হঠাৎ করেই ঘুমটা ভেঙে গেলো মহামায়ার। এখনও শীতের রেশটা যায়নি, কোকিলের কুহু কুহু ডাকে বসন্তের আগমনি গাইছে। এদিকে ভোরের স্নিগ্ধ ঠান্ডা হাওয়ায় একটা শিরশিরে ভাব, পায়ের কাছের চাদরটা গলার কাছে টেনে নিয়ে আবার চোখ বুঝলেন। একটা অলসতা গ্রাস করেছে সারা শরীর জুড়ে। না আজ আর উঠে পড়ার তাড়া নেই। গত বত্রিশটা বছর শিক্ষকতা করেছেন, গতকাল মহামায়া চাকরি জীবনে থেকে অবসর নিলেন।
আজ আর তার স্কুলে যাওয়ার তাড়া নেই, আর কেউ বলবে না, মিস এই অঙ্ক টা একটু বুঝিয়ে দেবে, স্কুলের যাবতীয় কাজের ভার আর তাকে নিতে হবে না আর। হ্যাঁ Head Mistress ছিলেন মহামায়া। অঙ্কের ক্লাস নিতেন। ছাত্রছাত্রীদের বড় আদরের – বড় কাছের একজন ছিলেন মহামায়া। প্রিয় এই দিদিমণির স্কুল থেকে অবসরের দিনটায় তারা চোখের জলে বিদায় দিয়েছে তাকে। তাদের আবেগ ও ভালোবাসায় মহামায়া নিজেকেও সামলাতে পারেন নি। অনেক বছরের অনেক স্মৃতি, একটা সময় স্কুল টাকে প্রতিষ্ঠিত করতে দিনরাত এক করেছেন। অতি যত্নে লাগানো সেই গাছে আজ হাজার হাজার ফুল ফুটেছে, সুরভিত করেছে চারিদিক। নিজের অজান্তেই মনে মনে গর্বিত হয়েছেন। প্রত্যেকটা ছাত্র ছাত্রীদের নিজের ছেলে মেয়ের মত আগলে রাখতেন। প্রত্যেকটা Teacher এর কাছে তিনি ছিলেন আদরের বড়দি। সব সমস্যার মুস্কিল আসান, সদা হাস্যময়।
অনেকক্ষণ এদিক ওদিক পাশ ফিরেও আর ঘুম এলো না। হঠাৎ করেই যেনো বড্ড একাকীত্ব বোধ করছেন আজ। শুভময় বাবু, ওনার স্বামী গত হয়েছেন বছর দুয়েক আগে, হঠাৎ করেই স্ট্রোকটা হয়ে গেলো, হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার আগেই সব শেষ। একমাত্র ছেলে অনেক বড় ডাক্তার হয়েছে, খুব বড় Surgeon, FRCS করে বিদেশ পারি দিয়েছে, এটাই তো স্বপ্ন ছিল শুভময় বাবুর। নিজের সর্বস্ব দিয়ে মানুষটা সেই স্বপ্ন পূরণ করেছেন বটে, কিন্তু দেনার দায় মাথায় নিয়ে তিনিও চলে গেলেন। গত চার বছর ছেলে বিদেশ গেছে – না আর ফেরেনি। আগে তবু মাঝে সাজে ফোন করত। শেষ কথা হয়েছিলো হাসপাতালে শুভময় বাবুর নিথর শরীর টার পাশে দাঁড়িয়ে…।
-“বাবু তোর বাবা চলে গেলেন”। উত্তর এসেছিল,
-“মা তুমি একটু সব সামলে নাও, আমার কয়েকটা urgent O”T করতে হবে, এই মুহূর্তে আমি যেতে পারবো না। শরীর টা কি একটু দুলে গেলো, মোবাইলটা হাত থেকে মনে হয় স্বশব্দে মাটিতে আছড়ে পড়লো। দম ফাটা একটা কান্না নিয়ে মহামায়া, শুভময় বাবুর বুকের মধ্যে লুটিয়ে পড়লেন।
“-হায় রে কপাল ছেলের জন্ম দিয়েছি , তাকে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছি বটে, কিন্তু তাকে মানুষ করতে পারলাম কই”।
আত্মীয়স্বজন খবর পেয়ে সবাই এসেছিল একে একে। একটু আধটু সান্ত্বনা দিয়ে চলেও গেছে সবাই। আসেনি শুধু তার বিলেতি ডাক্তার ছেলে। পাশে ছিল একমাত্র পারার বখাটে ছেলে অভি। সবাই তাকে বখাটে ভাবলেও মহামায়ার সংসারে ছিল তার অবাধ যাতায়াত। শুভময় বাবু খুব স্নেহ করতেন তাকে। সারাক্ষণ বলতেন,
“-দেখেছ মায়া তোমার ছেলে তোমার খোঁজ না রাখলেও আমাদের অভি কিন্তু সবসময় আমাদের পাশে থাকে”। অভির বাবা সারাক্ষণ মনে করতেন আমার ছেলে টি কুলাঙ্গার, সারাটা দিন শুধু আড্ডা মেরেই সময় কাটায় একটা চাকরি পর্যন্ত জোগাড় করতে পারলো না। আর দেখো শুভময়দা আর বৌদি কত ভাগ্যবান, ছেলে ডাক্তার, আবার যে সে ডাক্তার নয়, একেবারে বিলাতি ডাক্তার। আর শুভময়বাবু মনে করতেন আমরাও যদি অভির মত একটি ছেলে পেতাম! সবার আপদে বিপদে পাশে দাঁড়ানোর মত মহান গুণের অভির মত খুব ছেলেই আছে। দুটো মানুষের চিন্তা