হাবু আর গবু দুজনে এক শীতের সন্ধ্যায় তান্ত্রিক তারা শঙ্করের বাড়ী যায় গল্প শুনতে । যাবার সময় দোকান থেকে গরম গরম পিয়াজি কিনে নিয়ে যায় মুড়ি দিয়ে খাবে বলে। আর এক প্যাকেট বিড়ি কিনে নিয়ে যায় তারা শঙ্করের জন্য । কলিং বেল বাজাতেই বৌদি এসে দরজা খুলে দেয়। একটু বাদে তারা শঙ্কর এসে বসে ওদের পাশে। ওরা পিয়াজির ঠোঙাটা তারা শঙ্করের সামনে রাখতেই তারা শঙ্কর তার স্ত্রী মধুবালাকে ডাক দিয়ে বলে একটা বাটিতে করে মুড়ি আর তিন কাপ চা দিয়ে যেতে। আয়েস করে মুড়ি পিয়াজি খেতে খেতে গবু বলে… ” তারা দা আজ একটা জমিয়ে ভূতের গল্প বলো তো এই শীতের মধ্যে।” তারা শঙ্কর….”শোন তাহলে পরিত্যক্ত রুজভেল্ট নাগরীর গল্পটা আজ তোদের বলি। “
দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের সময় আমেরিকা কলকাতা থেকে প্রায় পঞ্চাশ কিলোমিটার দূরে নদিয়া জেলার গঙ্গার তীরে পয়তাল্লিশটি গ্রাম নিয়ে একটি সেনা নোগরী গড়ে তুলেছিল। আমেরিকার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্কলিন D রুজভেল্ট সাহেবের নামে নাম করণ করে নাম রাখা হয়েছিল, “রুজভেল্ট সেনা নগর”। এখানে সেনা নিবাস, সেনা চাউনি,সেনাদের প্রয়োজনীয় হাসপাতাল, স্কুল, কলেজ, এয়ারপোর্ট, রেল স্টেশন সব নির্মাণ করেছিল আমেরিকার সরকার। এখান থেকে জাপানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিচালনা করাই ছিল তাদের উদ্দেশ্য। তখন রেল স্টেশনের নাম ছিল চাঁদমারী হল্ট । এই নগর নির্মাণের কিছু দিন পর দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধ থেমে গেলে আমেরিকান সৈনিকরা তাদের দেশে ফিরে চলে যায়। এই শহরের প্রয়োজনীয়তাও তাদের ফুরিয়ে যায়। সেই থেকে এই শহরটি পরিত্যক্ত অবস্থায় পরে ছিল সুদীর্ঘ কাল। কালের নিয়মে গাছ পালা বন জঙ্গল ঘিরে ধরে ছিল সেনা নগরটিকে। এই জঙ্গলের মধ্যে যে এমন একটা ফৌজি শহর লুকিয়ে আছে সেটা কেউ বুঝতে পারতো না। মানুষের জানার অন্তরালে রয়ে গিয়েছিল। ডাক্তার বিধান চন্দ্র রায় পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হবার পর কলকাতা শহরের চাপ কমাবার জন্য একটা বিকল্প শহর নির্মাণের কথা ভাবেন। তখন ওঁনার মনে পরে যায় নদীয়া জেলার পরিত্যক্ত এই রুজভেল্ট ফৌজি শহরের কথা । তিনি এই পরিত্যক্ত রুজভেল্ট সেনা নগরীকে পুনরুজ্জীবিত করে একটা প্ল্যানড সিটি তৈরি করার পরিকল্পনা করেন। ১৯৫০ সালে তৈরি হয় এই শহরের মাস্টার প্ল্যান । ১৯৫১ সালে রাজ্যপাল কৈলাশ নাথ কার্টজু এই শহরের শিলান্যাস