কানাইয়ের মা কাল ভীষণ ব্যস্ত থাকবে। সব বাড়ি থেকে বলে দিয়েছে তাড়াতাড়ি যেতে, ঘরে ঘরে নাকি ঘটা করে ‘মেয়ে-দিন’ পালন হবে! ও মনে মনে ভাবল- “জানি নে বাপু, ‘মেয়েদিন’, ‘ছেলেদিন’ বলি কোনও দিন হয় না কি! আমার মা-বাপের যদি আলাদা আলাদা দিন হতো, তালি আমি জম্মাতাম কী করি, আর আমার কানাইও বা জম্মাত কী করি! ঢং দেকে গা জ্বলে যায় বাপু! কানাইয়ের বাপই ভালো, রেশকো চালাক আর মাজে মদ্দি এট্টু-আট্টু টনিক গিলে প্যাকাঠি পানা হাত-পা ছুড়ে গালমন্দ করুক, তা বলে ভালোবাসায় কোনও কেপনতা নেই কো! বাবুদের খালি নোক দেকানো কারবার”!
পরদিন কানাইয়ের মা কাকভোরে উঠে একেক করে সব বাড়ির কাজ সেরে ফেলল, শুধু ঘরের কাছে নুটুদের বাড়িটাই হয়নি।
“বড্ড নেট হয়ে গেল আজ! নুটুর মা’র কাচে আজ কী যে বকুনি খেতি হবে তা এশ্বরই জানে! এমনিতে বড় বোদি বেশ ভালোই, কিন্তু খেপি গেলি আর ওক্কে নেই! যাগ্গে, যা আচে কপালে দেকা যাবে”!
কানাইয়ের মা’কে গেট থেকে ঢুকতে দেখেই বড় বউদি বললেন-
“আজ আর তোকে বাসন মাজতে হবে না রে; শুধু ঘরটা মুছে দে, বাকিটা বিকেলে এসে করিস খোন”। এ কথা শুনে কানাইয়ের মা অনেকটাই স্বস্তি পেল- শরীরটা আর দিচ্ছিল না। যাইহোক খুশি মনে ঝাঁট দিতে গিয়ে দেখল অনেকগুলো গোলাপফুল ঘরের মেঝেতে পড়ে আছে। সেগুলো একটা একটা করে নিজের আঁচলে তুলে নিয়ে বলল-
“এই সুন্দর ফুলগুলো মাটিতে পড়ে কেনে গো বড় বোদি”?
বউদি ভাবলেন ওগুলো বুঝি ওর নেওয়ার ইচ্ছে। তাই একগাল হেসে বললেন- আমার ছেলেমেয়েদের তো তুই চিনিস। তা তুই নিতে চাইলে নিয়ে যা না”!
কানাইয়ের মা খুশি মনে গোলাপগুলো তুলে কাপড়ে গুছিয়ে নিল। কাজ সেরে যখন বাড়ি ফিরছিল তখন হঠাৎই একজন মাঝ বয়সী ভদ্রলোক হন্তদন্ত হয়ে এসে জিজ্ঞেস করলেন-
“কত করে বেচছো গো? লজ্জা কোরো না, তুমি যা চাইবে আমি তাইই দেব”! এই বলে পকেট থেকে দুটো একশ টাকার নোট বের করে ওর হাতে গুঁজে দিয়েই ফুলগুলো নিয়ে দৌড়ে চলে গেল! কানাইয়ের মা কিছুক্ষণ ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে দাঁড়িয়ে থেকে আবার বাড়ির দিকে রওনা দিল।
কানাই গোষ্ঠদের পুকুর থেকে চান সেরে এসে মা’কে জিজ্ঞেস করল-
“তোমার শরীল ভালো আছে তো মা”? “ঐ আচে আর কী, নুটুদের বাড়িতে আজ আর থালা-বাসন মাজতি হয়নি তাই অক্কে! সুদু আজ নয় রে; পায় ওজই বড় বোদি বাসনকোসন মেজি রাকে, আমায় আর মাচতি হয় না কো! আজ তো আবার আরেট্টা কাণ্ড ঘটল রে”! হাসতে হাসতে ছেলেকে গোলাপ-কাণ্ড বর্ণনা করে বলল-
সব শুনেঠুনে কানাই বলল- “দাঁড়াও দেকিনি, এই ফুলগুলো তো আমাকে দেই ওদের ছোটো বউ আজ সকালে কেনালে, তা তোমায় আবার দে দেলে কেনে”?