ভাবনার পার্থক্যটা কতটা প্রকট। এ এক তার জ্বলন্ত নিদর্শন, এক অদৃশ্য রেষারেষি। তবে যেদিন শুভময় বাবু মারা গেলেন সেদিনের পর সবার অলক্ষে আর একটা মানুষও কেঁদেছিলেন ,তিনি অভির বাবা। যখন দেখলেন মহামায়ার ওই দুঃসময়ে একমাত্র অভিই সমস্ত দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছে, সেদিন বুঝলেন শিক্ষিত অমানুষ ছেলের থেকে আমার অশিক্ষিত বাউন্ডুলে ছেলেই ঢের ভালো। সেদিন তিনি কেঁদেছিলেন আনন্দে। কেঁদেছিলেন মহামায়া বৌদির দুর্ভাগ্য দেখে।
শুভময় বাবু সামান্য ডাকঘরের কর্মী ছিলেন, খুব সামান্যই আয়। বিয়ের পর বাসর রাতে মহামায়া একটাই জিনিস চেয়েছিলো।
-“আমি আরো পড়তে চাই”। তখনকার দিনে ঘরের বউ পড়াশুনা করবে, চাকরি করবে এটা ভাবাও যেনো পাপ ছিল কিন্তু শুভময় যে অন্য ধাতুর মানুষ, তাই বিয়ের কয়েকদিনের মধ্যেই উনি মহামায়াকে University তে ভর্তি করিয়ে দিলেন। এতবড় surprise টা মহামায়া আশা করতে পারেনি…
-“মায়া আজ থেকে তুমি শুধুই পড়াশুনা করবে, বাকি সব আমি সামলাবো”। সমস্ত প্রতিকূলতাকে উপেক্ষা করে তিনি মহামায়ার পাশে দাঁড়িয়েছেন। তার আদরের মায়াও তাকে সঠিক প্রতিদান দিয়েছে। প্রথম মহিলা হিসাবে ইউনিভার্সিটিতে ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট হয়েছেন। তারপর স্কুলের চাকরিটাও পেয়ে গেলেন মহামায়া। শুরু হল তাদের এক নতুন জীবন। এলো এক ফুটফুটে সন্তান…। শুয়ে শুয়ে একটু যেনো তন্দ্রা এসে গিয়েছিলো, স্মৃতির সাগরে ভেসে যাচ্ছিলেন মহামায়া,হঠাৎ করেই চোখটা খুলে গেলো। বাইরে কোকিলটা ডেকেই চলেছে, দেখো আজ বসন্ত।
এবার উঠে পড়লেন তিনি, ঘড়িতে প্রায় সাতটা। আজ যেনো কাঁটাটা চলছেই না। এবার একটু চা না খেলেই নয়। প্রাত্যহিক কাজকর্ম সেরে চা নিয়ে বারান্দায় এসে দাঁড়ালেন মহামায়া, এই সেই বাড়ি, সেই বারান্দা, দুজন মিলে কত সময় কাটিয়েছেন, ঘন্টার পর ঘন্টা বারান্দায় বসে চায়ের পেয়ালায় চুমুক দিয়ে একে অপরের সুখ দুঃখের সাথী হয়েছেন, একে অপরের পরিপূরক হয়ে ওঠার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু আজ তিনি বড্ড একা, নিঃসঙ্গ।
শুভময় বাবুর বরাবরের ইচ্ছা ছিল শহরের বাইরে খোলা আকাশের নিচে তাদের একটা ছোট্ট বাড়ি থাকবে, দক্ষিণের ফুরফুরে বাতাস বইবে বারান্দায়। সকালে পূবের আলো রাঙিয়ে দেবে সারাটা বিছানা। কিন্তু সামর্থ্য হয়নি। তাই মহামায়া চাকরিটা পাওয়ার পরেই উনি আর দেরি করেননি। কিছুটা জেদের বশে ধার দেনা করে, শহরের প্রান্তে এই বাড়িটা উনি তৈরী করেন। তারপর থেকে গত তিরিশ বছরের সুখ দুঃখের সাথী এই বাড়ি। এরপর ছেলে বড় হতে লাগলো, বাবার ইচ্ছে ছেলে ডাক্তার হবে। ওই যে অমুক বাবুর ছেলে বিদেশে থাকে, বড় ডাক্তার। এইতো সেদিন উনি আমাদের পোস্ট অফিসে এসেছিলেন। ছেলে মানি অর্ডার করেছে, ছেলে কে নিয়ে কত গর্ব ওনার। মহামায়া শুধু শুনেছে আর মানুষটার পাগলামি দেখে মনে মনে হেসেছে। সে তো জানে এই মানুষটা পাশে না থাকলে তার আর চাকরি করা হতো না। তার জীবনে এই মানুষটার অবদান সে মরার পরেও ভুলতে পারবে না। এবার ছেলেকে সুপ্রতিষ্ঠিত করার পালা…।
কুহু কুহু মিষ্টি সুরে বাইরের দরজার বেলটা বেজে উঠলো। মহামায়া জানেন, পরী এসেছে। পরী ওনার কাজের মেয়ে। বড় ভালো মেয়েটি। বিয়ের কিছু দিনের মধ্যেই স্বামী ছেড়ে চলে গেছে। থাকে গঙ্গার পাড়ে পেছন দিকের বস্তিতে…। মহামায়া ধীরে সুস্থে গিয়ে দরজাটা খুলে দিলেন। পরীও জানে আজ আর মাসির অফিস নেই। তাই সেও আজ এসেছে দেরি করে…।
-“মাসি একটু চা করে দেবো তোমাকে?”