করেন। পরবর্তী কালে ১৯৫৪ সালে চাঁদমারী হল্টের নাম পরিবর্তন করে নতুন নাম রাখা হয় কল্যাণী স্টেশন । পরে কল্যাণী স্টেশনের নাম থেকে পুর শহরটার নাম হয়ে যায় কল্যাণী শহর । ডাক্তার বিধান চন্দ্র রায় এই শহরের রূপকার। অনেকে বলেন ডাক্তার বিধান চন্দ্র রায় এই শহরের নাম “কল্যাণী “নাম করণ করেছিলেন “কল্যাণী” নামে তার একজন প্রেয়সীর নামে। সেই বিষয়টা নিয়ে বহু মতান্তর আছে। কোনটা ঠিক আর কোনটা ভুল এখন আর সেটা বোঝার উপায় নেই। তাই ডাক্তার বিধান চন্দ্র রায় এবং কল্যাণী নামে ডাক্তার নীলরতন সরকারের এক মেয়ের অপূর্ণ প্রেমকাহিনী নিয়ে যেটা শোনা যায় সেটা সম্ভবত আষাঢ়ে গল্প হলেও হতে পারে । কারণ বাস্তবে ডাক্তার নীলরতন সরকারের ঐ নামে কোন মেয়ে ছিল না বলেই জানা যায় । আর ডাক্তার নীলরতন সরকারের সঙ্গে ডাক্তার বিধান চন্দ্র রায়ের সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত মধুর। ডাক্তার নীলরতন সরকার ছিলেন এক জন ধন্বন্তরি চিকিৎসক তেমনি এক জন নিরঅহংকারী জন দরদী ভালো মানুষ। ওঁনার ছিল পাঁচ মেয়ে আর এক ছেলে। তাদের নাম ছিল ….১) নলিনী বসু ২) অরুন্ধতী চ্যাটার্জী ৩) শান্তা সেন ৪) মিরা সেন ৫) কমলা চ্যাটার্জী। পুত্রের নাম ছিল .. অরুন প্রকাশ সরকার। বস্তবে সেই রুজভেল্ট সেনা নগরীই এখন আমাদের কল্যাণী শহর।
হাবু…. “আচ্ছা তারা দা তুমি কি একটা বলবে বলেছিলে যে পরিত্যক্ত রুজভেল্ট নগরীর বিষয়ে। একটা ভৌতিক ঘটনার কথা তুমি শুনেছিলে । সেটা একটু আমাদের বল না শুনি। “ তারা শঙ্কর…” হ্যাঁ সেটাই আজ বলবো তোদের। আমার ঠাকুর দা একবার তার শিষ্যর কাছ থেকে আমন্ত্রণ পেয়ে ঐ রুজ ভেল্ট নগরীর দিকে একটা বাড়ীতে গিয়েছিল কয়েক দিনের জন্য। আজ সবুজায়ন ও পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতায় এই শহর এক নম্বর । কিন্তু এমন এক দিন ছিল যে সে দিনের এই শহরের সঙ্গে আজকের এই শহরের কোন মিল খুঁজে পাওয়া যাবে না। আমেরিকান সৈনিকরা এই শহর ছেড়ে চলে যাবার পর বহু বছর জনমানব হীন অবস্থায় পরে ছিল এই নগরী। পরিত্যক্ত অবস্থায় পরে থাকার জন্য গাছ পালা বন জঙ্গলে ঢেকে গিয়েছিল এই সুন্দর ছোট্ট নগরীটা। বাইরে থেকে বোঝা যেত না যে এই গভীর বনের মধ্যে একটা সামরিক শহর ছিল। ঘর বাড়ী গাড়ি ঘোরা বিমান ইত্যাদির মধ্যে সাপ কোপ বিষাক্ত পোকা মাকর বাসা বেঁধেছিল নিরাপদে । চেনা অচেনা নানা প্রকার গাছের জন্ম হয়েছিল এই নগরীতে। কিছু কিছু গাছ নাকি ছিল ভয়ঙ্কর । অনেকে বলতো মানুষ খেকো গাছ। এই নগরীর বনের মধ্যে দিয়ে একটা