চোখ বড় বড় করে মা জিজ্ঞেস করল, “আমার কাজের বাড়িতে তুই কি কত্তি গেসলি”?
“আমি তো ওদের বাড়ির সামনে দে গোষ্ঠদের পুকুরে চান কত্তি যাচ্চিলুম, ত্যাকোন শুনলুম ওদের বউগুলো তোমার আসতে দেরি হচ্চি দেকে কী সব বলচিল! ত্যাকোন আমি মুখ বাড়াতেই আমাকে বারোটা গোলাপ নে এনে দিতি বলল। আমি আগে বাসনগুলো মেজে দে তারপর গোলাপফুল নে এনে দিলুম”।
এ কথা শুনে কানাইয়ের মা’র তো মাথায় রক্ত চড়ে গেল! তক্ষুণি ছুটল নুটুদের বাড়িতে। কানাইও মা’র পেছন পেছন ছুটল! লুকিয়ে!
বড় বউদির হাতে দুশো টাকা দিয়ে মা বলল- “তোমাদের তো সাওস কম লয়, আমার এক রত্তি ছেলেকে দে তোমরা বাসন মাজিয়েচো! ওকে দে আমি কিচ্চুটি করাই নে কো। ছেলে আমার অনেক কষ্ট করি পড়াশুনো কত্তিচে! এট্টু ভালোমন্দ খাওয়াতে পারি নে, আর সেকেনে তোমরা কি না……
নোক খুজে নিয়ো, কাল থিকি আমি আর আসতিচি নে”!
এসব বলে গজগজ করতে করতে বেরিয়ে গেল!
মা বেরিয়ে যেতেই কানাই ঢুকল-
“আগের কতা মা’কে কিচু বলনি তো জেটিমা”?
“তোর জন্যই আজ এত গণ্ডগোল! কে তোকে বলেছিল রোজ রোজ আমাদের থালা বাসন মেজে দিতে! দেখলি তো সব নিজের চোখে, কী অপমানটাই না করে গেল তোর মা”!
মুখ কাঁচুমাচু করে কানাই বলল-
“তোমার কী দোষ, মা’র কষ্ট হবে দেখে আমিই তো নিজে থিকি করিচি”!
একোন আমি যাই গো জেটিমা, এতখুণে মা আমায় খুজতে শুরু করে দেচে! তুমি কিন্তু মা’কে কিচু বলবে নি”!
★★★
পরদিন কানাইয়ের মা ঘুম থেকে উঠে ঘরের সব কাজকম্ম সেরে আগে গেল বড় বউদির কাছে-
গিয়ে দেখে ওই ভারী শরীর নিয়ে বউদি নিজেই বাসন মাজছে! দেখে খারাপ পেল, বলল-“অনেক হয়েচে, ওগুলো একে দাও, আমি সময় মতো এসি মেজে দেবোখোন, তুমি ওদের ইশকুল আর আপিসে যাওয়ার ব্যবস্তা করো গে যাও”!
কাঁপা গলায় বউদি বললেন-
“আমার কথা তোকে আর ভাবতে হবে না। কিছু জানলি না বুঝলি না, যা খুশি তাই বলে চলে গেলি! আমি যে কী জ্বালায় জ্বলছি তা তুই আর কী বুঝবি!
বউদির চোখে জল দেখে এবার কানাইয়ের মা বসে পড়ল বাসন মাজতে।
“সত্যিই তো, ওবাবে বলাটা মোটিই ঠিক হয়নি! আজ পায় একবছর হতি চলল বদ্দা ফিচ্চে না, একা একা তো সবই সামলাচ্চে! একজন মেয়েছেলে কিনা সবার খেয়াল রাকতিচে, নিজের দুটো ছেলেমেয়ে, বুড়ো বুড়ো শ্বউর শাউড়ি, দুটো দেওর এবং তাদের বউ। বাহ বাঃ, এসব কী চাট্টী খানি কতা! সুদু তাই লয়, রোজ রেতে নেওম করে বদ্দাকে ফোন করা, যার যা পোয়জন সব তাকে জানানো। বদ্দা নিজে না এলিও সাদ্দি মতো হিরুদাদাকে দে সব পাটিয়ে দেয়! বন্দুর আসা নিয়েও তো কত নোক কত কতা কইচে- তাও বউদি মুখ বুজে সব সজ্জি কচ্চে”!