-“না রে, তোর দেরি হচ্ছে দেখে আমি নিজেই একটু চা বসিয়ে নিলাম। তুই বরং আজ একটু লুচি আর আলুর তরকারি কর তো। ” বলেই মহামায়া আবার যেনো অন্যমনস্ক হয়ে পড়লেন। ছেলেটা লুচি তরকারি খেতে বড্ড ভালোবাসতো। পরিষ্কার শুনতে পাচ্ছেন,
-“মা আর দুটো লুচি দাওনা গো।”
-“কেনরে দশটা লুচি খেয়েছিস তো, এরপর তো দুপুরে কিছু খেতেই পারবি না বাবা।”
-“ও মা…. দাও না।” আদূরে গলায় মাকে জড়িয়ে ধরে ছেলে বলেছিলো, -“you are the best mom in the world, তোমার হাতের লুচি তরকারি খাবার জন্য আমি সব ছাড়তে পারি।”
-“আচ্ছা বাবা হয়েছে, এবার ছাড়, আমি লুচি দুটো নিয়ে আসি। এত বড় ছেলে, তবু ছেলেমানুষি গেলো না তোর। দেখব বউ আসলে কি করিস? তখন দেখব মাকে ছাড়া কেমন থাকিস?” ছেলে তখন মুখ ভেংচে ছিলো। শুভময় বাবু খবরের কাগজের আড়াল থেকে মা ছেলের খুনসুটি দেখেছেন আর শুধু মুচকি হেসেছেন।
ছেলের সামনে উচ্চমাধ্যমিক, সাথে জয়েন্ট এন্ট্রান্স। ছেলে নাওয়া খাওয়া ভুলেছে। ছেলের যাতে সময় নষ্ট না হয়, মা গিয়ে ছেলের ঘরে খাইয়ে দিচ্ছেন। যে ছেলে কোনো দিন রাত জাগেনি, আজ সে রাতভর পড়ছে। স্বামী স্ত্রী পালা করে জেগে আছেন। এই বুঝি ছেলের কিছু লাগবে। এ যেনো বাবা মায়েরও পরীক্ষা।
আজ জয়েন্ট এর রেজাল্ট বেরোবে। সকাল থেকেই শুভময়বাবু কেমন যেনো মুখটা ফেকাসে করে ঘুরছেন। এদিকে ছেলের কোনো হেল-দোল নেই। সকাল नটা বাজে, তিনি এখনও ঘুমাচ্ছেন।
-“মায়া এবার তোমার ছেলে কে ডাকো। এতক্ষণে দেখো list টাঙিয়ে দিয়েছে। রাজপুত্রকে নিয়ে যখন স্বামী-স্ত্রী NRS Medical College এ পৌঁছালেন, বেশ ভিড় জমেছে সেখানে…। চারিদিকে কারোর আনন্দ উচ্ছ্বাস, কারোর কান্না, কারোর আফসোস। শুভময়বাবু যেন আরষ্ঠ হয়ে গেলেন। ছেলে হওয়ার পর থেকেই একটা স্বপ্ন দেখেছেন। আমার ছেলে বড় একজন ডাক্তার হবে। দেশের ও দশের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করবে। তাহলে কি হল না? ওইতো ছেলে দৌড়ে আসছে।
-“মা engineering এ আমার rank হয়েছে।” শুভময় কেমন যেনো দমে গেলেন…
“আর Medical -এ হয়নি”। মিনমিন করে বললেন। গলাটা বড় শুকনো লাগছে।
-“নাগো বাবা ওখানে খুব ভিড় আমি তো দেখতেই পাইনি এখনও”। আবার যেনো মনের ভিতর আলোটা জ্বলে উঠলো।
-“তোরা বস, আমি যাচ্ছি…।” একপ্রকার ঠেলাঠেলি করেই সামনে পৌঁছালেন। রোল নাম্বার ধরে ধরে খুঁজতে লাগলেন…। ওই তো, ওই তো শুভজিৎ চ্যাটার্জি, Rank 500…. তিন তিন বার মেলানোর পর ছুটে বেরিয়ে এলেন।
-“মায়া মায়া আমাদের বাবু ডাক্তার হয়েছে।” বলেই ছেলেকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। মানুষটাকে প্রথম কাঁদতে দেখলেন মহামায়া।
ডাক্তারই হল, মানুষ হল কই? সারাজীবন স্কুলের বাচ্চাদের মনুষ্যত্বের শিক্ষা দেওয়া, প্রধান শিক্ষিকা মহামায়া চ্যাটার্জি নিজের ছেলেকেই শিক্ষা দিতে ব্যর্থ। সম্পর্কের মূল্যবোধ যার নেই, যে নিজের স্বার্থ সিদ্ধির জন্য ভালোবাসার মানুষগুলোকেও অবলীলায় ভুলে যেতে পারে। সে আর যাই হোক মানুষ হওয়ার যোগ্য নয়। হেরে গেছেন মহামায়া। তার দু-গাল দিয়ে কয়েক ফোঁটা বুক ফাটা রক্ত বেরিয়ে এলো যেন…