জন পথ ছিল। শর্ট কাট রাস্তা হওয়াতে দিনের বেলা এক দুজন যাওয়া আসা করলেও সূর্যো ডোবার পরে এই পথ কেউ মাড়াতো না। ভয়ে গা ছম ছম করতো। যে গ্রাম গুলো নিয়ে এই ফৌজি শহর গড়ে উঠেছিল তার মধ্যে একটা ছিল আদিবাসী সাঁওতাল গ্রাম। এটা বলছি রুজভেল্ট নাগরী গড়ে ওঠার আগের কথা । তখন এই গোটা অঞ্চল ছিল সবুজ বনানীতে ঘেরা। আর ছিল দিগন্ত প্রসারিত সবুজ ধানের খেত। প্রচুর চাষবাস হতো তখন এই অঞ্চলে। ধান পাট তো হতোই তাছাড়া শীতকালে রবি শস্য হতো ভালো। আর সেই বনে কি না ছিল। বাঘ সিংহ বাদ দিয়ে আর প্রায় সব জন্তু জানোয়ারই ছিল এই বনে । আর ছিল বহু প্রজাতির পাখির বাস । সূর্যো ডোবার পরে অন্ধকার নেমে এলেই শুরু হয়ে যেত ঝিঁ ঝিঁ পোকা আর শিয়ালের ডাক। প্যাঁচার শিকার ধরার জন্য পাখা ঝাপটানো তার সঙ্গে রাত জাগা পাখির কর্কশ আওয়াজ মিলে ভয়াল করে তুলতো এই বনের পরিবেশ। রাত যত বাড়তো অন্ধকারের ঘনত্ব তত বাড়তো। কালো চাদরে মুড়ে যেত পুর অঞ্চলটা। রাতটাকে মনে হত বিভীষিকাময়। শোনা যায় এই জঙ্গলের মধ্যে মাঝে মাঝে অপদেবতাদের দেখা পাওয়া যেতো। সেই ভয়ে সাধারণ মানুষ কেউ এই পথ দিয়ে রাতের বেলা যাওয়া আসা করত না। তবে এই বনটা ছিল আদিবাসীদের জীবন। ওরা এই বন থেকে বেঁচে থাকার বহু রসদ সংগ্রহ করতো। বলা ভালো এই বনকে অবলম্বন করেই ওরা বেঁচে ছিল। ওদের ভয় ডর কম থাকায় ওরা কেউ কেউ ঐ বনের মধ্যে যেত সাপ, বন বিড়াল,ইঁদুর ও পাখি শিকার করতে। এই বনের মধ্যে একটা বিশেষ গাছ ছিল সেই গাছটাকে আদিবাসীরা পূজো করতো। রাতের বেলা সিঁদুর ও তেল দিয়ে গাছের গোঁড়া লেপে দিত। মশাল জ্বলতো অনেক গুলো। সেই মশালের আলোতে আদিবাসী সাঁওতাল রমণীরা পূজো করতো । ঐ গাছটা ভয়ঙ্কর হলেও আদিবাসীদের কাছে ছিল দেবতা। ঐ গাছটাকে ওরা খুব মানত। পুরুষরা মাদল বাজাতো আর নারী পুরুষ সবাই মাদলের তালে তালে নাচ করতো। পুরুষরা সাদা ধুতি পড়তো হাঁটুর উপর পর্যন্ত আর মাথায় মাগছা বাঁধতো। মেয়েরা ছোট সবুজ পেড়ে হলুদ শাড়ি পড়তো হাঁটুর উপর পর্যন্ত আর মাথায় বাহারী জংলী ফুল দিয়ে সাজতো। এখানে শহর তৈরির জন্য যখন জঙ্গল কাটা শুরু হয় তখন এই অঞ্চলের আদিবাসীরা ভীষণ ভাবে বাধা দেয়। মারমুখি হয়ে ওরা সরদারের নেতৃত্বে দল বেঁধে এগিয়ে এসে লড়াই করেছিল । ঘেরাও করে রেখেছিল আধিকারিকদের। এখানে ওদের প্রবেশ অধিকার বন্ধ হয়ে যাবার জন্য অশান্ত হয়ে উঠেছিল এই আদিবাসী সাঁওতাল সমাজ। আধিকারিকরা প্রথমে কিছু বলতে চায় নি কারণ খবরটা ছড়িয়ে পড়লে দশ বিষটা গ্রাম থেকে বাঁধা আসতে থাকলে