বাসনগুলো মেজে বউদির হাতে দিয়ে যখন রান্নাঘর থেকে বেরোচ্ছে তখন ঘরের ভেতর থেকে লাঠিতে ভর দিতে দিতে এসে নুটুর ঠাকুমা বলে উঠলেন-
“কানাইয়ের মা’র গলা পাচ্ছি মনে হচ্ছে। অ বউ, তোর সঙ্গে আজকাল তো আমার দেখাই হয় না রে”!
“আমি জ্যাকোন আসি ত্যাকোন তো তুমি পূজো করো গো মা, তাই আর দ্যাকা হয় নাকো”।
“কাল থেকে আমি তোকে খুঁজে মরছি, আয় দেখি আমার সঙ্গে”!
“আমার যে মেলা কাজ পড়ি আচে গো মা”।
“আয় না বাপু, দু’মিনিটের তো কাজ”। নিজের ঘরে ডেকে নিয়ে এসে একটা ঠোঙা হাতে দিয়ে বললেন-
“এটা তোর জন্য রেখেছি, বউদের কালই দিয়ে দিয়েছি। একটা আলতা সিঁদুর, একটু মিষ্টি আর একুশটা টাকা। তোর মেসোমশাই বিশেষ বিশেষ দিনে আমাকে এসব দিতেন, এখন তো ওঁর কিছুই মনে থাকে না, বিছানায় শুয়ে শুয়ে শুধু বড় খোকার খবর নেয়! কেমন আছে, কবে আসবে, খুব দেখতে চায় ওকে! কেন জানি না, আর কারুর কথা জানতে চায় না! খোকার তো আসার সময়ই হয় না! অথচ দেখ, ওর বন্ধু হিরু কবে চলে এসেছে! সেনাদের চাকরি তো অনেকেই করে বাবা, তাই বলে….”! কাপড়ের খুঁট দিয়ে চোখ মুছতে মুছতে আরও বললেন- “আমরা চোখ বুঝলে তখন ঠিক আসবে”!
“তা কাল নাকি কী সব মেয়েদের দিন পালনের উৎসব টুৎসব ছিল? আমরা বাপু ওসব বুঝি না রে। আরে বাবা, দেয়া-থোয়া, ভালোবাসা- এসব তো আমাদের চিরকালের অভ্যেস, যা আমরা লালন করে আসছি বাবা-জ্যাঠার আমল থেকে। কিন্তু আজকাল দেখ, সব পালনের উৎসব! আজ অমুক ডে, কাল তমুক ডে, আর পরশু দিনই ডিভোর্স দে”! কানাইয়ের মা এতক্ষণ ধরে মাসিমার কথার তালে তাল ঠুকে কখনও হেসেছে, কখনও বা কেশেছে, কিন্তু শেষে এসে এক্কেবারে মুখ থুবড়ে পড়েছে! তাই আর ঝুঁকি না নিয়ে মাথা চুলকে বলেই ফেলল-
“ও মা, তুমি যে কী সব শক্ত শক্ত কথা বলতিচো ওসব আমার গোবর মাথায় ঢুকতিচে না গো”।
“ঠিকই বলেছিস, ওসব তোদের মাথায় না ঢোকাই ভালো! যা বলছিলাম- আজ আমাদের বাড়িতে দুপুরে চাট্টি মাছ-ভাত খেয়ে যাস না রে। কানাইকেও সঙ্গে নিয়ে আসিস”। “নাগো মা, সেটি হবেনি কো। কেন বলি, তালি শোনো- আমার সোয়ামী লাইন থেকে ফেরার সময় আমার জন্নি চাট্টি কুচো মাচ নে আসে কম দামে; একদিন নয় গো, পিতিদিন! ও জানে- এট্টু মাচের গন্দেই আমি পেট পুরি খে-নি”!
এ-কথা বলেই আহ্লাদী লজ্জা মাখো ভঙ্গীতে ঘোমটায় খানিক আড়াল দিয়ে ডান পায়ের বুড়ো আঙুলটা মেঝের উপর নাড়ীয়ে বাঁকিয়ে সোহাগ প্রকাশ করল একেবারে নতুন বউয়ের মতো করে! ওর কথা শুনতে শুনতে মাসিমাও যেন নিজের বউবেলাকে এক ঝলক দেখে ফেলল! “জানো তো মা, ঐ মাচ আমার বেধবা শাউড়ি নিজের হাতে আণ্ণা করে! আর আমরা সব্বাই তা দাওয়ায় বসে দুকুর বেলায় চেটেপুটে খাই গো”! এবার লজ্জার মাত্রা আরও একটু বাড়িয়ে দিয়ে বলল- “আর এট্টা কতা শুনলে তুমিও নজ্জা পাবে গো মা! জানো তো, আমি কাজ থিকে ফিললে কানাইয়ের বাপ আমায় কিচ্চুটি কত্তি দেয় না”!