-“মাসি তুমি কাঁদছো? ওদিকে অভিদাদা এসে যে বাড়ি মাথায় তুলেছে। এতবার করে ডাকছে তুমি শুনতে পাওনি?”
-“ও হ্যাঁ এই যাচ্ছি রে।” নিজের আবেগ গুলো লুকানোর বৃথা চেষ্টা করলেন মহামায়া ।
পেছনে অভি এসে দাঁড়িয়েছে। “কাকিমা তুমি আবার বাবু দাদার কথা ভাবছ বল… আচ্ছা তুমি কি বলতো এত চিন্তা করলে এবার তোমারও তো শরীর খারাপ করবে।” মহামায়া শান্ত গলায় বললেন, -“তোর কাকুর ঋণের বোঝাটা যেদিন শেষ হবে সেদিন আমিও চোখ বুঝবো রে। ওই মানুষটা আমার জন্য সর্বস্ব করেছেন। নিজের সুখ শান্তির কথা কোনোদিন ভাবেননি। জীবনে ওনাকে কিছুই ফিরিয়ে দিতে পারিনি। শুধুই পেয়েছি। মানুষটা চলে গেছেন। মরার আগে এই বাড়িটাকে ঋন মুক্ত করে যেতে যদি পারি তো মানুষটার শান্তি।”
-“হ্যাঁ গো… একটা ছোট কোম্পানিতে কেয়ার টেকার এর কাজ। মাইনে একটু কম, ও ঠিক আছে, আমার মত বাউন্ডুলে ছেলের এর থেকে কি আর ভালো চাকরি হয় বল? তবে এই আমি বলে গেলাম তোমাকে, দুটো মাস একটু কাটুক। একটু পয়সা জমিয়ে নেই, তারপর মা বাবা কে নিয়ে কাশি যাব। তোমাকেও নিয়ে যাবো কিন্তু। আমি কোন ‘না’ শুনবোনা কিন্তু। মিষ্টিটা রেখে গেলাম, পরে আসব। আজ ওই গলির পিছনের বস্তির বুড়ো আর বাচ্চা গুলোকে মাংস ভাত খাওয়াতে হবে। আমি এলাম কাকিমা, পরে আসব।” কথাগুলো বলেই অভি ঝড়ের বেগে বেরিয়ে গেলো। এই ছেলেটা এই রকমই। ছোট্ট বেলা থেকেই মানুষের পাশে থাকে। সবাইকে আপন করে নিতে পারে। আপন পরের বিচার শুধুই রক্ত দিয়ে হয়না। আন্তরিকতা, ভালোবাসা আর পবিত্র মন থাকলে সে সবাইকে আপনার করে নিতে পারে। আর স্বার্থপর, বেইমান, বিশ্বাসঘাতকরা কারোর আপন হয়না। এরা নিজের স্বার্থ সিদ্ধির জন্য সময় বুঝে সম্পর্কের খোলসগুলো পাল্টে ফেলে মাত্র। অভির মত ছেলেরা আছে বলেই হয়তো পৃথিবীতে সম্পর্ক গুলো আজও সুন্দর। একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেললেন মহামায়া।
সাত পাঁচ চিন্তা করতে করতে অনেক বেলা হয়ে গেলো, প্রায় দশটা বাজতে গেলো, পরী এসে কখন যেনো লুচি রেখে গেছে। আজ আর তারা নেই তাই মহামায়া সময় নিয়ে জল খাবার টা শেষ করলেন। আজ আর বেশি কিছু রান্না করতে হবে না রে ,শুধু আলু পোস্ত আর ডাল কর, শুভময় বড্ড ভালোবাসতেন পোস্ত খেতে। আবার স্মৃতির সাগরে ডুব দিলেন মহামায়া। ছেলে ডাক্তারি পাশ করার পর MD এন্ট্রান্স পরীক্ষায় চান্স পেয়ে গেলো , কিন্তু সরকারি কলেজে ভালো কিছু হলোনা ,শেষে এক বেসরকারি কলেজে surgery পেলো,কিন্তু খরচ তো বড্ড বেশি। এদিকে ছেলে গোঁ ধরেছে সে surgeon হবে। মহামায়া বুঝতে পারছেন মানুষ টা ছেলের স্বপ্নে বাঁধা দিতে চাননা, কিন্তু এতগুলো টাকা আসবে কোথা থেকে, বছরে পনেরো লক্ষ্, তিন বছরের fees আর ছেলের হস্টেল খরচ মিলিয়ে পঞ্চাশ লক্ষের কাছে প্রায়। সব জমানো পুজিঁ শেষ করেও মহামায়া কে প্রোভিডেন্ট ফান্ড থেকে