বিপদ হয়ে যাবার ভয় ছিল । কারণ এই জঙ্গল এক দিকে ওদের জীবন জীবিকার মূলধন আর অন্য দিকে এই জঙ্গলকে ওরা দেবতা বলে মানে । এই জঙ্গলে ওদের দেবতার থান আছে। তাছাড়া এই অরণ্যের উপর ওদের বংশ পরম পড়ায় অধিকার চলে আসছে। সেই অধিকার ওরা জীবন দিয়ে রক্ষা করতে চায়। কিন্তু এখন আর কোন উপায় নেই আধিকারিকদের। শহরের নীল নকশা তৈরি হয়ে গেছে। এখন যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এলাকা পরিষ্কার করে ফেলতে হবে। কোন গাছ এখানে রাখা যাবে না। সাঁওতাল আদিবাসীদের প্রধান দেবতা হলো মারাং বুরু । সাঁওতাল সমাজে নানা উপকথা ও কাহিনী প্রচলিত আছে এই মারাংবুরুকে নিয়ে। মারাং বুরুকে তারা শক্তির প্রধান উৎস বলে মনে করে। এর কোন মুখ বা আকৃতি বা মূর্তি নেই। এরা মারাং বুরু বলতে প্রকৃতিকে বোঝে । মারাং বুরুর আসল নাম হলো “লিতা “। প্রকৃতিতে যা কিছু পাওয়া যায় সব কিছুই দেন এই মারাং বুরু। সাঁওতালরা মূর্তি পূজা বিশ্বাস করে না। তাদের মতে দেবতার কোন আঁকার নেই । প্রকৃতিকে তারা মারাং বুরু হিসাবে পূজা করে। তাদের মতে মারাং বুরুই প্রথম মানব জুটি। পিলচু হাড়াম ও পিলচু বুধিকে চাষাবাদ,নাচ,গান,শিকার ও চোলাই মদ তৈরি করতে শিখিয়েছেন মারাং বুরু । । মারাং বুরুই সাঁওতালদের ভাত থেকে চোলাই মদ তৈরি করতে শিখিয়ে ছিলেন। তাই আজও মদ খাওয়ার আগে কয়েক ফোটা মদ মারাং বুরুর উদ্দেশ্যে ছিটিয়ে দেয় সাঁওতালরা । মারাং বুরু নারী না পুরুষ সেটা বলা যায় না। আসলে নারীও না পুরুষও না। প্রকৃতিই মারাং বুরু। নানা লোককথা প্রচলিত আছে । একটি লোককথা অনুযায়ী সৃষ্টির প্রথমে এই বিশ্বব্রহ্মান্ডে শুধুই জল ছিল। চারি দিকে ছিল বড় বড় সমুদ্র। মাটি ছিল না। কোন প্রাণী ছিল না। মারাং বুরু এবং আরও কয়েক জন দেবতা ঠিক করলেন যে তারা এই পৃথিবীতে মানুষ, উদ্ভিদ ও অন্যান্য প্রাণীর সৃষ্টি করবেন। তাই মারাং বুরু একটি পুরুষ পাখি ও মালঙ বুধি নামে আর এক জন দেবতা একটি স্ত্রী পাখির রূপ নেয়। কিন্তু মাটি খুঁজে পায় না ওরা বসবাসের জন্য । তখন জলের মধ্যে একটি কচ্ছপকে ওঁরা অনুরোধ করে তার পিঠে বাসা বানাবার জন্য। কচ্ছপ মত দিলে ওঁরা দুজনে কচ্ছপের পিঠে বাসা বানায় । সেখানে স্ত্রী পাখিটি দুটি ডিম পারে। কিছু দিন পর সেই ডিম ফুটে একটি ছেলে ও একটি মেয়ের জন্ম হয়। ছেলেটির নাম হয় পিলচু হাড়াম ও মেয়েটির নাম হয় পিলচু বুধি। এরাই হলো পৃথিবীর প্রথম মানুষ। সাঁওতাল জনজাতি গোষ্ঠীর মানুষেরা প্রধানত স্বার্ণা বা সারি ধর্মীয় বিধি মেনে চলে। তারা প্রধানত