মাসিমার কানের কাছে মুখটা আরও একটু এগিয়ে নিয়ে বলে-
“এমনকী দুকুরের খাবারটাও তোমার ছেলে আমায় বেড়ে দেয় গো”! কথা শেষ করে মুখ চেপে এমন হাসি হাসল যে খুশির ঢেউ ওর সারা শরীরে খেলে গেল!
বড় বউদি ততক্ষণে সবাইকে খাইয়ে দাইয়ে স্কুল-অফিসে পাঠিয়ে দিয়ে একটু নিঃশ্বাস ফেলে শাশুড়ি মা’র ঘরের দিকে আসছিলেন। কানাইয়ের মা’কে দেখতে পেয়ে বললেন, “এই যে বড়লোকের বিটিলো, আমি দিনদিন গরিব হচ্ছি আর তুই তো দেখছি কারণে অকারণে সবাইকে টাকা বিলোচ্ছিস ! এই নে তোর দু’শ টাকা। তা বলি….
বউদিকে থামিয়ে দিয়ে কানাইয়ের মা বলল-
“আরে শোনো শোনো কী হয়েছেল সেদিন”!
বড়ো বউদির সঙ্গে হাসি মজা সেরে যখন অন্য বাড়ির কথা মনে পড়ল, তখন তেড়ে-ফুঁড়ে ছুটল বাকি কাজ সারতে!
★★★
আজ টুসির স্কুলে পরপর দু’জন টিচার না আসায় শেষের ক্লাসদুটো আর হয়নি। তাই অনেক আগেই বাড়ি ফিরে এল। এসে শুনল- মা একটা জরুরী কাজে কোথাও বেরিয়েছে, আসতে দেরি হবে। এমনিতেই দু’দিন ধরে টুসির মনটা বিগড়ে রয়েছে! তারওপর মা’কে দেখতে না পেয়ে ভারি রাগ হল! ওর ক্লাসের মেয়েরা আজকাল মা আর হিরু কাকুকে নিয়ে বড্ড বেশি নোংরা নোংরা কথা বলছে, কেউ কেউ তো এও বলছে……….! ছি ছি!
এতদিন গায়ে না মাখলেও আজকাল কিন্তু মা’র ওপর বেশ সন্দেহ হচ্ছে টুসির! আজই সুযোগ মা’র ঘরে ঢোকার। আজকাল মা ভাইকে ছাড়া কাউকেই নিজের ঘরে ঢুকতে দেয় না! আলমারিটাও সারাক্ষণ আটকে রাখে! কেমন যেন হয়ে গেছে মা! এসব নিয়ে প্রশ্ন করলেই মা খুব রেগে যায়, কিছু যেন লুকোচ্ছে!
“এতদিন হয়ে গেল বাবাও যে কেন আসছে না? তাহলে কী ওরা যা বলছে সেটাই সত্যি! মায়ের ওপর রাগ করেই কি বাবা আসছে না”!
গুটিগুটি পায়ে মা’র ঘরে ঢুকে পড়ল টুসি। প্রথমে গেল টেলিফোনের কাছে, এর আগে কখনও বাবার অফিসে ফোন করেনি। মিলিটারি-মানুষ তো খুব রাগী হয়, যদি বকে দেয়! তবুও সাহস করে ডায়াল করল; কিন্তু কোনও সাড়াশব্দ নেই কেন? ফোনটা কি ডেড হয়ে গেল! উঃ, আজই হতে হল! রাগে দুঃখে কান্না পেয়ে গেল! কিন্তু কালই তো মা চিৎকার করে বাবার সঙ্গে কথা বলছিল! ঠাকুমাকে- দাদানকে শুনিয়ে শুনিয়ে সে কত মজার মজার কথা! টুসি এবার টেলিফোন সেটটাকে নেড়েচেড়ে দেখতে লাগল, এ যে অবাক কাণ্ড- টেলিফোনের তারটাই তো কাটা! মাকড়সার জাল জমে আছে তারের ওপর!
সব যেন কেমন গোলমাল লাগছে, মনে হচ্ছে ঘরটা যেন ঘুরছে! কিন্তু এই সুযোগ রোজ রোজ পাওয়া যাবে না; মন শক্ত করে এগিয়ে গেল আলমারির দিকে….