অনেকটাই Loan নিতে হলো। এই প্রথম সংসারের সচ্ছলতায় টান পড়লো। শুভময় ও মহামায়া সব হাসিমুখেই সয়ে নিলেন, ভিতরে ভিতরে একটা চাপা গর্ব হতে থাকলো, ছেলে আমার মস্ত ডাক্তার হচ্ছে। এইভাবেই পেরিয়ে গেলো আরো তিনটি বছর, ছেলে surgeon হয়েছে, প্র্যাক্টিস টা শুরু করলো বটে কিন্তু ছেলের আর মন বসেনা। একদিন রাতে খেতে খেতে হঠাৎ করেই ছেলে বললো, বাবা কিছু টাকা দিতে পারবে। কেনো রে বাবু টাকা কি করবি, মহামায়া বললেন। আমি FRCS পড়ব, বিদেশে যাবো, এখানে কোনো ভবিষ্যত নেই। শুভময় ভুরু কোঁচকালেন, কিন্তু এতগুলো টাকা এখন…… মুখের কথা কেড়ে নিয়ে ছেলে বলল, প্রয়োজন পড়লে এখন ধার নাও, আমি পরে সব টাকা তোমাদের কে সুদে আসলে শোধ করে দেবো, জীবনে প্রথমবার শুভময় বুঝলেন ছেলে অনেক দূরে সরে গেছে, না বাবা তোকে টাকা শোধ করতে হবেনা, পারলে আমাদের ভালোবাসা গুলো সুদে আসলে ফেরত দিস।
এবার যেনো আকাশ ভেঙে পড়েছে, এতগুলো টাকা শুভময় কোথায় পাবেন, কিছুতেই কোনো রকম কুল কিনারা উনি করতে পারলেন না। মহামায়া বললেন আমি একটা কথা বলি রাগ করবে না তো… শুভময় বুঝে উঠতে পারলেন না মায়া কি বলছে চাইছে। কিছুক্ষণ চুপ থেকে মহামায়া বলেন, তুমি না হয় এই বাড়িটা বন্ধক দিয়ে দাও। শুভময়ের চারিদিক টা যেনো টলে গেলো। এ তুমি কি বলছ মায়া, এই বাড়ি আমাদের পবিত্র মন্দির, হাজার হাজার স্মৃতি জড়িয়ে আছে আমাদের, আমাদের সম্পর্কের বন্ধন এই বাড়িটা, এই বাড়ি কে বন্ধক রাখলে তো আমি নিজের কাছেই ছোটো হয়ে যাবো মায়া। মহামায়া বুঝতে পারছিলেন যে জীবনে প্রথম বার সে মানুষটার আবেগে ধাক্কা মেরেছেন, মানুষটাকে কষ্ট দিয়ে ফেলেছেন, বিয়ের পর আজ পর্যন্ত মহামায়া এমন কিছু করেনি যাতে মানুষটা কষ্ট পায়, কিন্তু আজ…। মহামায়া ঠান্ডা মাথায় বললেন, আরে বাবা আমি তো তোমাকে বাড়ি বিক্রি করতে বলছি না, শুধু তো বন্ধক রাখবে, আমরা আবার ঠিক সব টাকা শোধ করে বাড়ি ছাড়িয়ে নেবো। যদি না পারি, শুভময় আৎকে উঠলেন। ঠিক পারবো দেখো, আর ছেলে যখন চাইছে তখন আমরা ওর পাশে থাকবো না তো কে থাকবে বল, আর ও তো বললো যে ও নিজেও আস্তে আস্তে কিছু টাকা দেবে, তুমি আর অমত করো না লক্ষীটি ।
ছেলে বিদেশে চলে গেলো, ওই শেষ বারের জন্য তাকে চোখের জলে বিদায় দিলেন তারা , না আর ফিরে আসেনি সে। আজ চার বছর অতিক্রান্ত, দেনার দায় নিয়ে মানুষ টাও হঠাৎ চলে গেলেন, দিন রাত কেমন অন্য মনস্ক থাকতেন, মায়া আমি পারব তো আমাদের মন্দির কে রক্ষা করতে.. হঠাৎ করেই স্ট্রোক টা হয়ে গেলো, সব শেষ। এখন মহামায়ার একটাই লক্ষ্য , বাড়ি টাকে ঋণ মুক্ত করা। তাদের এই সংসার টা কে আমৃত্যু আগলে রাখা, তাদের মন্দিরের পবিত্রতা বজায় রাখার গুরু দায়িত্ব ওই মানুষটা তার ঘাড়ে দিয়ে গেছেন… অবসরকালীন যা টাকা পাবেন তার সবটুকুই চলে যাবে লোন শোধ করতে, তারপরেও কিছু দেনা থেকে যাবে ,সেটা না হয় pension থেকে কিছু কিছু দিয়ে আস্তে আস্তে শোধ করবেন ।