প্রকৃতির পূজারী। মারাং কথার অর্থ হলো বিরাট বা মহৎ আর বুরু কথার অর্থ হলো পর্বত। তার মানে মারাং বুরু হলো বিরাট পর্বত বা মহৎ পর্বত । এই সমস্যায় পরে মারাং বুরুর শরণাপন্য হয় আদিবাসীরা । মারাং বুরুর নির্দেশে ঐ গাছটার মধ্যে ওরা বসিয়েছিল দেবী জাহিরেরার থান। দেবী জাহিরেরা ওদের কাছে জীবন্ত মূর্তি । গাছটাকে কেটে ফেলা আর দেবী জাহিরেরাকে মেরে ফেলা একই কথা। দেবী জাহিরেরা এখানে মানবী রূপে এসে দেখা দেন আর পূজা নেন ভক্তদের কাছ থেকে। তাই যে কোন মূল্যে ওরা এই গাছটাকে রক্ষা করতে চায় । কিন্তু শেষ পর্যন্ত আদিবাসীরা পিছু হটতে বাধ্য হলো পরাক্রম শালী আমেরিকান সরকারের কাছে। ঐ গাছটাকে যখন কাটা হচ্ছিল তখন ঐ গাছটার গোড়া থেকে কাল জলের ধারা বেরিয়ে এসেছিল গল গল করে। অনেকে এটাকে পঁচা রক্ত বলে অভিহিত করেছেন । যেটা দেখে অবাক হয়ে গিয়েছিল উপস্থিত সকলেই । এ দৃশ্য এর আগে কেউ কখনো দেখেনি কোন দিন। নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিল না। তবুও থামেনি শহর নির্মাণের জন্য নিযুক্ত আধিকারিকরা। দেখতে দেখতে চোখের সামনে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় পুর বনটা। আদিবাসীরা কান্নায় ভেঙে পড়ে। এলাকা ছেড়ে চলে যায় কোন দূর অঞ্চলে। বিশ্বাসের মূলে আঘাত করায় ওরা রেখে যায় একরাস অভিশাপ। ক্রধের বহিঃপ্রকাশ পায় এই অভিশাপের মধ্যে দিয়ে। এর অল্প দিনের মধ্যে নানা অঘটন ঘটতে থাকে এই শহরের নির্মাণ কার্য শুরু হবার সময় থেকেই । ঐ ঘটনা গুলোকে কারো কারো কাছে অলৌকিক ঘটনা বলে মনে হয়েছে। এই নগরীতে বসবাসকারীদের মধ্যে মৃত্যুর হার ব্যাপক মাত্রায় বেড়ে গিয়েছিল। কম বয়স্ক থেকে বেশি বয়স্ক প্রচুর মানুষ মরে যেতে থাকে কোন কারণ ছাড়াই। এর সঠিক কারণ কেউ কিছু খুঁজে বের করতে পারেনি। বেশ কিছু সংখ্যক মানুষ মারা যাবার পর প্রশাসনের টনক নড়ে। তারা এর কারণ অনুসন্ধান করতে শুরু করে। কর্মচারীরা কেউ আর একা একা কোয়ার্টারে থাকতে রাজি হচ্ছিল না। তাদের মধ্যে সাংঘাতিক একটা মৃত্যু ভয়ের সঞ্চার হয়ে গিয়েছিল। মৃত্যু ভয় তাদের সব সময় তাড়িয়ে বেড়াতে থাকে। এই কারণে অনেক কোয়ার্টার ফাঁকা হয়ে পরেছিল। কোয়ার্টারে থাকলে কি ভাবে মৃত্যুর হার বেড়ে যেতে পারে এটা প্রশাসকদের মাথায় ঢুকছিল না। এটাকে তাদের অবাস্তব বলে মনে হয়। তাদের মতে এটা কোন অলৌকিক ভিত্তি ছাড়া আর কিছু হতে পারে না। এই সব নিয়ে নানা জল্পনা কল্পনা চলতে থাকে। এক সময় এই খবর আমেরিকায় গিয়ে পৌঁছায়। তারপর সেখান থেকে