বাড়িটা তিন তলা। বেশ বড় সড় আর খোলা মেলা। দু চোখ মেলে চারদিক দেখতে দেখতে গাড়ি থেকে নামলো রিন্টি। কেমন যেন স্বপ্নের মত লাগছিল। জীবনে প্রথম গাড়ি চড়া ওর। তাও ঠাণ্ডা গাড়ি। কোনদিন কি ভাবতে পেরেছিল গাড়ি চড়তে পারবে ও। সন্ধেবেলা যখন শিখা বৌদি নিয়ে এসে দেখা করালো ওই অর্চনা বৌদির সঙ্গে তখনও বুঝতে পারছিল না ও। কী হবে ওর ? যদি ওকে পছন্দ না হয় ? তাহলে ? কিন্তু পুরো উল্টো হয়ে গেল। ওকে দেখেই হাত বাড়িয়ে কাছে টেনে নিল অর্চনা বৌদি। “ বাহ ! তোর চোখ দুটো তো ভারী মায়াবী রে ! আর মুখখানাও কী সুন্দর ! থাকবি আমার বাড়ি? যাবি আমার সঙ্গে ?” হঠাৎ করে এক ঝলক জল এসে গেল চোখে। সেই কবে বাবা মা মরে গেছে। দুটো মিষ্টি কথা শোনা ভুলেই গেছিল ও। দাদা বৌদিদের লাথি ঝাঁটা খেয়ে, সারাদিন অবিশ্রান্ত কাজ করে দুপুরে এক মুঠো ঠাণ্ডা ভাত আর জলের মত ডাল পেটে দিয়ে মড়ার মত পড়ে থাকত। বিকেল হতে না হতেই আবার খাটনি শুরু। সারাদিনে বাঁচার মত একটা সময়ই ছিল। যখন পিসিমার কাছে যাবার ফুরসৎ মিলতো। পিসিমাই একমাএ আদর করে কাছে ডাকত। কিন্তু আর কেউ তো কখনও এমন করে কথা বলেনি। ওর চোখ মায়াবী ? মুখ সুন্দর ! কই কখনও শোনে নি তো ? আয়নায় মুখই দেখে না ও। সেই ছোট বেলায় ইস্কুলে যাবার সময় মা দুদিকে ঝুঁটি বেঁধে , আঁচল দিয়ে মুখ মুছিয়ে আয়না ধরতেন মুখের সামনে। মা চলে যাবার পর থেকে আর আয়নার সামনে দাঁড়ায় না ও। এমনিই চুল আঁচড়ে নেয়। অভ্যেস হয়ে গেছে। আজ অবশ্য শিখা বৌদি ভালো করে চুল আঁচড়ে মুখ পরিষ্কার করিয়ে নিয়ে এসেছে। কী জানি ওর মুখে কী ফুটে উঠেছিল ? অর্চনা বৌদি হাত দিয়ে ধরে রেখেছিল ওর হাত। কী ভরসা আর বিশ্বাস যে ছিল হাত টার মধ্যে ! নির্ভর করতে পেরেছিল ও। মনে হয়েছিল এবার বোধহয় ভগবান মুখ তুলে চেয়েছেন ! “ আয়। ভেতরে আয়। ওখানে দাঁড়িয়েই সব দেখবি নাকি?” গেটের মুখে দাঁড়িয়ে ডাক দিয়েছিল বৌদি। ভয়ে ভয়ে বিরাট গেট টা দিয়ে ভেতরে ঢোকে ও। সামনে বিরাট বাগান। এক পাশে ফুল। অন্য পাশে ফল আর সবজি। কী চমৎকার বেগুন হয়েছে গাছে ! সবুজ সতেজ কাঁচা লংকা ঝুলছে বোঁটা থেকে ! টুকটুকে লাল টমেটো। নধর ঢ্যাড়োশ উঁকি মারে পাশ থেকে। টবে গাছ। কিন্তু বেশ বোঝা যাচ্ছে যে খুন যত্ন করা হয়। ইস ! ওকেও যদি বলে এই গাছ গুলোকে দেখা শোনা করতে। কী ভালই না হবে ! ওরাই তো ওর বন্ধু। কত সুখ দুঃখের সাথী। এক পলক গ্রামের স্মৃতি ভেসে আসে ওর মনে। প্রায় দিনই তো ভাতের সঙ্গে পাতলা ডাল ছাড়া আর কিছু জুটত না ওর কপালে। তখন নিজের হাতে লাগানো ওই কাঁচা লংকা, আর টমেটো দুপুরের ভাতের সঙ্গী হয়েছে। কাঁচা লংকায় কামড় দিতে দিতে মনে মনে ভাবত ও — এই মুখে দিলাম তরকারি। এই এক গাল ভাত খেলাম মাছ দিয়ে। ভাবতে ভাবতে লংকা, টমেটো দিয়ে কখন শেষ হয়ে যেত ভাতের থালা ! ওরা বলুক আর না বলুক রোজ কাজের পরে গাছ গুলোর যত্ন করবে ও। যে করে তাকে বলেই করবে। “ কই আয় –” দোতলার সিঁড়ির মুখে দাঁড়িয়ে আবার ডাক দেয় অর্চনা। মেয়েটা একদম সরল আর সাধাসিধে। সদ্য গ্রাম থেকে এসেছে। বড্ড গরীব । এত বড় বাড়ি দেখে ঘাবড়ে গেছে। হতেই পারে। দুটো মিষ্টি কথা বলেছে অমনি গলে জল। চোখ দুটো যেন শান্ত দীঘি। টলটল করছে জল। একটু ছুঁয়ে দিলেই বুঝি উপচে উঠে গড়াবে ওই নিটোল গাল বেয়ে। বেশ সুশ্রী কিন্তু। তাও পেট ভরে খেতেই পায় না। একটু যত্ন করলেই চেহারা ফিরে যাবে। রূপও খোলতাই হবে। বাপ মা মরা মেয়ে। ভাইদের সংসারে লাথি ঝাঁটা খাচ্ছিল। কলকাতায় এসেছে ভাগ্য ফেরাতে। যার কাছে এসেছে তার নিজের অবস্থাই তো তথৈবচ। নিজেরা কী খাবে আবার একে কোথায় রাখবে ? কোনক্রমে কোথাও জুতে দিতে পারলে বাঁচে। দোলার কাজের লোকটার তো মুখ দেখে সেই কথাই মনে হচ্ছিল। মনে হয় না আর কোনদিন খোঁজ নিতে আসবে।