আবার কুহু কুহু শব্দে বাইরের বেল টা বেজে উঠলো, দেখ তো পরী কে এলো। কিছুক্ষণ বাদে পরী এসে বললো, মাসি সুন্দর দেখতে একজন ভদ্রলোক বাইরে দাঁড়িয়ে আছেন, তোমাকে খুঁজছে… আচ্ছা দারা আমি যাচ্ছি, বাইরে এসে দেখলেন একটি মধ্য বয়সী পরিপাটি করে সুট টাই পরা ছেলে , দাঁড়িয়ে আছে। কে বাবা তুমি, আমাকে কি দরকার। আসলে আমি এসেছি আপনার bank branch থেকে, আসলে ওই লোনের ব্যাপারে কিছু কথা ছিল আরকি।না বাবা আমার আর কোনো loan লাগবে না।
দরজাটা মহামায়া বন্ধ করতে যাবেন, তখনই ছেলেটি বলে উঠলো, না না ম্যাডাম আমি নতুন কোনো লোনের কথা বলতে আসিনি…. আসলে আপনাদের বাড়ি বন্ধক রেখে যে লোন আপনারা নিয়েছিলেন তার কিছু EMI বাকি পড়েছে, আমি সেই সূত্রেই কিছু কথা বলতে এসেছি। মহামায়া জানেন সেটা, শুভময় নিজের সমস্ত পুঁজি ঢেলে দিয়েছিলেন ছেলের জন্য।উনি চলে যাওয়ার পর কয়েকটা মাসিক কিস্তি বাকি পরে যায় বটে, কিন্তু মহামায়া তো ব্যাংক ম্যানেজারের সাথে কথা বলে এসেছিলেন যে ওনার অবসরকালীন টাকা গুলো পেলেই অনেকটাই শোধ করে দেবেন, তাও যে কেনো এরা লোক পাঠায়… মনে এক অজানা আশঙ্কা এসে ভর করলো, তাহলে কি অন্য কিছু, bank কি তাদের এই মন্দিরের দখল নিতে চায়… মুখে বললেন আসুন। ছেলে টিকে বাইরের ঘরে বসতে বলে মহামায়া ভিতরে এলেন, একবার শুভময়ের ছবিটার দিকে তাকিয়ে মনে মনে প্রমাদ গুনলেন।
ম্যাডাম এত টেনশন করার কিছুই নেই, এটা আমাদের একটা routine ভিজিট, আমি শুধু একবার দেখা করে গেলাম আপনার সাথে, আপনি অবসর নিয়েছেন, আপনার অবসরকালীন পাওনা টাকা গুলো হয়তো আসতে একটু দেরিই হবে, pension টাও তো মনে হয় চালু হতে কয়েক মাস লাগবে,কিছু চিন্তা করবেন না ম্যাডাম, আমি bank এ গিয়ে গিয়ে সেই মতোই রিপোর্ট করব যাতে আপনার কোনও সমস্যা না হয়। চা খেয়ে ছেলেটি উঠে পড়লো, মহামায়া কে স্বসম্ভ্রমে প্রণাম করে, মহামায়া কিছু বুঝে ওঠার আগেই ছেলেটি বেরিয়ে গেলো। তার এই কান্ড টার জন্য মহামায়া প্রস্তুত ছিলেন না।ছেলেটির মুখটা কেমন যেনো চেনা চেনা লাগলো কিন্তু স্মৃতির পাতা থেকে পড়ে উঠতে পারলেন না।
মহামায়ার অজান্তেই আরও একটা ঘটনা ঘটে চললো। মহামায়ার কাছ থেকে যে মধ্যবয়সী ভদ্রলোক বেরিয়ে এলেন তিনি বরুণ সেনগুপ্ত, না তিনি কোনও সাধারণ ব্যাংক কর্মী নন, তিনি সেই রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের জোনাল হেড। আসলে ওনাদের দুটো মাসিক কিস্তি যখন বকেয়া পড়েছিলো, তখনই ওনাদের ফাইল টা ওনার কাছে যায়। মহামায়া চ্যাটার্জি নামটা দেখেই কেমন যেনো সন্দেহ জাগে ওনার, তাই নিজেই ব্যাংক কর্মী হয়ে এসেছিলেন চোখের সন্দেহ নিরসন করতে।