কয়েক জন নতুন সাহসী অফিসারকে পাঠানো হয় এই নগরীতে পর্যবেক্ষণ করতে । তাদের মধ্যে এক জন জাপানের ফুজি পর্বত মালার অরণ্যের উদাহরণ টেনে এনে এর ব্যাখ্যা বের করার চেষ্টা করে। যদি কোন পর্যটক ঐ অরণ্যে এক বার প্রবেশ করে তখন সে একটা অলৌকিক শক্তি দ্বারা পরিচালিত হতে থাকে । সেই অলৌকিক শক্তি তার মগজ ধোঁলাই করে তাকে আত্ম হত্যা করতে বাধ্য করে । এই ভাবে প্রচুর মানুষ ঐ পর্বত অরণ্যের ভিতরে প্রবেশ করে আর ফিরে আসতে পারেনি। তাই জাপান সরকার ঐ পর্বত অরণ্যকে আত্মহত্যার অরণ্য নামে চিহ্নিত করেছে। অনেক গুলো কোয়ার্টার দীর্ঘ দিন ধরে ফাঁকা পরে থাকার জন্য জীর্ণ হয়ে গিয়েছিল। অনেকে ঐ কোয়ার্টার গুলোতে ভূত প্রেতের কথা বলে। তাদের ধারণা এক বা একাধিক অশরীরী আত্মা বাসা বেঁধেছে এই কোয়ার্টার গুলোর মধ্যে। সেই আত্মাই মানুষকে ভয় দেখিয়ে মৃত্যুকে বরণ করে নেবার প্রবণতা বাড়িয়ে দিচ্ছে। এক দিন একজন কার্যকরী অফিসার রাতের অন্ধকারের মধ্যে জানলার ফাঁকা দিয়ে দেখতে পান যে একটা পরমা সুন্দরী মেয়ে ধোঁয়ার কুন্ডলির মধ্যে থেকে বেরিয়ে এসে এই কোয়ার্টারে বসবাসকারী এক জনকে ডেকে নিয়ে যায়। ঐ মহিলা তাকে ডেকে নিয়ে গিয়ে এমন যন্ত্রনা দিতে থাকে যে সে তখন একটা ধারালো ছুরি দিয়ে তার গলার নলি কেটে ছটফট করতে করতে মৃত্যু বরণ করে । সে মারা যাবার আগে দেখতে পায় অনেক মানুষ গলায় দড়ি দিয়ে কালো ছায়ার মতো ঝুলছে ফ্যানের রডের সাথে এবং চিৎকার করে সে এই সব কথা বলতে থাকে । আশেপাশের মানুষ কান খাড়া করে তার কথা শুনে বিষয়টা বোঝার চেষ্টা করে। তবে পরিষ্কার ভাবে বুঝতে পারে না। মাঝে মাঝ তীক্ষ্ণ চিৎকার শোনা যায় কোয়ার্টার গুলোর ভিতর থেকে। কখনো আবার গোঙ্গানির শব্দ কানে ভেসে আসে। পঁচা লাশের আঁশটে গন্ধে গা গুলিয়ে ওঠে। বমি পেয়ে যায়। এক দিন এক জন সৈনিক কোয়ার্টারের বাইরে থেকে দেখতে পায় কোয়ার্টারের মধ্যে এক জন লোক একটা সুন্দরী মহিলার পাশে বসে নিজের গলা নিজে চেপে ধরে রয়েছে । ঐ সৈনিক শুনতে পায় যে মহিলা পাশে বসে ঐ লোকটাকে বলছে তুই পারবি তুই পারবি মরতে। মর মর তাড়াতাড়ি মর। লোকটা বলছে আমার যন্ত্রনা হচ্ছে আমার কষ্ট হচ্ছে। আমি মরতে চাই না, আমার বৃদ্ধ বাবা আছে মা আছে। আমি তাদের জন্য বাঁচতে চাই। মহিলা বলে তুই না মরলে তোর পেটে এই ছুরিটা ঢুকিয়ে দেবো। এই বলে মহিলা ধারালো চকচকে ছুরিটা তার পেটের কাছে ধরে। এরপর লোকটা তার গলায় গামছা বেঁধে ফ্যানের রডে ঝুলে পড়ে মারা যায়। তারপর ঐ সুন্দরী মহিলা ছায়া হয়ে বাতাসে