁটে উঠতে পারেনি।
-
বাজারের প্রবণতা: বেশিরভাগ বিনিয়োগকারী এখন NSE এবং BSE ব্যবহার করেন। এর ফলে CSE-তে লেনদেনের পরিমাণ ও লিকুইডিটি (Liquidity Quality) ক্রমাগত কমতে থাকে, যার জেরে এটি বাজারে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ে।
৪. আইনি লড়াইয়ে ক্লান্তি ও স্বেচ্ছামূলক প্রস্থান
-
২০১৩ সালে লেনদেন স্থগিত হওয়ার পর থেকে CSE হাইকোর্ট ও সুপ্রিম কোর্টে দীর্ঘ আইনি লড়াই চালিয়েছে। অবশেষে, ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে CSE বোর্ড সেই মামলাগুলি প্রত্যাহার করে স্বেচ্ছামূলকভাবে স্টক এক্সচেঞ্জ লাইসেন্স থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।
-
২০২৫ সালের এপ্রিলে শেয়ারহোল্ডাররা এই প্রস্থানের প্রস্তাবে সায় দেন। এখন SEBI-র অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে এক্সচেঞ্জটি।
কলকাতার আর্থিক ঐতিহ্যের সমাপ্তি
১৯০৮ সালে প্রতিষ্ঠিত (তবে কার্যক্রম শুরু ১৮৩০ এর দশকে) কলকাতা স্টক এক্সচেঞ্জ ছিল দেশের অন্যতম প্রাচীন স্টক এক্সচেঞ্জ। এটি শুধু একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান ছিল না, বরং বাংলার শিল্প ও বাণিজ্যের প্রতীক ছিল।
-
ঐতিহাসিক গুরুত্ব: একসময় এখানে প্রায় ২৭০০টিরও বেশি কোম্পানি তালিকাভুক্ত ছিল।
-
শেষের ইঙ্গিত: দীর্ঘদিন ধরে লেনদেন বন্ধ থাকলেও, CSE তার সদস্যদের NSE ও BSE প্ল্যাটফর্মে লেনদেন করার সুবিধা দিচ্ছিল। কিন্তু, ২০২২ সালের নভেম্বরে কলকাতা হাইকোর্টের নির্দেশে NSE-র সাথে CSE-র চুক্তি বাতিল হওয়ার পর, CSE-র সকল লেনদেন সম্পূর্ণরূপে বন্ধ হয়ে যায়।
এক প্রবীণ স্টক ব্রোকারের কথায়, “২০১৩ সাল পর্যন্ত প্রতিদিন ট্রেডিং শুরুর আগে আমরা মা লক্ষ্মীর কাছে প্রার্থনা করতাম। এবারের উৎসব সেই ঐতিহ্যের প্রতি এক বিদায় জানানোর মতো।”
ভবিষ্যতে কী?
CSE এখন একটি ‘হোল্ডিং কোম্পানি’ হিসাবে তার কাজ চালিয়ে যাবে। তাদের সাবসিডিয়ারি সংস্থা CSE ক্যাপিটাল মার্কেটস প্রাইভেট লিমিটেড (CCMPL) NSE এবং BSE-তে ব্রোকিং ব্যবসা চালাবে। এই প্রস্থানের প্রক্রিয়ার অংশ হিসাবে, CSE তার কর্মীদের জন্য স্বেচ্ছামূলক অবসর প্রকল্প (VRS) চালু করেছে।
অঞ্চলভিত্তিক স্টক এক্সচেঞ্জগুলির পতনের মুখে দাঁড়িয়ে, কলকাতা স্টক এক্সচেঞ্জের এই সমাপ্তি ভারতে পুঁজিবাজারের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি ঘটাল, যা আর্থিক লেনদেনকে সম্পূর্ণরূপে মুম্বাইয়ের ইলেকট্রনিক প্ল্যাটফর্মগুলির দিকে কেন্দ্রীভূত করল।
#কলকাতা_স্টক_এক্সচেঞ্জ #CSEবন্ধ #আঞ্চলিকশেয়ারবাজার #শেয়ারবাজারেরইতিহাস #কেতনপারেখ #সেবি #ভারতেরপুঁজিবাজার #কলকাতা_অর্থনীতি #বাংলারঐতিহ্য #stockmarketbangla #CalcuttaStockExchange #CSEClosure #RegionalStockExchanges #IndianStockMarket #SEBI #KetanParekhScam #FinancialHistoryIndia #KolkataBusiness #MarketTrends #StockMarketNews
![]()