হ্যাঁ তিনি ঠিকই সন্দেহ করেছেন, এই তো তার মহামায়া মিস্, যার হাতে কানমলা না খেলে হয়তো আজ আর তার ব্যাংকের বড় অফিসার হওয়া হতো না… এই বরুন…. বরুন,পেছন থেকে সন্দীপ ডেকে উঠলো। কিরে ডাকছিস কেনো?? তোকে বড় মিস খুঁজছেন, তাড়াতাড়ি চল। মনের মধ্যে অজানা ভয় নিয়ে এক দৌড়ে বরুন প্রধান শিক্ষিকার ঘরের দরজায় পৌঁছালো। আসবো মিস…. ওহ বরুন আয় এদিকে, কি করেছিস এটা, অঙ্ক করতে গিয়ে এত ভুল কেনো হয়েছে, বলেই মিস তার কান টা মূলে দিলো। পরীক্ষা হলে মন কোনদিকে থাকে শুনি। বরুন ভয়ে ঘামছে,সত্যিই তো এত ছোট ছোট্ ভুল, সে খেয়াল করেনি , লজ্জায় মাথা নত করে দাঁড়িয়ে ছিল বরুণ.. মিস মনে হয় অন্তর্যামী, তাই পরের মুহূর্তেই মাথায় স্নেহের হাত বুলিয়ে বলেছিলেন বাবা অঙ্ক করতে জানা আর তাতে perfection আনা,দুটোর মধ্যে একটাই পার্থক্য সেটা হল মনোসংযোগ।না বরুণ আজ পর্যন্ত সে কথা ভুলতে পারেনি, আর কোনোদিন তাকে কেউ অঙ্কতে নাম্বার কাটতে পারেনি।
স্যার অফিস এসে গেছে, ড্রাইভার এর কথায় চোখ তাকালো, পুরোনো কথা ভাবতে ভাবতে কখন যেনো ঘুমিয়ে পড়েছিলো সে।
অফিস ঢুকেই প্রথম ফোন টা করলো সৌম্য কে । সৌম্য গাঙ্গুলি, শহরের নামকরা cardiologist, বরুণের ফোন টা সাথে সাথেই ধরলেন, বল রে কেমন আছিস?? শোন যে কারণে তোকে ফোন করেছি, আজ বহুদিন পর মহামায়া মিসের বাড়ি গিয়েছিলাম, গতকালই অবসর নিয়েছেন। আমি নিজের পরিচয় দেইনি,সমস্ত ঘটনা সে খুলে বলল সৌম্যকে। তাহলে আমরা কাল যাচ্ছি ওনার বাড়িতে। সবাই কে খবর দে, যতোজন পারবে চলে আসুক।
আজ সকালে মহামায়ার ঘুম টা একটু তাড়াতাড়িই ভেঙে গেলো, আজ তার জন্মদিন, বিয়ের পর প্রত্যেকটা বছর এই দিনটা শুভময় ,জন্মদিনের শুভেচ্ছা দিয়ে তার ঘুম ভাঙ্গাতেন, একবারও তার অন্যথা হয়নি। ওই মানুষটার সবথেকে বড় গুণ ছিল এটা, ভালোবাসার মানুষদের ছোটো ছোটো খুশি গুলোকেও উনি গুরুত্ব দিতেন। আজ তাই মহামায়াও বদ্ধপরিকর ,মানুষটার রক্ত জল করা পরিশ্রম দিয়ে গড়া এই মন্দির ঠিক রক্ষা করবেন, শুধুই তো আঁচল পেতে নিয়েছেন মানুষটার কাছে, না চাইতেই প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশিই পেয়েছেন ,আজ সেটা ফিরিয়ে দেওয়ার পালা, মানুষটার আত্মা নাহলে শান্তি পাবেনা। ওই মানুষ টা ছাড়াও একবার তার জন্মদিন খুব ধুমধাম করে পালন হয়েছিলো তার স্কুলে। বছর টা দু হাজার সাল… তার স্কুল থেকে মাধ্যমিকে সেবার brilliant result হয়েছে। পঞ্চাশ জনের মধ্যে পয়তিরিশ টা স্টার, বাকিরা ফার্স্ট ডিভিশন, নিজের হাতে তৈরী করেছিলেন সেই ব্যাচ টাকে, সাথে সহযোগিতা করেছিলেন বাকি মিস রাও। সবাই কে তাক লাগিয়ে দিয়েছিল তার স্কুল। সেদিন ছিল দুহাজার সালের দোসরা মার্চ, স্কুল ছুটি কিন্তু এত ভালো রেজাল্ট এর জন্য সবাই সেদিন একত্রিত হয়েছিলেন, উৎসবের মেজাজ, কাকতালীয় ভাবে ওইদিনই মহামায়ার জন্মদিন.. একে একে প্রত্যেক টা কৃতী ছাত্রছাত্রী মহামায়া কে প্রণাম করে এক একটা গোলাপ দিয়ে বড় মিসকে জন্ম দিনের শুভেচ্ছা জানিয়েছিল,শপথ করেছিলো যে যেখানেই থাক মিসের দেখিয়ে দেওয়া মনুষ্যত্বের পথ থেকে কোনোদিনও সরে আসবে না। সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতে মহামায়া দৈনন্দিন কাজে মত্ত হয়ে গেলেন।কিন্তু ঘুনাক্ষরেও টের পেলেন না একটু বাদেই কি হতে চলেছে…..