মিলিয়ে যায়। আদিবাসীরা যখন এই খবর শুনতে পায় তখন তাদের মনে হয় যে ঐ মহিলা আর কেউ নয় স্বয়ং আদিবাসী দেবী জাহিরেরা। যার থান এই শহরের অফিসাররা উফরে ফেলে দিয়েছিল শহর নির্মাণের সময় । সেদিন এই শহরের অফিসাররা বুঝে উঠতে পারেনি যে দেবী জাহিরেরা কতটা ভয়ঙ্কর হয়ে উঠেতে পারে সময় বিশেষে। এখন তাদেরকে আর এই প্রতিশোধের হাত থেকে বাঁচার কোন পথ নেই। দেবী জাহিরেরা এই শহরে বসবাসকারী মানুষের মাথায় ঢুকে পরে তাকে মৃত্যুর দিকে টেনে নিয়ে যেতে বাধ্য করে । এই ভাবে কারো মৃত্যু হলে অপঘাতে তার মৃত্যু হয়েছে বলে ধরে নেওয়া হয়। এক দিন দেখা যায় সেই সুন্দরী মহিলা এলো চুলে উস্কোখুস্ক চেহারা নিয়ে বসে আছে পথের ধারে। মাঝে মাঝে বিড় বিড় করে বলছে আমার এখনো প্রতিশোধ নেওয়া শেষ হয় নি। আমার রক্তের দাগ আমি ভুলতে পারছি না। একদিন সন্ধ্যার পর শহরের একটা জায়গায় প্রচুর মানুষের জটোলা হতে দেখাতে পাওয়া যায়। কেউ চিৎকার করছে, কেউ হাউ হাউ করে কাঁদছে। নানা মানুষ নানা কিছু বলাবলি করছে। ভিড় ঠেলে কাছে যেতে দেখা গেলো একটা যুবকের মর দেহ পরে আছে । দেহটা বিশ্রী অবস্থায় পরে আছে। তাকানো যাচ্ছে না। শরীরের বিভিন্ন জায়গার মাংস পেশী কোন ভয়ানক জন্তু যেন খুবলে খেয়েছে। বুকের ভিতর থেকে কলজেটা ছিঁড়ে বের করে নিয়েছে। পেটের নারীভুঁড়ি কেউ ছিড়ে টুকরো টুকরো করে চারি দিকে ছড়িয়ে দিয়েছে। মুখটা কোন ভারী পাথর জাতীয় কিছু দিয়ে থেতলে দিয়েছে। ধারালো নক দিয়ে চোখ দুটো উপরে নিয়েছে। এই সব দৃশ্য দেখতে গিয়ে গা শির শির করে ওঠে। হাঁটু কাঁপতে থাকে থর থর করে। সকলের ধারণা হয় এই নাগরীতে কোন ভয়ঙ্কর মাংসাসী জানোয়ারের প্রবেশ ঘটেছে। কিন্তু সারা শহর তল্লাশি করে কোথাও কোন জন্তু জানোয়ারের সন্ধান পাওয়া গেলো না। অবশেষে মানুষ বুঝতে বাধ্য হলো যে এই কাজ কোন অশরীরী বা বিদেহী আত্নার। প্রচন্ড আক্রোশে সে এই কাজ করেছে। এর কিছু দিন পর এই শহরের আধিকারিকরা খোঁজ করে এই স্থানের পুরানো আদিবাসীদের কাছে যায়। অফিসাররা তাদের বলেন যে শহরের এক প্রান্তে তোমাদের একটা জায়গা দিচ্ছি সেখানে তোমরা দেবী জাহিরেরার থান স্থাপন করো। আদিবাসীরা তাদের প্রধান দেবতা মারাং বুরোর কাছে যায় তার অনুমতি পাবার জন্য। মারাং বুরো অনুমতি দিলে আদিবাসীরা অফিসারদের কথায় সম্মতি জানিয়ে সেই অদ্ভুত টাইপের গাছের একটা চারা পুঁতে তার গোড়ায় তেল সিঁদুর লেপে দেবী জাহিরেরার থান বসায়। তারপর দেবী জাহিরেরা একটু শান্ত হন। মৃত্যুর হারও আস্তে আস্তে কমে যায়।