দেখতে দেখতে বেলা এগারোটা বেজে গেলো, হঠাৎ করেই কুহু কুহু শব্দে বেল টা বেজে উঠলো, আজ আবার কে এলো। পরী মা দেখত কে এলো। না আজ আর একজন নয়, এক ঝাক তারা অপেক্ষা করছে, মহামায়ার ঘরের বাইরে। পরী দৌড়ে এলো, ওমা মাসি দেখবে চলো, কতো নতুন লোক এসেছে গো বাইরে দাঁড়িয়ে আছে। কি বলিস রে, বলেই মহামায়া ছুটে গেলেন দরজার দিকে…
মহামায়াকে বাইরে বেরিয়ে আসতে দেখেই, আকাশ বাতাস মুখরিত করে শুধু একটাই সুর বাজতে লাগলো… Happy birthday to you, Happy birthday to you,Happy birthday to dear বড় মিস,… Happy birthday to you….
একজন নয় দুজন নয় সমাজে সুপ্রতিষ্ঠিত পঞ্চাশ জন মধ্যবয়সী পুরুষ ও নারী হাতে গোলাপ নিয়ে হাঁটু মুড়ে বসে আছে রাস্তায়, সামনে লেখা আমরা ব্যাচ 2000…..
স্মৃতির অতল থেকে আস্তে আস্তে ছোট ছোট মুখ গুলোকে মেলাতে চেষ্টা করছেন মহামায়া। হ্যাঁ চেনা চেনা লাগছে যেনো! ওইতো ওই ছেলেটা, কাল এসেছিল। মিস আমাকে চিনতে পারছেন না। আমি বরুণ, বরুণ সেনগুপ্ত। আমি ওই ব্যাংকের জোনাল হেড…। মিস আমি সৌম্য গাঙ্গুলি…।
-“হ্যাঁ হ্যাঁ এত সেই দুষ্টু সৌম্য…”
-“মিস আমি নীলাক্ষী, নীলাক্ষী সান্যাল। উত্তর চব্বিশ পরগনার ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট।” মহামায়া তাকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। “ওই তো, ওই তো সঞ্জয়, সঞ্জয় ধর। শেষ বেঞ্চে বসে দুষ্টুমি করত।” আজ সে বড় Industrialist, তার আর এক পরিচয় হল সে একজন মানুষ। আজ সে পাঁচশো গরিব বাচ্চার দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছে…. একে একে সবাই এসে প্রণাম করছে,
-“ওই তো করবি”, করবি পাঠক, কি সুন্দর english বলত, আজ সে এক কর্পোরেট সংস্থার ডিরেক্টর। এ যেনো চাঁদের হাট বসেছে। না মহামায়া হেরে যাননি, এই তো তিনি মানুষ তৈরী করতে পেরেছেন। তার দেওয়া পাঠকে পাথেয় করে এগিয়ে চলেছে এক ঝাঁক যুবক যুবতী। আজ যেন জয়ের বাদ্য বাজছে, বহুদিনের না পারার অব্যক্ত যন্ত্রণা আজ জল হয়ে গলে পড়ছে দু চোখ দিয়ে। সবাইকে নিয়ে কেক কাটলেন মহামায়া। বিধাতা আজ যেন মহামায়ার আরও কিছু দেওয়া বাকি রেখেছিলেন…। এবার বরুণ এগিয়ে এলো। মহামায়ার হাতে এগিয়ে দিলো কিছু কাগজ। এ যে তারই বাড়ির দলিল! সাথে ব্যাংকের লোন Clearance Certificate… মহামায়ার হাতে গড়া তারই ব্যাচ দু-হাজার আজ যেনো তাকে গুরু দক্ষিণা ফিরিয়ে দিল।
দৌড়ে শুভময়ের ছবির সামনে চলে গেলেন মহামায়া। অজস্র আনন্দাশ্রু আজ যেনো এক একটা মুক্তর মতো ঝড়ে পড়ছে তার গাল দিয়ে।
-“দেখ অবশেষে আমাদের ভালোবাসার মন্দিরকে রক্ষা করতে পেরেছি। আজ আমি শুধুই একটা অমানুষের মা নই। আজ আমি এক ঝাঁক মানুষেরও মা। আমি মহামায়া চ্যাটার্জি। শুভময় চ্যাটার্জির গর্বিত স্ত্রী…।”